যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে তেহরান সতর্ক করে বলেছে, কোনো চুক্তি এখনই হচ্ছে না।
সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আলোচনাধীন বিষয়গুলোর একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছি। এ কথা সত্য। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র- এমনটা বলা ঠিক হবে না।’
বাঘাই আরও বলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে একটি সাধারণ সমঝোতাও তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তি এখনই হচ্ছে না।
বাংলাদেশ সময় রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, খুব শিগগিরই ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়টিও আছে। একইদিন ভারতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, বিশ্ববাসী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুখবর পাবে। তবে রাতে ট্রাম্প জানান, তিনি চুক্তির বিষয়ে তড়িঘড়ি করতে বারণ করেছেন।
চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেওয়ার আগে ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, ইরানের উদ্দেশ্য প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক বা এক ধরনের রূপরেখা চুক্তি তৈরি করা। এর পরবর্তী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
দুই পক্ষ পৃথকভাবে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কথা বললেও মূল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কে কতটুকু ছাড় দিতে পারে তা স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে আছে- পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, জব্দকৃত সম্পদ ও লেবানন প্রসঙ্গ।
পারমাণবিক কর্মসূচি
ইসমাইল বাঘাই জানান, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি প্রাথমিক রূপরেখার অংশ না। বরং পরবর্তী পর্যায়ে এটি পৃথক আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকবে। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান বিষয় হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। যেটির মজুত ত্যাগ করার বিষয়ে তেহরানের একটি দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি আছে।
ইরানের ফার্স ও তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ইউরেনিয়ামের মজুত স্থানান্তর, সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়ে কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। উভয় সংস্থাই উল্লেখ করেছে, সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
হরমুজ কীভাবে খুলবে?
সমঝোতার একটি জটিল ও অমীমাংসিত বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা। ইরান জোর দিয়ে বলছে, তেলবাহী জাহাজ চলার সময় তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে। ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিটি চূড়ান্ত হলেও কৌশলগত এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনা বজায় থাকবে।
তাসনিম নিউজ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, হরমুজ প্রণালির সার্বিক পরিস্থিতি কোনোভাবেই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না। ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের কথা উল্লেখ করে তারা আরও লিখেছে, রূপরেখা অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।
জব্দ সম্পদ ও লেবানন
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেকোনো প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পূর্বশর্ত হতে হবে এই আটকে থাকা সম্পদের অন্তত আংশিক ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া। একেবারে প্রথম ধাপে যদি তাদের অবরুদ্ধ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ ছেড়ে দেওয়া না হয়, তবে কোনো চুক্তি হবে না।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের আধা-সরকারি এই সংস্থাটি লিখেছে, আটকে থাকা বাকি তহবিল ধারাবাহিকভাবে বা নিয়মিত ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তির আগে নিশ্চিত করতে চায় তেহরান। আরেক সংস্থা ফার্স লিখেছে, সম্ভাব্য সমঝোতার আওতায় আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল লেবাননে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে প্রতিদিন বিমান হামলা চালাচ্ছে। তাসনিম জানিয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির আগে একটি সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করা হবে। সেখানে লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানের বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করা থাকবে।




