ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ছয় মাস পার হওয়ার পর তিন দেশেই সরকারকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে জনসমর্থন কমছে এবং ইরানে বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট।
ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও দেশটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ চেয়ে আসছিলেন। তবে যুদ্ধের পরও ইরানের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দামের ক্ষেত্রে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে পেট্রোলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা অ্যাপ্রুভাল রেটিংও সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও তাঁর সমালোচনা বাড়ছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বোঝা অনেক মার্কিন নাগরিকের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন আমেরিকানের মধ্যে একজনেরও কম ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে সমর্থন করেন।
তেলহামির মতে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে—এমন ধারণাও মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ইসরায়েল-সংক্রান্ত বিষয়টি এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়, বরং মানুষের আর্থিক অবস্থা ও মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছে।
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে গত সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও সুবিধাজনক একটি চুক্তিতে তেহরানকে রাজি করানোর লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প এ উদ্যোগকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরান সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি। মার্কিন লেখক ও কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইরানের কাছে এখনও অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং তা আরও সমৃদ্ধ করার সক্ষমতাও রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে ইরান তার প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রেখেছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হলেও এখনও সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের জনবিক্ষোভ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আশা করেছিল, তাও দেখা যায়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উদ্যোগের ব্যর্থতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন মিলার। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন প্রশাসন এমন সামরিক অভিযান শুরু করার বিষয়ে আরও সতর্ক হবে।
ইসরায়েলেও নেতানিয়াহুর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র টিচিং ফেলো আহরন ব্রেগম্যান বলেন, গাজা, লেবানন এবং ইরানের ক্ষেত্রেও নেতানিয়াহুকে ব্যর্থ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর মতে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার পরিবর্তে নেতানিয়াহু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগ সফল হয়নি এবং ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির আগের চেয়ে আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ইরানকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার উদ্যোগও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের তাঁকে আক্রমণের সুযোগ দিয়েছে। ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভির মতে, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন যুদ্ধটি তাঁর নির্বাচনী অবস্থান শক্তিশালী করবে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল না আসায় তা রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারেনি।
ইরানের অর্থনীতিতেও যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে। ইরানের নিজস্ব হিসাবে, এপ্রিল নাগাদ যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। গত মাসে দেশটির বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু মার্কিন অবরোধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
তবে এসব চাপের মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ইরান বিষয়ক গবেষক ও লেখক শেরভিন মালেকজাদে বলেন, অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতির সংকট গুরুতর হলেও তা এখনও সামাল দেওয়ার মতো পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্বের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার ধারণাকে কেন্দ্র করেই ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, যা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশটির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরানের সরকারের অভ্যন্তরেও মতপার্থক্য রয়েছে। কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দিয়েছে। তবে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও কোনো পক্ষই পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নয়।
ইরানের জন্য সংঘাতটি এখন শুধু সামরিক প্রতিরোধের বিষয় নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য এবং ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে ব্যর্থতা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও ইরানকে এখনও গভীর ও অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


