ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের ক্ষমতার সর্ববৃহৎ হাতিয়ার হিসেবে ঘোষণা করেছে ইরান। দোহায় মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো পরোক্ষ বৈঠক হবে না বলে তেহরান জানিয়ে দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ফি আরোপ করা নিয়ে ওমান ও ইরানের যৌথ পরিকল্পনায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
আলজাজিরার খবর অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পর ইরানের তেল রপ্তানি বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখনও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এই জলপথে সামুদ্রিক পরিষেবার জন্য ফি মওকুফের সুবিধাটি কেবল সাময়িক ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য।
গালিবাফ বলেন, ‘এগুলো আমাদের আঞ্চলিক জলসীমা। যুক্তরাষ্ট্র এখানে অযথা বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে যে ইরান হরমুজকে সামরিকীকরণ করেছে। কিন্তু আমরা কোনো অবস্থাতেই এই অবস্থান থেকে পিছু হটব না।’ তিনি এই জলপথকে যুদ্ধের সময়ে আল্লাহর দেওয়া একটি ঐশ্বরিক উপহার এবং ইরানের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ওমান-ইরানের যৌথ ফি আরোপের পরিকল্পনা
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য একটি পরিষেবা ফি বা টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকে বাণিজ্যিক জাহাজের বিনামূল্যে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও তা কেবল ৬০ দিনের জন্যই প্রযোজ্য।
দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে এই রুটটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইরান ও ওমান এখন যুদ্ধ-পরবর্তী একটি বিজনেস মডেল দাঁড় করাতে চাইছে। ওমান চায়, এই ফি যেন স্বেচ্ছামূলক হয়। কিন্তু ইরান এটিকে বাধ্যতামূলক করার পক্ষে। তবে ওমান যদি রাজি না হয়, তবে তেহরান একাই এই ফি আরোপ করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এই পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে একপ্রকার উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কেউ এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এটি আন্তর্জাতিক জলসীমা। ওমানকে সবার মতো আচরণ করতে হবে। অন্যথায় আমরা তাদের উড়িয়ে দেব।
যদিও ওমান পরে মার্কিন প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে, তাদের টোল আদায়ের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা
হরমুজ প্রণালিতে ওমান ঘোষিত একটি নৌরুটের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। সম্প্রতি ইরানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত রুট অমান্য করায় একটি বিদেশি কনটেইনার জাহাজ হরমুজে আটকা পড়েছে। মেরিটাইম এআই কোম্পানি উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। অনেক নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাঙ্কার ভুয়া ইউরোপীয় পতাকা ব্যবহার করে যাতায়াত করছে।
এই অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার ২৮ সেন্ট এবং মার্কিন ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৬৯ ডলার ৮৪ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ার পুঁজিবাজারেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে।
দোহায় কারিগরি আলোচনা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
কাতারের রাজধানী দোহায় পরমাণু ইস্যু, কূটনীতি ও অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ নিয়ে দুই পক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো সরাসরি বৈঠক হচ্ছে না। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলেও যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক শক্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে চীন এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে বেইজিং সবচেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করেছে। আর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যখনই এই অঞ্চলের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ আসবে, তখন আমরা সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতে পারি। তবে সবার আগে যুদ্ধ অবশ্যই থামতে হবে।’




