কৃষকের গোলা খালি, চালের বাজার চড়া

‘ঈদের আগে চাইলের কেজি কিনলাম ৪৮ ট্যাকায়। অহন ৫৬ ট্যাকা করে চায় দোকানদার। এরুকুমভাবে দাম বাড়লে আমরা গরিব মাইনষেরা বাঁচমো ক্যামনি?’ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কয়েকটি দোকান ঘুরে চালের বাড়তি দাম দেখে হতাশায় সমকালকে এভাবেই বলছিলেন রাহেলা আক্তার। শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামেই চাল কিনতে হয়েছে তাঁকে।

টানাটানি করে সংসার চলছে নির্মাণ শ্রমিক জয়নাল আবেদিনের। কারওয়ান বাজার থেকে ৬৫ টাকা দরে পাঁচ কেজি পায়জাম চাল কিনেছেন তিনি। সমকালকে এই ক্রেতা বলেন, ‘এক দিনে যা আয় করি, তার অর্ধেকের বেশি চলে যায় চাল কিনতে। পোলাপানের পড়ালেখা আর ঘর ভাড়া দেব কীভাবে? মোটা চালের কেজি ৫০ টাকার ওপরে। সংসার চালানোই এখন অনেক কষ্ট।’

শুধু রাহেলা বেগম আর জয়নাল আবেদিন নন, চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপদে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। মাসখানেক আগে বোরো ধান উঠেছে কৃষকের ঘরে। বাজারে নতুন চালের সরবরাহ ঘাটতি তেমন একটা নেই। তবে ভরা মৌসুমে হঠাৎ চালের বাজার তেতেছে। মানভেদে কেজিতে চালের দর বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ টাকা।

হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ বিশ্লেষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের। তাদের যুক্তি, কৃষকের ঘরে এখন ধান নেই। তাদের গোলা খালি। সব কিনে নিয়েছেন বড় করপোরেট ব্যবসায়ীরা। তাদের হাতেই এখন বাজারের নাটাই।

কেজিতে কত বাড়ল

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা, মালিবাগ ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা দেখা গেছে, সরু চালের মধ্যে মিনিকেটের কেজি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা ও নাজিরশাইলের কেজি ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে এই দুই জাতের চালের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। মাঝারি চাল (পাইজাম ও লতা) বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬৫ টাকায়, যা সাত-আট দিন আগে ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) দাম। এসব চালের কেজি এক সপ্তাহ আগে কেনা গেছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। এখন প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়।

00036 1781843076

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। সরু চালের দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে এক দশমিক ২৯ শতাংশ, মাঝারি চালের বেড়েছে দুই দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মোটা চালের দর বেড়েছে তিন দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে বছরের ব্যবধানে এই বাড়ার হার আরও বেশি। এক বছরে এই তিন ধরনের চালের দাম বেড়েছে যথাক্রমে তিন দশমিক ২৯, দুই দশমিক ৫০ ও ছয় দশমিক ৬৭ শতাংশ হারে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, দরিদ্ররা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কেউ কেউ চাহিদার চেয়ে কম কিনছেন। কৃষকের গোলার ধান এখন মজুতদারদের কাছে। তাদের কারসাজি বন্ধ না করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিশাল চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ৮ থেকে ১০টি বড় করপোরেট কোম্পানি। তারা আগেই কৃষকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে। এখন তারা ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে চালের বাজারকে উত্তপ্ত করছে।

প্রান্তিক কৃষকের ধান শেষ ও ব্যাংক সুদের প্রভাব

চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো, মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি শহিদুর রহমান পাটোয়ারী চালের দাম বাড়ার জন্য ধানের মৌসুম শেষ হওয়া এবং ঋণের সুদকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, পাইকারি বাজারে কেজিতে সর্বোচ্চ দুই টাকা বেড়েছে, যা স্বাভাবিক। বোরো মৌসুমে প্রান্তিক চাষির কাছে যে উদ্বৃত্ত ধান ছিল, তা প্রায় শেষ। ধান এখন বড় কৃষক তথা করপোরেটদের কাছে সংরক্ষিত। তারা ইচ্ছা অনুযায়ী বাজারে ধান ছাড়ছেন। ফলে বাজারে সরবরাহ কমেছে।

শহিদুর রহমান বলেন, ধান মজুত রাখতে গিয়ে ১৫ শতাংশ হারে ব্যাংক সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে প্রতি মাসে ধানের পেছনে খরচ কেজিতে প্রায় দেড় টাকা বেড়ে যায়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকি চলছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও তদারকি হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকায় অধিদপ্তরের ছয়টি টিম ও সারাদেশে ৪০ থেকে ৪৫টি অভিযান হচ্ছে। এরপরও কেউ অবৈধ মজুত করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি)

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর