রুদ্ধশাস ম্যাচটি যখন শেষ হয় তখন ডালাসের আকাশে চেনা সেই গোধূলির আলোতেও উজালা ইংল্যান্ড। মাঠের বাইরে ইংলিশ সমর্থকদের মাতাল করা ‘থ্রি-লায়ন্স’ গানের সুর আর সন্ধ্যায় লোকাল পাবগুলোর রেকর্ড পরিমাণ বিয়ার বিক্রির উন্মাদনা। দৃশ্যটা আসলে বদলাতে শুরু করে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। ড্রেসিংরুমের সেই অন্ধকার টানেল থেকে প্রথমার্ধের ২-২ স্কোরের খাঁচা ভেঙে দ্বিতীয়ার্ধে যখন তিনটি সিংহ বেরিয়ে আসে, তখন ডালাসের মাঠটা আর সকার ফিল্ড ছিল না। ওটা তখন হয়ে উঠেছিল এক রোমহর্ষক শিকারের ময়দান। হ্যারি কেন, জুড বেলিংহাম আর মার্কাস রাশফোর্ড–ইংল্যান্ডের জার্সি বুকে থাকা তিন সিংহ যেন তখন খাঁচা খোলা। আহত, ক্ষুধার্ত আর বড্ড হিংস্র– তাদের সামনে ক্রোয়াট যোদ্ধারা তখন যেন বড্ড অসহায়।
প্রতিবারই ইংলিশ মিডিয়া তাদের দলকে যা না তার চেয়েও বেশি মোহিমান্বিত করে। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের কাগুজে সিংহ প্রমাণিত করে। এবার যেন এই ইংল্যান্ড সত্যিকার অর্থেই সিংহের মেজাজ নিয়ে এসেছে বিশ্বকাপে। ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-২ গোলে সমতায় থাকার পর যেভাবে তারা ৪-২ গোলে ম্যাচটি জিতেছে তারপর ইংলিশ হোলিগানারদের বাড়াবাড়িতে মোটেই অবাক হয়নি ডালাস পুলিশ ও ফায়ার মার্শালরা।
ফুটবল ইংলিশদের কাছে অহংকার, ফুটবল তাদের আভিজাত্য। এই দলটার আভিজাত্যের শিকড়টা লুকিয়ে আছে ইউরোপের তিনটি প্রধান ফুটবল-সাম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদে। একটু ভেবে দেখুন। জুড বেলিংহাম যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সাদা জার্সিতে মাঠ মাতান, তখন তিনি কেবল একজন মিডফিল্ডার নন, তিনি রিয়াল মাদ্রিদের নতুন ফুটবল-যুবরাজ। হ্যারি কেইন যখন বাভারিয়ার মিউনিখে যান, তিনি বয়ে নিয়ে বেড়ান বায়ার্ন মিউনিখের সেই চিরন্তন, খুনে ও নিখুঁত ফিনিশারের রাজদণ্ড। আর মার্কাস রাশফোর্ড? ন্যু ক্যাম্পের ঘাসে বার্সেলোনার সেই শৈল্পিক তিকিতাকার ছন্দে যিনি নিজের গতিকে নতুন করে চিনেছেন। ক্লাব ফুটবলের এই তিন ভিন্ন পরাশক্তির ট্রফি-জয়ের মেজাজ যখন থ্রি-লায়ন্সের এক জার্সিতে এসে মেশে, তখন একটা বারুদ তৈরি হতে বাধ্য।
কিন্তু প্রথমার্ধে মনে হচ্ছিল গ্যারেথ সাউথগেটের সেই পুরোনো মেদযুক্ত, জড়তায় ভরা রক্ষণশীল ইংল্যান্ডই তো ফিরে এলো! থমাস টুখেলের ওই ড্রেসিংরুমের খাঁচায় কি তবে সিংহরা বন্দিই থেকে যাবে? আসল গল্পটা শুরু হলো ওখানেই। হাফ টাইমে টুখেল বা তাঁর সহকারী অ্যান্থনি ব্যারি কোনো চড়া সুরের ব্রিটিশ মেজাজে চিৎকার করেননি। টুখেলের মধ্যে একটা জার্মান দার্শনিক ভাব আছে। তাঁর ড্রেসিংরুমে নাকি কোনো রণহুঙ্কার হয়নি। টুখেল শুধু বেলিংহাম আর কেইনের পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘যদি হারতেই হয়, তবে নিজেদের স্টাইলে হেরে এসো। কোনো ভয় রেখো না।’
ব্যাস, ওইটুকুই। খাঁচার দরজাটা ওখানেই খুলে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ঠিক শুরুতেই জুড বেলিংহাম যখন ক্রোয়াট রক্ষণভাগকে এক ঝটকায় বোকা বানিয়ে কোনাকুনি শটে গোলটা করলেন, তখন তাঁর চোখেমুখে রিয়াল মাদ্রিদের সেই রাজকীয় ঔদ্ধত্য। তিনি ফুটবল খেলছিলেন না, ডালাসের ঘাসে যেন পা দিয়ে কবিতা লিখছিলেন। আর হ্যারি কেইন? ম্যাচের চাপের মুখে হিমশীতল মস্তিষ্ক। আধুনিক ফুটবলের এই চিরসবুজ হিরো যখন নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করলেন, তখন বোঝা গেল কেন বায়ার্ন মিউনিখ তাঁর জন্য অত টাকা ঢেলেছিল। কেইন যখন ধেয়ে আসেন, তাকে কোনো ডিফেন্সের বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায় না।
খেলার বয়স যখন সত্তর মিনিট, তখন টুখেল চাললেন তাঁর শেষ ঘুঁটি। অ্যান্থিন গর্ডনকে তুলে মাঠে নামালেন মার্কাস রাশফোর্ডকে। বার্সেলোনার সেই চেনা ক্ষিপ্রগতি নিয়ে রাশফোর্ড যখন ক্রোয়াট ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে চতুর্থ গোলটি করলেন, ক্রোয়েশিয়া তখন ম্যাচ থেকে পুরোপুরি উধাও!
ম্যাচের পর টুখেল স্বীকার করেছেন সিংহ দুয়ার খুলে দিতে তাঁর সময় লেগেছিল। ‘আমার মনে হয় (শুরুতে) আমরা কিছুটা স্নায়ুচাপে ছিলাম, সম্ভবত একটু বেশিই করতে চেয়েছিলাম। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই অতিরিক্ত ভেবে ফেলেছিলাম এবং এতে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বেশি সময় নষ্ট হয়েছে। যখন শর্ট পাস খেলার সুযোগ ছিল, আমরা লং পাস খেলেছি; আর যখন লং পাস খেলার দরকার ছিল, তখন শর্ট পাস খেলেছি। রক্ষণে খুব বেশি সময় কাটিয়েছি আমরা, যেটা আমাদের ধরন নয়, আমরা যা চাই সেটার সঙ্গেও যায় না। দুইবার এগিয়ে গিয়েও আমরা চাপমুক্ত থাকতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, আমরা কেবল লিড টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি, যেটার খেসারত দিতে হয়েছে, যা মানসিকভাবে সহজ ছিল না। তবে দ্বিতীয়ার্ধে দলের প্রতিক্রিয়া আমার দারুণ লেগেছে।’ টুখেল সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়া তিন সিংহের গর্জন কতটা ভয়ংকর।




