বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। এই জুনের প্রথম তিন সপ্তাহে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যান। অথচ নব্বইয়ের দশকে এই সংখ্যা ছিল গড়ে মাত্র ৩০ জন।
বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর প্রাণহানি কমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া হয়েছিল একের পর এক প্রকল্প। ৪০ লাখ তালগাছ রোপণ, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সেন্সর বসানোসহ সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে শত শত কোটি টাকা। তবে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পই কার্যত ভেস্তে গেছে। কোথাও গাছের অস্তিত্ব নেই, কোথাও যন্ত্র অকেজো, আবার কোথাও প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে হয়েছে অনিয়ম ও অপচয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বজ্রপাত এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপের বদলে লোকদেখানো প্রকল্পের কারণে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।
৪০ লাখ তালগাছের প্রকল্পে নেই গাছ
বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। এতে খরচ হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সরকারের যুক্তি ছিল, তালগাছের উচ্চতা ও গঠন বজ্রপাত মাটিতে নামিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তবে দুই বছর না যেতেই দেখা যায় অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও গবাদি পশু খেয়ে ফেলেছে, কোথাও পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে। আবার কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
রাজশাহীতে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১৪ লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। খরচ হয়েছিল দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। এখন সড়কের পাশে সেই গাছের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় দুই লাখের বেশি তালগাছের চারা ও বীজ রোপণে খরচ হয়েছিল ছয় কোটির বেশি টাকা। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ৯৫ শতাংশ গাছই টেকেনি।
সুনামগঞ্জে ২০১৮ সালে এক লাখ এবং পরে আরও দুই হাজার তালগাছ লাগানোর কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
নেত্রকোনায় দুই লাখের বেশি তালগাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছিল। স্থানীয় কৃষিবিদ ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, সেই গাছগুলোরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র পাওয়া গেছে।
কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড, অধিকাংশই অচল
তালগাছ প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় ৩৩৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানোর জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এসব দণ্ডের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিজমি বা হাওরে না বসিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, বাজার কিংবা মুজিবপল্লিতে বসানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি দণ্ড স্থাপন করা হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, সেই দণ্ড কোথায় আছে স্থানীয় লোকজনই জানেন না। বেশির ভাগ বজ্রনিরোধক দণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণও হয় না। বগুড়ায় ২০২১ সালে প্রায় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১টি যন্ত্র বসানো হয়েছিল। এসবের ১৯টিই অকেজো বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
নেত্রকোনায় ২০২২ সালে স্থাপন করা ৩২টি দণ্ডের অধিকাংশই কার্যকারিতা হারিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ হাওরাঞ্চলের বদলে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বসানো হয়েছিল সেগুলো।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের যন্ত্রাংশ বসানোর ছয় মাসের মধ্যে চুরি হয়ে যায়।
বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে ‘লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর’ স্থাপন করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই সেন্সরগুলো বজ্রপাতের ১০ থেকে ৩০ মিনিট আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন অধিকাংশ সেন্সর কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কৃষক ছাউনি
সরকারি প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি ছোট উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে উপজেলার শিবরাম গ্রামে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি কৃষক ছাউনি। ঝড়বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।
স্থানীয় কৃষক আল আমিন বলেন, ‘আগে বৃষ্টি এলেই মাঠে আতঙ্কে থাকতাম। এখন অন্তত আশ্রয় নেওয়ার একটা জায়গা আছে।’
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, তালগাছ বড় হতে কয়েক দশক সময় লাগে। কিন্তু কৃষক ছাউনি দ্রুত নির্মাণ করা সম্ভব এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানি কমাতে কার্যকর হতে পারে।
আবারও নতুন প্রকল্প
পুরোনো প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেই নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলে সাইরেন স্থাপন, শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণ এবং কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুস ছোবহান জানান, আগে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। কমিশনের পরামর্শে সেটি ছোট পরিসরে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
তবে নতুন উদ্যোগ নিয়েও আশাবাদী নন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, আগের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের নামে লুটপাট হয়েছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মকর্তা একই রয়েছেন। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন প্রকল্পও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি আছে।




