কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর পাহাড়ধস মিলিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বড় মানবিক সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ– এই সাত জেলায় লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি। কোথাও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আবার কোথাও কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদি পশুর খামার একসঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাবে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ এবং পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮।
এই বন্যার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস। সোমবারও দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় আরও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আক্রান্ত ৫৮ উপজেলা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌর এলাকায় বন্যা হানা দিয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু হলেও সেখানে উঠেছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নিজ নিজ এলাকায় বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। যাদের বড় অংশই খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চট্টগ্রাম। এখানকার ১৬ উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দি হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার। এখানে ১৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন ১২ জন। ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, টাকা, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৬ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৫৮ হাজার ২৭। সেখানে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন, এর মধ্যেও পাঁচজন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া একজন নিখোঁজ রয়েছেন। জেলার ২৭টি কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
বান্দরবানে সাত উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে পানিবন্দি রয়েছে ১২ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫০০। সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন দুজন। ২২০টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ছয় হাজার ২৫০ জন।
রাঙামাটিতে ৯ উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৪৪টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা তিন হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০টি কেন্দ্রে তিন হাজার ৬৩৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌর এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৭৩টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। ১৫০ কেন্দ্রে দুই হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে সাত হাজার ৩০৮ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ২০টি কেন্দ্রে দুই হাজার ১৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
হবিগঞ্জের তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ছয় হাজার ৪৪৪ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ হাজার ১৪০। দুটি কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে এখনও কেউ আশ্রয় নেননি।
অপ্রতুল বরাদ্দ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সাত জেলার জন্য নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ মানুষের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ২৮ টাকা। অন্যদিকে, পানিবন্দি দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের হিসাবে পরিবারপ্রতি বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ টাকা। একই সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ২৫০ টন চাল। সেই হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিপ্রতি চালের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।
যদিও সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চাল, টাকা, শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায়ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ক্ষতি
বন্যার প্রভাব শুধু মানুষের বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি খাতেও এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি রয়েছে।
পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন সবজি, পাট, মরিচ, আদা, হলুদ, পানের বরজ এবং বিভিন্ন ফলের বাগানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। আরও প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমির ফসল এখনও ডুবে আছে। পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর আউশ এবং ৫৫০ হেক্টর আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, আক্রান্ত হওয়া মানেই সব জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। পানি দ্রুত নেমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। তবে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে আরও সময় লাগবে।
তিন পার্বত্য জেলার কৃষকের আরেক দুশ্চিন্তার নাম কাঁঠাল। পাহাড়ে এ বছর ফলন ভালো হলেও টানা বৃষ্টিতে গাছে থাকা ফল পচে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে নেওয়ার আগেই নষ্ট হচ্ছে ফল। সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় কৃষক লোকসান গুনছেন। একই সঙ্গে জুমচাষের আদা, হলুদ ও সবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে প্রাথমিক হিসাবে তিন হাজার ৭০২ একর জমির ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমনের বীজতলার পানি দ্রুত নেমে গেলে কৃষকরা ফের বীজতলা তৈরি করে অনেকটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব অবস্থায় থাকায় এ ক্ষতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ কম। তিনি মনে করেন, চলতি বছর হাওর অঞ্চলের বোরো ক্ষতির পর এখন আউশ ও আমনেও চাপ তৈরি হওয়ায় ধান উৎপাদনে ঝুঁকি বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে যদি মৌসুমের শেষদিকে বন্যা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, ভাসমান বীজতলা, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত আমনের চারা রয়েছে, যা বন্যাকবলিত এলাকায় সরবরাহ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, যেসব এলাকায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন জেলা থেকে চারা পাঠানো দরকার। ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে বড় ধরনের চারার সংকট হবে না। তবে বন্যার কারণে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হবেই।
প্রাণিসম্পদ খাতেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উদ্বেগজনক। শুধু চট্টগ্রামেই প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার ক্ষতির তথ্য দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। বন্যায় ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল এবং প্রায় ৪৩ হাজার মুরগি মারা গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার একর ঘাসের প্লট এবং বিপুল পরিমাণ শুকনো পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। এতে অনেক খামারি গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের খামার পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খামারি ফরহাদুল ইসলাম জানান, ঝড়ের সময় একটি গাছ তাঁর খামারের ওপর ভেঙে পড়ে তিনটি গরু মারা গেছে, আরও কয়েকটি আহত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামারিদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষুরা রোগ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বন্যায় মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর, দিঘি ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে চার হাজার ১০৬ হেক্টর জলাশয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২০টি চিংড়ি ঘের। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। বহু মাছচাষি এক মৌসুমের পুরো বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
এদিকে বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এসব সড়ক পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ কৃষি ও জীবিকার পাশাপাশি অবকাঠামো পুনরুদ্ধারেও বড় ব্যয়ের মুখে পড়বে সরকার।
জানতে চাইলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। যেখানে বীজ বা চারা সংকট তৈরি হবে, সেখানে সরকার চারা সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছে।




