সৌদি প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ ১৪ দেশের এই জোটের মূল লক্ষ্য জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখা

0
3

লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা থেকে জাহাজ রক্ষার জন্য সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স নামের এই জোটে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। ১৪ দেশীয় জোটের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। রয়টার্স ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। রিয়াদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে এই জোট কাজ করবে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে জোটে বাকি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সত্ত্বেও সংঘাতপূর্ণ এলাকার দুই প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ওমান নতুন এই জোটে যোগ দেয়নি। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, নিজস্ব আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে অন্য যে কোনো দেশের এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত একটি উদীয়মান সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছিল। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠক এবং পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই আলোচনার পালে হাওয়া দেয়। তবে পরবর্তীতে যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার খবরটি জল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অবস্থান
জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তথ্য জানা যায়নি। এর আগে লোহিত সাগরের পরিস্থিতি নিয়ে গত ২২ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘সরকার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের নৌ অবরোধের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। বাংলাদেশ মনে করে, এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তেজনা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহতের ঝুঁকি তৈরি করে।’

ওই বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটে নিরবচ্ছিন্ন নৌ-চলাচলের প্রতি সমর্থনও ব্যক্ত করা হয়। বলা হয়, ‘লোহিত সাগর বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখানে যে কোনো ধরনের ব্যাঘাত সারাবিশ্বের মানুষের জন্য গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে। তাই বাংলাদেশ সব নাবিক ও পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে।’

আবার সৌদি আরব যে বিবৃতি প্রকাশ করেছে, সেখানে একক কোনো দেশের ভূমিকার কথা আলাদা করে উল্লেখ নেই। বলা হয়েছে, যৌথ বিবৃতির বক্তব্যের বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, সদস্যরা জোটের সনদ অনুযায়ী সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অপারেশনাল পরিকল্পনা, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং যৌথ সামুদ্রিক অভিযানে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করবে। জোটটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো দেশ, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে নয়।

তারা সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল রক্ষা এবং অভিন্ন সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো জোটের যৌথ কমান্ড, কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার, যৌথ সামুদ্রিক অপারেশন সেন্টার এবং প্রধান নির্বাহী সংস্থা হিসেবে সৌদি আরবে সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাসপাইডস নামের নিজস্ব নৌ-সুরক্ষা মিশন চালু রয়েছে। এই জোটের সঙ্গে ইইউ মিশন কীভাবে সমন্বয় করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

জোট গঠনের কারণ 
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি স্থবির হয়ে পড়ার পর বিশ্ব বাণিজ্যে লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০-১২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানি বজায় রাখতে দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদির বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়ে বেশ কিছু তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে টোল বা ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে বলেও খবর এসেছে। সবচেয়ে সরু পয়েন্টে মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

হুতিদের প্রতিক্রিয়া
বৃহস্পতিবার জোটের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা আগে হুতির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছিল। ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সৌদি আরবকে উদ্দেশ করে ‘সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আবদুল মালিক আল-হুতি বলেন, ‘কিছু ইঙ্গিত বলছে, সৌদি আরব পূর্ণাঙ্গ উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। আমরা পূর্ণাঙ্গ উত্তেজনার মাধ্যমেই এর পাল্টা জবাব দেব।’
তিনি দাবি করেন, লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর হুতিদের নৌ-অবরোধ ইতোমধ্যে সফল হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here