স্তন ক্যান্সারের লাখ লাখ রোগীর কেমোথেরাপি এড়ানো যেতে পারে: গবেষণা

0
6

স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত লাখ লাখ রোগীর সামনে কেমোথেরাপি এড়ানোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন একদল গবেষক। তাদের দাবি, এমন এক ডিএনএ পরীক্ষা তারা উদ্ভাবন করেছেন, যেটা বলে দেবে, কেমোথেরাপি কোন রোগীর ক্ষেত্রে কাজ করবে, কার ক্ষেত্রে করবে না।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্টি কলেজ অব লন্ডনের (ইউসিএল) নেতৃত্বে এ গবেষণা হয় বলে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

গবেষণায় স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া চার হাজারের বেশি রোগীকে যুক্ত করা হয়। এ তালিকায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের রোগীরা ছিলেন, যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি।

আন্তর্জাতিক এই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষকে কেমোথেরাপি এড়িয়ে শুধু হরমোন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

কেমোথেরাপি দেওয়ার ফলে সাধারণত একজন রোগীর মধ্যে ক্লান্তি, বমিভাব, চুল পড়া, প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা কিংবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।

গবেষকরা এ পরীক্ষার নাম দিয়েছেন ‘প্রোসিগনা’। এই পরীক্ষায় ৫০টি জিনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়, যেগুলো মূলত ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। বিশ্লেষণে মূলত এটাই হিসাব করা হয়, রোগটি ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটা।

স্কোর যাদের কম, তাদের কেমোথেরাপি নেওয়া ছিল না। এই হার চার হাজারের দুই-তৃতীয়াংশ। এই দলে পাঁচ বছর পর্ন্ত বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর ক্যান্সার কোষ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে কেমোথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

ক্যান্সার কোষ শুধু লিম্ফ নোডের আশপাশে ছড়িয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এমন রোগীদেরও কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। ইউসিএল বলেছে, চিকিৎসকরা একটা বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সেটা হলো- স্তন ক্যান্সারের অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি সামান্যই কাজে আসে।

ইংল্যান্ডের এ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার (এনএইচএস) অধীনে থাকা ৫ হাজারের বেশি রোগীর সামনে কেমোথেরাপি এড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কার্ডিফের বাসিন্দা কারেন বনহ্যাম। তিনি বলেন, গবেষণার ফল তার জন্য ‘খুবই স্বস্তির’ একটা খবর; অনেকটা ‘বড়দিনের উপহার’ পাওয়ার মতো।

‘প্রোসিগনা’ পরীক্ষার কারণে কেমোথেরাপি এড়াতে পেরেছেন ৬৪ বছরের এই রোগী। তিনি গত আট বছর রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি নিয়েছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া এবং এর চিকিৎসা শুরু হওয়া— দুটোই জীবনে ধাক্কা দেওয়ার মতো ঘটনা। এটি আপনাকে অনিশ্চয়তার এক জগতে ঠেলে দেয়। জীবনের অগ্রাধিকারের তালিকা বদলে যায়; একটাই ইচ্ছা বেঁচে থাকে, সেটা বেঁচে থাকা।’

গবেষণার ফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সারবিষয়ক সম্মেলন— আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির’ বার্ষিক সভায় তুলে ধরার কথা।

পরীক্ষা কার্ক্রমের প্রধান ছিলেন ইউসিএল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রোব স্টেইন। তিনি বলেন, এই ফল ক্যান্সার চিকিৎসাকে ব্যক্তিভেদে আলাদা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই গবেষণায় শুধু প্রচলিত ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করা হয়নি। পাশাপাশি টিউমারের জৈবিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষক রোব স্টেইন আরও বলেন, রোগীদের জন্য এর অর্থ হলো, অনেকেই কেমোথেরাপির শারীরিক ও মানসিক ধকল এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তি পেতে পারেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এটি সম্পদের আরও যথাযথ ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

তবে ইউসিএলের মতে, ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে একই ফল প্রযোজ্য কি না, তা এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফল পেতে আরও কয়েক বছর লাগতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here