দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ মোকাম রাজারহাটে চামড়া বিক্রি হচ্ছে ২৫-২৮ টাকা ফুট

0
4

হাটের এক কোণে কাঠফাটা রোদ্দুরে মাথায় গামছা প্যাঁচিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন নড়াইলের লক্ষীপাশার রনজিত দাস। পাশেই দাঁড়িয়ে তার বড় ছেলে রোমেন দাস। ৯০ পিস গরু ও ৫৫ পিস খাসির চামড়া নিয়ে এসেছেন তারা। আড়ৎদাররা চামড়া উল্টে পাল্টে দেখছেন। কিন্তু তারা যে দাম বলছেন; তাতে বিক্রি করতে রাজি হচ্ছেন না রনজিত।

তিনি জানান, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ৫ শ’ থেকে ৯ শ’ টাকা পর্যন্ত গরুর চামড়া কিনেছি। আর খাসির চামড়া ৫০ থেকে দেড় শ’ টাকা পর্যন্ত। এরপর প্রতিটি গরুর চামড়ায় লবণ লেগেছে একশ টাকার। খাসির চামড়ায় ২০ টাকা। লবণ শ্রমিক, বাজারে আনতে সব মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ায় খরচ হয়েছে দেড় শ’ থেকে দুই শ’ টাকা পর্যন্ত। অথচ হাটে গরুর চামড়া সর্বোচ্চ বলছে আটশ’ টাকা। আর খাসি ৫০ টাকা।

রনজিত বলেন, সরকারের বেধে দেওয়া দর অনুযায়ী আমার প্রতিটি গরুর চামড়ার দাম হয় ১৫ শ’ থেকে ১৭ শ’ টাকা। অথচ বাজারে এনে দাম বলছে অর্ধেক। তাদের দামে চামড়া দিলে আসলও থাকবে না!

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে কুরবানি পরবর্তী প্রথম হাট ছিল শনিবার। কাঁকডাকা ভোর থেকেই খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও ঢাকার গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি থেকে মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন যানবাহন ভর্তি করে চামড়া নিয়ে এসেছেন। অন্তত ১৫ হাজার চামড়া উঠলেও বাইরের পাইকার ও ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা না আসায় বেচাকেনা জমেনি। সরকার নির্ধারিত মূল্য উপেক্ষা করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্ধেকেরও কম দামে চামড়া কিনছেন বলে অভিযোগ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও। সরকার এবার জেলা পর্যায়ে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে মাঝারি গরুর চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ৯৫০ থেকে ১২০০ টাকা এবং বড় গরুর চামড়া ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ যশোরের বাজারে মাঝারি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ আর বড় সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। সেই অনুযায়ী সরকারের নির্ধারিতের চেয়ে যশোরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা ফুট।

চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি রেট কার্যকরে প্রশাসনের কোনো তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছে। তবে চামড়া ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে রাজি নন।

বাগেরহাট থেকে আমজেদ বিশ্বাস নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, পিকআপ ভ্যানে করে ৪০০ গরুর চামড়া এনেছি। প্রতিটি চামড়া আড়তদাররা দিতে চাচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা করে। সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হলে প্রতি গরুর চামড়ার দাম পেতাম ১ হাজার ২৫০ টাকার বেশি। কিন্তু চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো দাম বলে চামড়া কেনাবেচা করছে। প্রতিটি গরুর ৩০ থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত চামড়া হয়। সেই ক্ষেত্রে সরকারি রেটে চামড়ার দাম হবে ২১০০ টাকা। অথচ যশোরের বাজারে সর্বোচ্চ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার। তাহলে ফুট পড়ছে ২৮ টাকা পর্যন্ত। সরকারি রেট কার্যকর হলে ছোট ব্যবসায়ীরা লাভবান হতো।

রমেন দাস নামে আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, প্রতি বছর লোকসান করে ব্যবসা করে যাচ্ছি। সিন্ডিকেটে আমাদের ব্যবসাটা একটি গোষ্ঠী শেষ করে দিচ্ছে। কোনো সরকারই এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না।

তবে আড়তদার গিয়াজ উদ্দিন বলেন, সরকারি দরের চেয়ে ২০ টাকা কমে আমাদের চামড়া কিনতে হয়। কেননা কাঁচা চামড়া কিনে লবণজাত, শ্রমিক ও ঢাকাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি চামড়া দুই শ’ টাকা পর্যন্ত পড়ে যায়। আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে পারছি না। যে কারণে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কেমিক্যালের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ট্যানারি মালিকরা সরকারি দামে চামড়া কিনছেন নজ। ফলে দিন দিন চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে।

রাজারহাট চামড়া মোকামের ইজারাদার রাজু আহম্মেদ বলেন, ঈদ-পরবর্তী প্রথম হাট হওয়াতে এদিন চামড়া উঠেছে কম, আবার বাইরের আড়তদার বা ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরাও আসেননি। ফলে এদিন হাটে বিক্রিও হয়নি ভালো। আগামী কয়েকটি হাটে বেচাকেনা বাড়বে বলে আশা করা যায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল সর্ববৃহৎ এই হাট। তিন শতাধিক আড়তদারের মাধ্যমে ঈদ মৌসুমে লক্ষাধিক পিস চামড়া বিক্রি হয় এখানে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here