Home Blog Page 121

রাজনীতি আওয়ামী লীগের ফিরে আসার কল্পনা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কার্যত একটি জোটের নিয়ন্ত্রণে। জোটটির একাংশ সরকার চালাচ্ছে, বাকি অংশ বিরোধী দলের ভূমিকায়। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে নানা রাজনৈতিক প্রশ্নে মতভেদ প্রকাশ পাচ্ছে বটে, তবে এগুলো কোনোটাই চূড়ান্ত বিচারে কোনো পক্ষের জন্য ‘রাজনৈতিক হুমকি’ নয়। সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু উত্তপ্ত কথাবার্তা হচ্ছে বটে; অনুমান করা যায়, কিছুদিনের মধ্যে এরও সমাধান হয়ে যাবে। যখন বিএনপি সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে ‘কার্ডগুলো’ ওপেন করতে শুরু করবে।

এটিও বোধগম্য, এই সময়ের মধ্যে বিএনপি সংগঠন গুছিয়ে নেবে; সরকারের আশপাশে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি করবে; সরকারি সুযোগ-সুবিধার ভেতর দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘প্যাট্রন ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ‘ভোটব্যাংক’ শক্তিশালী করবে। এরপরই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করে দেশব্যাপী দলের শক্তিশালী ভিত রচনা করবে।

অস্বীকারের উপায় নেই, বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যের ভিত্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। ‘জুলাই সনদ’ এই ঐক্যের পোশাকি দিক। অ-পোশাকি দিকটা বরং বেশি শক্তিশালী; আওয়ামী লীগ যাতে কোনোভাবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। এটিও সত্য, বিরাট জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে ‘ব্রাত্য’ রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ নিয়ে সদ্য গঠিত এনসিপির ক্রোধ যত বেশিই হোক, বিএনপি-জামায়াত এটি বোঝে যে, আওয়ামী লীগকে এক সময়ে রাজনীতিতে জায়গা করে দিতেই হবে। দল দুটি আশা করে, সেই আওয়ামী লীগ হবে পুনর্গঠিত। গণঅভ্যুত্থান-পূর্ব আওয়ামী লীগ নয়; তারা এমন আওয়ামী লীগ চায়; যার ভেতরে ‘বোধোদয়’ ঘটেছে। প্রতিশোধস্পৃহাসম্পন্ন আওয়ামী লীগকে জায়গা দিতে নারাজ বিএনপি-জামায়াত।

এটিও মনে রাখা দরকার, আওয়ামী লীগ এখন বিএনপি-জামায়াতের কাছে ‘চরম অবিশ্বস্ত’ দল। ২০১৪ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর ধরে দল দুটির ওপর যে মাত্রার নিপীড়ন চলেছে; সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে আওয়ামী লীগ যদি বোধোদয় নিয়েও রাজনীতিতে ফিরে আসে, তাহলেও বিএনপি-জামায়াত তাদের ‘চোখে চোখে’ রাখবে। কেননা, শক্তি সঞ্চয় করতে পারলেই আওয়ামী লীগ প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে বলে তাদের ধারণা।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে এখনও ঘোর অমানিশা। বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর কাছে আশ্রয় পেয়ে হয়তো টিকে থাকা যায়। কিন্তু নিজ দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা যায় না– এটি তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে বলে মনে হয়। কিন্তু কী কৌশলে তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করবে; সেটি এখনও অজানা।

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্রীয় নেতাসহ ক্ষমতাশালীদের বড় অংশই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। অনেক নেতাকর্মীকে বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশে হিংসাত্মক ঘটনায় জীবন দিতে হয়েছে। দেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী এখনও জেলে কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অনেকেই এখন ঘর-সংসার, জীবন-জীবিকা হারিয়ে নিঃস্বপ্রায়। স্থানীয় পর্যায়ে যেখানে যতটুকু সম্ভব জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে টিকে আছে। গ্রাম-গঞ্জে-হাট-বাজারে এক সময় যেসব আওয়ামী নেতা-পাতি নেতার দাপটে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাথা নিচু করে হাঁটতে বাধ্য হতেন, সেই নেতারা এখন জামায়াত-বিএনপির নেতা-পাতিনেতাদের সামনে মাথা নিচু করে নীরবে হেঁটে যান!

ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা চিরাচরিত কায়দায় ‘হুমকি-ধমকি’ দিয়েছেন। কর্মীদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য প্রথম কয়েক মাস হয়তো এটি দরকার ছিল। কিন্তু তিনি দলটিকে গোপনে গুছিয়েছেন কিংবা সে প্রচেষ্টা নিচ্ছেন– এমন কোনো আলামত এখনও দেখা যায়নি। বিদেশের মাটিতে বসে কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী সামাজিক মাধ্যমকে গরম রাখছেন বটে; দেশের মাটিতে বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। বিচ্ছিন্নভাবে এখানে সেখানে আওয়ামী কর্মীরা ভয়ানক রিস্ক নিয়ে ঝটিকা মিছিল করে গোপনে মিলিয়ে যাচ্ছে; ঠিক যেমন আওয়ামী শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী ঝটিকা মিছিল করত।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জীবনে দুর্দিন নেমে এসেছিল; তবে সেটি আজকের মতো ঘোর দুর্দিন ছিল না। আওয়ামী এমপি-মন্ত্রীরা মোশতাকের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন; নেতাকর্মী-বুদ্ধিজীবীরা কেউ পালিয়ে যাননি। সুতরাং সেই বৈরী পরিবেশেও দেশে থেকে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে খুব বেগ পেতে হয়নি। এবারের আওয়ামী লীগের বিপর্যয় একেবারেই অন্যরকম। প্রায় দু’বছর হতে চলল; নেতৃত্বের কোনো দিশা পাওয়া গেল না। জামায়াত কিংবা বামপন্থি-চরমপন্থি দলের মতো আওয়ামী লীগ কোনো ‘ক্যাডারভিত্তিক’ দল নয় যে, তারা বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম। ফলে আওয়ামী লীগকে যে কোনোভাবেই হোক মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার পথ খুঁজতে হবে।

কিন্তু দলটি সম্ভবত এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। মনে করছে, বিএনপি-জামায়াতের দ্বন্দ্ব/মতপার্থক্য যদি মারামারি হানাহানিতে রূপ নেয়; বর্তমান সরকার যদি আওয়ামী শাসনামলের তুলনায় আরও বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে এবং ‘টুক’ করে তারা রাজনীতিতে হাজির হবে। এটি খুবই বালখিল্য চিন্তা। অন্যদিকে এমন ধারণাও আছে, ভারত তাদের জন্য কিছু একটা করবে। সেটি এমন হতে পারে, ভারত সরকার নানা দিক দিয়ে চাপ সৃষ্টি করবে। এটিও খুব অপরিপক্ব চিন্তা। কারণ বাংলাদেশের সরকার এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত এবং হ্যান্ডল করার মতো ক্ষমতা রাখে। তা ছাড়া ভারত নিজে ডিল করতে চায় একটা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে, যেটি তারা এখন পেয়েছে। ভারতের নজর এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে। কারণ বিগত দু’বছরে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এর বাইরে আছে আরও নানান আঞ্চলিক ইস্যু। ফলে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার পেছনে বিপুল সময় ব্যয় করার সময় কি ভারতের আছে?
তাহলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ কী? সম্ভবত এখনও এটি কেউ জানে না। এমনকি খোদ আওয়ামী নেতৃত্বও নয়!

দুর্যোগে বড় ঝুঁকি ভোলার ২১ চরে

মহিষের বাথানিয়া (রাখাল) মো. মাকসুদের বাড়ি নেয়ামতপুর চরে। মধ্য মেঘনার চরটি পড়েছে ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নে। বছর দুয়েক আগে জোয়ারে ভেসে যায় তাঁর ১০টি মহিষ। তিন দিন পর ৮টি ফিরে পেলেও বাকি দুটি আর পাননি। মাকসুদের ভাষ্য, বর্ষা, ঝড়-বাদলে আশ্রয় নেওয়ার মতো চরবাসীর জন্য নিরাপদ কোনো কেল্লা (শেল্টার) নেই। ফলে প্রতিবছরই জোয়ারের স্রোতে চরের অনেক বাথানিয়ার মহিষ ভেসে যায়।

চলতি বছরের দুর্যোগ মৌসুমের শুরুতেই নিরাপত্তা নিয়ে ভুগছেন উপকূলীয় জেলা ভোলার চরাঞ্চলের লাখো বাসিন্দা। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে আছেন মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী ২১টি চরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ। এসবের ৯টিতেই কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই। ১২টি চরে দু-একটি করে আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব মিলিয়ে দুর্যোগকালে জেলার ২০ লাখ মানুষের আশ্রয়ের জন্য ৯১৫টি ‘স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার’ আছে। এতে সব মিলিয়ে পাঁচ লাখের মতো মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন। যা জেলার মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ, বাকি তিন ভাগ মানুষকে অরক্ষিত অবস্থায় কাটাতে হবে। চলতি মৌসুমের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বড় ক্ষতির আগেই অরক্ষিত এসব মানুষের আশ্রয় নিয়ে সরকাবি ব্যবস্থাপনার দাবি উঠেছে।

গত শুক্রবার সরেজমিন দেখা গেছে, চরগুলোর চারপাশের মেঘনার অথই পানি। এর মধ্যে ছোট ছোট কাঁচা ঘর আর সরকারি আশ্রয়ণে বসবাস করছেন মানুষ। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। ভরা বর্ষায়ও ছোট নৌকা দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। শুকনো মৌসুমে খোলা মাঠ আর নালা-ডোবা হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়।

নদীভাঙনে সব হারিয়ে বেশ কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন মদনপুর ইউনিয়নের চর মুন্সীতে। মেঘনার এই চরে বর্তমানে বাস করেন সাড়ে চার হাজার মানুষ। কৃষিনির্ভর এই চরে রয়েছে কয়েক হাজার গরু-মহিষ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই এখানে। এই চরের কিষানি মরিয়ম বিবি বলেন, একটানা কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টি থাকলে তাদের ঘরেই বন্দি থাকতে হয়। বের হওয়ার উপায় থাকে না। ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ করেই তাদের মোকাবিলা করতে হয় বৈরী আবহাওয়া।

ব্যবসায়ী মিলন পাটোয়ারীর ভাষ্য, বর্ষার দুর্যোগে মেঘনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে সাত-আট ফুট উঁচু দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ সময় পুরো চর প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। তখন গবাদি পশু নিয়ে তাদের পড়তে হয় বিপাকে। স্রোতের তীব্রতা বাড়লে ঘরবাড়ি, গরু-ছাগলও ভেসে যায়। এই চরে জীবনধারণ পুরোপুরি অনিরাপদ উল্লেখ করে মিলন আরও বলেন, নদীভাঙনের শিকার দরিদ্র পরিবারের লোকজনই এখানে বসবাস করেন। তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। দুর্যোগের সময় তাদের আশ্রয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

একই ইউনিয়নের চরপদ্মার কিষানি মর্জিনা বেগমের দুটি গরু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জলোচ্ছ্বাসে মেঘনায় ভেসে গেছে। এতে দরিদ্র এই নারীর ক্ষতি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকার। একই সময়ে একটি করে গরু হারিয়েছেন চরপদ্মার রফিক মাঝি, পারভেজ ও কবির।

স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, জেলার চরফ্যাসনের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত ঢালচর, পূর্ব ঢালচর, তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনার মধ্যবর্তী চর লাদেন, চর লক্ষ্মী, দৌলতখান উপজেলার চর হাজিপুর, মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের চর সামসুদ্দিন, কলাতলী ইউনিয়নের কাজিরচর, সদর উপজেলার চর সুলতানি; তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী লালমোহন উপজেলার মোতাহারনগরের চর কচুয়াখালীতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। অথচ এসব চরে বসবাস করেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় খড়কুটো দিয়ে তৈরি নাজুক কাঁচা ঘরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হয়।

একইভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট আছে মূল ভূখণ্ডের নদী তীরবর্তী এলাকায়ও। জানা গেছে, মূল ভূখণ্ড থেকে বিছিন্ন দুর্গম চর নিজামের তিন হাজার মানুষের জন্য একটি, কলতলীর চরের ২০ হাজার মানুষের জন্য দুটি, চর মোজাম্মেলের সাত হাজার মানুষের জন্য একটি, মেদুয়ার পাঁচ হাজার মানুষের জন্য দুটি, মদনপুরের ১০ হাজার মানুষের জন্য দুটি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার আছে।

ঢালচরের বাসিন্দা রফিক ফরাজী বলেন, দুর্যোগ শুরু হলে গবাদি পশু রেখে অনেকে অন্য জায়গায় যেতে চান না। দুর্যোগের সংকেত ৮ থেকে ১০ হলে প্রশাসনের পক্ষে এসব মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। তখন নদীতে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বা ঘরে বসে প্রাণ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না বিপুল সংখ্যক মানুষের।

ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার বলেন, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়েই বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও গবাদি পশুর ক্ষতি হয়। জোয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র ও ক্ষেতের ফসল ভেসে যায়।

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৯১৫টি। সদর উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য ১৩৭টি, দৌলতখানের এক লাখ ৭২ হাজার মানুষের জন্য ১১২টি, বোরহানউদ্দিনের দুই লাখ ৬৫ হাজার বাসিন্দার জন্য ১২২টি, তজুমদ্দিন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য ৭৬টি, লালমোহন উপজেলার দুই লাখ ৮৩ হাজার মানুষের জন্য ১৯৮টি, চরফ্যাসনের চার লাখ ৫৬ হাজার বাসিন্দার জন্য ১৬৫টি ও মনপুরার লক্ষাধিক মানুষের ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করা হয়েছে ভোলা সদরে ৯টি, দৌলতখানে ছয়টি, বোরহানউদ্দিনে ছয়টি, তজুমদ্দিনে আটটি, চরফ্যাসনে ১১টি ও মনপুরায় ছয়টি কেন্দ্র।

এর মধ্যে শতাধিক কেন্দ্রে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চরফ্যাসনের চর কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের চরপাতিলার প্রায় দুই হাজার বাসিন্দার জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র। তিন দশক আগে নির্মিত কেন্দ্রটি ব্যবহারের অনুপযোগী বলে জানান সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম ও বাদশা মিয়া। তারা জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রের ছাদের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। ভবনে আশ্রয় নেওয়ার মতো অবস্থা নেই।

মদনপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র দুটি আশ্রয়কেন্দ্র আছে। মেঘনায় মাছ ধরা আর গবাদি পশু পালন করেই চলে তাদের জীবিকা। চরমুন্সীর সাড়ে চার হাজার মানুষের জন্য একটিও নেই। যুগ যুগ ধরে চরের এসব বাসিন্দারা অরক্ষিত। তাদের নিরাপত্তা বলয়ে আনা জরুরি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আজিম উদ্দিন গতকাল রোববার সমকালকে বলেন, যেসব চরে আশ্রয়কেন্দ্র নেই, সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সাতটি চরে মাটি কেটে উঁচু করাসহ একতলা অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প চলছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগের সময় পশুর পাশাপাশি মানুষও আশ্রয় নিতে পারবেন।

জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমানের ভাষ্য, যেসব চরে আশ্রয়কেন্দ্র নেই, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেন্দ্রে নির্মাণ করা হবে। এ বিষয় তিনি সম্প্রতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। দুর্যোগে সবাইকে আশ্রয়ের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। যেসব আশ্রয়কেন্দ্র জরাজীর্ণ, সেগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইরানের ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’: ট্রাম্প

যুদ্ধবিরতি আলোচনা থমকে যাওয়ায় ইরানকে আবারও কড়া বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জন্য ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে শেষ পর্যন্ত তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এখন সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর সঙ্গে ফোনালাপের ঠিক আগে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।

এদিকে ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে, সংঘাত নিরসনে তেহরান যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থানের কারণেই আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

এর আগে এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার ঠিক আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান সমঝোতায় না এলে ‘পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই একই ধরনের কড়া অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে।

সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের দাবিগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে।

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, তেহরানের প্রস্তাব ছিল ‘দায়িত্বশীল’ এবং ‘উদার’।

আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, ইরানের দাবির মধ্যে ছিল সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না চালানোর নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিও দাবি করেছে তেহরান।

অন্যদিকে আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ইরানকে শুধু একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হবে এবং তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে হবে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান যদি ২০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে রাজি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেটি বিবেচনা করতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন হয়তো আগের ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। পরে আলোচনা এগিয়ে নিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়েছে। ইরানের পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে।

তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে বন্দর অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যস্থতায় কাজ করছে পাকিস্তান। তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগজনক?

ডিআর কঙ্গো-এ নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে এমন এক অঞ্চলে, যেখানে চলমান সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এবার যে ধরনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে, সেটিও তুলনামূলক বিরল।

বিশ্বের জন্য কি বড় হুমকি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলা প্রাদুর্ভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও, বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন যে, এটি কোভিড-১৯-এর মতো বিশ্বব্যাপী মহামারির রূপ নেবে না। বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসের বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময়েও যুক্তরাজ্যে মাত্র তিনজন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারা সবাই ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সাইন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারির ঝুঁকি না থাকলেও, এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডার জন্য বড় ঝুঁকি রয়েছে। ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে উগান্ডায় এরই মধ্যে দুজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একজন মারা গেছেন।

প্রাদুর্ভাব কতটা গুরুতর?

বর্তমানে প্রায় ২৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

কোন ধরনের ইবোলা ছড়াচ্ছে?

এবারের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস। এটি খুবই বিরল এবং আগে মাত্র দুইবার বড় প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে-২০০৭ ও ২০১২ সালে।এই ধরনের ইবোলার জন্য এখনো অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

লক্ষণ কী কী?

সংক্রমণের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথমে সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন-জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি। পরে পরিস্থিতি গুরুতর হলে দেখা দিতে পারে- বমি, ডায়রিয়া, শরীরের অঙ্গ বিকল হওয়া, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ।

কীভাবে ছড়ায়?

ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল-যেমন রক্ত, বমি বা অন্যান্য নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের পর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের তরল খাবার, পুষ্টি ও ব্যথানাশক সেবার (সাপোর্টিভ কেয়ার) মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।

দেরিতে শনাক্ত 

কঙ্গোয় গত ২৪ এপ্রিল প্রথম এক নার্সের শরীরে লক্ষণ দেখা দিলেও প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তিন সপ্তাহ সময় লেগেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ড. অ্যান কোরি বলেন, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অলক্ষ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর পর এটি শনাক্ত হয়েছে, যা বেশ উদ্বেগজনক। ডব্লিউএইচও আশঙ্কা করছে, বর্তমানে যে সংখ্যার কথা জানা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশন, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতাল ও দাফন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কঙ্গোর যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে, যেখানে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, সেখানে এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। আক্রান্ত অঞ্চলের অনেকগুলোই খনি এলাকা, যেখানে মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত করা, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানো। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ডিআর কঙ্গোর আগেও ইবোলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখনকার পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে নাকি এটি বড় আকারের সংকটে পরিণত হবে।

মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর বসাবেন না এনবিআরের প্রতি বাইকারদের আবেদন

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। পরে তারা এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপিও দেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য পাঁচ হাজার টাকা ও ১৬৫ সিসির বেশি হলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রাথমিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বাজেটের নীতিগত রূপরেখা ও কর প্রস্তাব পেশ করেছে এনবিআর। তবে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মোটরসাইকেলের এই করহার অনেক বেশি। তাই তিনি তখন ১১১ থেকে ১২৫ সিসিতে এক হাজার, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত তিন হাজার টাকা। ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতিবছর পাঁচ হাজার টাকা কর নির্ধারণের নির্দেশনা দেন।

গতকাল মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বাইকাররা বলেন, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু শখের বাহন নয়; বরং দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাইড শেয়ার চালকরা সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল।

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের পক্ষে এনবিআরে স্মারকলিপি জমা দেন ও মানববন্ধনে কথা বলেন এ কে এম ইমন নামের একজন বাইকার। তিনি বলেন, বাইক সাধারণ মানুষের একমাত্র বাহন। রাইড শেয়ার কিংবা পণ্য ডেলিভারি দিয়ে বাইকের মাধ্যমে দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় করা যায়। এই টাকা দিয়েই চলে অনেকের সংসার। কিন্তু বাইকে কর আরোপ করা হলে এসব মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানববন্ধনে বেশ কয়েকজন নারী বাইকাররাও অংশ নেন। তাদের একজন শিউলি রহমান বলেন, ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা ভালো নয়। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য মাথায় ঝুঁকি নিয়ে বাইক নিতে হয়েছে। কর আরোপ করা হলে বাইকারদের ঘাড়ে অনেক চাপ পড়বে।

যশোরেও মানববন্ধন

একই দাবিতে গতকাল বাংলাদেশ বাইকার অ্যাসোসিয়েশন যশোর জেলা শাখার উদ্যোগে প্রেস ক্লাব যশোরের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার শতাধিক বাইকার অংশ নেন। মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন যশোর বাইকিং কমিউনিটির অ্যাডমিন ও সংগঠনের সভাপতি এসকে সুজন। পরে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

ঋণের বন্ধকি সম্পত্তির বড় অংশই অস্তিত্বহীন

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণের বন্ধকি সম্পত্তির আর্থিক মূল্যায়ন করিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে দেখা গেছে, পাঁচ ব্যাংকের এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য আছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের যা মাত্র ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর ফোর্স সেল ভ্যালু বা তাৎক্ষণিক বিক্রয়মূল্য রয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রস্তুত করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ টাকা বন্ধকি সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৫০ থেকে ৮০ টাকা ঋণ দিতে পারে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় এ রকম দেখিয়েছে। তবে সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান যাচাই করে কয়েক গুণ বেশি দেখানোর তথ্য পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে সম্পত্তি বন্ধক দেখানো হয়েছে, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকের সম্পত্তির অস্তিত্ব নেই। আবার ঋণের বেশির ভাগ বেনামি এবং সুবিধাভোগী পলাতক থাকায় নতুন করে বন্ধক বা আদায় করা যাচ্ছে না। তবে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ রকম অবস্থায় এসব ব্যাংকের অবস্থার উন্নতির জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করে তাদের কাছে বিক্রির সুপারিশ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা করে ফেরত দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের মাধ্যমে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আট লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আরও আট হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরতের কার্যক্রম চলছে। একজন আমানতকারীর যত অর্থই জমা থাকুক, এ প্রক্রিয়ায় তিনি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থের বাইরে এ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংকের সমপরিমাণ দায় কমে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত এপ্রিল শেষে এক লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৮৬ শতাংশ। মোট আমানত কমে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন হিসেবে সরকার এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। অবশ্য ব্যাংকটির মোট মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার ইস্যু করা হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দেওয়া হবে আরও সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার শেয়ার। এভাবে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় চলার পর এক পর্যায়ে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চার মাস আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মানে ঋণ কমলেও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিমের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছিল খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের কর্তৃত্ব ছিল নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। বাকি চার ব্যাংক পরিচালিত হতো এস আলম গ্রুপের কর্তৃত্বে।

এই চার ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপি। মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটির ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।

জামায়াত ছাড়তে ধর্মভিত্তিক ৪ দলকে হেফাজতের চাপ

জামায়াতে ইসলামীর জোট ছাড়তে নির্বাচনের পরও ধর্মভিত্তিক চারটি দলকে চাপ দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হেফাজতের পদেও রয়েছেন। তাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, জামায়াত জোট বা হেফাজত– যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। তবে তারা জোট ও হেফাজত দুই জায়াগায় থাকতে চান। উদাহরণ দিচ্ছেন, বিএনপির সঙ্গে থাকা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর নেতারা দুই জায়গায় থাকতে পারলে, তারা কেন পারবেন না?

দলগুলোর এবং হেফাজত নেতারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতবাদকে ভ্রান্ত আখ্যা দেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান। জামায়াতকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হেফাজত আমির ফতোয়া দিয়েছিলেন, জামায়াত জোটকে ভোট দেওয়া হারাম।

যদিও হেফাজত ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক। বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব। দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই হেফাজতের বিভিন্ন পদে রয়েছেন।

খেলাফতের অপরাংশের আমির আবদুল বাছিত আজাদ এবং মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল– দুজনেই হেফাজতের নায়েবে আমির। নেজামে ইসলামের মহাসচিব মুসা বিন ইজহার হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব। খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত হাবিবুল্লাহ মিয়াজী হেফাজতের নায়েবে আমির।

হেফাজত-সংশ্লিষ্ট জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের দুই অংশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনী সমঝোতা না করলেও, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছে। এই তিনটি দলের নেতাদের বিএনপি ছাড়তে চাপ দিচ্ছে না হেফাজত।

জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত-সংশ্লিষ্ট চারটি দলগুলোর একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে সমকালকে বলেছেন, হেফাজত ও জোট দুই জায়গাতেই থাকবেন তারা। দীর্ঘদিনের সম্পর্কসহ নানা কারণে হেফাজত সংগঠন হিসেবে বিএনপির দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে। হেফাজত ছাড়বেন না, তবে এই অবস্থার পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন।

এই চারটি দল ছাড়াও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল মিলে নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছিল। নির্বাচনের পর দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্মিলিতভাবে বিরোধী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে সংসদে। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে সংসদের বাইরে জোটবদ্ধ থাকবে। এই দাবিতে গত শনিবারও রাজশাহীতে সমাবেশ করেছে ১১ দল। আগামী জুলাই পর্যন্ত জোটের কর্মসূচি চলবে।

নির্বাচনের পরও চাপ

জামায়াতের জোটে ছিল চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জামায়াতের কড়া সমালোচক ছিল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল দুটি প্রকাশ্য সম্পর্কে আসে। সংস্কারের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করে। তবে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন জোট ভাঙে জামায়াত ও চরমোনাই পীরের।

এরপর থেকে আবারও জামায়াতের সমালোচনায় মুখর হয়েছে ইসলামী আন্দোলন। এই দলটি হেফাজতের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হলেও, একই ভাষায় সমালোচনা করছে। নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ ‘মুরব্বিরা’ জামায়াতের বিরুদ্ধে যেমন প্রচার করেছেন, ভোটের পর কওমিভিত্তিক চার দলকে চাপ দিচ্ছেন জামায়াত ছাড়তে।

চারটি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে গত ২৮ এপ্রিল কমিটি গঠন করে দেন হেফাজত আমির। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী নেতৃত্বাধীন এই কমিটি। কমিটি বৈঠকও করে দলগুলোর সঙ্গে। এতে গুঞ্জন ছড়ায় জামায়াত জোট না ছাড়া দলগুলোর নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হবে।

এসব আলোচনার মধ্যেই রোববার মামুনুল হক চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা করেছেন হেফাজত আমিরের সঙ্গে। বৈঠকের পর মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী দাবি করেন, হেফাজতের মধ্যে বিভেদ নেই।

মামুনুল হক বলেন, হেফাজতের আমির যে বিশ্বাস ও আকিদার কথা বলেন তা বাংলাদেশ খেলাফতসহ সংগঠনের যুক্ত সব দল তা ধারণ করে। বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মত ও পথের দল নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য গঠিত হয়।  জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আকিদা, বিশ্বাস ও আদর্শিক পার্থক্য আগের মতোই রয়েছে। ১১ দল আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক ঐক্য।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন সমকালকে বলেন, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে রয়েছে, থাকবে। সংগঠনে যুক্ত নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে রয়েছেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী নিয়ে থাকেন। এই বক্তব্যই হেফাজত আমিরকে জানানো হয়েছে। তিনি সবার মুরব্বি হিসেবে নিশ্চয় বিষয়টি বুঝেছেন। জোট না ছাড়লে হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জন সঠিক নয়।

যদিও এবারের ৫ মে হেফাজত এককভাবে কর্মসূচি করতে পারেনি। ঢাকায় ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা লালবাগে কর্মসূচি করেন। মাওলানা মামুনুল হক হেফাজতের পরিবর্তে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’-এর ব্যানারে কর্মসূচি করেন। এতে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা আসেন।

বৈঠকে যায়নি বাকি তিন দল 

খেলাফত মজলিসের অপরাংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলনকেও ডাকা হয়েছিল রোববারের বৈঠকে। তবে তাদের সবার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন মামুনুল হক। এই দলগুলোর একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, হেফাজত যে জামায়াতকে ছাড়তে চাপ দিচ্ছে তাতে তারা নীতিগতভাবে একমত নন। তারা হেফাজত আমিরের কমিটিকে জানিয়েছেন, একসময় জামায়াতের সঙ্গেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ছিলেন তারা। তখন যদি প্রশ্ন তোলা না হয়, তবে এখন কেন আপত্তি করা হচ্ছে?

নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দুই দফা গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেন। বিএনপিকে নির্বাচনে সমর্থন করেছেন। হেফাজতের পদে থাকা জমিয়ত নেতাদের মধ্যে উবায়দুল্লাহ ফারুক, জুনায়েদ আল হাবিব, মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মনির হোসেইন কাসেমী নির্বাচন করেন বিএনপির সমর্থনে। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন জমিয়তের অপরাংশের নেতা রশিদ ওয়াক্কাস। এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা বলেছেন, জমিয়ত যদি বিএনপির জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারে, তাহলে তারা কেনো পারবেন না?

জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আবদুল কাদের সমকালকে বলেন, হেফাজত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের নেতারা রাজনৈতিকভাবে কে কোন দলে জোটে থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যা সব দল ও নেতার জন্যই প্রযোজ্য।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলের সমন্বয়কারী হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কোনো দলই জোট ছাড়ছে না। বরং জোট দৃঢ় হচ্ছে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারের জন্য।

খামারিদের হিসাব মিলছে না

কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারে খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র প্রস্তুত হচ্ছে পশুর হাট। তবে এবারের কোরবানির বাজারে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। পশুখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ লাগামহীন থাকায় পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন খামারিরা।

সরকার বলছে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংকট নেই। বরং চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের খামারিরা বলছেন, ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পশু আছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা। ফলে কোরবানির পশুর দাম গতবারের চেয়ে বেশ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দাম বাড়ার শঙ্কাই বেশি। খামারিরা যেমন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, তেমনি সাধারণ ক্রেতারাও অপেক্ষায় আছেন শেষ পর্যন্ত কোরবানির পশুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু পাঁচ হাজার ৬৫৫টি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কত পশু হাটে ওঠে, কত বিক্রি হয়, আর কত পশু অবিক্রীত থেকে খামারে ফেরত যায়– সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ফলে উৎপাদনের সরকারি হিসাব বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাও খামারিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, করোনার আগে দেশে বছরে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতো। তবে করোনার পর থেকে সেই সংখ্যা কমে গেছে। ২০২১ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল প্রায় এক কোটি ১৯ লাখ, অথচ কোরবানি হয়েছিল ৯০ লাখের কিছু বেশি পশু। প্রায় ২৮ লাখ পশু বিক্রি হয়নি। গত বছরও ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রীত ছিল। ফলে এবারও অনেক খামারি শঙ্কা করছেন, চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে আবারও লোকসান গুনতে হতে পারে।

ঢাকায় ঘাটতি, উত্তরাঞ্চলে উদ্বৃত্ত

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। অর্থাৎ, ঘাটতি প্রায় সাড়ে সাত লাখ। চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রয়েছে। শুধু রাজশাহী বিভাগেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকেই মূলত রাজধানীর বাজারে গরু আসবে।

খাদ্যের দামেই বাড়ছে ব্যয়

খামারিদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ পশুখাদ্যের বাজার নিয়ে। তারা বলছেন, গত দুই বছরে দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভুসি, খইল, খুদ, খড়, ঘাসসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুৎ খরচও বেড়েছে।

রাজধানীর মেরাদিয়া এলাকার আদিল ডেইরি ফার্মের মালিক আদিল হোসেন জানান, কুষ্টিয়া থেকে গরু এনে খামারে রাখা হচ্ছে। এবার তাঁর খামারে ১৫০ থেকে ২০০ গরু তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাঝারি আকারের গরুর দাম এবার বেশি থাকবে। তিনি বলেন, পশুখাদ্যের খরচ বাড়ার কারণে আগে যে গরু এক লাখ টাকার একটু বেশি দামে বিক্রি হতো, এবার সেই গরু দেড় লাখের কাছাকাছি যেতে পারে।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় সামারাই ক্যাটল ফার্ম লিমিটেডেও এখন কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। খামারটির মালিক ও বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, আমার এখানে ২০০ থেকে এক হাজার ১০০ কেজি ওজনের গরু রয়েছে। তবে বড় গরুর চাহিদা এবার কম থাকবে। তিনি বলেন, গরুর খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরিসহ সবকিছু বেড়েছে। আগে যে মাঝারি গরু এক লাখ টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেটি দেড় লাখে যেতে পারে। তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে বড় গরু কিনলে ক্রেতাকে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ফলে বড় গরুর ক্রেতারা খামারে আসছেন না। এতে বড় খামারিরা লোকসানে পড়বেন। অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, গত বছরের চেয়ে গমের ভুসির বস্তা ৩০০ টাকা, মসুরের ভুসি ২০০ টাকা, ধানের গুঁড়া ৩০০ টাকা বেড়েছে। খড়ের দামও অনেক বেশি। তাঁর হিসাবে, প্রতি মণ গরু পালনে এখন খরচ পড়ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। শ্রমিক রেখে পালন করলে সেই খরচ আরও বাড়ে। তিনি বলেন, ৩৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা মণ দর না পেলে লাভ করা সম্ভব নয়।

নওগাঁর খামারি একরামুল হাসান বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দানাদার খাবারের বাজার নিয়ন্ত্রণ নেই। তিন মাসে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়েছে।

গাইবান্ধার খামারিরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, আগে যে খাবার ৪০ টাকায় কেনা যেত, এখন সেটি ৬০ টাকা। চুয়াডাঙ্গার খামারিরা বলছেন, এবার তীব্র গরম ও লোডশেডিং নতুন করে ব্যয় বাড়িয়েছে। গরুকে সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ বৈদ্যুতিক পাখা চালানো, পানি ছিটানো ও ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রম খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ।

পরিবহন, হাটের হাসিল, মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশনসহ সবকিছু যোগ হয়ে রাজধানীর বাজারে দাম আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গাবতলীর গরু ব্যবসায়ী তৈয়ব আলী বলেন, খামার থেকেই দাম বেশি। মাঝারি গরুতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাড়তি পড়ছে। ছোট আর বড়– দুই ধরনের গরুতেই এবার দাম বাড়বে।

বড় গরুতে ঝুঁকি, বাড়ছে ছোট গরুর চাহিদা

বাজার বিশ্লেষক ও খামারিরা বলছেন, বড় গরুর চেয়ে এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকবে। কারণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

জয়পুরহাটের খামারি সাগর হোসেনের অভিজ্ঞতা এখন অনেকের জন্য সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালে প্রায় এক হাজার কেজি ওজনের একটি গরু বিক্রি না হওয়ায় তিনি আরও এক বছর লালন-পালন করেন। পরে সেটি আগের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে দেড় লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, এত বড় গরু পালার সাহস এখন আর পাই না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন জয়পুরহাটের আরেক খামারি সুমন হোসেন। তিনি বলেন, এবার বড় গরু কম রেখেছি। ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি।

খামারিদের বড় উদ্বেগ ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ। তারা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে দেশি খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না। পাবনার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, ভারতের গরু এলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতিতে পড়বেন।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী হাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি গরু বাজারে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন, খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কাজ করছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু অযৌক্তিকভাবে দাম যেন না বাড়ে সে বিষয়েও নজর রাখা হবে।

গতকাল রোববার বগুড়ায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প আয়োজিত এক সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, খামারির স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে একদিকে খামারিরা তাদের উৎপাদিত পশুর ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও সহনীয় দামে কোরবানির পশু কেনার সুযোগ পাবেন।

জুলাইয়ের ৭৯৮ মামলায় ৫০৭৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চার দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর মা জেসমিন আক্তার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্তে নেমে এজাহারে উল্লেখ আসামিদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে রাব্বি হত্যাকাণ্ডে কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। তবে এজাহারভুক্ত ১২ জনের পাশাপাশি এবং তদন্তে নতুনভাবে শনাক্ত আরও ছয়জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পিবিআই।

শুধু রাব্বি হত্যা মামলা নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ জন্য ৭৯৮টি মামলায় ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।

পাশাপাশি অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কোনো মামলা তদন্ত করার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ না পেলে বা মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করে সেটিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলে। এ ছাড়া পুলিশ গত ১৬ মে পর্যন্ত জুলাইয়ের ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এতে মোট আসামি ১৩ হাজার ৮২৪ জন।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫৬টি।

অভিযোগপত্র দেওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৩। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারনামীয়, বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয়, বাকি ২ হাজার ৯২৭ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এ ধারা ১৭৩ (এ) সংযোজন করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। এই ধারা অনুযায়ী, হয়রানিমূলক কারও নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবেন এবং আদালত প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই ধারার আওতায় ডিএমপির বিভিন্ন থানার ৩৫৪ মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ।

এর বাইরে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানার ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জনকে, চট্টগ্রামে (সিএমপি) ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে (জিএমপি) ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে (আরএমপি) ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে (বিএমপি) ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় (কেএমপি) ১টি মামলায় ৫ জন ও রংপুরে (আরপিএমপি) ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

একইভাবে ঢাকা রেঞ্জের ৯টি জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬টি জেলার ৩৪টি মামলায় ৯৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮টি জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২ মামলায় ২৮ জন, ময়মনসিংহের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২ মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারার কার্যকর প্রয়োগ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ, তদন্তে স্বচ্ছতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মান আরও উন্নত হয়।

৬১% আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ পায়নি পিবিআই

থানার মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থাটি। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের ২৭২টি মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৪টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ১৮৮। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এসব মামলার মধ্যে মোট ১৬৫টির তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, যার ৪২টি হত্যা মামলা, বাকি ১২৩টি অন্যান্য ধারার। তদন্তাধীন আছে ১০৭টি মামলা।

সংস্থাটির তদন্ত শেষে নিষ্পত্তি হওয়া ১৬৫ মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, যার শতকরা হার ৬৭ দশমিক ৩। এসব মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে; যার মধ্যে ১৯টি হত্যা মামলা ও ৯২টি অন্য ধারার। এর বাইরে ৩১টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে; যার ১২টি সিআর ও দুটি জিআর মামলাকে মিথ্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে কোনো সিআর মামলায় বাদীর আদালতে হাজির না হওয়া, মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া ও একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা। এ ছাড়া অন্যান্যভাবে নিস্পত্তি হয়েছে ২৩টি (অধিকাংশ সিআর মামলা); যেসবের বাদী অনীহাসহ নানা কারণে আদালতের কাছে আবেদন করে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে এজাহারনামীয় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে বেশির ভাগই সিআর মামলা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে পূর্ব বিরোধ, প্রতিশোধপরায়ণতা কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অনেককে এসব এজাহারে আসামি করা হয়েছিল। এমন ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যারা ঘটনার সময় দূরের কথা, কয়েক বছর ঢাকায় অবস্থানই করেননি।

জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক মামলা

মুদি দোকানী মো. জামাল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ভাড়া থাকেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন তিনি। মামলায় বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে আশপাশের অলিগলি থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। হামলাকারীরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে জামাল গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া পরে। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৯৭ জনকে আসামি করা হয়। পিবিআইর তদন্তে ঘটনার সত্যতা উঠে আসে। তবে মামলায় অভিযুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে ৩৮ জনের জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই সম্প্রতি জড়িত ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ সমকালকে বলেন, যে ১০৭টি মামলা তদন্তাধীন, তার প্রায় ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। যে ১০ ভাগ কাজ বাকী আছে, তার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি, মেডিকেল সনদ ও অন্য মামলার সঙ্গে একত্রে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে বিলম্ব হচ্ছে। তবে অতি শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

সংসার ভাঙার পর প্রেম-বিয়ে নিয়ে অভিনেত্রীর মন্তব্য ভাইরাল

দুই সপ্তাহ ধরে দাম্পত্য ভাঙনের গুঞ্জনের পর অবশেষে বিচ্ছেদের কথা স্বীকার করেছেন বলিউড অভিনেত্রী মৌনী রায় এবং তার স্বামী সুরজ নাম্বিয়ার। যৌথ বিবৃতিতে চার বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার কথা জানিয়েছেন তারা।

বিচ্ছেদ ঘোষণার মধ্যেই নতুন করে ভাইরাল হয়েছে মৌনী রায়ের একটি পুরনো সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি প্রেম-বিয়ে নিয়ে নিজের আবেগঘন ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।

সহ-অভিনেতা নবীন কস্তুরিয়ার সঙ্গে আলাপকালে মৌনী বলেন, ‘আমি ১৯ বছর বয়সেই বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হতো, একজন সঠিক মানুষ পাশে থাকলে জীবনে নিরাপত্তা ও ভিন্ন অনুভূতি আসে।

তিনি জানান, বাস্তবে সেই সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। তার অনেক বন্ধু এখনও অবিবাহিত তাদের অভিজ্ঞতা দেখে তিনি বুঝেছিলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময় ও ধৈর্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অভিনেত্রীর কথায়, ‘সঠিক মানুষকে খুঁজে পেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যখন মানুষ খোঁজা বন্ধ করে দেয়, তখনই হয়তো জীবনের সঠিক মানুষ এসে যায়।’

সম্প্রতি বিচ্ছেদ নিয়ে যৌথ বিবৃতিতে মৌনী রায় ও সুরজ নাম্বিয়ার জানিয়েছেন, পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেই তারা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণের কাছে তাঁদের অনুরোধ, এই কঠিন সময়ে যেন তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে দুবাইয়ে প্রথম দেখা হয়েছিল মৌনি রায় এবং ব্যবসায়ী সুরজ নাম্বিয়ার। নিজেদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি গোয়ায় ঐতিহ্যবাহী মালায়ালি ও বাঙালি রীতিতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। চলতি মাসে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়।

মৌনিকে শেষবার ‘দ্য ভূতনি’ ধারাবাহিকে দেখা গিয়েছিল এবং শিগগিরই তিনি ‘হ্যায় জাওয়ানি তো ইশক হোনা হ্যায়’ ও ‘দ্য ওয়াইভস’ ধারাবাহিকে অভিনয় করবেন।