Home Blog Page 131

ল্যাংটার মেলা বন্ধের নির্দেশ খাদেমকে কুপিয়ে জখম

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের বেলতলী এলাকায় হজরত শাহ সোলেমান ল্যাংটার মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত ১০৭তম ওরশের মেলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। অনুমতি ছাড়াই মেলা আয়োজন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে গতকাল বুধবার বিকেল থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে সোমবার থেকেই মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। পরদিন মঙ্গলবার ওরশ ও মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিন মাদক সেবন ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে মেলায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুর্বৃত্তদের হামলায় মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া গুরুতর জখম হন।

তাঁকে উদ্ধার করে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জবীর হুসাইন সানীব সমকালকে বলেন, মেলা আয়োজনের জন্য প্রশাসনের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তাই গতকাল বুধবারের মধ্যেই মেলার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্দেশনা জানিয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই মেলা আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবন, জুয়ার আসর এবং চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। কিছু স্থানে নারী-পুরুষের যৌথ অশ্লীল নৃত্যসহ অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে মেলা বন্ধের দাবিতে চাঁদপুর জেলা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে একটি সংগঠন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।
মতলব উত্তর থানার ওসি মো. কামরুল হাসান বলেন, হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বেলতলী লঞ্চঘাট থেকে সাদুল্ল্যাপুর মোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেলা বসেছিল। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী এতে অংশ নেন।

গণভোট বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে বিএনপিকে বড় মাশুল দিতে হবে

গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাদের মতে, গণভোট কার্যকর হলে দেশের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এ প্রক্রিয়ায় গড়িমসি করলে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় মাশুল দিতে হতে পারে।
গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘ত্রয়োদশ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি গণভোট বাস্তবায়নের অন্তরায়?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি এ আয়োজন করে।

আলোচনায় এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, দলটির মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা কাজ করছে। বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না। এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই অতীতে জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। তবে দলটির রাজনীতি এখন আর আগের মতো এক্সক্লুসিভ নয়। অতীতে সংবিধান ও আওয়ামী লীগের প্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিতে না পারার কারণে জিয়াউর রহমানকে মূল্য দিতে হয়েছিল। বিএনপি একই পথে হাঁটছে বলেও মন্তব্য করেন এ নেতা।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াত নেতা শিশির মনির বলেন, সংবিধানে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা নেই। বিএনপি নিজেই তপশিলে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলেছিল। অথচ এখন তারা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। এখন ঐকমত্য কমিশনের সাংবিধানিক ভিত্তি কোথায়?
তিনি আরও বলেন, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং গণভোটের পক্ষে প্রচারণাও চালিয়েছে। কিন্তু এখন দলটির অবস্থান অস্পষ্ট।
আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা দাবিতে আন্দোলন হলেও এখন সেগুলোর আর কোনো প্রতিফলন নেই। তিনি জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে দ্বিচারিতার অভিযোগ করেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে গত ১৭ বছরে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হয়েছে বিএনপি; কিন্তু দলটি সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়নি। গণভোট উপেক্ষা করলে দলটির জন্য তা চরম মূল্য বয়ে আনতে পারে।
ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ফাহিম মাসরুর বলেন, জুলাই সনদে এমন কিছু নেই, যা বিএনপির ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন প্রমুখ।

সংবিধান সংস্কার না হলে আন্দোলন: বিরোধী দল

গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার না করলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। নিজের তোলা মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না পাওয়ার অভিযোগ তুলে গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী জোট।

সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, সংসদ বর্জন নয়, ওয়াকআউট করেছি। সংসদে বিরোধী দল ফিরবে কিনা, তা বৃহস্পতিবার (আজ) দেখা যাবে। তিনি বলেন, আন্দোলন ছাড়া আমাদের করার আর কী আছে? আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বক্তব্য বিকৃতির অভিযোগ করে তিনি জানান, ১১ দলের বৈঠকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করা হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিএনপি গণভোটের প্রস্তাব করেছে; কিন্তু সরকারে আসার পর গণভোটের রায় বাস্তবায়ন থেকে সরে গেছে। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এমপি পীরজাদা হানজালা উপস্থিত ছিলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবের ওপর মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হয়। তাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘বিশেষ সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করেন। বিরোধীদলীয় নেতা সরকারি এবং বিরোধী দল থেকে সমান সদস্য নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করেন। আইনমন্ত্রী এর বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন।

শফিকুর রহমান গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বক্তব্য বিকৃত করার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার চায়। গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কার চেয়েছে। সংবিধান সংশোধন কমিটি বিরোধী দল মেনে নেয়নি।

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের পর বিরোধী দল প্রস্তাবটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চায়। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্পিকার জানিয়েছেন, অতীতে মাত্র তিনটি মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব মঙ্গলবারের আলোচনায় শেষ হয়েছে। স্পিকার তাদের ওয়াকআউট না করার অনুরোধ করেছিলেন।

স্পিকারের অনুরোধের পরও জামায়াত-এনসিপি জোট কেন ওয়াকআউট করেছে– এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণভোটের রায় সংসদে যেহেতু কার্যকর করতে পারলাম না, তাই জনগণের দাবি জনগণের কাছে নিয়ে যাব।

স্বতন্ত্র এমপি শেখ মুজিবুর রহমানের পর বিএনপির এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক গতকাল জুলাই সনদের ওপর মুলতবি প্রস্তাব আনেন। ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম সরকারি দল মুলতবি প্রস্তাব আনল। এর ওপর আগামী রোববার আলোচনা হবে বলে স্পিকার সময় নির্ধারণ করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অভিপ্রায় চাপা দিতেই এই নোটিশটি আনা হয়েছে। এটারও প্রতিবাদ করেছি।

শফিকুর রহমান গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে বিরোধী সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এর আগে সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল।

জামায়াত আমির বলেন, বিএনপির পক্ষে যিনি ঐকমত্য কমিশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন। জামায়াতসহ অন্যান্য দল এতে সমর্থন করেছিল। বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাবের পর বাধার মুখেও ডেপুটি স্পিকার নোটিশটি আমলে নেন।
অতীতের গণভোটের নজির দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আগে তিনটি গণভোটের ফল মান্য করা হয়েছে। সংসদে এবারের গণভোটের সমাধান চেয়েছিলাম। গণভোটের রায় কীভাবে কার্যকর করা যায়, চেষ্টা করেছিলাম।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সরকারি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এটা তাদের ব্যাপার। জনগণ গণভোটে জুলাই আদেশ অনুমোদন করেছে। সংসদে যেহেতু পারলাম না, জনগণের দাবি জনগণের কাছে নিয়ে যাব।

এর আগে অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বের পরপরই বিরোধীদলীয় নেতা পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আগের দিনের মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন। ওই দিনের আলোচনার শেষ বক্তা আইনমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করেন। গণভোট ও গণভোটের আলোকে যে পরিষদ গঠন হওয়ার কথা ছিল, তার সভা আহ্বানের বিষয়টি ছিল নোটিশে। প্রত্যাশা করেছিলাম সংসদে প্রতিকার পাব।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে মাত্র তিনটি মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। বছরের পর বছর চলে যায় সংসদে কোনো মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ হয় না। তার পরও প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য ডেপুটি স্পিকার মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। আরেকটি নোটিশ এসেছে, বিরোধী দল সেখানে কথা বলার অবারিত সুযোগ পাবে।

স্পিকারের বক্তব্যের পর আবারও ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা প্রতিকার চেয়েছিলাম। যে বিষয়ে নির্বাচনের আগে সবাই একমত হয়েছিলাম। এর সপক্ষে কথা বলেছি, প্রচার করেছি। বিরোধী দলে বসে এখন এর অবমূল্যায়ন মেনে নিতে পারি না। এর প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।

এ সময় বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে স্পিকার বলেন, ওয়াকআউট আপনাদের অধিকার। আরেকটি নোটিশ রয়েছে, সেখানে মন খুলে আরও কথা বলতে পারবেন। তার পরও যদি ওয়াকআউট করতে চান, একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধী দলের নোটিশের সময়ই আপত্তি উত্থাপন করেছিলাম। উভয় পক্ষে বিতর্ক হয়েছে। সুতরাং আলোচনার পর নিষ্পত্তি কী হবে– সেজন্য ভোটাভুটি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

সরকারি দলের পক্ষে নোটিশ দিয়ে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগ ও লড়াইয়ের পর বিএনপির নেতৃত্বে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফসল জুলাই সনদ। যা ভবিষ্যতের পথরেখা।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরাজয় নিশ্চিত, বলছে ৮০ থিংকট্যাংক

ইরানে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে- বিশ্বের প্রধান ৮০টি থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি। সংবাদমাধ্যমটির ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ গত এক মাসে প্রকাশিত এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ কথা জানিয়েছে।

গবেষণায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেন পিছিয়ে-বিশ্লেষকরা এমন পাঁচটি বিষয় মূল স্তম্ভ হিসেবে ধরেছেন। এগুলো হলো—

১. প্রযুক্তিগত বনাম কৌশলগত জয়: সামরিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘ট্যাকটিক্যাল’ বা কৌশলগত কিছু আঘাত হানতে পারলেও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বা রণকৌশলগত দিক থেকে তারা ব্যর্থ।

২. ইরানের প্রতিরোধ: রাজনৈতিক ব্যবস্থা উপড়ে ফেলা, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধ্বংস করা বা দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার যে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ছিল, তা অর্জনে বাধা দিতে সক্ষম হয়েছে তেহরান।

৩. হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: ইরান বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ চালিয়ে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি দখল এবং সেটি পুনরায় সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ব্যর্থতা ইরানের হাতকে শক্তিশালী করেছে।

৪. ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ: বর্তমানে যুদ্ধটি একটি ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে সময় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের চেয়ে ইরানের পক্ষেই বেশি কাজ করছে।

৫. যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের পথ: যুদ্ধ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে হয় একটি ‘প্রচারণামূলক বিজয়’ দেখাতে হবে, নতুবা কোনো জয় ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করতে হবে।

তাসনিম নিউজের গবেষণায় মোট ৮০টি থিংকট্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি—ব্রুকিংস, কার্নেগি, সিএফআর, র‍্যান্ড, সিএসআইএস, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আটলান্টিক কাউন্সিলহ বাকিরা।

যুক্তরাজ্যের আটটি—চ্যাথাম হাউস, আইআইএসএস, রুসি, পলিসি এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য ১৮টি—ব্রুগেল, ইফরি, সিইপিএস, এসআইপিআরআই, জার্মান মার্শাল ফান্ড ইত্যাদি। এশিয়ার ৯টি—চীনের সিআইসিআইআর, ভারতের ওআরএফ, জাপানের জেআইআইএ, দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই ইত্যাদি। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপসহ ১৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া কানাডা (২), অস্ট্রেলিয়া (৩), ল্যাটিন আমেরিকা (১) ও আফ্রিকার (৩) শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এই তালিকায় রয়েছে।

গবেষণায় ব্রুকিংস, কার্নেগি, চ্যাথাম হাউস, সিএসআইএস, র‍্যান্ড, এসআইপিআরআই, ইউরেশিয়া গ্রুপ ও হাডসন ইনস্টিটিউটের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনই যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আটকে দিতে পেরেছে ইরান।

ইরান থেকে ‘শিগগির’ই বের হবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে আবার ফিরবে: ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধ থেকে শিগগিরই বের হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রয়োজন পড়লে আবার ফিরে এসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বুধবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান ট্রাম্প। এর আগে, গত মঙ্গলবার ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করা প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। সেখানে ‘শিগগিরই’ বোঝাতে একটি সময়সীমা তুলে ধরেন তিনি। সেটি হলো, দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো দুই অথবা তিন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ট্রাম্প একাধিকবার যুদ্ধ শেষ করার কথা বলেছেন। একই সময়ে যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনও করছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প আদৌ তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করবেন কিনা? গত সপ্তাহে তার দেওয়া একটি বক্তব্যও সামনে এসেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ট্রাম্পের সময়ে এক দিনের কোনো সীমা নেই। দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো দুই অথবা তিনও লাগতে পারে।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে চাপে আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ–সংক্রান্ত পরবর্তী পদক্ষেপগুলো তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বুধবার রাত ৯টায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।

রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তার ভাষণের একটি দিক হবে ন্যাটোর প্রতি তাঁর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা। তার মতে, ইরানে মার্কিন লক্ষ্য অর্জনে এই জোটের পক্ষ থেকে সমর্থনের অভাব রয়েছে। ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তিনি ‘অবশ্যই’ বিবেচনা করছেন বলে জানান। ১৯৪৯ সালে মার্কিন সিনেটে এই জোটের অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের যখন দরকার পড়ল, তখন তারা বন্ধুর পরিচয় দেয়নি। আমরা কখনো তাদের কাছে খুব বেশি কিছু চাইনি…এটা সব সময় একতরফা ছিল।’

যুক্তরাষ্ট্র কখন ইরান যুদ্ধ শেষ বলে বিবেচনা করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে নির্দিষ্ট করতে বলতে পারব না…আমরা খুব দ্রুতই সরে আসব।’

জরিমানার প্রতিবাদে সিলেটের সকল পেট্রোল পাম্প বন্ধ ঘোষণা

জরিমানা ও হয়রানির অভিযোগে সিলেটে সব ধরনের পেট্রোল পাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট বিভাগের সকল পাম্প বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী সমকালকে জানিয়েছেন, সিলেটে জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও তুচ্ছ অজুহাতে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে ছয়টি পেট্রোল পাম্পকে জরিমানা করা হয়েছে। সংকটের মধ্যে এসব জরিমানা না করলে চলতো।

তিনি জানান, অন্যায়ভাবে জরিমানা করা এবং পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার বসানো, বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ঘনঘন হিসাব নেওয়ার প্রতিবাদে তারা তেল বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সিলেট বিভাগের সিএনজি ও এলপিজিসহ কোনো পাম্পই মালিকদের পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব নয় দাবি করে সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন আহমেদ জানান, সরকারের প্রতিনিধিরা চাইলে পাম্প চালাতে পারেন, এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। মূলত প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জরিমানাকে ‘হয়রানি’ হিসেবেই আমরা দেখছি।

তারা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে এসব বিষয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কোনো ফলাফল আসেনি। ফলে রাতেই তারা বৈঠক করে পেট্রোল পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে কর্মসূচি চলবে।

রেলের গতি ধীর, উন্নতি নেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষায়

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গতি খুবই ধীর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে উন্নতি নেই। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত আট মাসে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নে এই তিনটিই সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। এ রকম আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়ন দুর্বলতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাস শেষে এডিপিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ অবস্থায় শেষ ৪ মাসে বরাদ্দের বাকি ৬৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করা অনেকটা অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়নের  হালনাগাদ প্রতিবেদন গতকাল বুধবার প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, গত আট মাসে এডিপির বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে মোট ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থছরের একই সময়ে যা ছিল ৬৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকারও বেশি।

অবশ্য একক মাসের হিসাবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাস্তবায়নের হার আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। মাসটিতে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই মাসে ছিল সাত হাজার  ৬৭৬ কোটি টাকা।

গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার প্রায় প্রতিবছরই এই ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এই অর্থবছর এ রকম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে মোট এডিপি বরাদ্দের ৭১ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যয় মাত্র ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মোট এডিপির ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। মোট বরাদ্দ আছে আট হাজার ৫৪ কোটি টাকা। ছয়টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ রয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রায়ই একই ধরনের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ছিল মন্ত্রণালয়টির।

প্রায় একই গতি রেলের। আট মাসে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ব্যয়ের পরিমাণ এক হাজার ২৪ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয়টির জন্য বরাদ্দ রয়েছে চার হাজার  ৯২৪ কোটি টাকা। সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ পেয়েছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়।

সর্বাধিক বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এডিপি ব্যয়ের হার ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আট মাসে ব্যয় করা গেছে মাত্র ৬৬০ কোটি টাকার মতো। মোট বরাদ্দ রয়েছে তিন হাজার ১২৮ কোটি টাকারও বেশি। ১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের।

পরিকল্পনা কমিশন এবং আইএমইডির কর্মকর্তারা বলেন, সাম্প্রতিক নানা কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি এত ধীর। প্রধান কারণ বাস্তবায়নে অদক্ষতা। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা ছিল। নতুন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালাও অন্যতম কারণ হতে পারে। এখন শতভাগ টেন্ডার ইজিপির আওতায় আনা হচ্ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে সময় লাগছে। নতুন ও বিধিমালা অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়টাতে সরকারি ক্রয় বন্ধ রেখেছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

অনলাইনে এক দিন স্কুল, দোকানপাট রাত ৮টায় বন্ধের চিন্তা

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে এক দিন ক্লাস হবে অনলাইনে এবং দোকানপাট ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে আজ রাত সাড়ে ৮টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। এরপর জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা

হবে। করোনাভাইরাসের সময় ২০২০ সালে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ও শপিংমল খোলার সময় ছিল সকাল ৯টা এবং বন্ধের সময় ছিল রাত ৮টা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ও শপিংমল খোলা থাকছে রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। খোলা হচ্ছে সকাল ১০টা থেকে ১১টায়। এখন সরকার আগের সেই সময় (সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা) কার্যকর করতে পারে। চলমান জ্বালানি সংকট বাড়তে থাকলে বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৭টাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মিসরসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে দোকান, রেস্তোরাঁ ও শপিংমল রাতে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব ওঠে, যার মধ্যে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীরে ক্লাস থাকবে। শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ক্লাস নেবেন এবং জোড়-বিজোড় দিন ধরে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাসের সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আপাতত সপ্তাহে এক দিন অনলাইনে ক্লাস করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া স্কুল-কলেজের ক্লাস অনলাইনে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা হবে সশরীরে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু গতকাল বুধবার সমকালকে বলেন, দোকানপাট, শপিংমল খোলা ও বন্ধের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে বুধবার রাতে আমরা স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক করেছি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত সরকারকে জানাব।

তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস ছুটি বিকেল ৫টায়। এ জন্য দোকানপাট ও শপিংমলগুলো কমপক্ষে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখতে হবে। কারণ, অনেক মানুষ অফিস শেষে মার্কেটে আসে।

এর আগে গত ১৫ মার্চ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতিসহ বিভিন্ন মার্কেটের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়বিষয়ক একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার শর্তে ৪০ শতাংশ আলোকসজ্জা কম করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন সব দোকান ব্যবসায়ী।

পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উপলক্ষে ৪০ দিনের ছুটির পর গত রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকটে পড়েছে অনেক দেশ, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন পাঠদান চালুর বিষয়টি সামনে এসেছে।

এর আগে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার সময় বিকল্প হিসেবে অনলাইন ও টেলিভিশনে ক্লাস চালু করা হলেও বিভিন্ন গবেষণায় সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত বলে উঠে আসে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শ্রেণিকক্ষের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নেই, তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না।

‘প্রিন্স’-এর জন্য শাকিবের দুঃখ প্রকাশ, দায়ী করলেন সময়-পরিস্থিতিকে

ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খানের সিনেমা নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা একটু বেশিই থাকে। কিন্তু এবার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রিন্স’ সেভাবে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কারণ সাউন্ড, কালারসহ বেশকিছু টেকনিকেল জটিলাতার মুখে পড়ে সিনেমাটি। অবশেষে মুক্তির ১০ দিন পর সবকিছুর জন্য সময় ও পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন সিনেমায় নায়ক শাকিব খান।

মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে অবস্থিত স্টার সিনেপ্লেক্সে বিশেষ প্রদর্শনী শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিনেমাটি নিয়ে কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা আবু হায়াত মাহমুদ, প্রযোজক শিরিন সুলতানা, অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ, জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু, অভিনেতা ডা. এজাজ, ইন্তেখাব দিনারসহ অনেকে।

এসময় শাকিব খান বলেন, “আমি যখন প্রিন্স সিনেমার গল্প শুনেছি তখন মনে হয়েছিল এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিনেমা হতে যাচ্ছে। হয়তো সময় স্বল্পতার কারণে আমরা সেটা করতে পারিনি। এজন্য নির্মাতাসহ সবার পক্ষ থেকে আমি দুঃখ প্রকার করছি। আমরা কিছু চেষ্টা করেছি। আমি আমার পরবর্তী সিনেমাতে ত্রুটিগুলো খেয়াল করবো।”

শাকিব খান ভাষ্য, ‘আমি ৩০টির বেশি গল্প শুনে একটি গল্প পছন্দ করি। বলতে গেলে, সারা বছরই গল্প শুনি। এরপর একটি গল্প পছন্দ করি। কিন্তু এবার যেটা হয়েছে সেটা সেটা ভিন্ন। আমরা তিন মাস ভারতে কাজের অনুমতি পাইনি। এরপর যা হয়েছে সেটা আরও ভয়াবহ। যেখানে আমাদের সিনেমার সেট ফেলা হয়েছিল সেটা ভেঙে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখানেও অনেক সময় চলে গেছে। ফলে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হয়েছে। যার কারণে সময়ের অভাবে অনেক ত্রুটি থেকে গেছে। হায়াত মাহমুদ অনেক ভালো ও মেধাবী একজন নির্মাতা। আমরা যদি উপযুক্ত সময় পেতাম তাহলে ভালো কিছু হতো।”

শাকিব বলেন, ‘আমার জীবনের এইটা কোনো সিনেমা যেটার শুটিং ঈদের আগের দিন পর্যন্ত করেছি। তাসনিয়া ফারিণের সঙ্গে আইটেম গানের শুটিং ঈদের আগেই করেছি। এছাড়া পরী গানের শুটিং একদিনে শেষ করেছি। এগুলো হয়েছে শুধু সময়ের কারণে।’

প্রযুক্তিগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, মুক্তির পর প্রথম পাঁচ দিন মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমাটি চলেনি, যা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঈদের পর পাঁচদিন আমরা মাল্টিপ্লেক্সে ঢুকতে পারিনি। এটা কষ্টের। কিন্তু এই পাঁচদিন সবচেয়ে ভালো কোন সিনেমা ছিল। বলতে গেলে প্রায় কোনোটাই ছিল না। তার মানে, আমাদের বড় সিনেমা দরকার।’

নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এই অভিনেতা বলেন, ‘দেশের নতুন সরকার এসেছে। তাদের বলতে চাই- বিগত সরকারের কথা ভুলে যান। আপনাদের কাছে আমাদের আশা-প্রত্যাশা অনেক। আপনারা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে শুধু নাচে-গানে ভরপুর একটা জায়গা ভাববেন না। একটি সিনেমা সমাজ ও সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন যথাযথ সহযোগিতা।”

এসময় তাসনিয়া ফারিণ বলেন, ‘এই সিনেমায় যুক্ত হওয়ার পর আমার প্রত্যাশার জায়গাটা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে সময় বা সবকিছু মিলে প্রত্যাশাটা সেরকমভাবে পূরণ হয়নি। তবে আমি আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি। আশাকরি ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে ভালো করে করে দেখাতে পারবো।’

নির্মাতা হায়াত মাহমুদ বলেন, “প্রিন্স যথা সময়ে এসেছে। নানা জটিলতায় হয়তো পাঁচদিন সিনেপ্লেক্সে চলেনি। কিন্তু যেদিন থেকে সিনেপ্লেক্সে প্রিন্স এসেছে সেদিন খেকেই সর্বোচ্চ শো নিয়ে চলছে। সিনেমাটি দেখার পর থেকেই দর্শক বলেছে ‘প্রিন্স ২’ চাই। সময় হলে আমরা এটির ঘোষণা দেবো।”

ডিজেল সংকটে উপকূলের লাখো জেলে কর্মহীন

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে রণজিৎ চন্দ্র দাস সাত দিন ধরে নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন। নদী আছে, জাল আছে, ইঞ্জিনও আছে; কিন্তু নেই ডিজেল। এই অভাবই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে রণজিৎ বলেন, ‘নদীতীরের হাটবাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে লিটারপ্রতি ৬০-৭০ টাকা বেশি দামে কিনে নদীতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই খরচ তোলা সম্ভব না।

রণজিৎ বলেন, ‘সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার আর শ্রমিকদের নিয়ে খুব বিপদে আছি। ছেলেমেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।’ রণজিৎ একা নন; একই চিত্র দেশের প্রায় সব নদী ও উপকূলীয় এলাকায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে। ডিজেলের সংকটে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী কিংবা সাগরে যেতে পারছে না।

মৎস্যজীবীদের ভাষ্য, এ অবস্থা চলতে থাকলে মাছ ধরা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

জেলে ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে নদনদীতে মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতে। অনেক জায়গায় কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ফলে শুধু জেলে নয়; আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে।
এই সংকটের মধ্যেই সামনে আসছে আরেক বড় চাপ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। এর লক্ষ্য– মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করা। জেলেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ, তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা; সব মিলিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায়।

সামনে নিষেধাজ্ঞা, জীবিকা হুমকিতে
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব বলছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমুদ্রগামী ট্রলার পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, জেলেদের খাবার, বরফ, মজুরি– সব মিলিয়ে খরচ এত বেড়েছে যে মাছ বিক্রি করে সেই টাকা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক নিষেধাজ্ঞা; ৬৫ দিনের সমুদ্র নিষেধাজ্ঞা, ২২ দিনের মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচি, অভয়ারণ্যে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ, আট মাস জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ তিন হাজার। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। পরিবারসহ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখেরও বেশি। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী ও সাগরে যায়। ছোট নৌকায় দৈনিক ৫-২০ লিটার, মাঝারি নৌকায় ২০-৫০ লিটার এবং বড় ট্রলারে প্রতিদিন ১০০-৩০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দেশে ২১৫টি শিল্প ট্রলার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৮০টি নিয়মিত সাগরে মাছ ধরে। এসব ট্রলারকে একটানা ২২ থেকে ২৫ দিন সাগরে থাকতে হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটে এখন অনেক ট্রলারই ঘাটে পড়ে আছে।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আগে ১২ মাস মাছ ধরতাম। এখন নানা নিষেধাজ্ঞায় বছরে প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ থাকে। কিন্তু ব্যাংকের সুদ তো থামে না। এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে। সরকার সমুদ্র অর্থনীতির কথা বলছে; কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা না দিলে আমরা টিকে থাকতে পারব না।

উপকূলজুড়ে স্থবিরতা
উপকূলজুড়ে নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা, খালে নোঙর করে থাকা ট্রলা, আর তীরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা। খুলনা অঞ্চলের সমুদ্রগামী জেলেদের অবস্থা সবচেয়ে সংকটজনক। জাল, নৌকা, ট্রলার– সব প্রস্তুত থাকলেও জ্বালানির অভাবে সমুদ্রে যেতে পারছেন না তারা। কয়রা উপজেলার কালনা গ্রামের জেলে সাইদুল শেখ বলেন, ‘সংকটের শুরুতে বেশি দামে হলেও তেল পাওয়া যেত। এখন দুই-তিন গুণ দাম দিলেও তেল নেই। এক সপ্তাহ ধরে ঘরে বসে আছি।’

একই উপজেলার আটরা গ্রামের ট্রলার মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ট্রলারে ১০ জন জেলে। তেল না পেলে আমরা কীভাবে চলব? এভাবে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।’

কয়রা মৎস্য আড়ত সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী জানান, এক সপ্তাহ ধরে আড়তে মাছ আসছে না বললেই চলে। জেলেরা যেতে পারছে না, আবার গভীর সুন্দরবন থেকে মাছ আনাও বন্ধ।
বঙ্গোপসাগরের দুবলার চর, আলোর কোল, শ্যালার চর, নারকেলবাড়িয়া– এসব শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এখন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল– এই পাঁচ মাসেই পুরো মৌসুমের আয় নির্ভর করে। কিন্তু মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে তেল সংকটে ভেঙে পড়েছে পুরো কার্যক্রম। দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একটি ট্রলারে ৩০ লিটার ডিজেল লাগে, সেখানে পাচ্ছি দুই-তিন লিটার। ৪৫০-৫০০ ট্রলার বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। দূরে পাঠানো যাচ্ছে না, খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে গেছে।’

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে ডিজেল সংকট যেন দীর্ঘ হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন। অনেক জায়গায় ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড সাঁটানো। কোথাও সীমিত রেশনিং। এই উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার জেলের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। প্রতিদিন এসব নৌকায় ৩০-৪০ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু এখন মাত্র ১০ শতাংশ জেলে কোনোভাবে তেল জোগাড় করে নদীতে নামছেন। দক্ষিণ তারাবুনিয়া, কাচিকাটা, দুলার চর ঘুরে দেখা যায়, নৌকায় বসে জেলেরা জাল বুনছেন, কেউ লুডু খেলছেন, কেউবা চায়ের দোকানে সময় কাটাচ্ছেন। উপজেলার কাচিকাটার জেলে করিম হাওলাদার বলেন, ‘এক লিটার ডিজেল ১৭০ টাকা দিয়ে কিনেছি। কিন্তু সেই তেলে নদীতে নামার সাহস পাইনি। আমার নৌকা ১০ মিনিটও চলবে না।’

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই অভিযোগ– পাম্পে তেল নেই, কিন্তু খোলাবাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে আগে লিটারপ্রতি ১০০-১০৫ টাকা ছিল, এখন ১৫০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। জেলেরা বলছেন, টাকা দিলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বেশি দিলেই পাওয়া যায়।

পটুয়াখালী ও আশপাশের উপকূলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জেলেদের দাবি, মাছ আহরণ ৭০-৮০ শতাংশ কমে গেছে। মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে শত শত ট্রলার ঘাটে বাঁধা। প্রতিদিন ৩০-৩৫ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র চার-পাঁচ হাজার লিটার। ট্রলার মালিক মনু খান বলেন, ‘এক সপ্তাহের জন্য ১ হাজার ২০০ লিটার তেল লাগে। কিন্তু ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুদিনেই ফিরে আসতে হয়েছে।’

বরগুনার বদরখালী এলাকায় জেলেরা গতকাল মঙ্গলবার মানববন্ধন করেছেন। তাদের অভিযোগ, বোতলে তেল বিক্রি বন্ধ থাকায় ছোট নৌকার জেলেরা তেল পাচ্ছেন না। জেলে ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘আমরা নৌকা নিয়ে পাম্পে যেতে পারি না। বোতলে তেল না দিলে আমরা কীভাবে নেব?’

পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্যবন্দরের এফভি ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের মালিক মো. মনু খান জানান, এক সপ্তাহ সাগরে থাকতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু তিনি মাত্র ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুই দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে ডিজেল না পেয়ে ট্রলার, ১৮ জন মাঝিমাল্লাসহ বন্দরে নোঙর করে আছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের ভরণপোষণ তাঁকেই করতে হচ্ছে। মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, এ দুটি বন্দরে ১২০টি আড়তে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ করেন। এসব আড়তের মাধ্যমে সারাদেশে মাছ সরবরাহে প্রায় ৩০০ পাইকার যুক্ত। পাশাপাশি বরফকল, হোটেল, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ পুরো অর্থনৈতিক চক্র এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডিজেল সংকটে সবখানেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মহিপুর ও আলীপুর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার সরদার জানান, তাঁর সংগঠনের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক এখন কর্মহীন। ঈদের আগ থেকেই কাজ বন্ধ। সামনে আবার নিষেধাজ্ঞা, তাতে সংকট আরও বাড়বে। মহিপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস বলেন, ট্রলার চলাচল ৭০-৮০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আড়তের শ্রমিকদের কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আগে প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ সরবরাহ হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ। মহিপুরের একটি ফিলিং স্টেশনের ডিলার মো. রাজু আহমেদ জানান, প্রতিদিন ট্রলারের চাহিদা ৩০-৩৫ হাজার লিটার হলেও তিনি পাচ্ছেন মাত্র চার-পাঁচ হাজার লিটার। ফলে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, ঈদের আগ পর্যন্ত জেলেদের জ্বালানি পেতে সমস্যা হয়নি। তবে ঈদের পর নদীতীরবর্তী হাটবাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু এলাকায় জেলেরা তেল পাচ্ছেন না– এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই সংকট কেটে যাবে।

চিলমারীতে জেলেদের অবস্থান কর্মসূচি
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ডিজেল সংকটে বিপাকে পড়েছেন নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো। জ্বালানি না পেয়ে ও অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় সোমবার ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অর্ধশতাধিক জেলে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দিলেই কেবল ডিজেল মিলছে। ফলে অনেক জেলে নদীতে নামতে পারছেন না; বন্ধ হয়ে গেছে আয়ের পথ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, শতাধিক পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।