Home Blog Page 18

২০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি পিছিয়ে গেল মন্ত্রিসভা কমিটিতে অসম্পূর্ণ প্রস্তাব

প্রায় ২০ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ২০টি প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এসব প্রস্তাব নিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন প্রশ্ন তুললেও জ্বালানি বিভাগ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ফলে প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ আবার উপস্থাপনের পরামর্শ দেয় কমিটি। এরপর এসব প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়।
সচিবালয়ে গতকাল মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। ডিজেল আমদানির প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি বৈঠকে থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রস্তাবগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বেশ কিছু অসংগতি থাকায় কমিটির সদস্যরা একাধিক প্রশ্ন তুললেও জ্বালানি বিভাগ তার সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এজন্য আরও পর্যালোচনা করে ফের উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সংঘাতের সময় সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরবরাহের প্রস্তাব আসে। বিপিসি সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাব আকারে জ্বালানি বিভাগে পাঠায়। পরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হয়। অনেক প্রস্তাব একসঙ্গে আসায় সদস্যরা বলেছেন, যদি আরও কোনো প্রস্তাব থাকে তাহলে সবগুলো একসঙ্গে পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ কারণেই ফের উপস্থাপনের জন্য রাখা হয়েছে।
টানা দুই সপ্তাহ প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হবে কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হবে না। কারণ দেশের জ্বালানি তেলের নিয়মিত আমদানি আগের মতোই চলছে। সরকার দুটি পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল কিনে– ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তি। তাই এগুলো অনুমোদনে কিছুটা সময় লাগলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টি হবে না।’

প্রস্তাবে যা ছিল
দেশে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যাচাই-বাছাই ও দরকষাকষির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেছে। প্রস্তাবে ওমান, নাইজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, কাজাখস্তান, দুবাই ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়।

আগের সপ্তাহে ফেরত যায় ১৫ প্রস্তাব
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও একই ধরনের অন্তত ১৫টি প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। প্রস্তাবগুলোর আওতায় প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।
ফলে টানা দুই সপ্তাহে প্রায় ২০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ আটকে গেল। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত নতুন করে অনুমোদন না মিললে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যেসব প্রস্তাব অনুমোদন 
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুনভর ইউএসএ এলএলসি থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করছে। গুনভর ইউএসএ এলএলসির কাছ থেকে ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ছয় কার্গো এলএনজি কেনা হবে। প্রস্তাবটি জিটুজি চুক্তির আওতায় প্রক্রিয়াকরণের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মহেশখালীতে এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা দেশকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

শিক্ষার্থীদের চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে নিজেরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে দিনাজপুর সাংবাদিক সমিতি, ঢাকা (ডিজেএডি) আয়োজিত ‘ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। দিনাজপুর জেলা থেকে ঢাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য আসা এবং সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের দিকনির্দেশনা দিতে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের প্রায় ৬৫০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। তরুণ এই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান তরুণদের চিন্তা-ভাবনা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি রাখে। শুধু একটি জেলা বা উপজেলার উন্নয়ন নয়, পুরো দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ভালো ক্যারিয়ার গড়তে সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা লাগবে যেটা পরিবার থেকে অর্জন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।

মন্ত্রী বলেন, সফল ক্যারিয়ার গড়তে জিনিয়াস হওয়া জরুরি নয়। ধৈর্য, কমিটমেন্ট এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন সাধারণ মেধার মানুষও নিজের পেশায় সফল হতে পারেন। ফাঁকফোকড় দিয়ে পরীক্ষায় পাস করা সম্ভব হলেও এভাবে কখনও ভালো মানের ডাক্তার হওয়া যায় না। শুধু চিকিৎসক নয়, একজন দক্ষ প্রকৌশলী বা যেকোনো পেশায় সফল হতে হলে যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রমের বিকল্প নেই।

তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ এবং আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সঠিক কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, শুধু সনাতন বা মুখস্থবিদ্যা দিয়ে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তী হওয়ার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে নিজেদের মেধা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা (স্কিল) অর্জন করতে হবে। এজন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  এদেশে তরুণ সমাজ তথা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ট্রেডে স্কিল দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলছে, যাতে তারা সমাজের মেইনস্ট্রিমে আসতে পারে।

এ লক্ষ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে, যাতে তারা মূলধারার কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, এ দেশের কোন মানুষ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারবে না, শিক্ষা অর্জন করতে পারবে না, এটা বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, আমরা সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়তে চাই।

দিনাজপুর অঞ্চলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন হবে: পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি বলেন, মফস্বল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যেন ঢাকায় এসে সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, সেজন্য এ ধরনের মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম অত্যন্ত জরুরি।

তিনি পরিবেশ উন্নয়ন এবং কৃষিজ উন্নয়নে বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচির উপর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দিনাজপুর অঞ্চলের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে।

চাকরি খোঁজার মানসিকতা বদলাতে হবে: রাজউক চেয়ারম্যান
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, চাকরি খোঁজার মানসিকতা বদলে নিজে নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

দিনাজপুর সাংবাদিক সমিতি, ঢাকার (ডিজেএডির) সভাপতি মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হুমায়ন চিস্তির সঞ্চালনায় সেমিনারে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব এবং বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা ক্যারিয়ার গঠনে প্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা, বিসিএস প্রস্তুতি এবং নতুন স্টার্টআপ খাতের বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেন। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডিজেএডির সহসভাপতি ও দৈনিক আমাদের বার্তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জাকারিয়া মন্ডল।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন, নিউরোসাইন্স হাসপাতালের সার্জন ডা. মাহফুজ, পাটোয়ারী বিজনেস হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন, অ্যাডভোকেট দুর্বার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নওরোজ পত্রিকার সম্পাদক শামসুল হক দুররানী, ডিজেএডির সাবেক সভাপতি মর্তুজা হায়দার লিটন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ কে এম ওবায়দুর রহমান, ডিজেএডির যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব মমতাজী, অর্থ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান পারভেজ, জিলফুল মুরাদ শানু প্রমুখ। এতে দিনাজপুর জেলার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকশত শিক্ষার্থী এবং সমিতির সদস্য সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

গ্যাস সংকট কাটাতে মালয়েশিয়ার সাহায্য চাইলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি ও ফোনালাপ

দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে কথা বলেছেন। গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে এলএনজি সরবরাহসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সংকট নিরসনে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, দেশের গ্যাস সংকটের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি পাঠিয়েছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে কথাও হয়েছে।

এদিকে টেলিফোনে আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ফেসবুক পোস্টে  বলেন, পারস্পরিক স্বার্থে বিশেষ করে জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার উপায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেছেন। এ ধরনের সহযোগিতা অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং উভয় দেশের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক হবে।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো চিঠি মঙ্গলবার তাঁর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে দুপুরে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি তুলে ধরে সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর দেশের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, তা করা হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশকে জানানো হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে। তবে বিকল্পের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই সংকট তীব্র হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে মালয়েশিয়ার কাছে এটিও জানতে চাওয়া হয়েছে যে, চলমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানে দেশটি কোনো সহায়তা দিতে পারবে কিনা।

মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কবে নাগাদ এর সুফল পাওয়া যাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। মালয়েশিয়া সরকার কত দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে, সে বিষয়েও তাদের মতামত চাওয়া হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলা যাবে। তিনি বলেন, এটি একটি প্রক্রিয়ার বিষয়। একই সঙ্গে অন্য উৎস থেকেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণই এ সমস্যার কার্যকর সমাধান বলে মনে করছে সরকার।
দেশে গ্যাস সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে আবারও দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গণপরিবহন– সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে এক্সিলারেট এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে। এ সময় টার্মিনাল চালুর অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল যৌথভাবে দিনরাত কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীও পুরো বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বন্ধ থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। এর মধ্যে আগামী সপ্তাহে ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। পরবর্তী সপ্তাহে টার্মিনালটির পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারের একটি বিশেষজ্ঞ দল এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।

পেট্রোনাসের প্রস্তাব 
দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস। ক্রায়োজেনিক লরি ট্যাঙ্কার বা আইএসও কনটেইনার পদ্ধতিতে মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি এনে সরাসরি বাংলাদেশের শিল্পকারখানায় সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে স্বল্প সময়ে গ্যাসের সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে মনে করা হলেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উচ্চ মূল্য। বর্তমানে শিল্পে সরকার প্রতি ইউনিট গ্যাস ৩১ টাকায় সরবরাহ করলেও পেট্রোনাসের প্রস্তাব অনুযায়ী আইএসও পদ্ধতিতে সেই গ্যাসের দাম পড়বে প্রায় ১০০ টাকা। সোমবার পেট্রোবাংলায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পেট্রোনাস এ প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে অতিরিক্ত দামের কারণে প্রস্তাবটি নিয়ে সরকার ও শিল্প মালিকদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। তাই তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে আরও যা বললেন আনোয়ার ইব্রাহিম
ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের সময় আমরা পারস্পরিক স্বার্থে বিশেষ করে জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বাস্তবসম্মত সহযোগিতা এবং উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করতে মালয়েশিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকট এবং দেশটির জরুরি চাহিদা মেটাতে পেট্রোনাসের সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে সহযোগিতাসহ মালয়েশিয়ার সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ব্যবহার একই, তবু জুনে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল

প্রতিবছর জুন শেষ হলেই বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। আগের মাসের চেয়ে কয়েক গুণ বিদ্যুৎ বিল হাতে পেয়েই অনেকের চোখ কপালে ওঠে। এবারও নিয়মে ফেরেনি এই অনিয়ম।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, বাসায় নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র লাগানো হয়নি, তার ওপর ছিল লোডশেডিং। তবু কেন জুনের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ বাড়ল!

ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের এমন যৌক্তিক প্রশ্নে নানা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। খোদ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম দাবি করছেন, জুনে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি হয়েছে। তাই আগের মাসের চেয়ে বিল বেশি এসেছে। তিনি মনে করেন, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এ জন্য অনেকেরই বিল বেশি এসেছে, এটা স্বাভাবিক।

দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক প্রায় পাঁচ কোটি। এর বড় একটি অংশ এখনও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহার করেন। এসব গ্রাহকের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না। কোথাও কোথাও দেওয়া হয় অনুমাননির্ভর বিল। আবার কোথাও একসঙ্গে কয়েক মাসের রিডিং যোগ করা হয়।

অন্যদিকে, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বলছেন, জুন-জুলাইয়ে বিদ্যুৎ বিল রিচার্জ করার পরপরই টাকা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা তো বটেই; নারায়ণগঞ্জ, সাভার, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের এমন অভিযোগ মিলেছে।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, জুনের এমন বিলের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে মিটার রিডিং নিয়মিত নেওয়া হয় না। অর্থবছরের শেষে কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়ায় গ্রাহক উচ্চ স্ল্যাবে চলে যান। ফলে বিল অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তবে বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি সূত্রের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষে রাজস্ব আয় বেশি দেখানো বা সিস্টেম লস কমিয়ে দেখানোর প্রবণতাও অতিরিক্ত বিলের কারণ হতে পারে।

এদিকে, জুনে হঠাৎ কয়েক গুণ বিল আসায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, মিটার রিডিংয়ে ভুল বা বিলিং ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি ভুল বিলের কারণে যেন কোনো গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা জরিমানা করা না হয়, সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি করেছেন গ্রাহকরা।
এ পরিস্থিতিতে ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে সারাদেশের জেলা প্রশাসক ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা আসে। করনিক বা কারিগরি ভুল হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন এবং অসদুপায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ এখন শুধু অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহীতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। তারা ভূতুড়ে বিল বাতিল, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের ভিত্তিতে নতুন বিল, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিল সমন্বয় এবং বিশেষ অভিযোগ সেল গঠনের দাবি জানিয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

বিস্ময়কর বিদ্যুৎ বিল
রাজধানীর দুই বিতরণ সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতির অধিকাংশ গ্রাহক বিল বিপত্তিতে পড়েছেন।

ঢাকার আদাবরের বাসিন্দা ইকবাল হোসেনের বাসার প্রতি মাসের বিদ্যুৎ বিল এক হাজার ৫০০ টাকার আশপাশে থাকলেও জুনে তা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে! পরে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, একটি ডিজিট ভুল করে বসানো হয়েছিল। সংশোধনের পর বিল নেমে আসে এক হাজার ৪৬০ টাকায়। ইকবালের প্রশ্ন– আমি অভিযোগ করেছি বলে ভুলটি ধরা পড়েছে। যিনি অভিযোগ করবেন না, তার কী হবে?

খিলগাঁওয়ের সজিবুর রহমান বলেন, একই ব্যবহারেও জুনে কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে। ডেমরার শরিফুল ইসলামের দাবি, প্রায় প্রতি বছরই জুনে এমন হয়। অভিযোগ দিয়েও লাভ হয় না।
নিকেতনের বাসিন্দা সালাউদ্দিনের মার্চে বাসার বিদ্যুৎ বিল আসে ছয় হাজার ৩৭৭ টাকা, এপ্রিলে সাত হাজার ৪০২ টাকা আর মে মাসে ছয় হাজার ৮৪২ টাকা। সালাউদ্দিনকে অবাক করে দিয়ে জুনে বিল আসে ৪৮ হাজার ৯০৯ টাকা! যা বিলের ধারাবাহিকতায় চোখে পড়ার মতো। তিনি বলেন, এই বিল অবিশ্বাস্য!

মোহাম্মদপুরের আমিন খানের অভিযোগ, মিটার না দেখে কিংবা সঠিক রিডিং না নিয়ে এভাবে বিল তৈরি করলে সাধারণ গ্রাহক বাড়তি আর্থিক চাপ পড়বে। এটার সুরাহা দরকার।
নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়ার বাসিন্দা মিঠু ভূঁইয়া ডিপিডিসির গ্রাহক। তাঁর মে মাসের বিল ছিল ছয় হাজার ১০০ টাকা। জুনে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২০০ টাকায়। তিনি বলেন, গরম ছিল, এসি চলেছে। কিন্তু ব্যবহার এতটা বাড়েনি যে বিল প্রায় দ্বিগুণ হবে।

রাজধানীর বাইরের চিত্রও একই। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বিতরণ সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো), দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিতরণ সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এবং দেশের সীমিত এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গ্রাহকরাও ভুগছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক রিফাত আবির জানান, সাধারণত তাঁর বাসার বিল আসে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা। জুনে এসেছে প্রায় চার হাজার টাকা। অভিযোগ করলে তাঁকে বিল পরিশোধ করে পরে সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়। একই এলাকার মো. শাহীনের নিয়মিত বিল ছয় হাজার টাকার মতো হলেও জুনে এসেছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনোয়ার হোসেনের বাসায় কোনো এসি নেই। তবু তাঁর বিল এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৭৬৬ টাকা। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘বিদ্যুৎ বিল দেব, নাকি সংসার চালাব– সেটাই বুঝতে পারছি না।’

হবিগঞ্জে এক নারী গ্রাহকের নামে দুই কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল ইস্যু হওয়ার ঘটনাও আলোচনার জন্ম দেয়। পরে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সেটিকে কম্পিউটারজনিত ভুল বলে সংশোধন করে দেয়।
এদিকে, কুড়িগ্রামের উলিপুরের এক গ্রাহকের হাতে এসেছে বিস্ময়কর এক বিল! তাঁর ঘরে রাতে জ্বলে একটি বাল্ব আর একটি ফ্যান। আর তাতেই ওই গ্রাহকের জুনের বিল এসেছে সাত হাজার ২০০ টাকা। বিলের কাগজ নিয়ে দুদিন উলিপুরের বিদ্যুৎ অফিসে গেলেও মেলেনি কোনো সমাধান।

প্রিপেইড মিটারেও একই ভোগান্তি
শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরাও একই ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকার তেজকুনীপাড়ার ডিপিডিসির গ্রাহক ইমরান হোসেন জানান, ১৪ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১৩ দিনে তিনি ৯ হাজার টাকার রিচার্জ করেছেন। অথচ মিটারে বাকি আছে মাত্র ৭২৪ টাকা। অন্য মাসে যেখানে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় মাস চলে যায়, এবার একই ব্যবহারে প্রায় তিন গুণ অর্থ খরচ হয়েছে।
ডিপিডিসির আরেক গ্রাহক জোছনা আহমেদ জবা জানান, জুনে কয়েক দিনের ব্যবধানে তাঁর মিটার থেকে ২৫৮, ২১৬, ১১৪, ১২৬ ও ১২৮ টাকা করে কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ বাসায় শুধু ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ ব্যবহার করা হয়। নেসকোর প্রিপেইড গ্রাহক আমির সোহেল অভিযোগ করেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করার তিন দিনের মাথায় প্রায় ৩৫০ টাকা কমে যায়।

কারা কী বলছেন
জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ নতুন নয়। বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে এবং মিটার রিডিং সঠিকভাবে নেওয়া না হলে এ ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে।
পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম দাবি করেন, পাঁচ কোটি গ্রাহকের মধ্যে দুই একজনের হয়তো রিডিং ভুল হয়েছে। তবে যেসব অভিযোগ এসেছে, যাচাই করে দেখা গেছে তার অধিকাংশই ঠিক নয়। বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিল বেশি এসেছে।
এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেল করা হয়েছে। সেখানে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধান মিলবে।

জাপানে ভূমিকম্প ধসে যাওয়া শপিং সেন্টারে বহু মানুষ আটকা, নিহতের আশঙ্কা

জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমামোতোতে মঙ্গলবার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ১। ভূমিকম্পে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, কুমামোতোতে ধসে পড়া একটি বিপণিবিতানের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন। সেই ভবনে অনেক ব্যক্তি নিহত হতে পারেন।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির একটি তলা ধসে পড়ার পর বহু মানুষ ভেতরে আটকা পড়েন। জরুরি উদ্ধারকর্মীরা তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন।

জাপানের সম্প্রচারমাধ্যম টিবিএস জানিয়েছে, শপিং সেন্টারটিতে ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক’ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে টিভি আসাহি স্থানীয় পুলিশের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এ ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ফুজি টিভিও হতাহতের খবর দিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে ভূমিকম্পের পর জাপানের আবহাওয়া দপ্তর উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। তারা কুমামোতো, নাগাসাকিসহ কয়েকটি এলাকায় এ সতর্কতা জারি করে। তবে আবহাওয়া-বিশেষজ্ঞরা সাগরের পানিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখতে পাননি। তাই প্রায় দুই ঘণ্টা পর আবহাওয়া দপ্তর সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়।

ভূমিকম্পে কিউশু দ্বীপের অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে রেল কর্তৃপক্ষ বুলেট ট্রেন চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে।

চলতি মাসেও রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা

ব্যাংকিং চ্যানেলে টানা দুই অর্থবছর প্রবাসী আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেও ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রয়েছে। চলতি মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ২৪৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের জুলাইয়ের একই সময়ের তুলনায় যা ৫০ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।

২০২৫-২৬ অর্থবছর প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্য উৎসে ভালো অবস্থান না থাকলেও রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। অবশ্য গত এক মাসে ডলারের দর এক টাকার মতো বেড়ে গতকাল সোমবার আন্তঃব্যাংকে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা বেচাকেনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আমদানিতে ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ২ শতাংশের বেশি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) ১৪৮ কোটি ডলার পরিশোধ হয়। এর মধ্যেও গতকাল গ্রস রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় যা ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। সেখান থেকে বেড়ে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার হয়। আর জুনের শেষে উঠেছিল ৩৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। তবে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। তবে অর্থ পাচারে কড়াকড়ি নীতির ফলে হুন্ডি কমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার গতি বেড়েছে। এ কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। রেমিট্যান্সের এ ধারা ধরে রাখতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখাসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

ফেরত গেল উন্নয়নকাজের বরাদ্দ, বিপাকে ৬১ বিদ্যালয়

ময়মনসিংহের নান্দাইলে ৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণসহ উন্নয়নকাজ কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি। এতে বরাদ্দের পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। এদিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বিদ্যালয়গুলোয় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।

প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তারা বারবার তাগাদা দিয়েও কাজ শেষ করাতে পারেননি। ঠিকাদাররা বলছেন, এ পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তা তারা নিজেদের টাকায় করেছেন। এখন বরাদ্দের অর্থ ফেরত গেলে তাদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে পিইডিপির (প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প) অধীনে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও এখন পর্যন্ত তা শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট অফিস জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের পর বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ না করায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষে বরাদ্দের টাকা ফেরত গেছে। উন্নয়নকাজের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ।

উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাদের তত্ত্বাবধানে উপজেলায় পিইডিপি প্রকল্পের অধীন দুই কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া রয়েছে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬টি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর এবং দুই কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের আলাদা কক্ষ নির্মাণ। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব প্রকল্প ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে নির্দিষ্ট সময়েও কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিকবার সময় বৃদ্ধি করা হলেও এখনও কাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ ২০ শতাংশও শেষ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

নির্মাণকাজ বাকি থাকা কয়েকটি বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চণ্ডীপাশা মডেল সরকারি বিদ্যালয়, ধীতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর ভেলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভবন নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গাঁথুনির জন্য মাটির ওপর ভিম তৈরি করে সেভাবেই ফেলে রাখা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবু বকর ছিদ্দিক জানান, একটি ভবনের অভাবে পাঠদানে তাদের খুব সমস্যা হচ্ছে।

দেউলডাংরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, বারবার তাগাদা দেওয়ার পর সম্প্রতি ঠিকাদারের লোকজন দরজা জানালা লাগিয়েছে, প্লাস্টার এখনও বাকি রয়েছে। হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে প্রধান শিক্ষকের জন্য তিন তলায় পৃথক কক্ষ নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক বেগম নুরুন্নাহার জানান, প্রতি মাসে প্রকৌশল অফিসে গিয়ে তাগাদা দিয়েও তিনি কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কান্দাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক জুলফিকার আলী ভূঁইয়া জানান, কাজটি শেষ না হওয়াতে তিনি বিদ্যালয়টিকে সুন্দর করে গোছাতে পারছেন না। পুরহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান ফকির জানান, তাঁর বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের কাজ দীর্ঘদিন অর্ধেক করে ফেলে রাখা হয়েছে।

ঠিকাদারদের একজন আমরু মিয়া জানান, তিনি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ পেয়েছেন। প্রায় সবগুলোর কাজই শেষের পথে, কয়েকটির সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম (বড় সাইফুল) জানান, সীমানা জটিলতার কারণে সেখানে এতদিন কাজ শুরু করা যায়নি। কিছু দিন আগে জায়গা বুঝে পেয়ে তিনি কাজ শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানান, নিজেদের টাকায় কাজ করেছেন, বরাদ্দ ফেরত গেলে তারা মাঠে মারা যাবেন।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া পিয়াল জানান, ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ হয়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। আগামীতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনরায় টেন্ডার দিয়ে কাজ করতে হবে।

বন্যায় তছনছ চট্টগ্রামের কৃষি, প্রণোদনার অপেক্ষায় কৃষক ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে

ঋণ নিয়ে ও নিজের সঞ্চিত অর্থ লগ্নি করে আউশের ধান চাষ, ক্ষেত-খামার করেছিলেন চট্টগ্রামের অসংখ্য কৃষক। বৃষ্টি ও বন্যায় এসব চাষাবাদ তলিয়ে গেলে সবজির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব হিসাবনিকাশও নষ্ট হয়ে গেছে। চাষের মাছ বন্যায় ভেসে যাওয়াতে চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। পরের মৌসুমের আবাদ নিয়েও রাজ্যের অনিশ্চয়তা ভর করেছে তাদের মনে। সরকারি সহায়তা ছাড়া উদ্ধারপ্রাপ্তির আর কোনো সহায় দেখছেন না এই চাষিরা।

কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশের শঙ্খ নদের চরে সবজি চাষ করছেন মোহাম্মদ হাসান (৩২)। চলতি মৌসুমেও এই চরে প্রায় পাঁচ কানি জমিতে ঢ্যাঁড়শ, লাউ, ঝিঙা, চিচিঙ্গাসহ নানান সবজি চাষ করেছিলেন। নিজের সঞ্চিত ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে স্থানীয় একটি সমবায় সমিতি থেকে চড়া সুদে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকায় সবজিক্ষেত করেছিলেন এই চাষি। কিন্তু বন্যার পানিতে ডুবে যায় তাঁর ক্ষেত। পানি নামার পর দেখতে পান তাঁর বেশির ভাগ সবজি পচে গেছে; যা অবশিষ্ট ছিল, তাও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের মধ্যবয়সী বাসিন্দা মওলানা মো. হামিদ একজন মাছচাষি। ১৫ লাখ টাকা খাটিয়ে এলাকার ছোট-বড় কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়েছেন তিনি। নিজের সাত লাখ টাকার পাশাপাশি সমবায় সমিতি ও একটি এনজিও থেকে আট লাখ টাকা ঋণ করেছেন। দিনে দিনে তাঁর পুকুরের মাছ বড় হচ্ছিল। কিন্তু বন্যায় চোখের সামনেই পুকুরগুলো তলিয়ে গেলে সব মাছ বেরিয়ে যায়। এখন পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা এই ক্ষুদ্র মৎস্য খামারি।

সমকালের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মওলানা মো. হামিদ ও মো. হাসানের চোখে পানি টলমল করছিল; গলাও ধরে আসছিল তাদের। হামিদ বলেন, ‘পুকুর থেকে আসা লাভের টাকায় সংসার চলত। এবার পুকুরে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যায় পুকুর ডুবে সব মাছ বেরিয়ে গেছে। এখন কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, আর কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’

মো. হাসান বলেন, ‘শঙ্খচরে সবজি চাষ করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করি, সংসার চালাই। এখন ধার-দেনা কীভাবে মেটাব? কীভাবে সংসার চলবে? বুঝতে পারছি না। সরকারের সহায়তা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই আমাদের।’

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলায় ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি ও আউশ ধানের আবাদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। জেলার ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৪৩ হাজার ৫০ টন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলায় ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার। ৫২০ টন আদা নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হলুদের ১১৮ দশমিক ৩৬ টন উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ৭৮ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। টাকার অঙ্কে এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।

৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৭ জুলাই বিকেল ৩টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় চট্টগ্রামে। টানা কয়েক দিনের অতিভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ধানি জমি, সবজিক্ষেত, মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম আর পানের বরজ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বন্যায় শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫১১ জনই কৃষক। তবে জেলা প্রশাসনের হিসাবে,  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়েছেন, ‘কেবল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষি খাতেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার। কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্যান্য জেলায়ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ আশ্বাস দিয়ে অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনাসহ সব ধরনের সহায়তা দিতে কাজ চলছে।’

শিশুরা যে ক্ষেত্রে বিকশিত হতে চায়, সরকার সহযোগিতা দেবে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজকের শিশুরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবেই ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছোট্ট বন্ধুরা, সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে কিশোর-কিশোরীদের বৃহৎ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৫-২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এই আয়োজন হয়।

প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোর ও খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার কাজ করছি। কিন্তু এই কাজটি আমরা তখনই সফলভাবে করতে পারব, যখন আজকে যারা গ্যালারিতে বসে আছে এবং যারা খেলার মাঠে পুরস্কার পেয়েছ, তোমরা নিজেদের আগামী দিনের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। এখন পড়ার সময় মন দিয়ে পড়তে হবে, একইভাবে মন দিয়ে খেলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তুলতে পার, আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। এই কাজ আমরা হয়তো শুরু করেছি। কিন্তু বাংলাদেশ গড়ার কাজ তোমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আজ প্যান্ডেল ও গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার শিশুর মধ্য থেকেই আগামী দিনের সফল ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থপতি, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার, সাঁতারু ও টেনিস খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে, যারা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই তোমরা শক্তভাবে আত্মগঠনে মনোযোগ দাও।’

শিশুদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমাদের সবার কাছে আমি একটি সহযোগিতা চাই। এই দেশটা আমাদের সবার দেশ। এই দেশের আলো, এই দেশের বাতাস, এই দেশের পরিবেশ আমরা সবাই মিলে যদি ঠিক রাখি, তাহলে আমরা একটি সুন্দর পরিবেশ গড়তে পারব। তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো– রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তোমার বাসার আশপাশে অনেকে বিভিন্ন রকম ময়লা, প্লাস্টিকের বোতল ফেলে যায়। কেউ এগুলো ফেলছে, সেটি পুকুর হোক, নদীনালা হোক, বাসার আশপাশে এখন থেকে যদি এ রকম কোনো দৃশ্য তোমাদের চোখে পড়ে, প্লিজ তোমরা তাকে বারণ করবে। দরকার হলে সেই ময়লাটি তোমরা তুলে নিয়ে গিয়ে যেইখানে ময়লা ফেলার জায়গা, নির্দিষ্ট সেই জায়গায় ফেলতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি কাজ তোমাদের করতে হবে, কেউ যদি পুকুর নদীনালায় ময়লা ফেলে, যদি তুমি পার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সেই ময়লা পরিষ্কার করবে। যাতে আমাদের পরিবেশ, আমাদের নদীর পানি, পুকুরের পানি পরিষ্কার থাকে। যাতে সেখানে মানুষ সুন্দরভাবে হাঁটাচলা করতে পারে বা মানুষ সেখানে বসতে পারে। প্রতিবছর চেষ্টা করবে, তোমার বাড়ির আশপাশে হোক, তোমার স্কুলের আশপাশে হোক অথবা যেখানে তুমি সুবিধা মনে করো সেইখানে একটি করে গাছ লাগাতে হবে। গাছ যদি আমরা লাগাতে পারি, আমাদের পরিবেশটা সুন্দর হবে, পরিষ্কার হবে। আমরা সবাই মিলে বুকভরে শ্বাস নিতে পারব।’
কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা প্রকৃতির প্রতি, বিভিন্ন পশুপাখির প্রতি অত্যন্ত নির্দয় হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোট বন্ধুদের আমি অনুরোধ করব, এসো আমাদের আশপাশে যত কুকুর-বিড়াল, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন রকম পশুপাখি আছে, আমরা চেষ্টা করব, এই যে প্রকৃতির, আল্লাহ দেওয়া বিভিন্ন জীব, পশুপাখি এদের যত্ন নেওয়ার। যত্ন যদি নিতে না পারি, অন্তত আমরা চেষ্টা করব, তাদের যাতে কোনো প্রকার ক্ষতি হতে না পারে।’

বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। শিশুরা যে ক্ষেত্রে নিজেদের বিকশিত করতে চায়, তা পড়ালেখা, খেলাধুলা, গান বা ছবি আঁকা যাই হোক না কেন সরকার তাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
উপস্থিত সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রায়শই নানামুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক খবর লিড নিউজ হিসেবে প্রাধান্য পায়। তবে শিশুরা এবং তাদের এই আয়োজনই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত ভবিষ্যৎ। তাই আগামীকালের (আজ) পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদে শিশুদের এই উদ্যোগ ও তাদের সাফল্যকে যেন অগ্রাধিকার দিয়ে প্রচার বা লিড নিউজ করা হয়, এটা আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান থাকল।

গণমাধ্যমের নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের চলমান কাজে সম্পাদকদের সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া সংবাদপত্রের সম্পাদকদের প্রতি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ও যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠকে উপস্থিত ছিল। অন্যরা হলেন– দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম এবং মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম।

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনে সভা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সভা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে এ সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

সভায় জাতীয় সংসদের বিদ্যমান সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সাউন্ড সিস্টেম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এ সময় গণপূর্ত অধিদপ্তর সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত বিকল্প, কারিগরি সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার কথাও  উল্লেখ করে।
সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি করা আমলাকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের উপসচিব মো. সামসুল আলম ২০১৮ সালের মার্চে চাকরি থেকে অবসরে যান। পরে তিনি বিএনপির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। গত বছর গঠিত বিএনপির আসন পুনবির্ন্যাস-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৩ জুলাই তাঁকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসি সচিবালয়ে এক বছরের চুক্তিতে অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

একই দিন ১১টি কোম্পানি, করপোরেশন এবং সরকারি সংস্থায় বিএনপির পদধারী নেতাদের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে আমলাদের নিয়োগ করা হতো। সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের নজির রয়েছে। বিএনপির আগের আমলগুলোতে অবশ্য দু-একজন নেতাকে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী এসব কোম্পানি, করপোরেশন এবং সংস্থায় সরকার যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে বাধা নেই।

তবে সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসিতে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি এই নিয়োগকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দলীয় রাজনীতি করা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যায় না। অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয়েছে, সেগুলো নির্বাহী বিভাগের অংশ, মানে সরকারের অধীন। সরকার চাইলে যে কাউকে নিয়োগ করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সরকারের অধীন নয়; অংশও নয়। এর মূল চরিত্রই নিরপেক্ষতা।

তিনি বলেন, ইসিতে দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া মানে, এই চরিত্র শেষ হওয়া। তখন আবার ইসির প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। ৫ আগস্টের আগের মতো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। সরকারের এই নিয়োগ বাতিল করা উচিত।

বিএনপি করা কর্মকর্তা
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ সমালোচনা করলেও নিজের নিয়োগে সমস্যা দেখছেন না মো. সামসুল আলম। তিনি সমকালকে বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ‘রাতের ভোট’খ্যাত নির্বাচনের ফলাফলের তথ্য চাওয়ায় তাঁকে তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীনের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই মাস তিন দিন কারাগারে ছিলেন তিনি।

সামসুল আলমের ভাষ্য, তিনি কখনোই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কথা বলায় তাঁকে আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। পরে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে বিএনপির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

জামায়াত-এনসিপির সমালোচনা বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি তো বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে সব পদেই সরকারি দলের কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হয়। আমি অবসরের পর বিএনপির আসন পুনর্বিন্যাস কমিটিতে ছিলাম মাত্র। এটা কোনো দলীয় পদ নয়। যে কোনো ব্যক্তি তা থাকতে পারেন। তবে আমি এখন নিরপেক্ষ। বিএনপি করি না।

নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ পাওয়া নৈতিক কিনা– এমন প্রশ্নে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, কাজের মাধ্যমেই আগামী দিনে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করব।

গত বছরের ৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে গঠিত আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন সামসুল আলম। একই কমিটিতে সদস্য ছিলেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চাহিদা অনুযায়ী, নাকি সরকার থেকে সামসুল আলমকে নিয়োগ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমকালকে বলেন, ‘এটা আমি পরিষ্কার নই। আমার ধারণায় নেই।’

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায় কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমিও তো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অতিরিক্ত সচিব সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পদ। তাই সরকারের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

সামসুল আলম বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আন্দোলনও করেছেন। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও নিয়মিত অফিসার্স ক্লাবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে দলের নেতাকে নিয়োগ দিয়ে দলীয়করণের সব সীমা পার করেছে বিএনপি। অতীতে কেউ এতটা নির্লজ্জতা করেনি। সামসুল আলম যদি চাকরিজীবনে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে সরকার তাঁকে ভূতপূর্ব পদোন্নতি দিয়ে সম্মান এবং বকেয়া বেতন-ভাতা দিতে পারত। যেমন দেওয়া হয়েছে শত শত বঞ্চিত কর্মকর্তাকে। কিন্তু ৬৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি, যিনি সরাসরি দল করেছেন, তাঁকে কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে পারে?

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, স্থানীয় নির্বাচন এবং আগামী সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করতেই সরকার বিএনপি নেতাকে ইসিতে নিয়োগ দিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ও আবদুল বারীর বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।