Home Blog Page 205

উচ্চকক্ষের সদস্য কারা হচ্ছেন সর্বত্র আলোচনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পথে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসন নিয়ে বিজয়ী বিএনপি। সরকারের মন্ত্রিসভা কেমন হবে- এ নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠলেও মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে জাতীয় সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর এখন আলোচনায় তুঙ্গে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদের বিষয়টি। কারা হচ্ছেন এই উচ্চকক্ষের সদস্য আর কী হবে তাদের যোগ্যতা- তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা। এ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। দলগুলো যাদেরকেই মনোনয়ন দেবে তারাই হবেন জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্য। সেক্ষেত্রে নি¤œকক্ষের নির্বাচনে পরাজিত অনেক প্রার্থীকেই সংসদের উচ্চকক্ষে দেখা যেতে পারে। নি¤œকক্ষের প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে সরকার ও বিরোধী দল কে কতটি আসন পাচ্ছে, তাও নির্ধারিত হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সাধারণত উচ্চকক্ষ ও নি¤œকক্ষের নির্বাচন একই সঙ্গে হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নি¤œকক্ষের নির্বাচন আগে হয়ে যাওয়ায় একটি বিশেষ বিধান রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন, তবে এই সুযোগ থাকবে শুধু ত্রয়োদশ সংসদের জন্য।
উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর। সম্ভাব্যভাবে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিও থাকতে পারে। যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন করবেন। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত করা হবে এবং শপথ গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট। ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। বাকি ৫ জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে মনোনীত করবেন। এই পরিষদের প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নি¤œকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
উচ্চকক্ষ গঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সংসদ কার্যত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হয়ে যাবে। উচ্চকক্ষের প্রধান কাজ হবে আইন পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। বিশেষ করে সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। তবে এই কক্ষ সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারবে না, যদিও তারা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে।
এছাড়া উচ্চকক্ষের আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। দুই কক্ষের মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, উচ্চকক্ষের পাশাপাশি নি¤œকক্ষ বা জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা হবে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৪০০টি আসন হবে নি¤œকক্ষের। ৩০০টি আসনে প্রচলিত সরাসরি ভোট পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। বাকি ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তবে তারা সারাদেশের নির্দিষ্ট ১০০টি নির্বাচনী এলাকা থেকে কেবল নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।

পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন যে পরিকল্পনা

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন সরকারের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। ‘দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে সংগঠিত কর্মচারীরা জানান, শিগগিরই তারা তারেক রহমান-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সাত দফা দাবি উপস্থাপন করবেন।

দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ সচিবালয়ের বাইরে দপ্তর, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। সংগঠনটির দাবি, শিক্ষক-কর্মচারীসহ প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী এ জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সংগঠনের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী গণমাধ্যমকে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই পে-স্কেল নিয়ে তারা আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। লাগাতার কর্মসূচির পর সরকার একটি কমিটি গঠন করলেও দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচন শেষ হওয়ায় এখন নতুন সরকারের কাছে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ওয়ারেছ আলীর নেতৃত্বে সংগঠনের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়। আবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের পে-স্কেলে বৈষম্য তৈরি হয়েছে এবং বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ১১ থেকে ২০ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সাত দফা দাবি

সংগঠনটির দাবির মধ্যে রয়েছে—

১:৪ অনুপাতে ১২ ধাপে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে বৈষম্যহীন নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন

মূলবেতন সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছানো কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা

২০১৫ সালের গেজেটে বাতিল হওয়া তিনটি টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পেনশন প্রবর্তন ও গ্রাচ্যুইটির হার শতভাগ নির্ধারণ

প্রতি পাঁচ বছর পরপর উচ্চতর গ্রেড বা পদোন্নতি

টেকনিক্যাল কাজে নিয়োজিতদের টেকনিক্যাল মর্যাদা প্রদান

ভাতা পুনর্নির্ধারণ, রেশন ব্যবস্থা চালু, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ ও অবসরের বয়স ৬২ বছর নির্ধারণ

এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদধারীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আদেশ বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে।

সংগঠনটির নেতারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

যে কারণে বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে থাকছেন না মোদি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবেন না—এমন তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভারত সফরে যাচ্ছেন। ওইদিন মুম্বাইয়ে মোদি ও ম্যাক্রোঁর মধ্যে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, ম্যাক্রোঁ পরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এআই ইমপেক্ট সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করবেন।

মোদির ব্যস্ততার কারণে শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি অংশ নিতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের মধ্যে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম আলোচনায় রয়েছে।

এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর নরেন্দ্র মোদি দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে টেলিফোনে অভিনন্দন জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে তিনি আনন্দিত এবং বাংলাদেশের নির্বাচনে অসাধারণ জয়ের জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারতের অব্যাহত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

আসন্ন শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, প্রতিবেশী দেশগুলোর অংশগ্রহণ নতুন সরকারের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখির কারুকার্য

০

গ্রামবাংলার প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পী বাবুই পাখি—তার নিপুণ বুননে তৈরি বাসা একসময় ছিল গ্রামীণ সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তালগাছের পাতায় ঝুলন্ত সেই কারুকার্যময় বাসা শুধু পাখির আবাস নয়, ছিল প্রকৃতির জীবন্ত স্থাপত্য। কিন্তু পরিবেশের পরিবর্তন, তালগাছ নিধন ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে আজ বাবুই পাখি ও তার বাসা দুটোই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।

এক সময় বাংলার মাঠ-ঘাট, পুকুরপাড় ও গ্রামাঞ্চলের তালগাছে সারি সারি বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়তো। বাতাসে দুলতে থাকা সেই বাসাগুলো গ্রামীণ দৃশ্যকে দিত আলাদা মাত্রা। কবিতায়ও এসেছে বাবুইয়ের শিল্পীসত্তা—খড়-কুটো দিয়ে গড়া তার নিখুঁত নির্মাণশৈলী আজও বিস্ময় জাগায়। অথচ কালের বিবর্তনে সেই পরিচিত দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে।

সাতক্ষীরা জেলাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ কমে যাওয়ায় বাবুই পাখির আবাসস্থলও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। শুধু তালগাছ নয়—নারকেল, সুপারি ও অন্যান্য উঁচু গাছেও তারা বাসা বাঁধে। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে নিরাপদ আবাস হারিয়ে বিপদে পড়ছে এই পাখি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে একটি গাছে ১০–২০টি পর্যন্ত বাবুইয়ের বাসা ঝুলতে দেখা যেত। শিশু-কিশোরদের কৌতূহল, ঢিল ছোড়া কিংবা বাসা সংগ্রহের প্রবণতাও ক্ষতির একটি কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ডিম ও বাচ্চাসহ বাসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং সংখ্যা কমে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবও বাবুই পাখির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে অনিরাপদ স্থানে বাসা বানাতে গিয়ে ঝড়ে বাসা ভেঙে পড়া বা মানুষের হাতে ধ্বংস হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।

স্থানীয় মাষ্টার হাসানুজ্জামান বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখি ও বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। বাবুই পাখির মতো প্রাকৃতিক কারিগরকে টিকিয়ে রাখতে হলে তালসহ দেশীয় বৃক্ষরোপণ, বাসা ধ্বংস বন্ধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

প্রকৃতির এই নিখুঁত শিল্পীকে রক্ষা করতে এখনই উদ্যোগ না নিলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বাবুই পাখির বাসা শুধু বইয়ের পাতায়ই দেখবে।

ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদের বাসায় যাবেন তারেক রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) তাদের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।

এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি একাই জয় পেয়েছে ২০৯টি। জোটের শরিকেরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। সব মিলিয়ে পরবর্তী সংসদে বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১২। তবে আরও দুটি আসনে জয়লাভের সম্ভাবনা আছে বিএনপির।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবার প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঢাকা ও বগুড়া থেকে দুটি আসনে জয়ী হয়েছেন।

এর আগে ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপি একাই পেয়েছিল ১৯৩টি আসন। আর জোটের শরিকসহ তাদের মোট আসন ছিল ২১৬। তখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

এবার দেশ গড়ার পালা এ বিজয় গণতন্ত্রের

যে কোনো মূল্য দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপিকে নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য দেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের। আজ থেকে আমরা স্বাধীন।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নির্বাচনোত্তর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
দেশ গড়তে ঐক্যের ডাক দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এবার দেশ গড়ার পালা। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, আর বিভাজন দুর্বলতা। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রধান্য দিয়ে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করব। আর জনগণকে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করব।
তারেক রহমান বলেন, আমরা শান্তভাবে বিজয় উদ্যাপন করেছি। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি দল এবং জোটের নেতাকর্মীদের আনন্দ মিছিল করতে নিষেধ করেছি। আমরা দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে বিজয়ের শুকরিয়া আদায় করেছি।
আরেক প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যর্পণ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষ শান্তি ও স্বস্তি চায়।
নতুন সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ, আঞ্চলিক কূটনীতি, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছেন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমান বলেন, আমরা বলেছিলাম জনগণের রায় পেলে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করবে। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং দেশের জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা সংস্কার প্রণয়ন করা হয়, যা দলের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই সঙ্গে কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও সই করেছিল।
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী- এ প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের সামনে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও পুঁজির সংকট মোকাবিলা। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, তারল্য সংকট দূর করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গত শাসনামলে দলীয়করণ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার কেবল তরুণদের নয়, সমাজের সব স্তরের মানুষের কথা শুনবে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও নারীদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে। একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
তারেক রহমান বলেন, দলমত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই হোক, কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকা- বরদাস্ত করা হবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত; প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। কারো ওপর কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকা- বরদাস্ত করা হবে না।
আরেক প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, আঞ্চলিক কূটনীতি ও দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, যেহেতু এই জোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের হাত ধরে, তাই বিএনপি সরকার চাইবে সার্ক আবার সক্রিয় ও কার্যকর হোক। তিনি বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে বিএনপির ভাবনা কী হবে- এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। তবে যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক ও লাভজনক হয়, তবেই সরকার এ উদ্যোগে ইতিবাচকভাবে এগোবে।
তারেক রহমান বলেন, সারাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এ সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। আমরা আল্লাহর দরবারে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় খালেদা জিয়া ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল-অবিচল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস ও ভালোবাসা দেখিয়েছে এবার তার প্রতিদান দেওয়ার পালা। স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে, এবার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এ বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার পালা। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট-অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এ যাত্রায় আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদ্যাপন করেছি। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আমরা বিজয় উৎসব পালন করেছি।
সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়ত কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি নিরাপদ-মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখব।
তারেক রহমান বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবাইকে বিজয়ের অভিনন্দন জানাচ্ছি।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১ টি রাজনৈতিক দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর।
তারেক রহমান বলেন, দেশে আর কোনো অপশক্তি যাতে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশে আবারও জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ অর্জন ধরে রাখতে হলে আর কোনো অপশক্তিকে ফ্যাসিবাদ কায়েম বা দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। এজন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাই যে, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাই যে, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। ভবিষ্যতে আর কেউ যেন স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। এ বিজয় বাংলাদেশের; এ বিজয় গণতন্ত্রের; এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন। আমি দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি বলেন, সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আপনারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন। ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি- এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সবার সহযোগিতা আশা করছি। দেশবাসীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি আমরা।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, ৭১-এর স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। দীর্ঘ এ সময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন; হতাহত হয়েছেন; যাদের রক্ত মাড়িয়ে, কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে আজকের এ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, সেই সব বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। মহান আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফিরাত কামনা করছি। যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন; হতাহত হয়েছেন; দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আপনাদের ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ রাখবে।
তারেক রহমান বলেন, চীন-ভারত-পাকিস্তান সবার সঙ্গে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে বিএনপি। সরকার-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মূলত কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে আপনাকে- এ প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের অর্থনীতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ আছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের অবশ্যই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করেছে। সুতরাং আমাদের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বিএনপি সরকারের পরিকল্পনা কী থাকবে- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, দেশে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তারেক রহমান বলেন, জনগণের বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গণতন্ত্রের ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, জনমনে সৃষ্ট সকল সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্মকর্তা, জনপ্রশাসন, সশস্ত্রবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য এবং রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হতো না। এজন্য তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
অপর এক প্রশ্নে সংসদ নির্বাচনে জনগণকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসাটাই বিএনপির ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল বলে মন্তব্য করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রশ্নটি ছিল এমন- ‘গত সরকার চলে যাওয়ার পর থেকে আপনি বলে আসছিলেন যে এই নির্বাচন সহজ হবে না। এখন নির্বাচন হয়ে গেল। এই নির্বাচন সহজ ছিল কি না আপনার কাছে? এই প্রশ্নের সঙ্গে একটু লেজ, ২০০-এর বেশি আসন পেতে আপনাকে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হলো কি না?’ জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণকে কনভিন্স করাটাই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল জনগণকে পক্ষে নিয়ে আসা। সেখানে আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সফল হয়েছি। আর জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর পরিবেশ এনশিওর করাই ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং। যে কোনো ভালো কাজ, গোল অ্যাচিভ করতে গেলে কষ্ট করতে হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবাদ সম্মেলনে দেশের সাংবাদিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অনেক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাঈল জবিউল্লাহ ও দলের মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ আহমেদ পাভেলের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত উপস্থিত ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, জয়নুল আবেদিন, শামসুজ্জামান দুদু, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ড. মাহদী আমিন, দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দীন আহমেদ অসীম প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উদার গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের শুভ সূচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারেক রহমানই হচ্ছেন ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৬ লাখ মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে এবং ২০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ১ হাজার ৭শ’ নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়  দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। যারা পরিবর্তন চান, তারা ব্যালটের মাধ্যমে রায় দিয়েছেন। এই নির্বাচনে উদার গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে দলের নেতা তারেক রহমানের হাত শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে জামানত হারিয়েছেন পাঁচ প্রার্থী

০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া -৪ (কসবা-আখাউড়া)সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন নির্ধারিত ভোটসংখ্যা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে জামানত হারিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী সংশ্লিষ্ট আসনে প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের কমপক্ষে এক-অষ্টমাংশ ভোট পেতে ব্যর্থ হলে তার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। সেই বিধান অনুযায়ী এই আসনে মোট ৫ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৪ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোঃ মুশফিকুর রহমান, তিনি মোট পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৪২ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী মোঃ আতাউর রহমান সরকার পেয়েছেন মোট ৯১ হাজার ৭৯৬ ভোট।

এ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে মো: জহিরুল হক খান পেয়েছেন ২ হাজার ৫৩ ভোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হাতপাখা প্রতীকে মো: জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ২৭৭ ভোট, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে মোঃ জহিরুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ১০৭ ভোট, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ আপেল প্রতীকে রাফি উদ্দিন পেয়েছেন ৭৭৪ ভোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি আম প্রতীকে শাহিন খান পেয়েছেন ১০৯ ভোট। প্রয়োজনীয় ভোটসংখ্যা না পেয়ে নিজেদের জামানত হারিয়েছেন তারা।

ছুটির দিনেও আজ যেসব এলাকায় ব্যাংক খোলা

জ্বালানি তেল সরবরাহের সুবিধার্থে আজ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দেশের কয়েকটি ব্যাংকের শাখা বা উপশাখা সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে দেশব্যাপী ডিলারদের জ্বালানি তেল ক্রয়ের সুবিধা নিশ্চিত করতে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুলের আবেদন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এনালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট (এসডিএমএডি) মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এ তথ্য জানায়।

আজ যেসব ব্যাংকের শাখা খোলা থাকবে:

পুবালী ব্যাংক পিএলসি: খুলনার খালিশপুর শাখা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শাখা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর শাখা, রংপুরের শাপলা চত্বর শাখা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা, চাঁদপুরের চাঁদপুর প্রধান শাখা, ঝালকাঠির ঝালকাঠি শাখা, বরিশালের বরিশাল শাখা, কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার শাখা, সিলেটের বড়ই কান্দি শাখা।

উত্তরা ব্যাংক পিএলসি: খুলনার খালিশপুর শাখা।

জনতা ব্যাংক পিএলসি: সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাট শাখা।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি: সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাট শাখা।

ওয়ান ব্যাংক পিএলসি: দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপশাখা।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সব তফসিলি ব্যাংক বন্ধ থাকবে। ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত থাকায় টানা চার দিন ব্যাংক বন্ধ থাকার কথা ছিল।

নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে জামায়াত!

০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিনের জোট-নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব শক্তিতে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করে দলটি এবার এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। শরিক দলগুলোর আসনসহ তাদের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। যদিও তারা সরকার গঠনের সংখ্যাতত্ত্ব স্পর্শ করতে পারেনি, তবে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী দলটি আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে।

নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে ১৮টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসন পেলেও ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে দলটির আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩টি ও ২টি। সেই তুলনায় এবারের নির্বাচনে ৬৮টি আসনে একক জয় দলটির জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ১৭ বছর পর নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গঠন করে বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই সাফল্য পাওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জামায়াতের এই বিজয়ের মূল ভিত্তি ছিল দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। বিভাগীয় বিশ্লেষণের চিত্রটি নিম্নরূপ:

খুলনা বিভাগ: এই বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার সবকটি আসনে তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ: রংপুরের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে তারা জয়ী হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও রংপুরের সবকটি আসনে জোটগতভাবে জয় নিশ্চিত করেছে দলটি।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ: ঢাকার ৭০টি আসনের মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রামের ৫৮টি আসনের মধ্যে ৩টিতে জামায়াত এককভাবে জয়ী হয়েছে। তবে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল তাদের জোটের শরিক খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয় পেয়েছে।

রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন অবস্থান
অতীতে ঢাকা মহানগরে জামায়াতের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও এবার তারা চমকপ্রদ ফল করেছে। ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬—এই ৬টি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা সরাসরি জয়ী হয়েছেন। এছাড়া তাদের জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী ঢাকা-১১ আসনে জয়লাভ করেছেন। আরও পাঁচটি আসনে (ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭) তারা সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে, যা রাজধানীতে দলটির শক্তিশালী উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।

সাফল্যের নেপথ্য কারণ ও সমীকরণ
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি বিশেষ দিক কাজ করেছে:

১. তরুণ ও নারী ভোটার: ধারণা করা হচ্ছে, তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্য এই পরিবর্তনের একটি পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নতুন দল এনসিপির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী জোট এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

২. আদর্শিক বিবর্তন: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত নিজেদের রক্ষণশীল ডানপন্থী অবস্থান থেকে সরিয়ে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছে। আগে যে ভোটগুলোকে বিএনপির একক আমানত মনে করা হতো, এবার জামায়াত সেই জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটে বড় ধরনের ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে। নিজেদের ক্ষমতার চেয়ে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে প্রচার করাও তরুণদের আকৃষ্ট করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

৩. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বিএনপির পক্ষ থেকে এই ফলাফলকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, দীর্ঘ সময় দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের ফলে এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ধারণা, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হলে এ ধরনের শক্তির উত্থান ঘটে এবং এর জন্য গত পনের বছরের শাসনব্যবস্থাকেই দায়ী করছেন তারা।

একই গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য!

০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়লাভ করেছেন রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের তিন কৃতি সন্তান। তারা তিনজনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই গহিরা গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে একই গ্রাম থেকে একই দলের তিন প্রার্থীর এমন বিজয় বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজয় অর্জনের তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে তাঁর ভাতিজা হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এছাড়া চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর ও খুলশী) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রয়াত জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান। চাচা-ভাতিজা ও একই গ্রামের এই তিন প্রার্থীর যুগপৎ সাফল্য স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছে।

নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ১ লাখ ১২ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ইলিয়াছ নূরী পেয়েছেন ২৭ হাজার ১৪৬ ভোট। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৭ আসনে হুম্মাম কাদের চৌধুরী ১ লাখ ২৪২ ভোট পেয়ে নিজের বিজয় নিশ্চিত করেন। এই আসনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৪৮৫ ভোট।

চট্টগ্রাম-১০ আসনেও ধানের শীষের বিশাল জয় এসেছে। গহিরা গ্রামের সন্তান সাঈদ আল নোমান ১ লাখ ২১ হাজার ৩৭৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪০৭ ভোট।

এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত শুক্রবার রাতে জাতীয় সংসদের ২৯৭টি আসনের নবনির্বাচিত সদস্যদের সরকারি গেজেট প্রকাশ করেছে। আদালতের নির্দেশনার কারণে চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে এবং প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, গত বৃহস্পতিবার সারাদেশে একযোগে উৎসবমুখর পরিবেশে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।