Home Blog Page 463

শুভ বাংলা নববর্ষ

image

নতুন বছর জুড়ে থাকুক সুখ আর শান্তির বার্তা। মুছে যাক সব গ্লানি, গুছে যাক ধরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক এই সুন্দর পৃথিবী।
আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি দিন, নতুন বছর বয়ে আনুক সবার জীবনে সফলতা আর সুদিন। পহেলা বৈশাখে আসুক ভালোবাসার ছোঁয়া, সব গ্লানি মুছে নতুন করে সাজুক আমাদের জীবনের পথচলা। সবার জন্যে রইলো আমার নতুন বছরের অগনিত শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা।

আজকের সকালটা ছিল স্নিগ্ধ, ঝলমলে আর অপার্থিব সুন্দর, নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য একেবারে নিখুঁত মায়াভরা রৌদ্রজ্জল ভালোবাসাময় মিষ্টি একটা দিন। 

আমাদের সকলের বাংলা নতুন বছর হোক শান্তিময়, সুস্থতাময় আর আনন্দময়। আমরা যেন একে অপরের কাছাকাছি থেকে, ভালোবাসায় মাখামাখি করে, কাটাতে পারি আরো অনেক অনেক বৈশাখ। আপনারা সকলে আমার অনেক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানবেন। অনেক অনেক ভালো থাকবেন সবাই।

শুভ নববর্ষ!!

পিএসএলে স্বপ্নের মতো অভিষেক রিশাদের

স্বপ্নের মতো শুরু রিশাদ হোসেনের। পিএসএল অভিষেকেই বাজিমাত বাংলাদেশী লেগ স্পিনারের। লাহোরের জার্সি গায়ে প্রথম ম্যাচেই কাড়লেন আলো। বল হাতে কাঁপিয়ে দিয়েছেন রাইলি রুশো-আমিরদের।

পিএসএলে দলের প্রথম ম্যাচে সুযোগ মেলেনি একাদশে। দ্বিতীয় ম্যাচে সুযোগ পেয়েই নিজেকে চেনালেন রিশাদ। ৪ ওভারে ৩১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন তিনি। তার এমন বোলিংয়ে ৭৯ রানের বড় জয় পেয়েছে তার দলও।

এবারের পিএসএলের ড্রাফটে নাম ছিল সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমানের মতো তারকাদের। তবে তাদের ছাপিয়ে দল পান তিন বাংলাদেশী; নাহিদ রানা, লিটন দাস ও রিশাদ হোসেন।

নাহিদ রানা এখনো পাকিস্তানের বিমানে ওঠেননি আর আসর শুরুর আগেই শেষ লিটন দাসের, চোটের কারণে ছিটকে গেছেন তিনি। তবে এর মাঝেই অভিষেক হয়ে গেল রিশাদ হোসেনের।

রোববার এই ম্যাচে টসে হেরে আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ২১৯ রান করে লাহোর। শুরুতে ফখর জামান ও শেষে ঝড় তুলেন স্যাম বিলিংস। মাঝে বাকিদের ছোট ছোট ইনিংস লাহোরকে পথ দেখায়।

ফখর জামান ৩৯ বলে ৬৭ রান করে আউট হোন। শেষদিকে ১৯ বলে ৫০ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেন বিলিংস। ২১ বলে ৩৭ রান করেন আব্দুল্লাহ শফিক আর ২৩ বলে ৩৭ করেন ডেরিয়েল মিচেল।

শেষ দিকে ব্যাট করতেও নামেন রিশাদ। তবে মাত্র ১ বল খেলে সমান ১ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। আকিল হুসেইন ও আবরার আহমেদ নেন ২টি করে উইকেট। ১টি করে উইকেট পান ফাহিম আশরাফ ও উসমান তারিক।

বড় লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরু থেকেই উইকেট হারাতে থাকে কোয়েটা। মাত্র ৯ রানের মাঝে তারা হারায় ৩ উইকেট। দুই ওপেনার সাউদ শাকিল ও ফিন অ্যালেনকে বিদায় করেন শাহীন আফ্রিদি। আর হাসান নাওয়াজকে ফেরান আসিফ আফ্রিদি।

ইনিংসের সপ্তম ওভারে রিশাদের হাতে বল তুলে দেন লাহোর অধিনায়ক আফ্রিদি। প্রথম ওভারে মাত্র ৬ রান দেন রিশাদ। দ্বিতীয় ওভারে এসে রুশোর কাছে ছক্কা হজম করলেও পরের বলে তাকে বোল্ড করেন তিনি, দেন ৯ রান।

১১তম ওভারে রিশাদ নিজের তৃতীয় ওভার করতে এসে একটু খরুচে ছিলেন, সেই ওভারে একটি ছক্কাসহ ৯ রান খরচ করেন তিনি। তবে শেষ ওভারে রিশাদ তুলে নেন জোড়া উইকেট। এবার মোহাম্মদ আমির ও আবরারকে ফেরান রিশাদ।

রিশাদের তোপে কোয়েটার ইনিংস থামে ১৪০ রানেই। রাইলি রুশোর ৪৪ রান ছিল ইনিংস সেরা, কুশল মেন্ডিস ২৮ ও ফাহিম আশরাফ করেন ২১ রান। বল হাতে রিশাদ ছাড়াও ২টি করে উইকেট নেন সিকান্দার রাজা, শাহীন আফ্রিদি ও আব্বাস আফ্রিদি।

রিতুর ব্যাটে অবিশ্বাস্য জয় বাংলাদেশের

অঘটন প্রায় ঘটেই যাচ্ছিল, তবে শেষ মুহূর্তে হয়েছে রক্ষা। আইরিশ নারীদের বিপক্ষে রক্তহিম করা রোমাঞ্চকর এক জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দিয়েছেন রিতু মণি।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে রোববার আয়ারল্যান্ড নারী দলের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ নারী দল। যেখানে রূদ্ধশ্বাস লড়াই হলেও ৮ বল হাতে রেখে ২ উইকেটের জয় পায় টাইগ্রেসরা।

লাহোরে রোববার আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৩৫ রান করেছে আইরিশ নারীরা। এর আগে কখনো এত রান তাড়া করে জেতেনি নিগার সুলতানারা। ফলে জিততে হলে ইতিহাস গড়তে হতো টাইগ্রেসদের।

তবে ইতিহাস গড়তে নেমে শুরুতেই হোচট খায় বাংলাদেশ। জবাব দিতে নেমে তৃতীয় বলেই ফারজানা হকের (০) উইকেট হারায় দল। দ্রুত ফেরেন আরেক ওপেনার ইশমা তানজিমও, ১৫ বলে মাত্র ২ রান করেন তিনি।

২ রানে ২ উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান নিগার সুলতানা ও শারমিন আক্তার। তৃতীয় উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ৫২ রানের জুটি। শারমিন আউট হোন ৪৫ বলে ২৪ করে। তবে লড়াই চালিয়ে যান জ্যোতি।

দলীয় ৮২ রানে ফেরেন সোবাহানা মোস্তারি (৭)। এরপর অবশ্য জ্যোতিও বেশিক্ষণ টেননি। ৬৮ বলে ৫১ রান করে আউট হন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ৯৪ রানে ৫ উইকেট হারানো বাংলাদেশের হাল ধরেন রিতু ও ফাহিমা খাতুন।

কিন্তু তাদের ৫৫ রানের জুটি ভাঙতেই বিপদে বাড়ে। ৩৮ বলে ২৮ রান করে আউট হন ফাহিমা। তবে থামেননি রিতু। জান্নাতুলকে নিয়ে সপ্তম উইকেটে যোগ করেন ৪০ রান। জান্নাতুল আউট হোন ১২ বলে ১৮ করে। দ্রুত ফেরেন রাবেয়াও।

১৮৬ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে দল যখন হারের প্রহর গুনছে, তখন জাদু দেখান রিতু। বোলারদের নিয়ে লিখেন অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি।

শেষ পর্যন্ত ৬১ বলে ৬৭ রানের অবিশ্বাস্য এক হার না মানা ইনিংস খেলে দলকে জয় এনে দিলেন রিতু। আর জয়সূচক রানটা করেন ছক্কা মেরে। আর টানা দুই জয়ে বিশ্বকাপ-স্বপ্নটা আরো উজ্জ্বল হয়েছে বাংলাদেশের।

এর আগে টস হেরে বোলিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো করে বাংলাদেশ। প্রথম ৫ ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে তুলে নেয় সারাহ ফোর্বসের (৪) উইকেট। তবে এরপর অধিনায়ক গ্যাবি লুইসকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ৫০ রান যোগ করেন অ্যামি হান্টার।

তবে ভয়ংকর হবার আগে এই জুটি ভাঙেন জান্নাতুল। ২৪ রানে ফেরেন লুইস। আর হান্টার ফেরেন রান আউট হয়ে। ৩৮ বলে ৩৩ রান করে। কিন্তু ওরলা প্রেন্ডারগাস্ট ও লরা ডিলানি মিলে এবার গড়েন ৭২ রানের জুটি।

৬৪ বলে ৪১ রান করে দলীয় ১৪৯ আউট হন প্রেন্ডারগাস্ট। ডিলানি আউট হোন ৬৩ রানে। ১৮২ রানে ৫ উইকেট পতনের পর অবশ্য আর কেউ তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ২৪ রানে অপরাজিত থাকেন ক্যালি।

বল হাতে রাবেয়া খান ৩ ও ফাহমিদা খাতুন নেন ২ উইকেট।

নববর্ষের অঙ্গীকার হোক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া : প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে। এ সুযোগ যেন আমরা না হারাই। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই হোক এবারের নববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ বা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।

নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশবাসীকে নতুন উদ্যমে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ সম্প্রীতির দিন, মহামিলনের দিন। আজকে সবাইকে আপন করে নেয়ার দিন। এবারের নববর্ষ, নতুন বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষ। আসুন, আমরা বিগত বছরগুলোর গ্লানি, দুঃখ-বেদনা, অসুন্দর ও অশুভকে ভুলে গিয়ে নতুন প্রত্যয়ে, নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে চলি। চলুন, নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’

বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় এবং তা এগিয়ে যাওয়ায় আমাদের সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের এসব ঐতিহ্য শুধু যেন নিজেদের মধ্যেই না থাকে, আমাদের সংস্কৃতি যেন আমরা ছড়িয়ে দিতে পারি বিশ্ব দরবারে। বছরের এই দিনটিতে আমরা সুযোগ পাই আমাদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে উৎসবমুখর পরিবেশে তুলে ধরতে এবং পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে।’

তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব, বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। পুরো পৃথিবীতে যেখানে যেখানে বাঙালিরা আছেন আজ আমাদের সবার আনন্দের দিন, বর্ষ বরণের দিন।

‘ফসলি সন’ এর ইতিহাস তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলা সাল গণনা শুরু হয়েছিল কৃষিকাজের সুবিধার জন্য, ‘ফসলি সন’ হিসেবে। এখনো এদেশের কৃষকরা বাংলা তারিখের হিসেবেই বীজ বোনেন, ফসল তোলেন।

বাংলা নববর্ষের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘হালখাতা’ উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এখনকার আধুনিক সময়েও এখনো এই হালখাতার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন বাংলাদেশের হাটে বাজারে শহরে বন্দরে। নববর্ষের বৈশাখী মেলায় বাংলাদেশের জেলায় জেলায় উদ্যোক্তারা সারা দেশে ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা, হাত পাখা ইত্যাদি তৈরি করে নিজেদের সৃজনশীলতাকে তুলে ধরেন এই দিনকে উপলক্ষ্য করে।

তিনি আরও বলেন, পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষে এবার বড় পরিসরে উৎসব উদযাপন করেছেন।

দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নববর্ষ ১৪৩২ আমাদের সবার জন্য শুভদিনের সূচনা করুক। নববর্ষ ১৪৩২ আমাদের সকলের জন্য নতুন ও গভীর আনন্দের উন্মোচন করুক— এই কামনা করছি।

তিনি নববর্ষের সকল আয়োজন ও উদ্যোগের সাফল্য কামনা করেন।

জাতির আত্মপরিচয়ে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল উপাদান : তারেক রহমান

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জাতির আত্মপরিচয়ে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল উপাদান।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশী জাতিসত্তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নববর্ষ উদযাপন। বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশীদের হৃদয়ে তার প্রকাশ অনন্য ভিন্নরূপ। আমি এই উৎসবমুখর দিনে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশীদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

তিনি বলেন, ‘আবহমানকাল ধরে নানা রূপ ও বৈচিত্র্য নিয়ে জাতির জীবনে বার বার ঘুরে আসে পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের উৎসবের সাথে যেন ভরে ওঠা প্রকৃতি ও প্রাণের যোগ আবহমানকাল ধরে বিদ্যমান। আমাদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় স্বজাতির অতীত গৌরব ও ঐশ্বর্য। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সুদূর অতীতকাল ধরে নির্মীয়মাণ বিশালত্ব এক শক্ত ভিত্তি লাভ করে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্বের বাণী একত্রিত হয়ে গঠন করে এক সুগ্রন্থিত জাতি।’

তিনি আরো বলেন, ‘জাতির আত্মপরিচয়ে পহেলা বৈশাখ এক উজ্জ্বল উপাদান। প্রতি বছর নববর্ষ পেছনের আলোকের দীপ্তিতে উৎকর্ষ ও অগ্রগতির পথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। এখন আমাদের প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের উদার দৃষ্টিভঙ্গির যে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রবণতা রয়েছে তার ভিত্তিতে বহুমত ও পথের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চিরস্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’

বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বলেন, ‘১৪৩১ সাল নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনার সাক্ষী। আমরা ১৪৩২ সালের প্রভাতে দাঁড়িয়ে আছি। শান্তির জন্য শুধু অপেক্ষা করলে হবে না, সমাধান হতে হবে নিঃস্বার্থ। তাহলেই রক্তপাত থামবে, শান্তি ধরা দেবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলা সন-তারিখ আমাদের প্রাত্যহিক জীবন, দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপরিহার্য অনুষঙ্গ, তাই এটি জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিদগ্ধজনের মানসিক আশ্রয় ও মননের পরিচর্যার উৎসস্থল। সুপ্রাচীনকাল ধরে গড়ে ওঠা ভাষা ও কৃষ্টির নিবিড় বন্ধন ভেঙ্গে ফেলার জন্য বিদেশী আধিপত্যবাদী প্রভুরা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমাদের এ সম্পর্কেও সচেতন ও সদা জাগ্রত থাকতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘নববর্ষের প্রথম দিনে আমি সকলের কল্যাণ ও শান্তি কামনা করছি। বৈশাখের বহ্নিতাপে সমাজ থেকে মুছে যাক অসত্য, অন্যায়, অনাচার ও অশান্তি। চারিদিকে প্রবাহিত হোক শান্তির সুবাতাস, সুশীলা নদী, সমস্ত জগৎ হোক অমৃতময়।’

১৪৩২ বাংলা সনের নতুন প্রভাতের প্রথম আলোতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তারেক রহমান।

সূত্র : বাসস

শোভাযাত্রায় সবার নজর ফ্যাসিস্টের মুখাবয়বে

বাংলা নববর্ষ ১৪৩২-কে বরণ করে নিতে নেওয়া হচ্ছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ শুরুর কথা রয়েছে।

বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে অন্যবারের মতো এবারও রঙের ছটা ও আমেজ থাকলেও একটি বিশেষ মুখাবয়ব সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেটি হচ্ছে ফ্যাসিস্টের মুখাবয়ব।

সম্প্রতি আগে তৈরি করা মুখাবয়বটি পুড়িয়ে ফেলার পর ফের ককশিট দিয়ে এই মুখাবয়ব তৈরি করা হয়েছে। এর সাথে দেখা গেছে জুলাই আন্দোলনে শহীদ মীর মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের স্মরণে ‘পানি লাগবে পানি’ মোটিফ।

শোভাযাত্রার জন্য চারুকলার সামনে মুখাবয়বটি রাখা হলে উপস্থিত দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অনেককে বেশ আগ্রহ নিয়ে ছবি তুলতেও দেখা গেছে। কেউ করেছেন ভিডিও।

শোভাযাত্রা শুরু হলে মুখাবয়বটি ঘিরে মানুষের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ দিনের বেশি থাকা বিদেশীদের নিবন্ধনের নির্দেশ

যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ দিনের বেশি সময় অবস্থানকারী সব বিদেশীকে নিবন্ধনের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক্স প্ল্যাটফর্মে দেয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশীদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে। অন্যথায় তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, নিবন্ধনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।

পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েমের সূত্রে বলা হয়, অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি তাদের বার্তা স্পষ্ট- যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ুন এবং স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যান।

একটি ছবিসহ প্রকাশিত বিবৃতিতে আরো বলা হয়, স্বেচ্ছায় ফিরে গেলে নিজের মতো করে ফ্লাইট ঠিক করা যাবে, আয় করা অর্থ সাথে করে নেয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে বৈধভাবে ফেরার সুযোগও থাকবে। এমনকি আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ ফিরতে না পারলে মার্কিন সরকার ভর্তুকি দেবে।

তবে কেউ যদি অবৈধভাবে অবস্থান অব্যাহত রাখেন, তাহলে তাদের কঠোর জরিমানা, তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো এবং কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। নির্দেশ অমান্যকারীদের প্রতিদিনের জন্য ৯৯৮ ডলার জরিমানার কথাও জানানো হয়েছে।

এছাড়া যাদের ফেরত পাঠানো হবে, তারা আর কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র : সিবিসি ও অন্যান্য

বাংলাদেশী পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শর্ত পুনর্বহাল

আগের মতোই বাংলাদেশের পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শর্ত পুনর্বহাল করা হয়েছে। রোববার (৭ এপ্রিল) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

রোববার (১৩ এপ্রিল) চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে পূর্বের ন্যায় বাংলাদেশী পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শর্ত পুনর্বহালের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

আগে বাংলাদেশের পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরায়েল ব্যতীত’। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালে দেশে নতুন ই-পাসপোর্ট চালু করলে সেই পাসপোর্টগুলো থেকে এই লেখা বাদ দেয়। এমনকি এ বিষয়ে কোনো ঘোষণাও দেয়া হয়নি।

সূত্র : ইউএনবি

গাজায় ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালে ইসরাইলের হামলা

গাজায় সীমিত আকারে সচল থাকা ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতাল বা আল-আহলি আরব ফিল্ড হাসপাতালটি ইসরাইলের হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় সময় রোববার (১৩ এপ্রিল) ভয়াবহ হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হাসপাতালটি। প্রায় ১০ লাখ মানুষের জরুরি সেবায় নিয়োজিত ছিল হাসপাতালটি।

গাজা উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডোর দখলের পরদিনই এই হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বঞ্চিত হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন উপত্যকাটির ফিল্ড হাসপাতালের পরিচালক মারওয়ান আল-হামস।

তিনি বলেন, গত ৪০ দিন ধরে গাজায় কোনো ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা জ্বালানি প্রবেশ করছে না। বেশিভাগ হাসপাতালের অক্সিজেন স্টেশন ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বেশ কিছু রোগীর জীবন দ্রুতই ঝুঁকিতে পড়বে।

তিনি আরো বলেন, গাজার অন্য হাসপাতালগুলোতেও সরঞ্জামের সঙ্কট রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার সেবা দেয়া সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন মারওয়ান আল-হামস। ‘বিশ্বের হস্তক্ষেপ ছাড়া গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে’ বলেও সতর্ক করেন তিনি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর যু্দ্ধ শুরু থেকে ইসরাইলের হামলা থেকে বাঁচতে অনেক ফিলিস্তিনিই হাসপাতালগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গাজার সেসব হাসপাতালের বেশিভাগই ইসরাইল ধ্বংস করে দিয়েছে।

ত্রাণ সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘ সতর্ক দিয়েছে, গাজায় ইসরাইলি হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

গাজার সিভিল ডিফেন্স রেসকিউ টিম জানিয়েছে, হামলায় হাসপাতালের অপারেশনের ভবন, অক্সিজেন স্টেশন ও নিবির পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

রোববারের হামলায় ব্যাপিস্ট হাসপাতাল ভবনের লোহার দরজা ভেঙ্গে পড়েছে এবং একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। ইরাকের একটি টেলিভিশন জানিয়েছে, তাদের একটি ভ্যানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত ১৮ মার্চ থেকে চালানো ইসরাইলি হামলায় ১ হাজার ৫৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৫০ হাজার ৯৪৪ জন।

দু’মাসের যুদ্ধবিরতির ফলে গাজায় হামলা বন্ধ করেছিল ইসরাইল। কিন্ত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে আবারো তীব্র হামলা শুরু করে ইসরাইল। এর কয়েকদিন পর হামাস ইসরাইলে আবারো রকেট হামলা চালায়।

সূত্র : ইউএনবি

নন্দনগরের সর্বশেষ মুসলিম দম্পতির নিদারুণ লড়াই

উত্তরাখণ্ডের নন্দ নগরে এক মুসলিম নাপিতের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে শুরু হয় সহিংসতা। এরপর তা খুব দ্রুতই সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ হামলার শিকার হন; রেহাই পায়নি তাদের বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট কিংবা ধর্মীয় স্থান। তখন বেশিরভাগ মুসলিম পরিবারই শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু আহমেদ হাসান নামের এক ব্যবসায়ী এখনো সেখানে শিকড় আঁকড়ে পড়ে আছেন।

নাজিবাবাদ থেকে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হারুন আনসারি নামের এক মুসলিম বাসিন্দা জানান, তার মাথায় একাধিক আঘাত লেগেছিল। তিনি আরো বলেন, ‘আমার শুধু মনে আছে যে মানুষ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তারপর আর কিছুই মনে নেই।

আনসারিকে মারধরের পর, স্থানীয় মুসলিমরা—যাদের মধ্যে হাসানও আছেন—আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু তাতেও রক্ষা হলো না তাদের। শত শত উগ্রবাদী হিন্দু এসে মুসলিমদের বাড়ি-ঘরে পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। হাসান বলেন, এ সময় আমরা বারবার পুলিশকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। এমনকি আমার পুরনো হিন্দু বন্ধুরাও সেদিন ফোন ধরেনি।

সন্ধ্যার পর উগ্রবাদীরা যখন চলে গেল, মুসলমানরা সবাই আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এলেন। রাত গভীর হতেই হাসান দোকানে যান। গিয়ে দেখেন, তার ‘দ্য হাসান ড্রাই ক্লিনার্স’ নামের দোকানটি পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত। শাটার ভাঙা, ধোয়া কাপড় রাস্তায় ছড়িয়ে, কাউন্টার গুঁড়িয়ে গেছে। সেখানে তালাবদ্ধ ড্রয়ারে তিনি সন্তানদের বিয়ের জন্য চার লাখ টাকা সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পুরো টাকাই চুরি হয়ে যায়।

তার দোকানের নামফলক পড়ে ছিল নন্দাকিনী নদীর ধারে, ছিন্নভিন্ন এক ধ্বংসাবশেষের মতো। এসব ভাঙচুরের ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সেই দিনটা কখনো ভুলতে পারব না।

পরদিন আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি

আগের দিন আঘাত পাওয়া হারুন বলেন, ২ সেপ্টেম্বর হিন্দু উগ্র-ডানপন্থী সংগঠনগুলো আরো বড় বিক্ষোভের ডাক দেয়। তারা আশপাশের শহর থেকে লোক এনে নন্দ নগরকে উত্তপ্ত করে তোলে। তাদের ডাকে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়। অথচ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ছিল মাত্র ৬০ থেকে ৭০ জন। আমরা বারবার এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। তবুও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি।’

ঘৃণামূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত হিন্দু নেতা দর্শন ভারতীও সেদিন নন্দ নগর আসেন। তার বক্তব্যের পর উগ্র জনতা নতুন করে হামলা চালায় মুসলিমদের বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট ও ধর্মীয় স্থানে। এ সময় তারা একটি পাঞ্জেগানা মসজিদও গুঁড়িয়ে দেয়। এক মুসলিমের গাড়ি তুলে ফেলে দেয় নদীতে। ভারতীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল জাজিরার প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি।

হাসান বলেন, ‘যখন হিন্দুরা পাথর ছুঁড়ছিল, তখন আশেপাশের মুসলিম পরিবারগুলো আমার বাড়ির দোতলায় এসে আশ্রয় নেয়। কারণ, বাড়িটি বহুতল হওয়ায় ও শক্ত লোহার গেট থাকায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করেছিল তারা। আমার সেই দিনের কথা মনে করলে এখনো গা শিউরে ওঠে।’

ঘটনার দিনই অভিযুক্ত আরিফকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তাকে জামিনে মুক্তি দিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর পুলিশ মুসলিম পরিবারগুলোকে জানিয়ে দেয় যে তারা আর মুসলমানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবে না। রাতের আঁধারে পুলিশই মুসলিমদের গাড়িতে করে পার্শ্ববর্তী শহরে নামিয়ে দিয়ে আসে।

এটাই ছিল অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের জন্য নন্দনগরের শেষ দিন।

‘এটাই আমার ঠিকানা’

কিন্তু আহমেদ হাসান নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যাননি। তিনি বলেন, ‘এটাই আমার বাড়ি। আমার জন্ম, শৈশব, জীবন, সবকিছু তো এই শহরের সাথে জড়িত। আমার অতীত, আমার শিকড়, সবই তো এখানেই।’ এ সময় তিনি আরো জানান, তার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সব সরকারি নথিপত্রেই ঠিকানা হিসেবে লেখা রয়েছে নন্দনগর।

হাসানের পরিবার এরপর কিছু দিনের জন্য ২৬৬ কিলোমিটার দূরে দেরাদুনে চলে যায়। সেখান থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর হাসান ও মোহাম্মদ আয়ুম নামের আরেক বাসিন্দা হাইকোর্টে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। আদালত চামোলি জেলার পুলিশ প্রধানকে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়।

এ বিষয়ে হাসান বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার নিরাপদে ফিরতে পারব। কিন্তু কেউই আর ফিরতে রাজি হয়নি। ভয়ে সব পরিবার এখন দূরেই থাকে।’

তার ভাইয়ের সেলুন বন্ধ হয়ে যায় বাড়িওয়ালার হুমকির কারণে। আত্মীয়রাও এগিয়ে আসেননি সহায়তায়।

সাহস দেখালেন হাসানের স্ত্রী

হাসান বলেন, ‘অনেক ভাবনা-চিন্তার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আমাকে ফিরতেই হবে। সবকিছু তো নন্দ নগরেই রয়ে গেছে।’ এসময় তার স্ত্রীই প্রথমে সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমরা না ফিরি, তাহলে আমাদের জীবনধারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’

তবুও হাসানের পরিবার এখনো দ্বিধায় আছে। চার সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ের স্কুল শেষ করেছে। হাসান দেরাদুনে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু তার স্ত্রী মনে করেন, যদি তারা আবার শহর ছেড়ে যান, তবে বাড়ি ও দোকান স্থানীয়দের দখলে চলে যেতে পারে।

অবশেষে ১৬ অক্টোবর হাসান পৌঁছান নন্দ নগরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, একজন হিন্দু ব্যক্তি তার দোকানের সামনেই সরাসরি প্রতিযোগিতার জন্য একটি ড্রাই-ক্লিনিং দোকান খুলে বসেছে।

হাসান নিজের দোকানটি মেরামতের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো হিন্দু কর্মী তাকে সাহায্য করতে রাজি হয়নি। তারা জানিয়েছে, ‘তাদেরকে পুরোপুরিভাবে মুসলিমদের বয়কট করার জন্য বলা হয়েছে। তারা এতটা ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে যে কেউ আমাদের দোকান মেরামতেও সাহস করছে না। কর্মীরা আমাকে জানিয়েছে, হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের মুসলমানদের সাহায্য না করার নির্দেশ দিয়েছে।’

হিন্দুত্ববাদ হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ। এর একটি আধাসামরিক সংগঠন রয়েছে। তার নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে আছেন।

অবশেষে হাসান নিজেই দোকান মেরামত করে তা খোলেন। কিন্তু কোনো গ্রাহক আসেনি। তিনি তার আগের নিয়মিত হিন্দু ক্লায়েন্টদের ফোন করেন। কিন্তু তারা আসতে অস্বীকার করে। যারা আসতো, তাদের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর গুন্ডারা হুমকি দিতো এবং হিন্দু ড্রাই-ক্লিনারের কাছে যেতে বলতো। হাসান বলেন, ‘সেদিন আমি বুঝলাম যে ড্রাই-ক্লিনিংয়েরও একটি ধর্ম আছে।’

নতুন নন্দ নগরে হাসানের পরিবারের লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। সেখানেও তাদের ধর্ম তাদের আলাদা করে ফেলেছে। তিনি জানান, তার ১৬ বছরের বড় মেয়েকে স্কুলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে ধর্মের কারণে।’ এক সহপাঠী তাকে বলেছিল, তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা উচিত। কারণ সে একজন মুসলিম। আমরা যখন অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ করি, এরপর নির্যাতন বন্ধ হয়।’

হাসান এবং শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অন্যান্য মুসলিমদের জন্য ন্যায়বিচার এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরে উত্তরাখণ্ড পুলিশ একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নথিভুক্ত করে। সেটি নন্দ নগর থানার ওসি সঞ্জয় সিং নেগি নিজেই করেন।

নথিতে তিনি লেখেন, ‘আমি দেখি ২৫০-৩০০ জন লোক জোরে জোরে ‘একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে’ গালিগালাজ করছে। আমি তাদের থামাতে গেলে তারা আমাকে সরিয়ে দেয়। তারপর আমি আমার ঊর্ধ্বতনদের ডেকে অতিরিক্ত পুলিশ চেয়েছিলাম।’ এরপর তিনি লেখেন, হিন্দুরা মুসলিমদের দোকান ভাঙচুর শুরু করে এবং একটি মসজিদও আক্রমণ করে।

তিনি আরো লেখেন, ‘উত্তেজিত জনতা একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কাজ করছিল। তাদের আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নারী ও শিশুরা ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।’ তিনি বলেন, এ সময় হিন্দুরা লাঠি, বেলচা ও লোহার রড নিয়ে এসেছিল। তবুও উত্তরাখণ্ড পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করেনি।’

আল জাজিরা চামোলি জেলার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট সর্বেশ পানওয়ারের সাতে যোগাযোগ করে। কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি।

নন্দ নগর হয়ে উঠেছে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের এক বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির নেতৃত্বে মোদির বিজেপি শাসিত এই রাজ্য বহু শহরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ এবং বৈষম্যের দ্রুত বৃদ্ধি দেখেছে। শহরের পর শহরে, উগ্র-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে প্রচারণা শুরু করেছে। অনেকক্ষেত্রেই তারা সফলও হচ্ছে।

সেখানে মুসলিমদের দোকান লুটপাট বা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। বয়কট চলে অর্থনৈতিকভাবে। প্রায়ই মুসলমানরা শারীরিক সহিংসতারও মুখোমুখি হন। সম্প্রতি ধামির সরকার একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করেছে, যা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন অনুসরণ করা থেকে বিরত রাখে।

আদালত কয়েকবার হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু অনেক কর্মী মনে করেন আরো কিছু করা দরকার। দেরাদুনের এক কর্মী খুরশিদ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশের আদালত এখনো বোঝে না যে মুসলিমরা কতটা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।’ খুরশিদ হাইকোর্টে আবেদন করতে হাসানকে সাহায্য করেছিলেন। মোটকথা, নিপীড়ন চলছে সব দিক থেকে- শারীরিক, মানসিক, আর্থিক।’

তবুও সম্প্রতি হাসান একটুখানি আশার আলো দেখতে পান।

১ সেপ্টেম্বরের সহিংসতার প্রায় পাঁচ মাস পর ১৯ ফেব্রুয়ারি, মুসলিমবিরোধী বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারী একজন হিন্দু ব্যক্তি হাসানের দোকানে আসেন। ওই সময় তার স্ত্রী দোকান চালাচ্ছিলেন। লোকটি একটি কোট এবং ট্রাউজার নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেন, সেগুলো দ্রুত ড্রাই-ক্লিন করা যাবে কিনা। হাসানের স্ত্রী তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি তো আমাকে বোন বলেছিলে এবং বলেছিলে মুসলমানরা যেন চলে যায়?’ লোকটি জবাব দেয়, ‘যা হয়েছে ভুলে যাও। তোমার কাজ খুব ভালো। তাই তোমার কাছেই এসেছি।’

ঘটনাটি মনে করে হাসান হেসে বলেন, ‘আমি এই দিনটা দেখতে পারলাম। কারণ আমি গিয়ে ঝগড়া করিনি।’

তবুও ভাঙা বন্ধুত্বের যন্ত্রণা তাকে কষ্ট দেয়। যখন মুসলিম পরিবারগুলো নিজেদের জিনিসপত্র নিতে ফিরে আসত, তখন তাদের সাথে আমরা একসাথে বসে হাসি-ঠাট্টা করতাম। তারা জিজ্ঞাসা করতো, আমরা কেন ফিরে এসেছি। এতে আমার হৃদয় ভেঙে যায়। শারীরিক সহিংসতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সামাজিক নিঃশব্দ সহিংসতা এখনো চলছে।’

তবু ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং নন্দ নগর নিয়ে আশাবাদ হারাতে রাজি নন হাসান।

সূত্র : আল জাজিরা