Home Blog Page 57

নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব জানতে চেয়েছে আইএমএফ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে গতকাল রোববার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে অর্থ বিভাগ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাস থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের কথা রয়েছে। এ জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কত ধাপে এবং কী পরিমাণে বাস্তবায়ন হবে, তা মন্ত্রিপরিষদ নির্ধারণ করবে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে আইএমএফ কোনো মতামত দেয়নি। বরং বাজেট বাস্তবায়নে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। এদিকে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু আইএমএফের সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেন।

গতকাল আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক শুরু করে। দিনব্যাপী আটটি বৈঠকের সূচি থাকলেও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়।

দিনের শুরুতে প্রতিনিধি দল অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট এবং সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থমন্ত্রী সংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা ঋণ পাওয়া নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে সরকার যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই নতুন কর্মসূচির প্রতিটি শর্তে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।

সরকার তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে। এ অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যে গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফকে চিঠি দিয়ে জানান, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হলেও সরকার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে সংস্কার এগিয়ে নিতে চায়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে, যা ২০২৫ সালের জুনে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেলেও ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের সম্মতিতে কর্মসূচি বাতিল হয়।

গতকালের বৈঠকে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব আহরণ, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ব্যয় বিষয়েও আলোচনা হয়।

সোয়া ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ৫১ মৃত্যু

কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর পাহাড়ধস মিলিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বড় মানবিক সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ– এই সাত জেলায় লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি। কোথাও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আবার কোথাও কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদি পশুর খামার একসঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাবে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ এবং পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮।

এই বন্যার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস। সোমবারও দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় আরও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আক্রান্ত ৫৮ উপজেলা 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌর এলাকায় বন্যা হানা দিয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু হলেও সেখানে উঠেছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নিজ নিজ এলাকায় বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। যাদের বড় অংশই খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চট্টগ্রাম। এখানকার ১৬ উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দি হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার। এখানে ১৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন ১২ জন। ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, টাকা, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৬ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৫৮ হাজার ২৭। সেখানে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন, এর মধ্যেও পাঁচজন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া একজন নিখোঁজ রয়েছেন। জেলার ২৭টি কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

বান্দরবানে সাত উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে পানিবন্দি রয়েছে ১২ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫০০। সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন দুজন। ২২০টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ছয় হাজার ২৫০ জন।

রাঙামাটিতে ৯ উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৪৪টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা তিন হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০টি কেন্দ্রে তিন হাজার ৬৩৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌর এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৭৩টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। ১৫০ কেন্দ্রে দুই হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে সাত হাজার ৩০৮ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ২০টি কেন্দ্রে দুই হাজার ১৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

হবিগঞ্জের তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ছয় হাজার ৪৪৪ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ হাজার ১৪০। দুটি কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে এখনও কেউ আশ্রয় নেননি।

অপ্রতুল বরাদ্দ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সাত জেলার জন্য নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ মানুষের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ২৮ টাকা। অন্যদিকে, পানিবন্দি দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের হিসাবে পরিবারপ্রতি বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ টাকা। একই সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ২৫০ টন চাল। সেই হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিপ্রতি চালের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।
যদিও সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চাল, টাকা, শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায়ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ক্ষতি

বন্যার প্রভাব শুধু মানুষের বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি খাতেও এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি রয়েছে।

পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন সবজি, পাট, মরিচ, আদা, হলুদ, পানের বরজ এবং বিভিন্ন ফলের বাগানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। আরও প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমির ফসল এখনও ডুবে আছে। পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর আউশ এবং ৫৫০ হেক্টর আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, আক্রান্ত হওয়া মানেই সব জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। পানি দ্রুত নেমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। তবে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে আরও সময় লাগবে।

তিন পার্বত্য জেলার কৃষকের আরেক দুশ্চিন্তার নাম কাঁঠাল। পাহাড়ে এ বছর ফলন ভালো হলেও টানা বৃষ্টিতে গাছে থাকা ফল পচে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে নেওয়ার আগেই নষ্ট হচ্ছে ফল। সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় কৃষক লোকসান গুনছেন। একই সঙ্গে জুমচাষের আদা, হলুদ ও সবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে প্রাথমিক হিসাবে তিন হাজার ৭০২ একর জমির ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমনের বীজতলার পানি দ্রুত নেমে গেলে কৃষকরা ফের বীজতলা তৈরি করে অনেকটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব অবস্থায় থাকায় এ ক্ষতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ কম। তিনি মনে করেন, চলতি বছর হাওর অঞ্চলের বোরো ক্ষতির পর এখন আউশ ও আমনেও চাপ তৈরি হওয়ায় ধান উৎপাদনে ঝুঁকি বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে যদি মৌসুমের শেষদিকে বন্যা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, ভাসমান বীজতলা, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত আমনের চারা রয়েছে, যা বন্যাকবলিত এলাকায় সরবরাহ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, যেসব এলাকায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন জেলা থেকে চারা পাঠানো দরকার। ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে বড় ধরনের চারার সংকট হবে না। তবে বন্যার কারণে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হবেই।

প্রাণিসম্পদ খাতেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উদ্বেগজনক। শুধু চট্টগ্রামেই প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার ক্ষতির তথ্য দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। বন্যায় ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল এবং প্রায় ৪৩ হাজার মুরগি মারা গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার একর ঘাসের প্লট এবং বিপুল পরিমাণ শুকনো পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। এতে অনেক খামারি গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের খামার পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খামারি ফরহাদুল ইসলাম জানান, ঝড়ের সময় একটি গাছ তাঁর খামারের ওপর ভেঙে পড়ে তিনটি গরু মারা গেছে, আরও কয়েকটি আহত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামারিদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষুরা রোগ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বন্যায় মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর, দিঘি ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে চার হাজার ১০৬ হেক্টর জলাশয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২০টি চিংড়ি ঘের। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। বহু মাছচাষি এক মৌসুমের পুরো বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

এদিকে বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এসব সড়ক পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ কৃষি ও জীবিকার পাশাপাশি অবকাঠামো পুনরুদ্ধারেও বড় ব্যয়ের মুখে পড়বে সরকার।

জানতে চাইলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। যেখানে বীজ বা চারা সংকট  তৈরি হবে, সেখানে সরকার চারা সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাজধানীতে বৃষ্টি কমতে পারে আজ, বাড়তে পারে উত্তরাঞ্চলে

রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। চলতি বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। একই সময়ে গতকাল রোববার দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে, সেখানে রেকর্ড করা হয়েছে ১৬০ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ সোমবার রাজধানীতে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে। তবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত জুলাই মাসে ঢাকায় গড়ে প্রায় ৩৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সে হিসাবে এক দিনেই মাসিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় দেশের মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাবে ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ আশপাশের এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামেও।

নাজমুল হক বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রসহ বৃষ্টি সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে হয়। কিন্তু জুন-জুলাইয়ে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাতের বিস্তৃতি অনেক বেশি হয় এবং একটি শহরের প্রায় সব এলাকা এর আওতায় আসে।

তবে চলতি মৌসুমে ঢাকায় এটি সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত হলেও অতীতের কয়েকটি রেকর্ডের চেয়ে কম। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই। এ ছাড়া ১৯৫৬ সালে এক দিনে ৩২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ২৪ ঘণ্টায় ২৫৫ মিলিমিটার এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ স্থানে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সকালে বান্দরবানের সাঙ্গু, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পাঁচটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরীসহ কয়েকটি নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে পারে। এতে নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

বাবার ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়া হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বাবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দেওয়া প্রথম বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, এই প্রতিশোধ গ্রহণ শুধু পরিবারের তার সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ইরানি জাতির ইচ্ছা।

আজ শনিবার ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা এই লিখিত বার্তা প্রকাশ করে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিন পর এমন বিবৃতি দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

মোজতবা খামেনি আরও বলেন, ‘আমরা অপরাধী ও কলঙ্কিত খুনিদের কাছ থেকে শহীদ নেতা এবং এই যুদ্ধের সব শহীদের পবিত্র রক্তের বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘অপরাধী ও কলঙ্কিত ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করেন মোজতবা।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছয় দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোরে আয়াতুল্লাহ খামেনির জন্মস্থান মাশহাদ শহরে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়।

শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোজতবা খামেনি। তাদের এই অংশগ্রহণকে ‘শত্রুর মনোবল চূর্ণকারী ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

বর্ষায় রান্নাঘরের ৫ জিনিস ছত্রাকমুক্ত রাখবেন যেভাবে

বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় রান্নাঘরের কিছু জিনিস দ্রুত ছত্রাকের কবলে পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য় হয়ে যায়। অনেক শুকনো খাবার বাতাসের আর্দ্রতা শোষণ করে দলা পাকিয়ে যায়, ছাতা পড়ে যায়। এতে খাবারের স্বাদও বদলে যায়। বর্ষাকালে যেসব জিনিস দ্রুত নষ্ট হয় তা সংরক্ষণের উপায় জেনে নিন। যেমন-

১. বৃষ্টির দিনে চিনির দানাগুলো একসাথে লেগে বড় বড় দলা পাকিয়ে যায়। চিনি বাতাসের সংস্পর্শে এলে এর ওপর আর্দ্রতা জমতে পারে। এছাড়া পাত্রটি খুললেও ভেজা ভাব, সোঁদা গন্ধ দেখা যায়। ভেজা চামচ ব্যবহার করলে চিনি আরও তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চিনি আর্দ্রতা মুক্ত রাখতে এয়ারটাইট পাত্র ব্যবহার করুন। চিনি তুলতে চামচটাও যাতে শুকনো হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

২.বর্ষাকালে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে লবণ একেবারে গলে যায়। তাই লবণও এয়ারটাইট পাত্রে রেখে শুকনো চামচ ব্যবহার করুন।

৩. আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে হলুদ, মরিচ, ধনে গুঁড়োও বাতাসের সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যায়। কৌটার মধ্যেই দলা পাকাতে শুরু করে। অনেক সময় আবার ছাতাও পরে যায়। এসব রাখতে এয়ার টাইট পাত্র ব্যবহার করুন। ড্যাম্প ধরা স্থান এড়িয়ে চলুন। শুকনো চামচ ব্যবহার করুন।

৪. বৃষ্টির সময় বেসন ও সুজিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এগুলোর গন্ধ বদলে যেতে পারে। প্যাকেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে এসব জিনিস বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন। ঠান্ডা ও শুষ্ক জায়গায় সংরক্ষণ করুন।

৫. বর্ষাকালে বিস্কুট ও স্ন্যাকসের মুচমুচে ভাব নষ্ট হয়ে নেতিয়ে যায়। খোলা প্যাকেটের মধ্যে বাতাসের আর্দ্রতা ঢুকে এমন অবস্থা হতে পারে। খোলার পর প্যাকেট ক্লিপ দিয়ে শক্ত করে সিল করুন। প্রয়োজনে বায়ুরোধী পাত্রে ভরে রাখুন।

দেশজুড়ে আরও ৫ দিনের বৃষ্টির পূর্বাভাস

মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশজুড়ে আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে বিভিন্ন বিভাগে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

রোববার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।

আজ রোববার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

আগামীকাল সোমবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। রংপুর ও রাজশাহীর কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। এদিন খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিনজুড়েই দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

পাহাড়ধসে রান্নাঘরে প্রাণ গেল গৃহবধূর, অল্পের জন্য বাঁচলেন স্বামী

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে স্বামীর সামনে মাটিচাপা পড়ে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের এ ঘটনায় তার স্বামী আব্দুল মজিদ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও স্ত্রীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার শহরের পূর্ব কলাতলী ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে রোজিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে জেলার পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বারবার সতর্ক করা হলেও জীবিকার তাগিদে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা পাহাড়ধস ও প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবারের বরাতে জানা যায়, রাতের খাবার একসঙ্গে খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আব্দুল মজিদ ও তার স্ত্রী রোজিনা বেগম। এ সময় পাহাড়ের পাশের রান্নাঘরে রান্না করতে গেলে ভারী বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ পাহাড়ধস নামে। এতে আব্দুল মজিদ সামান্য আহত হয়ে প্রাণে বাঁচলেও রোজিনা বেগম মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

নিহত রোজিনা বেগমের স্বামী আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমি বারবার ওকে বলেছিলাম, পাহাড়ের পাশের রান্নাঘরে না যেতে। বলেছিলাম, বৃষ্টি বেশি, পাহাড়ধসে যেতে পারে। কিন্তু রান্না করতে রান্নাঘরে যেতেই মুহূর্তেই ধস নামে। আমি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও আমার স্ত্রী মাটিচাপা পড়ে মারা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির লোকজনকে বলেছিলাম, যেন পানি না ফেলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশগুলো কেটে ফেলে। কিন্তু কেউ কথা শোনেননি। ঘটনার সময় আমি ও স্ত্রী পেছনের ঘরে, আর বাবা ও আমার ছোট মেয়ে সামনের ঘরে ছিলাম।’

স্বজনদের দাবি, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের অভিযোগ, পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির জন্য মাটি ভরাট করায় ধসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বারবার সতর্ক করলেও বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। পাহাড়ধসের পর চিৎকার করেও সময়মতো সহযোগিতা মেলেনি। আর সেই ধসেই প্রাণ হারান রোজিনা বেগম।

আব্দুল মজিদের ভাই আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমরা ১৯৯১ সাল থেকে এখানে বসবাস করছি। এতদিন কখনও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সম্প্রতি পাহাড়ের ওপরে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি ভরাট করায় ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আমরা বারবার সতর্ক করলেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। অন্তত পাহাড় ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো ধস নামত না, আর আমার বোনকেও প্রাণ হারাতে হতো না।’

ফায়ার সার্ভিস জানায়, রোজিনা বেগম রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ‘রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে একজন নারী মাটিচাপা পড়েছেন-এমন খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, ওই নারী রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। টানা বৃষ্টির এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান না করার জন্য তিনি সবাইকে আবারও অনুরোধ জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদন ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন শেখ হাসিনা

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য তিনি আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরতে চান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজে এসব কথা বলেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাননি।

টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় বৃহস্পতিবার রাতে। রয়টার্স এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শুক্রবার। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবু আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই তা যেন নিজের মাটিতেই হয়।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও তাঁর দলের সদস্যরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। আদালতে নিজেদের সমর্পণ করার মাধ্যমে তাঁরা মূলত বর্তমান কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা নিতে চান।

শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ কয়েক দফায় ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বর্তমান সরকার যখন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে।

ভারতে নির্বাসিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করলেন। এ সময়সূচির ব্যাপারে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি জানিয়ে বলেন, ‘তারা আমাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে বারবার ভারতের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালেরও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। দলটির অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তবে সাড়া পায়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে। নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চায় দিল্লি।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বছর আগে গণআন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের চালানো সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলছেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি এবং একদিন আপনাদের সবারই ফিরে আসা উচিত। আমরা একসঙ্গে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।’

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং কবে কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি বিচারে বিশ্বাস করি। আমার মনে হয় একবার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে আদালতের এই প্রহসন জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’

শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার পরিকল্পনার বিষয়ে ঢাকার বর্তমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তিনি বলেন, ‘একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার কেবল জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে দণ্ডিত করতে পারে, আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু তারা কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে সেটি জনগণকেই নির্ধারণ করতে দেওয়া হোক।’

ডিসেম্বরে কাউন্সিলের পরিকল্পনা বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

চলতি বছরে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এখনও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ হয়নি। প্রাথমিকভাবে আগামী ডিসেম্বরে কাউন্সিল করার বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে কাউন্সিলে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। রাত ৮টার দিকে বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় রাত পৌনে ১০টায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠক সূত্র জানায়, কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ এখনও নির্ধারণ না হলেও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে দলের। প্রস্তাবিত নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী, বিএনপি তৃণমূল পর্যায় থেকে একটি উন্মুক্ত কাউন্সিল প্রক্রিয়া চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি ওয়ার্ড থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন ও থানা ইউনিট হয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যন্ত পৌঁছাবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, কেন্দ্র থেকে সরাসরি নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন এই সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, জেলা নেতারা থানা কমিটি গঠনের বিষয়টি তদারকি করবেন। আবার থানা ইউনিট ইউনিয়ন কমিটি এবং ইউনিয়ন কমিটি ওয়ার্ড কমিটি গঠনের দায়িত্বে থাকবে। তৃণমূলের এ স্তরগুলোর সাংগঠনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে।

সূত্র আরও জানায়, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকি করতে একটি ‘মনিটরিং অ্যান্ড ডিজাইন কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় দুই-চারজনের একটি ছোট কোর টিম কাজ শুরু করবে, পরে এর পরিধি বাড়ানো হবে। সাংগঠনিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে এবং কাউন্সিলের প্রস্তুতি তদারকি করতে স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিভিন্ন অঞ্চল সফর করবেন।
জানা গেছে, কাউন্সিলের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার পর গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য একটি উপকমিটি এবং প্রচার, যোগাযোগ ও অভ্যর্থনা তদারকির জন্য আরও কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হবে। এ ছাড়া বিএনপির সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোকেও একই পদ্ধতিতে (বটম-আপ অ্যাপ্রোচ) পুনর্গঠন করা হবে। বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তবে বিষয়টি এখনও আলোচনাধীন।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। মালয়েশিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।

ভারী বৃষ্টি ও ঢল চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যার অবনতি, রান্নায় সংকট

কোলে ১১ মাসের শিশু। ডান হাতে ছাতা ধরেছেন। হাঁটুপানি ভেঙে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছেন রকিবুল ইসলাম। পেছনে পেছনে যাচ্ছেন স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মনকিচর এলাকায় হাঁটুপানিতে ডুবে থাকা সড়কে দেখা যায় এই দৃশ্য। রকিবুল জানান, তাদের বসতঘরে ঢুকেছে বন্যার পানি। রান্নাঘর তলিয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া নেই। বাড়িতে থাকার আর সুযোগ নেই। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন।

একই সড়কে আরেকটু সামনে যেতেই দুই যুবক ও এক কিশোরের দেখা মেলে। তাদের মাথায় ও হাতে পানির কলসি। যুবক রাজ্জাক আলী বলেন, তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি।

খাবারের সংকট। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। খাবার পানির সংকট। এ কারণে এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেছেন। কলসিতে পানি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। সেখানে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রয়েছেন।

কিশোর আক্কাস বলে,  সে তার বাবা-মায়ের জন্য এই খাবার পানি সংগ্রহ করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে দুই দিন ধরে সবাই শুকনা খাবার খাচ্ছে। কোনো খাদ্য সহযোগিতা পায়নি তারা।

তাদের মতো খাদ্য ও পানির সংকটে ভুগছেন সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বানভাসিরা।  এখানে অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। কক্সবাজারের দুটি উপজেলায়ও বন্যার অবনতি হয়েছে। সেখানেও দুর্গতরা শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। পানির সংকট তীব্র। বান্দরবান সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে দাবি করছেন বানভাসিদের অনেকে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকা গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন। মোবাইল টাওয়ারগুলো অচল হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকার মানুষরা যোগাযোগ করতে পারছেন না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা স্পিডবোট ও লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। উদ্ধারকাজ সুশৃঙ্খল করতে সেনাবাহিনী তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। বাঁশখালীর চেচুরিয়া এলাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশুসহ ১৩ জনের একটি পরিবারকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেছেন।

গতকাল সরেজমিন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদী সদর, শীলকুপ, গন্ডামারা বাহারছড়া ও শেখেরখিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলাচলের প্রধান সড়কের কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটুপানি। এলাকার পর এলাকা পানিতে ডুবে আছে। যেসব এলাকায় গত শুক্রবার পানি ওঠেনি, সেসব ঘরবাড়িতে ঢুকতে শুরু করেছে পানি। তাই মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

হাঁটুপানির নিচে থাকা গন্ডামারা সড়কে কথা হয় রাশেদ আলী নামে এক ব্যক্তি সঙ্গে। তিনি বলেন, সময় যত বাড়ছে, বন্যার পানি ততই বাড়ছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছেন। শুক্রবার শুকনা খাবার খেয়ে রাত কাটিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে গেছে।

বাহারছড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। তাকে কবর দেওয়ার জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে পুকুরপাড়ে একটি উঁচু এলাকায় তাকে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।’

বাঁশখালীর পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ১২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তারা গত বৃহস্পতিবার রাতে এসেছে। এখনও প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নেয়নি। খাদ্য সহযোগিতা পাননি। সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানির। পাঁচ কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

সেখানে আশ্রয় নেওয়া সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাড়ি থেকে চাল-আলু নিয়ে এসেছিলাম। খাওয়া শেষ। এখন মুড়ি খেয়ে আছি। এক গ্লাস করে পানি খাচ্ছি। আমার মতো অন্যরাও খাবার কষ্টে আছেন।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি ত্রাণের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও আড়াই হাজার পরিবারে শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। আজ থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে।’

সাতকানিয়ায়ও বন্যার পানি কমছে না। দুই উপজেলায় প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। মূলত বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার পানি নেমে আসায় বন্যার পানি কমছে না। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রতিনিধি জানান, সাতকানিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের কোনোটির পুরো অংশ, আবার কোথাও আংশিক পানিতে ডুবে রয়েছে। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কেও যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে।

পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়ে রাঙ্গুনিয়া হয়ে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সেতুর দুই পাশে আটকা পড়েছে হাজারো যাত্রী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গতকাল শনিবার ভোরে উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির চাপ আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে পানির তোড়ে সেতুটির একটি অংশ ভেঙে পড়ে। কর্ণফুলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার লিচুবাগান এলাকা থেকে নদীর অপর পারে চলাচলকারী ফেরি সার্ভিসও বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প পথেও বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাড়িঘর, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে হাঁটুপানি জমে আছে। কৃষিজমি ও পুকুর তলিয়ে রয়েছে। ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ফটিকছড়িতে দুর্গত মানুষের পাশে সেনাবাহিনী
বন্যায় ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়কযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

গতকাল গুইমারা রিজিয়নের অধীন লক্ষ্মীছড়ি জোনের উদ্যোগে উপজেলার সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও আশপাশের বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেনাসদস্যরা নৌযান ও অন্যান্য উপায়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ তুলে দেন।

দুই মন্ত্রীর দিনভর তৎপরতা
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রয়েছে। সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য রোগব্যাধি প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

সার্কিট হাউসে পৃথক এক সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, খাল-নালা দখল ও জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাঁশখালীর সব স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।

কক্সবাজার
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্যায় চকরিয়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নে বাড়িঘরের পাশাপাশি ডুবে গেছে স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ। এ দৃশ্য শুধু লক্ষ্যারচরের নয়। উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

এভাবে পানিবন্দি কক্সবাজার জেলার ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ বাসিন্দা। তবে, বৃষ্টি কিছুটা কমায় কোথাও কোথাও নামতে শুরু করেছে পানি। তবে, অধিকাংশ এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি।

লাক্ষ্যারচর ইউনিয়নের বন্যাদুর্গতের দাবি, প্রায় এক সপ্তাহ পানিবন্দি হয়ে থাকলেও এখনও পৌঁছায়নি খাদ্য সহায়তা। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে ভুগছেন তারা।

ভোক্তভোগীরা জানান, বহু নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। ঘরে বুকসমান থেকে কোমরপানি। তাই রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। প্রকট হয়ে উঠছে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও।

চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন বলেন, তিন দিন ধরে পানিবন্দি। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা অতি সামান্য।

মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ বলেন, বন্যার পানিতে বসতঘর ডুবে গেছে। চুলা ধরানোর সুযোগ নেই। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলায় ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে ত্রাণসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে বন্যাদুর্গত পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন।

রাঙামাটি
রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেখানে অন্তত ২০টি গ্রামের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের শিলক সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গতকাল বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে পানি বেড়েছে। এতে ১১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাইখ্যং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে এই ইউনিয়নের কয়েক হাজার দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

রাজাস্থলী-বিলাইছড়ি সীমান্ত সড়ক উদয়চর এলাকায় ধসে পড়ায় বড় যানবাহন চলাচল করছে না। উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, নদীতে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উপজেলা সদর থেকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বাজার থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবান 
বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন।

শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

খাগড়াছড়ি
দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে প্রায় চার দিন বন্ধ থাকার পর দীঘিনালা-লংগদু সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গতকাল সকাল থেকে মাইনী নদীর পানি কমে যাওয়ায় দীঘিনালার নিচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করে। উপজেলার মেরুং বাজারের পানি অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। ধীরে ধীরে বাজারের সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে।

১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে এ তথ্য জানান আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি এবং এ বিভাগের অধীনে আলিম এবং এইচএসসি ভোকেশনাল, বিএমপি, ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ নির্দেশনা
দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সাত দফা জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন, জরুরি ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ত মজুত, অ্যান্টি-ভেনম সরবরাহ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যু বেড়ে ৪৪
বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাতটি জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। এসব জেলায় ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।

হবিগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির সংকট
হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় নদীভাঙনে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩০টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। বানভাসিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে।

মৌলভীবাজারে দুর্ভোগ বেড়েছে
মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি কমতে শুরু করায় পরবর্তী দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার অনেক স্থানে বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে গোখাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেক এলাকার মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে।