ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সংসদ কার্যক্রমে গুছিয়ে উঠতে পারেনি বিএনপি। চলমান অধিবেশনে বাজেট আলোচনায় বিএনপি জোটের ২০০ জন সংসদ সদস্য ৩২ ঘণ্টা ৩ মিনিট বক্তব্য দেন। তবে খুব কম সংখ্যক এমপি সুনির্দিষ্টভাবে বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন।
সরকারি দলের এমপিদের পাশাপাশি সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে মন্ত্রীদের অনীহাও আলোচনায় এসেছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত না থাকলে মন্ত্রী-এমপিদের অনুপস্থিতি বেড়ে যাচ্ছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার বিষয়টি নজরেও এনেছেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে রেওয়াজ আইনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু রেওয়াজ লঙ্ঘন করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতি এড়িয়ে স্পিকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিলও পাস হচ্ছে।
সংসদে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তালিকায় নাম থাকা না থাকা, দিনক্ষণ, নামের ক্রম নিয়ে একাধিক দিন একাধিক এমপি ক্ষোভ জানিয়েছেন। একাধিক এমপি স্পিকারের আহ্বানের পর বক্তৃতা দিতে অপারগতা জানিয়েছেন।
সংসদে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি অস্বীকার করে হুইপ জি কে গউছ বলেন, বেশির ভাগ নতুন মুখ। সংসদীয় রেওয়াজের বিষয়ে অনেকেই তেমন ওয়াকিবহাল নন। এরপরও সবকিছুকে সমন্বয়ের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন তারা। আগামীতে সমন্বয় আরও সুচারু হবে বলে জানান তিনি।
সংসদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এমন বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি দলের সংসদীয় কার্যক্রমকে আশাব্যঞ্জক বলা যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ কয়েকজন সদস্য বিরোধী দলকে বিতর্কে কাবু করতে পারলেও অধিকাংশ সংসদ সদস্যকে নিষ্প্রভ মনে হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, এ পর্যন্ত সংসদীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব মূল সমস্যা বলে মনে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ অধিবেশনে যোগদানের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনীহা দেখা যাচ্ছে। হুইপিংয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি চোখে পড়েছে।
নিজাম উদ্দিন বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির জন্য যেমন সবকিছু সহজ করে দিয়েছে, তেমনি আবার সামান্য অসতর্কতা তাদের জন্য বড় বিপদ ঘটতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কটা কোন পর্যায়ে পৌঁছায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, বিগত দিনের তুলনায় এবারের সংসদ ভিন্নতা পেয়েছে। সংসদ নেতা থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই চেষ্টা করছেন সংসদকে কার্যকর হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরতে।
সংসদ গঠনের পর তিন দফা এমপিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবারও এমন একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আছে।
মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
গত ২২ জুন বাজেট অধিবেশনের বৈঠকে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল ইসলাম খান। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বাজেট অধিবেশনে বেশির ভাগ সময় অধিকাংশ মন্ত্রী উপস্থিত থাকেন না। এ বিষয়ে তিনি স্পিকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বিরোধীদলীয় নেতাও মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদে।
তাৎক্ষণিক জবাবে স্পিকার বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও উপস্থিতি দেখতে চাই। তবে শোকর করেন যে, অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন। বাজেট অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা থাকলে আমরা বাধিত হবো।’
স্পিকারের বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে সংসদে তাদের উপস্থিত থাকা উচিত। বাজেট-সংক্রান্ত বিষয়ে সব খাত বিষয়ে সবশেষে অর্থমন্ত্রীই বলবেন।
এ পর্যায়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন বলেন, ‘বিরোধী দল বলল, আমাদের মন্ত্রীরা নাই, ঠিক আছে। বলার আগে যদি নিজেদের দিকে তাকিয়ে বলতেন। সংসদে বিরোধী দলের নেতা এবং উপনেতা দুজনের কেউই নাই।’
অর্থের সংসদীয় কমিটিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের স্থায়ী কমিটিতে না রাখার রেওয়াজ ছিল সংসদীয় ইতিহাসে। তবে রেওয়াজ ভেঙে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সংসদীয় কমিটি। কিন্তু চলমান সংসদে কমিটি গঠনে ধীরগতি এবং আইনসভার তদারকি কমিটিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে সদস্য করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব হয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি অতীতে ছোটখাটো ভুল করেই বড় বিপদে পড়েছে। রেওয়াজ ভাঙার এই দৃষ্টান্ত তৈরির কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদাধিকারবলেই সদস্য থাকেন। সেখানে আরেকজন মন্ত্রীকে নিয়ে সদস্য করা খুবই দৃষ্টিকটু।
বাজেট বক্তৃতায় বাজেট নেই
২২ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নেন জামালপুর-২ আসনের এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু। তাঁকে প্রথমে ৬ মিনিট সময় দেন স্পিকার। কিন্তু তিনি বাজেট নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি তো বাজেট নিয়ে কোনো কথাই বলেন নাই।’
এরপর সুলতান আহমদকে স্পিকার আরও দুই মিনিট সময় দেন। ওই দুই মিনিটেও তিনি বাজেট নিয়ে কিছু বলেননি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রশংসায় তাঁর সময় শেষ হয়ে যায়। এ নিয়ে হাস্যরস হয় সংসদে।
অবশ্য বাজেট আলোচনায় প্রশংসিত হয়েছেন সরকারদলীয় একজন এমপি। সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী নির্ধারিত ১০ মিনিটের পুরোটা বাজেট নিয়ে কথা বলেন। বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে স্পিকার সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, আমান উল্লাহ আমানের নাম ঘোষণার পরও তারা বক্তৃতা করেননি। দুইজনেই বলেন, তাদের নাম যে বক্তার তালিকায় রয়েছে, তা জানতেন না। হুইপরা তা জানাননি।
হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান সমকালকে বলেন, সংসদে সমন্বয়হীনতা বলে কিছু নেই। কিছু ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। অনেক এমপিকে তাদের বক্তব্য দেওয়ার জন্য বারবার বলা হলেও তারা পরে বক্তব্য দিতে চান। ফলে এক সময় বাধ্য হয়ে ওই এমপিদের নাম তালিকায় দিতে হয়।
পোশাক নিয়ে বিতর্ক
গত ১৪ জুন বিরোধী দলের নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপির এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্য সরকারি দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তির মুখে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাঁর বক্তব্যের একাংশ এক্সপাঞ্জ করেন। কিন্তু একাধিকবার নির্বাচিত এই এমপি বিষয়টি মেনে নেননি। তিনি চিফ হুইপকে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর বক্তব্য না বুঝেই এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে। বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদের বৈঠকে যোগদান করবেন না।
১৪ জুনের বক্তব্যের পর ব্যাখ্যা দিতে ফ্লোর চাইলেও মনিরুল হককে বসিয়ে দেন ডেপুটি স্পিকার। গতকাল সোমবার মনিরুল হক সমকালকে বলেছেন, বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে অবহেলা করা হয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক
বিএনপির বিরুদ্ধে ‘জুলাই সনদ’ বা গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে অবমূল্যায়নের অভিযোগ করছে বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও সরকারি দলের অনেক এমপি একই ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান দেখিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপিদলীয় এমপি ফজলুর রহমানের বক্তব্যে দলের সামনের সারির সদস্যদের অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। গাজীপুর-২ আসনের এমপি মঞ্জুরুল করিম রনি জুলাই সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনার সময় বিষয়টিকে ‘অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক’ বলে আখ্যা দেন। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়।
নির্বাচন আদায়ে আপস করে বিএনপি জুলাই সনদে সই করেছে– স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যেও বিএনপি বিরোধী দলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়। পরে অবশ্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁর বক্তব্যের অপব্যাখ্যা হচ্ছে। তিনি আসলে বুঝিয়েছেন, দ্রুত নির্বাচনের স্বার্থে সব বিষয়ে একমত না হওয়ার পরও সনদে সই করেছে বিএনপি।
কক্সবাজার-২ আসনের বিএনপির এমপি আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ সংসদে পবিত্র কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধীদের কটাক্ষ করেন। এ নিয়ে বিতর্কের এক পর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিরোধী সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার অভিযোগ
সংসদে বিভিন্ন বিল পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যদের যথাযথ আলোচনার সময় না দেওয়া এবং বিলের কপি না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সরকারি দলের বিরুদ্ধে। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কমপক্ষে তিন দিন আগে বিলের কপি সব সদস্যকে সরবরাহ করার নিয়ম থাকলেও তার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগে গত ২৮ জুন বিরোধী দল ওয়াকআউট করে।
এর আগে প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ যখন বিল আকারে সংসদে তোলা হচ্ছিল, তখন কয়েকটি ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানায়। স্পিকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, বিরোধী দল সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি মেনে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ নেয়নি। তাই তাদের আপত্তি ধোপে টেকেনি। যদিও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, বিলগুলো উত্থাপনের আগে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে টেবিলে সরবরাহ করা হচ্ছে না।




