রদ্রি যেন দুর্ভেদ্য দেয়াল

বিরল এক কীর্তি গড়েছেন রদ্রি। ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর ও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছেন স্পেনের এই মিডফিল্ডার। যে তালিকার বাকি তিনজন হলেন পাওলো রসি, জিনেদিন জিদান ও লিওনেল মেসি। চোটে পড়ে প্রায় নিঃশেষ হতে বসা একজন খেলোয়াড়ের এমন দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন রদ্রি।

রদ্রির বিশ্বকাপসেরা হওয়া নিয়ে একটা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করা লিওনেল মেসিকে বাদ দিয়ে তাঁকে গোল্ডেন বল দেওয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। গত রোববার বিকেলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গোল্ডেন বলের জন্য রদ্রির নাম ঘোষণা হতেই গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা মেসির নামে জয়ধ্বনি শুরু করেন। তা দেখে মেসিও কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এই জয়ধ্বনি যে ফিফার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ, তা বুঝতে পারা যাচ্ছিল। এই প্রশ্ন তোলাদের তালিকায় রয়েছেন দুই সাবেক তারকা ফুটবলার ইব্রাহিমোভিচ ও আনহেল ডি মারিয়া। সুইডিশ কিংবদন্তি ইব্রা একটি টিভি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গোল্ডেন বলের জন্য মেসিকে আর কী করতে হতো? ২০১৮ সালের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া হারার পরও লুকা মডরিচকে গোল্ডেন বল দেওয়া হয়েছিল। তা হলে মেসি কেন পাবে না?’ সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা ডি মারিয়া তো ফিফার দিকে আঙুল তুলেছেন।

তবে রদ্রির পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, কেন তাঁর হাতে উঠল এই পুরস্কার। স্পেনের বিশ্বজয়ের কারিগর এই ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। আটটি ম্যাচেই শুরু থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতে। বল দখলে রাখা, নিখুঁত পাস, অসাধারণ পজিশনিং ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রদ্রি ছিলেন অনন্য। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পাস খেলেছেন এবার রদ্রি, সে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব দৌড়ানো এবং সবচেয়ে বেশি খেলায় সম্পৃক্ত থাকার কৃতিত্ব তাঁর দখলে। যেমন রক্ষণে সহায়তা করেছেন, তেমনই তাঁর পায়ে গড়ে উঠেছে আক্রমণ। হতে পারে তিনি কোনো গোল করেননি, কোনো অ্যাসিস্টও করেননি। এমনকি ফাইনালে যে জয়সূচক গোলটি হয়েছে, সেটিও তিনি মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার পর। তাতেও রদ্রির অবদান কমে যায় না। বিশ্বকাপে যে শুধু বেশি গোল ও অ্যাসিস্ট করলেই গোল্ডেন বল জেতা যায়, তা নয়। ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি দেখে পুরো টুর্নামেন্টে কে সবচেয়ে ভালো খেলেছে। সেই কারণেই ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানি রানার্সআপ হওয়ার পরও গোলরক্ষক অলিভার কান সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। ২০০৬ বিশ্বকাপে জিতেছিলেন ইতালির ডিফেন্ডার ফ্যাবিও ক্যানাভারো। রদ্রিও যেভাবে পুরো টুর্নামেন্টে সফলভাবে একটি দলকে চালনা করে চ্যাম্পিয়ন করেছেন, তাতে যোগ্য হিসেবেই তাঁকে গোল্ডেন বলের জন্য বেছে নিয়েছে ফিফা।

রদ্রির এই সেরা হওয়া অন্য একটি কারণে বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ। ২২ মাস আগে অসাধারণ ফর্মে থাকার সময় ভয়াবহ চোটে পড়েছিলেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটির ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়ের পর ২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়েও বড় অবদান ছিল তাঁর। ম্যানসিটির ৭৪ ম্যাচের অপরাজেয় যাত্রার নায়ক ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আর্সেনালের বিপক্ষে একটি ম্যাচে থমাস পার্টির সঙ্গে সংঘর্ষে পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় তাঁর। ওই মৌসুমে আর মাঠে নামতে পারেননি তিনি। পরের মৌসুমে ফিরলেও আগের সেই ধার ছিল না তাঁর খেলায়। বিশ্বকাপেও এসেছিলেন সেই সংশয়কে সঙ্গী করেই। কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য যেন নিজের সেরাটা তুলে রেখেছিলেন এ তারকা। ম্যাচের পর ম্যাচ দুর্ভেদ্য এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিপক্ষের সামনে। এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে মাত্র একটি গোল হয়েছে, সেটির বড় কৃতিত্ব তাঁর।

এই পুরস্কার পেয়ে ভীষণ আপ্লুত রদ্রি। ভয়ানক চোট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে তরুণ প্রজন্মের জন্য উদাহরণও মনে করছেন রদ্রি, ‘মনে হচ্ছে যেন নিখুঁত এক চিত্রনাট্য। আমি এটা একেবারেই আশা করিনি। আমি চাই নতুন প্রজন্ম দেখুক, একজন ফুটবলার সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও যিনি নরকে পতিত হন, তিনি আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন। এটি প্রতিকূলতা জয় করার একটি উদাহরণ এবং সবার জন্য শিক্ষা, সবসময় বিশ্বাস রাখতে হবে।’ সেরা হওয়ার পেছনে তাঁর ভালো করার তীব্র তাড়নার কথাও বলেছেন রদ্রি, ‘এটাই এই দলের (সাফল্যের) রহস্য। আমরা সবসময় জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরই তাঁর পুরস্কার দেন।’

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর