লাল-নীলে ভাগ হয়ে আছে নিউইয়র্ক

0
4

কানাডার গহন অরণ্য থেকে ধেয়ে আসা দাবানলের কালচে কুয়াশা আর ধোঁয়ার চাদরে আচ্ছন্ন নিউইয়র্কের আকাশ। যদিও এই আকাশ দেখে বিগ অ্যাপলকে চেনা অসম্ভব; এই মায়াবী শহরকে তার প্রকৃত স্বরূপে ছুঁতে তাকাতে হয় নির্ঘুম টাইমস স্কয়ারের সেই সুবিশাল, দেদীপ্যমান বিজ্ঞাপনী দেয়ালগুলোর দিকে। সেখানে এখন নিয়ন আলোর তীব্র ছটায় ফুটে উঠেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের এক আসন্ন মহাযুদ্ধের পটভূমি– একদিকে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মায়াবী আকাশি-নীল, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালদের স্পেনের উদ্ধত, তপ্ত লালের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এখানকার লোকেরা বলে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তীব্র ডামাডোলের লগ্নেই নাকি কেবল এমন আড়াআড়ি লাল আর নীলে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এই কসমোপলিটন নগরী। একদিকে রিপাবলিকানদের চেনা ‘লাল’, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ‘নীল’। ব্যালট বাক্সের সেই চিরন্তন বিভাজনটাই যেন এবার নেমে আসছে ফুটবল মাঠে। নিউইয়র্কের ধমনিতে এখন বইছে স্প্যানিশ আর্মাডা বনাম মেসি-সাম্রাজ্যের এক অনন্য ফুটবলীয় ‘ইলেকশন ডে’।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ব্যালট বাক্সের লড়াইয়ে নিউইয়র্ক বরাবরই নীল দাপটের অটল দুর্গ। কিন্তু রাজনীতির সেই চেনা নীল স্রোতকে এবার ওলটপালট করে দিয়ে, স্প্যানিশ আর্মাডার রক্তাভ লাল আর লাতিন ফুটবলের চিরন্তন আকাশি-নীল রঙে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈরথে মেতেছে ঘুমহীন মহানগরী নিউইয়র্ক। সকার থেকে একটু একটু করে যেন ফুটবলের মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে এই শহরটা। এক মাস আগের কথা। জেএফকে এয়ারপোর্টের এক কোণে ‘ফুটবলে একটা কিক মারো’ বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেইনের বুথটার সামনে যখন সুনসান নীরবতা, কাকপক্ষীও গলত না– গতকাল সেখানে রাজ্যের ভিড় ঠেলে ছেলে-বুড়ো সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে চামড়ার গোলকটায় লাথি মারার জন্য ব্যাকুল!

আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফাইনাল ঘিরে উন্মাদনার আসল বিস্ফোরণটা অবশ্য টের পাওয়া যাচ্ছে শহরের পাব আর রেস্টুরেন্টগুলোতে। ম্যানহাটানের স্যালুন কিংবা কুইন্সের স্প্যানিশপাড়ার বারগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই। একদিকে সানগ্রিয়ার গ্লাসে চুমুক দিয়ে স্প্যানিশ গিটারের দ্রুত লয়ে মেতে উঠেছে যুবসমাজ, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার চেনা ড্রামের তালে ‘মুচাচোস’ গানের সুরে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। উবার চালক থেকে শুরু করে ক্যাফের ওয়েটার– সবার মুখেই এক অদ্ভুত উত্তেজনার চোরাস্রোত। বিগ অ্যাপলের ধমনিতে এখন আর কোনো আমেরিকান কেতাবি ভাব নেই, সেখানে এখন রাজত্ব করছে লাতিন আমেরিকার তীব্র আবেগ আর ইউরোপীয় ফুটবলের অহংকারী আভিজাত্য।

শহরের এই তুমুল উৎসবের আলো-আঁধারির মাঝেই ম্যানহাটানের রাস্তায় চোখে পড়ে কিছু বিষণ্ন, ছন্নছাড়া অবয়ব। তারা আর কেউ নন, সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা একঝাঁক ইংলিশ সমর্থক। সেমিফাইনালের মহারণে থ্রি-লায়ন্সদের বুকভাঙা বিদায়ের পর থমকে গেছে তাদের সব স্বপ্ন। অথচ ফাইনালের টিকিটটা তারা পকেটস্থ করে রেখেছিলেন অনেক আগেই, বুক বেঁধেছিলেন ইউরোর অধরা ট্রফিটা এবার অন্তত ঘরে ফিরবেই। লন্ডনের পাব ছেড়ে নিউইয়র্কের রাস্তায় এখন তারা ঘুরছেন ঠিক যেন ‘বিবাহ আসর থেকে বর পালিয়ে যাওয়া’ কোনো হতভাগ্য নিমন্ত্রিতের মতো। লাখ টাকা খরচ করে কেনা সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের অমূল্য টিকিটগুলো এখন তাদের কাছে তপ্ত কয়লার মতো হাত পোড়াচ্ছে। না পারছেন ফেলে দিতে, না পারছেন সইতে। টাইমস স্কয়ারের কোনো স্পোর্টস বারের কোণে বসে মলিন মুখে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দেওয়া ছাড়া এখন আর কোনো গতি নেই এই ব্রিটিশদের। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার ‘মুচাচোস’ কিংবা স্প্যানিশ ফ্লামেনকোর সেই করতালির উৎসব যেন তাদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ্বকাপ ফাইনালের আঁচ পড়েছে এখানকার মিডিয়াতেও।

নিউইয়র্কের নামি দৈনিকগুলোর ‘পেজ থ্রি’ এখন আর কেবল গ্ল্যামার দুনিয়ার খামখেয়ালিপনার গল্প বলছে না, সেখানে এখন রীতিমতো চাঁদের হাট বসার উপক্রম। জেএফকে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ম্যানহাটানের রুফটপ লাউঞ্জ– সবখানেই ফিসফাস, রোববারের ফাইনালে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি বক্সে বসবেন কারা? হলিউডের তাবড় মহাতারকা টম ক্রুজ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও থেকে শুরু করে ব্র্যাড পিট আর ডেভিড বেকহামের মতো ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে গ্যালারিতে গ্ল্যামারের যে সুনামি বইবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে খবরের কাগজগুলো পাতার পর পাতা ভরিয়ে ফেলছে। এমনকি মাঠের সেই হাই-ভোল্টেজ ড্রামার আগে ৯০ মিনিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপাতে আসছেন পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা, শাকিরার মতো তারকারা, যা দেখার জন্য ফুটবলপ্রেমীদের আকাঙ্ক্ষার পারদ এখন ঊর্ধ্বমুখী।

তবে শুধু সেলিব্রিটিদের ঝলকানিই নয়, ম্যানহাটানের টাইমস স্কয়ার থেকে ব্রুকলিনের স্পোর্টস বারগুলোর দেয়াল ঢেকে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর বেটিং সাইটগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনে। কে হাসবে শেষ হাসি? বাজির দুনিয়ায় জুয়াড়িরা কিন্তু ইতোমধ্যেই নিজেদের পছন্দের ছক সাজিয়ে ফেলেছেন। বাজিকরদের খাতায় স্পেন এই মুহূর্তে কিছুটা এগিয়ে, ট্রফি ছোঁয়ার দৌড়ে তাদের সম্ভাবনা প্রায় ৫৮ শতাংশ। ওয়াল স্ট্রিটের করপোরেট নিউইয়র্কের বুক চিরে এখন যেন এক আদিম জুয়ার উন্মাদনা খেলা করছে; প্রতিটি ডলারের চাল, প্রতিটি বিজ্ঞাপনের স্লোগান যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে– বিগ অ্যাপল এখন আক্ষরিক অর্থেই এক আন্তর্জাতিক ফুটবল যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দু।

সেখানে জ্যাকসন হাইটস, ওজোন পার্ক কিংবা ব্রঙ্কসের বাঙালি পাড়াগুলোতে ফাইনালের হাওয়া বইছে প্রবলভাবেই। প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। নিউইয়র্কের এই মিনি বাংলাদেশও এখন আড়াআড়ি দুই ভাগে বিভক্ত। তবে এখানে স্পেনের ‘লাল’ রঙের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এক চিরন্তন আবেগের লড়াই– আর্জেন্টিনা বনাম ‘আর্জেন্টিনা ঠেকাও’ দল! চায়ের কাপে ঝড় তুলে একদল যখন লিওনেল মেসির শেষ নৃত্যের বন্দনায় মগ্ন, অন্যদল তখন কোমর বেঁধে নেমেছে কীভাবে লাতিন এই পরাশক্তিকে মাটিতে নামানো যায়, তার হিসাব কষতে। সব ক্লান্তি ভুলে মেতে উঠেছে সেই চিরন্তন ট্রল আর তর্কে; যেখানে মেসিবন্দনার উল্টো পিঠেই তৈরি হচ্ছে এক তীব্র, অলিখিত প্রতিরোধ। সব মিলিয়ে জমজমাট এক ফাইনালের জন্য তৈরি নিউইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here