সাক্ষাৎকারে তাসকিন প্রস্তুতি নিয়েও সেরাটা দিতে পারিনি

অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার জন্য মরিয়া ছিলেন তাসকিন আহমেদ। চোট পরিচর্যা করে সেরা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। তবুও কাঙ্ক্ষিত মানে পারফরম্যান্স করতে না পারায় আক্ষেপ আছে ৩২ বছর বয়সী এ বোলারের। তবে হতাশা ভুলে যেতে চান দলের সাফল্যে। টেস্ট সিরিজ ড্র করাকে ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য মনে করেন তিনি। আশা করেছিলেন, দ্বিতীয় টেস্টেও ভালো হবে। সেটি করতে না পারাকেও অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন তাসকিন আহমেদ। ম্যাকাই থেকে তাসকিনের একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সেকান্দার আলী।

সমকাল: ডারউইন টেস্টটা খুব থ্রিলিং ছিল?
তাসকিন:
 প্রথম ম্যাচে নিখুঁত ছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সবকিছু পরিকল্পনামতো হয়েছে। সবাই সবার রোলটা সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছে। স্কিলের প্রয়োগটা ভালো হয়েছে। আসলে প্র্যাকটিস করা, পরিকল্পনা দেওয়া কঠিন কিছু না। কঠিন কাজ হলো মাঠে কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারা। প্রতিটি ইউনিট সমন্বিতভাবে ভালো করায় ইতিহাস গড়া সম্ভব হয়েছে।

সমকাল: অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে টানা চার দিন এগিয়ে থাকা কীভাবে সম্ভব হলো?
তাসকিন: 
অতীত রেকর্ড সামনে এগিয়ে যেতে বা সফল হতে মানসিকভাবে সাহায্য করে। আমরা নিউজিল্যান্ডে টেস্ট ম্যাচ জিতেছিলাম, সেটি একটি এভিডেন্স ভালো করার জন্য। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছি তাদের মাটিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট জিতেছি। প্রতিটি অ্যাওয়ে সিরিজের সাফল্য মানসিকভাবে উজ্জীবিত করেছে ভালো করতে। ওই রেকর্ডগুলো আত্মবিশ্বাস দিয়েছে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। আমরা জানতাম, সেরা ক্রিকেটটা খেলতে পারলে জেতা সম্ভব। বাংলাদেশে সম্প্রতি ভালো উইকেটে খেলছি সব প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। এই বিষয়টি বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। যখনই ভালো উইকেটে ভালো ব্যাটিং করতে পারি, তখনই ফল মেলে। কারণ, বোলিং ইউনিট ধারাবাহিক ভালো করছে। অতীতে রেজাল্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে বোলিং ইউনিটের বড় ভূমিকা ছিল। এবার বোলিংয়ের সঙ্গে ব্যাটিং ক্লিক করায় সফল হতে পেরেছি।

সমকাল: সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় টেস্টে বোলিংটা ভালো ছিল। বোলিং ইউনিটই কি অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ তৈরি করেছে?
তাসকিন:
 প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের উইকেট কিছুটা ট্রিকি ছিল। ওরা অতি আত্মবিশ্বাস থেকে টসে জিতে ব্যাটিং নিয়েছে (হাসি)। সুযোগ পেয়ে আমরা কাজে লাগিয়েছি। ম্যাকাই টেস্টে ব্যাটিং নেওয়ার সাহস দেখায়নি। আমরা প্রথমে বোলিং করার সুযোগ পেলে ম্যাচ বের করে নিতাম। আসলে দ্বিতীয় টেস্টের কন্ডিশন সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল না। পেসের থেকে এখানে বাউন্স ছিল বেশি। বাউন্সে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা টসে জিতলে অন্যরকম হতে পারত।

সমকাল: অস্ট্রেলিয়ায় সম্মান পেলেন কেমন?
তাসকিন: 
অনেক সম্মান পেয়েছি। প্রথম ম্যাচ জয়ের পর যেখানেই গিয়েছি, অস্ট্রেলিয়ান থেকে শুরু করে সবাই ক্লাপ করেছে, সাপোর্ট করেছে। অভিনন্দন জানিয়েছে। ওয়ানডে বা টি২০ ক্রিকেটে নির্দিষ্ট দিনে ভালো ক্রিকেট খেললে ফ্লুক হতে পারে। যে কেউ জিততে পারে। টেস্ট ক্রিকেটে সেটি কোনোভাবে সম্ভব নয়। প্রতিটি সেশন জিততে হয় টেস্টে ভালো করতে হলে। আমরা ওই কাজটিই করেছি, যে কারণে সবাই সম্মান করেছে।

সমকাল: আপনি নিজে কেমন উপভোগ করলেন?
তাসকিন: 
সত্যি কথা বলতে, বিদেশের লিগে খেলা ছেড়ে দেওয়া, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েও আমি আমার সেরাটা দিতে পারিনি। আমি খুবই ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এক মাস আগের সিরিজেও দারুণ বোলিং করেছি। অথচ এখানে কাঙ্ক্ষিত মানে বোলিং করতে পারিনি। ভালো হোক, খারাপ হোক– প্রক্রিয়ার বাইরে যেতে পারব না। প্রত্যেক খেলোয়াড় একটি পরিকল্পনা নিয়ে সিরিজ বা ম্যাচ খেলতে নামে। কখনও সফল হয়, কখনও হয় না। আমার জন্য একটা শিক্ষা ছিল, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েও ভালো করতে পারিনি। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজ দেবে।

সমকাল: আপনি তো ব্রেক থ্রু দেন?
তাসকিন: 
আমি তো নিগেলস নিয়ে খেলি। ভালো বোলিং করা আমার কাজ। ওই কাজটিই করতে পারিনি। আমি জানি, যে বোলিং করেছি তার থেকে অনেক ভালো করতে পারি। তবে চেষ্টার কমতি ছিল না। আমি ব্যথা নিয়ে খেলি সব সময়। এবার একটু ব্যথা বেশি ছিল। সর্বোচ্চটা দিতে পারিনি, ঠিক আছে। সামনে ভালো করব, ইনশাআল্লাহ। টানা খেলতে থাকলে অনেক সময় মনের অজান্তেও ফ্যাটিগ আসে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে আপনি কখনোই অনুমান করতে পারবেন না, কখন ফ্যাটিগ চলে আসবে। সামনে বিরতি আছে, ক্লান্তি ঝেড়ে ফিরে আসব। তবে বড় পাওয়া, অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ ড্র করতে পেরেছি।

সমকাল: এই সিরিজের জন্য উন্মুখ হয়েছিলেন। উপভোগ করেছেন তো?
তাসকিন: 
প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছি। আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত। সিরিজ শুরুর আগে সবাই মনে করেছিল, আমরা জঘন্যভাবে হারব সিরিজটি। আল্লাহর রহমতে আমরা জয় দিয়ে শুরু করেছি। আমি সেরা বোলিং করতে পারিনি, এ কারণে কথা ওঠা স্বাভাবিক। তবে কি আমি ১০ বছর আগে যেভাবে বোলিং করেছি, ৩২ বছরে সেটি সম্ভব না। ১২ বছর বয়স বেড়েছে আমার। এখন ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করার স্বপ্ন দেখি না। এটিও তো ঠিক, ১৩২ কিলোমিটার গতিতে সুইংটা ভালো করছি। যেটাই হয়েছে, তার থেকে আমি ভালো বোলিং করতে পারি। আমাদের দলীয় প্রচেষ্টায় প্রথম টেস্ট ম্যাচটি জিতেছি।

সমকাল: নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় রেকর্ড হবে?
তাসকিন:
 আশা করি। আমরা ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় আইসিসি ইভেন্ট ছাড়া খেলিনি। এভাবে খেললে রেজাল্ট যেটাই হোক, সুযোগ বাড়বে। আমরা এ রকম বড় দলের বিপক্ষে নিয়মিত খেলতে পারলে উন্নতি হবে। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় এ রকম কন্ডিশনে খেলা হলে চার পেসারও খেলাতে হতে পারে। দোয়া করবেন, সব পেস বোলার যেন ফিট থাকে, সুস্থ থাকে এবং সেরা ছন্দে থাকে।

সমকাল: শরিফুলের বোলিংটা কেমন লাগল?
তাসকিন: 
শরিফুল সব সময় ভালো বোলিং করে। হাসানও ভালো করছে। এ দুজনের দুটি বোলিং ইনিংস ব্যতিক্রম ছিল। প্রথম টেস্টে সবারই ভালো বোলিং হয়েছে। বোলিংয়ে জুটি গুরুত্বপূর্ণ। দুই পাশ থেকে চাপ তৈরি করা গেলে একপাশে একজন বড় উইকেট পাবে। এটাই হয়েছে আমাদের। যে-ই বেশি উইকেট পাক, তিনজনের একটা সমন্বয় থাকে। সেটি উভয় টেস্টে।

সমকাল: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা কতটা খুশি?
তাসকিন: 
বিসিবির সবাই খুশি। আমি নিশ্চিত, পুরো দেশ খুশি। হার মেনে নিতে সবারই কষ্ট হয়। আমাদেরও কষ্ট হয়। প্রথম টেস্ট জয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টে আরও ভালো ক্রিকেট খেলা সম্ভব ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেটি হয়নি। তবে দিন শেষে আমরা সিরিজ ড্র করেছি।

সমকাল: বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেরা প্রজন্মের বেশির ভাগ ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে পারেননি। আপনারা খেললেন। নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে হয়?
তাসকিন:
 অবশ্যই। অনেক কিংবদন্তিতুল্য ক্রিকেটারের অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার সৌভাগ্য হয়নি। সেই ২৩ বছর আগে খেলেছে। আমরা আবার টেস্ট খেলে ভালো করে অন্যদের জন্য পথ তৈরি করে গেলাম।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর