পটুয়াখালী এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ বাবদ চলতি সেপ্টেম্বরে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে প্রকল্পের ঋণদাতা চায়না এক্সিম ব্যাংক। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিপিডিবির বকেয়া বিল আদায় এবং ঋণের অর্থ ডলারে রূপান্তর ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি।
পটুয়াখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের নোরিনকো ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে দুটি প্রতিষ্ঠান সমানভাবে বহন করেছে। প্রকল্পের বাকি ৭০ শতাংশ খরচ মেটাতে চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং ব্যাংক অব চায়না যৌথভাবে প্রায় ১৭৭ কোটি ডলার সিন্ডিকেটেড ঋণ দিয়েছে। এর মোট উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায় চায়না এক্সিম ব্যাংক। চিঠিতে কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ পরিশোধের জন্য আনুমানিক ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার অবশ্যই প্রস্তুত রাখার কথা বলেছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে যে নগদপ্রবাহ তৈরি হবে, তা দিয়েই প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের প্রয়োজনীয় অর্থ আসবে বলে আশা করছে তারা।
ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব নিশ্চিত করতে স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আরএনপিএলকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর উৎপাদন থেকে যে অর্থপ্রবাহ তৈরি হওয়ার কথা, তা যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়– সে বিষয়টি ঋণদাতা ব্যাংকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেলে বা বন্ধ থাকলে প্রত্যাশিত রাজস্ব কমে যেতে পারে। এতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চিঠিতে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এবং এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিলের তথ্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জানাতেও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিপিডিবির কাছে বকেয়া থাকা অর্থ দ্রুত যাচাই করে নিষ্পত্তির জন্য অনুরোধ করতে বলা হয়েছে। চায়না এক্সিম ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট তহবিল সিন্ডিকেট মনোনীত এজেন্ট ব্যাংকের হিসাবে জমা করতে হবে। এর মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে চাইছে ঋণদাতা।
শুধু রাজস্ব আয় ও বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায় নয়, কিস্তির অর্থ সময়মতো ডলারে পরিশোধের বিষয়েও সতর্ক করেছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার মূলধন ও সুদ পরিশোধের নির্ধারিত শেষ তারিখ। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের কোনো ঘাটতি তৈরি হলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ঋণের অর্থ সময়মতো পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার রূপান্তর ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে ব্যাংকটি। এখানে মূল বিষয় হলো, কেন্দ্রের আয় স্থানীয় মুদ্রায় হলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। তাই নির্ধারিত সময়ের আগে প্রয়োজনীয় ডলার সংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছে চীনা ব্যাংক।
খেলাপি হলে ক্রস ডিফল্টের ঝুঁকি
কিস্তি পরিশোধে কোনো ঘাটতি হলে সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে চিঠিতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। চায়না এক্সিম ব্যাংক বলেছে, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ঘাটতি হলে তা সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত অন্যান্য ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক খেলাপি বা ক্রস ডিফল্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


