পরপর তিন বছর আলুতে লোকসান গুনে এবার করলা চাষ করেছিলেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষকরা। এই বিকল্প ফসলও তাদের হতাশ করে বাড়িয়েছে দুশ্চিন্তা। মৌসুমের শুরুতে করলার বাজারদর ভালো থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে অস্বাভাবিকভাবে দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
চলতি মৌসুমে উপজেলায় এবার ১০ হেক্টর জমিতে করলার চাষ হয়েছে। ফলনও ভালো। মাসখানেক আগে থেকে ফসল বাজারে তুলতে শুরু করেছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত দাম পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ করলার দাম ২০০০-২১০০ থেকে কমে ১১০০-১২০০ টাকায় নেমে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ তোলা তো দূরের কথা, বড় লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
গত শুক্রবার বিকেলে ক্ষেতলাল-আক্কেলপুর আঞ্চলিক সড়কের ভাসিলার মোড়, কলিঙ্গার মোড়, কুসুমশহর, চৌমুহনী বাজার, নামাজগড়, আমলাগাড়ি মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে। এসব এলাকায় কৃষকরা জমি থেকে করলা তুলে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। সেখানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাওয়ার জন্য ট্রাকভর্তি করে করলা তুলতে দেখা গেছে।
কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমের শুরুতে করলার ভালো দাম পাওয়ায় তারা বেশ খুশি ছিলেন। হঠাৎ টানা বৃষ্টি হওয়ার পর ১৫ দিনের ব্যবধানে বাজারদর প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন তারা হতাশায় ভুগছেন। এই বাজারদর অব্যাহত থাকলে অনেক কৃষককে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
উপজেলার তুলসীগঙ্গা ইউনিয়নের আটি-মুকুল গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর ইসলাম জানান, প্রতিবছর তিনি এনজিও থেকে ফসলের ওপর ঋণ নিয়ে অন্যের পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করতেন। পরপর তিন বছর মোটা অঙ্কের লোকসান গুনে তিনি প্রায় নিঃস্ব। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আলু চাষ বাদ দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালান। সারাবছর ঢাকার অলিগলিতে ফেরি করে বেশি দামে সবজি বিক্রি দেখে তাঁরও ফের চাষবাসের ইচ্ছা জাগে। গত জুনে বাড়িতে ফিরেও আসেন। তবে এবার আর আলু নয়, বিকল্প হিসেবে বেছে নেন করলা। রিকশা চালিয়ে জমানো টাকায় তিনি এক বিঘা জমি ৫০ হাজার টাকা বর্গা নিয়ে করলার চাষ শুরু করেন। তিনি জানান, এরপর বাঁশ, সুতা, কীটনাশক, সার, শ্রমিক, অন্যান্য খরচসহ এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ করলা এক হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি এ দামে বিক্রি করতে হয়, তাহলে করলা চাষেও তাঁর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। তিনি বলেন, আপাতত আর কোনো ফসল চাষ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারের গতি ফিরে না আসছে, আর কৃষকের ওপর সরকারের দৃষ্টি না ফিরছে।
চৌমুহনী বাজারে আসা করলা চাষি তরিকুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর আলুতে লোকসান হওয়ায় এ এলাকার অধিকাংশ কৃষক করলা চাষ করেছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন ভালো হলেও হঠাৎ করে দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকরা পুঁজি হারানোর আশঙ্কা করছেন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি করেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক আলী আজম বলেন, দুই বিঘা জমিতে করলা চাষ করেছি। বাঁশ, সুতা, কীটনাশক, সার, শ্রমিক, মালচিসহ প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ করলার দাম মাত্র এক হাজার ১০০ টাকা। এ দামে করলা বিক্রি করে উৎপাদন খরচের টাকা ওঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, কৃষকরা সবজি উৎপাদন করলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্থানীয় কৃষি অফিসও বিষয়টি দেখভাল করছে না বলে অভিযোগ তাঁর। তারা কোনো প্রকার সহযোগিতা করে না বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
করলা কিনতে গত শুক্রবার কুমিল্লা থেকে আসা সবজির পাইকার কামরুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এখানে প্রতি মণ করলা দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছে। আজ দাম অনেক কম, অতিরিক্ত পরিমাণে কিনেছি।
উপজেলা কৃষি অফিসের ব্লক সুপাভাইজার মেহেদী হাসানের তথ্যমতে, এ উপজেলায় দেড় শতাধিক কৃষক করলার চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে ১৫ হেক্টর জমিতে করলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয় ১০ হেক্টরে। ফুল ও ফলের ওপর নির্ভর করে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭০ টন। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী করলা বিক্রি করলে কমপক্ষে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মল্লিকা রানী সেহানবীশ বলেন, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। সবজির দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়টি কৃষি বিভাগ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। পাশাপাশি কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


