আসিয়ানে সামর্থ্যের প্রতিশ্রুতি

এতদিন ফিফার টুর্নামেন্ট বলতে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কপালে জুটত স্রেফ বিশ্বকাপের সেই অন্তহীন, ধূসর বাছাই পর্বের শুরুর দিককার কিছু ম্যাচ। যেখানে মূল পর্বের আলো অধরাই থেকে যেত, আর টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যেত শুরুর বাঁশি বাজার অনেক আগেই। কিন্তু এবার গল্পটা আলাদা, প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ নতুন। বাংলাদেশ জাতীয় দল সরাসরি পা রাখছে ফিফার একটি মূল টুর্নামেন্টে ‘ফিফা আসিয়ান কাপ’-এর রাজকীয় আঙিনায়। যেখানে ইন্দোনেশিয়ার জার্কাতায় বাংলাদেশের (১৮১ র‍্যাঙ্কিং) প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া (১৩৬ র‍্যাঙ্কিং)। হামজা-শমিতদের জন্য এটা নিছক কোনো ম্যাচ খেলতে নামা নয়, ফুটবলের বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজের এক নতুন আত্মপরিচয় লেখার ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু তাদের কোচ থমাস ডুলি কেন জানি এই টুর্নামেন্টকে শুধুই ‘শিক্ষা সফর’ হিসেবেই মূল্যায়ন করতে চাইছেন।

আসিয়ানের মঞ্চে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি যেখানে কোচের মগজে স্রেফ একটি ড্রয়ের নিরাপদ বৃত্তে বন্দি, সেখানে তাঁর পদাতিক সৈন্যরা কিন্তু বুক চিতিয়ে গ্রুপ পর্ব টপকানোর স্বপ্ন দেখছে। ড্রেসিংরুমে চলছে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে ৯ জন প্রবাসী ফুটবলারের রক্তে টগবগ করতে থাকা ইউরোপীয় পেশাদারিত্বের বারুদ, যার প্রতিচ্ছবি হামজা চৌধুরীর হুঙ্কার, ‘আমরা এখানে কাউকে ভয় পেতে আসিনি।’ আর ঠিক তার উল্টো পিঠেই দাঁড়িয়ে থমাস ডুলি!  জাকার্তার ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও একই বাস্তবতার ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে গেলেন কোচ। ‘মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটি যদি আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে পারি, সুযোগ তৈরি করতে পারি, অন্তত একটি গোল করে ড্র করতে পারি, তবে সেটি অসাধারণ হবে। আর যদি জিতে যাই, তাহলে তো কথাই নেই। স্বপ্ন দেখার অধিকার তো সবারই আছে।’ আসলে আসিয়ানের মঞ্চটিকে ডুলি নভেম্বরে সাফের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন। ‘আমাদের ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্ট সাফ। তাই এই টুর্নামেন্ট এবং আগামী নভেম্বরে হতে যাওয়া সাফের জন্য এটি চমৎকার প্রস্তুতি।’

কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত ২১১ নম্বর ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের দল সান ম্যারিনোর বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলিয়ে জয় পেয়েছেন ডুলি। তাই এখন আসিয়ানের তিন প্রতিপক্ষ র‍্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর আর ইন্দোনেশিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জটা কঠিন শুধু নয় ‘অসম্ভব’ মনে করছেন ডুলি।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলে আজকের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া কিন্তু তাদের গত পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই হেরেছে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন আর থাইল্যান্ডের কাছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে হারিয়েছে সান ম্যারিনো আর ভারতকে। তবে প্রস্তুতির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে বাংলাদেশের। হামজা যেখানে গত তিন মাসে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, সেখানে মালয়েশিয়া গেল দুই মাসে খেলেছে পাঁচটি ম্যাচ। তার পরও বুক চওড়া করে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন হামজাদের মতো বিদেশি লিগে খেলা বাংলাদেশিরা। তাদের কাছে ফিফার চেয়ে আসিয়ান কাপের মতো মর্যাদার টুর্নামেন্ট খেলাটা অনেক বেশি প্রেরণার। ডুলির এই অতি-সাবধানী ‘ড্র’ সমীকরণের আড়ালে বাংলাদেশ ফুটবলের আসল বারুদটা কিন্তু লুকিয়ে আছে স্কোয়াডের ভেতরেই। এবার লাল-সবুজের ডেরায় যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের রক্তের নতুন জোয়ার এসেছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আক্রমণভাগে যদি ফারহানের মতো গতিশীল আর চতুর উইঙ্গার থাকেন, যিনি ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের কোমর ভেঙে দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন, তবে বক্সে কামড় দেওয়ার জন্য আছেন শুকির মতো জাপানি বংশোদ্ভূত খাঁটি গোলশিকারি স্ট্রাইকার। শুধু কী আক্রমণভাগ? মাঝমাঠের সেই ইঞ্জিনরুমে হামজা চৌধুরী আর শমিতের সঙ্গে এসে যুক্ত হয়েছেন ফাহামিদুল– প্রবাসী ফুটবলের আরও এক নতুন কারিগর। আর রক্ষণদুর্গের দিকে তাকালে তো ভরসার চওড়া বুক! জায়ান আর তারিক কাজীর চেনা দেয়ালের পাশে এবার যোগ হয়েছে জিদান ইউসুফের মতো নিখুঁত ডিফেন্ডার। এই ৯ প্রবাসীর পায়ে ভর করে বাংলাদেশ আজ আর স্রেফ লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না, আসিয়ানের মঞ্চে যে কোনো পরাশক্তির ঘুম কেড়ে নেওয়ার এক বিস্ফোরক সম্ভাবনা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তাদের কোচ নিজেরই তাতে বিশ্বাস নেই!

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর