বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে নির্মাণ করা হবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তা দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতায় বড় সংযোজন হবে। ভূমিকা রাখবে জ্বালানি নিরাপত্তায়। এই প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ১৮ টাকা। এই ব্যয় সম্প্রতি অনুমোদন হওয়া ফেনীর সোনাগাজী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম। সোনাগাজীর প্রকল্পে বিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি দর ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৮৭ টাকা। নতুন প্রকল্পটি সে তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
‘কনস্ট্রাকশন অব ৪৪২ মেগাওয়াট সোলার ফটোভোল্টাইক গ্রিড কানেক্টেড পাওয়ার প্লান্ট অ্যাট ব্লক-বি রামপাল’ নামে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। আজ বুধবার অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন একনেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম দামে বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে গড় উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কমবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে গ্রাহকের বিল সহনীয় রাখা সহজ হতে পারে। প্রকল্পটির নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যায়ে বাগেরহাট, খুলনা ও আশপাশের এলাকায় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত এই কেন্দ্র সমপরিমাণ কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ কমাবে, ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুর মান ভালো থাকতে সহায়তা করবে। তবে সৌরবিদ্যুৎ কেবল দিনের বেলা পাওয়া যায়, আর রামপালের ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ১৭ শতাংশ। তাই সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে অন্যান্য উৎস বা ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবি)। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার ১২৭ কোটি টাকা আসবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল (পিডিএফ) থেকে। বাকি ৩৭৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বিউবো তার নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে।
জানা গেছে, শুরুতে আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগে (জেভি) প্রকল্পটি করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২১) বাতিল হওয়ার পর সরকার সেই পথ থেকে সরে আসে। এরপর গত বছরের মে মাসে সরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ গ্রিড-সংযুক্ত হবে এবং বিউবো একাই উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করবে।
কয়লার জন্য নেওয়া জমিতেই সৌরবিদ্যুৎ
২০১২ সালে রামপালে কয়লাভিত্তিক ও অন্যান্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর ‘ব্লক-বি’ অংশেই হবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই ব্লকের আয়তন ৯১৮ দশমিক ৫০ একর। গ্রিন বেল্ট, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, লেক ও নিচু জমি বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য ৬৮৫ একর চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা ব্লকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। জমি আগে থেকেই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দখলে থাকায় নতুন অধিগ্রহণ বা বড় ভূমি উন্নয়নের প্রয়োজন হবে না।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এতে অবকাঠামো ব্যয় কমেছে এবং বিদ্যুতের দাম কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশাল জমি লাগে বলে এ সুবিধা ব্যয়ের হিসাবে বড় ভূমিকা রাখছে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান (আইইপিএমপি) ২০২৩ অনুযায়ী, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২০৩০ সালে ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট এবং ২০৫০ সালে প্রায় ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান মেটানো জ্বালানি নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ। এ চাহিদা মেটাতে এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করেছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।


