‘বাবা, আমাদের যত কষ্টই হোক, তুমি চলে এসো। আট বছর তোমাকে দেখিনি।’ মেয়ের সেই আকুতি রেখেই দেশে ফেরার টিকিট কেটেছিলেন রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬)। কথা ছিল, ১০ আগস্ট দেশে ফিরবেন। কিন্তু তার এক দিন আগে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি। জীবিত অবস্থায় আর ফেরা হলো না। ১৯ দিন পর শুক্রবার লাশ হয়ে ফিরেছেন তিন মেয়ের বাবা শ্যামল।
তিন মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন শ্যামল। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে গেলেও দালালের প্রতারণায় কাজের বৈধতা পাননি। ফলে দীর্ঘ প্রবাসজীবনে একবারও দেশে ফিরতে পারেননি। পরিবারের জন্যও তেমন কিছু করতে পারেননি। সম্প্রতি মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। এরপর পরিবারের অনুরোধে দেশে স্থায়ীভাবে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। কেটে ফেলেন বিমানের টিকিটও।
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাঁদের একজন শ্যামল উদ্দিন। তিনি বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
শুক্রবার শ্যামলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা এসে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্বামীকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন রশিদা খাতুন (৪২)। একপর্যায়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললে স্বজনেরা পানি ছিটিয়ে তাঁকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।
সংজ্ঞা ফিরতেই বিলাপ করে রশিদা বলেন, ‘তুমার সঙ্গে হামার কথা হলো। তুমি বাড়িত আসবে বললে, আর রাতে তুমার মরার খবর পানু।’
তিনি জানান, মৃত্যুর দিন ৯ আগস্ট সকালে স্বামীর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। পরদিনই শ্যামলের দেশে ফেরার কথা ছিল।
বাবার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন বড় মেয়ে শামিমা (২৪)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবাকে বলেছিলাম, আমাদের যত কষ্টই হোক, তুমি চলে এসো। আট বছর তোমায় দেখিনি। তুমি চলে এসো বাবা। সেই বাবা টিকিট করেও জীবিত আসতে পারল না। আজ বাবা আমার লাশ হয়ে এসেছে।’
শ্যামলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার রাতটির কথা মনে করে তাঁর বড় মেয়ের জামাই মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার দিন রাতে শ্যামলের এক সহকর্মী মুঠোফোনে তাঁর মৃত্যুর খবর দেন।’
তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্যামলসহ অন্য শ্রমিকেরা কারখানায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁদের একজন চুল কাটাতে সেলুনে যাওয়ায় আগুন থেকে বেঁচে যান।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে শ্যামল সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দালালের প্রতারণার শিকার হন। কাজের বৈধতা না পাওয়ায় আট বছরে একবারও দেশে ফিরতে পারেননি। এবারই প্রথম পরিবারের কাছে স্থায়ীভাবে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার মাত্র এক দিন আগে অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মৃত্যু হলো।
তিনি আরও বলেন, শ্যামলের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। তাঁর মেজো মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছে।
প্রতিবেশী ও সাবেক ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, শ্যামল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, বাকি দুজন এখনো ছোট। শ্যামলের মৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।
শুক্রবার শ্যামল উদ্দিনের জানাজায় অংশ নেন বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ। তিনি পরিবারটির পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই লাশটি দেশে আনার ব্যবস্থা করেছি। পরবর্তীতেও পরিবারটির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’


