ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রেন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি। এতে একসময় নিজেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে। খবর রয়টার্স ও মিডল ইস্ট আইয়ের।
এদিকে, রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে প্রভাব পড়েছে। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ১০০টি ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ৪১টি এবং বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর হয়ে পরিচালিত ৫৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। এ কারণে এসব ফ্লাইটের ১৫ হাজার ৩৯৩ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সমকাল প্রতিবেদক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি এবং সৌদিয়া এয়ারলাইন্স ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি করে ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, সালাম এয়ারের সাতটি, কাতার এয়ারওয়েজের সাতটি, ফ্লাই দুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার দুটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে।
ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন, বিলম্ব ও যাত্রা বাতিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসী, ছুটি শেষে সৌদি আরবে যেতে চাওয়া যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ অবস্থায় যাত্রীদের বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা ও নতুন সময়সূচি নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এয়ারলাইন্সগুলো টিকিট থাকা সাপেক্ষে রিয়াদ ও দাম্মামের যাত্রীদের মদিনা ও জেদ্দায় নিয়ে যাচ্ছে। বিমানের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভিসার মেয়াদ যাদের শেষের দিকে, তেমন যাত্রীদের বিনামূল্যে টিকিট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে হুতিদের হামলা
ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও অন্যান্য তেল স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী। জোটটি সানায় ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির তেল ডিপোসহ হুতি নিয়ন্ত্রিত একাধিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। এ হামলার পর গতকাল হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোয় হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
তেল জায়ান্ট সৌদি আরামকোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানের প্রধান কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার রাতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। একাধিক তলায় ছড়িয়ে পড়া এই আগুনে কার্যালয়টি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, আগুনে ক্ষতি সীমিত ছিল এবং কর্মীরা বাসা থেকে কাজ করছে।
তেল স্থাপনা ছাড়াও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে চারবার হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এর মধ্যে শনিবারের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন, যা গত এক দশকের মধ্যে সৌদিতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।
সৌদির প্রতিরক্ষা বিভাগ গতকালও রিয়াদমুখী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করে। আকাশে বিকট শব্দের পর রিয়াদে সাময়িক বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
‘রিয়াদ আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না’
এতদিন ধরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও রিয়াদ নিজেকে এক নিরাপদ ও শান্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা সেই নিরাপত্তার মিথকে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সৌদিতে বসবাসরত প্রবাসীরা এখন চরম আতঙ্কে আছেন। রিয়াদে সাত বছর ধরে থাকা ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ‘ওমরাহ বা হজ করতে আসা যাত্রীদের কখনও এভাবে জীবনের ঝুঁকিতে পড়া উচিত নয়। পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি ঘটে, তবে আমি আমার পরিবারকে দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হব।’
দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদে থাকা আরেকজন বিদেশি নাগরিক মোহাম্মদ বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে বিমানবন্দর রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাতে প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন। সত্যি বলতে, রিয়াদ আর আগের মতো নিরাপদ মনে হচ্ছে না।’
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশকে শুধু তেলের ওপর নির্ভর না রেখে পর্যটন, বিনোদন ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এই সংঘাত তাঁর ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা সরাসরি ধাক্কা দিয়েছে। চলতি মাসে দেশটিতে ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তার আগেই এমন হামলায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
ইয়েমেনে মানবিক বিপর্যয়
চলমান যুদ্ধে ইয়েমেনের ভেতরের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। দেশটিতে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালগুলো আহত লাশের চাপে পিষ্ট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, মারিব, তাইজ ও লোহিত সাগর উপকূলীয় ফ্রন্টলাইনের হাসপাতালগুলোয় শুধু এক সপ্তাহেই সাত শতাধিক রক্তাক্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। পর্যাপ্ত অক্সিজেন, অ্যানেসথেশিয়া ও সার্জিক্যাল উপকরণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, হুতিরা তাইজ শহর অবরুদ্ধ করে ফেলায় প্রায় আট লাখ মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ সহায়তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।


