আইইডিসিআরের পর্যালোচনা ডেঙ্গুতে ৬২% মৃত্যু শক সিনড্রোমে

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। বছরের শুরু থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুও বাড়ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মৃত্যুই শক সিনড্রোমে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩০৭ জন। এর মধ্যে আইইডিসিআর ১১৯ জন মৃতের তথ্য পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। অধিকাংশ রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ই ছিলেন সংকটাপন্ন অবস্থায়। সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া, বিপৎসংকেত উপেক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের মতো বিষয়গুলো মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই হাজার ১৬৭ জন। এ নিয়ে এ বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ এক হাজার ৪৪২। সব শেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও চারজন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৯৫ হাজার ৩৩১ জন।

আইইডিসিআরের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃতদের ৭৮ শতাংশের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় শকের লক্ষণ ছিল। ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ১৬ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণসহ ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য কারণের উল্লেখ রয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে।

পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, যেসব রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার সময় সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের ৬৮ শতাংশ উপসর্গ শুরুর তিন দিনের বেশি সময় পর চিকিৎসা নিতে গেছেন। ৬৬ শতাংশ রোগী গুরুতর জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ৩৫ শতাংশ রোগী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছিলেন। আর হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন ৩৮ শতাংশ রোগী।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেঙ্গু রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। যখন হাসপাতালে আসছেন তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যাচ্ছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগী হাসপাতালে না এসে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছেন। অনেকে ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করার উপসর্গ বুঝতে পারেননি। উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পরও রোগীদের বড় একটি অংশ হাসপাতালে আসতে দেরি করেছেন।

মৃত রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি। মৃত ১১৯ জনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ছিলেন ২৫ জন। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২০ জন এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ছিলেন আরও ২০ জন। অর্থাৎ এই তিন বয়সসীমা মিলিয়ে মারা গেছেন ৬৫ জন, যা পর্যালোচনা করা মৃত্যুর প্রায় ৫৫ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক তথ্য পাওয়া ১১৭ জনের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। আর বসবাসের স্থান সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া ৮৯ জনের মধ্যে ৫৫ শতাংশ ছিলেন গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।

গুরুতর অসুস্থ ১০৩ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৭২ জনের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। অর্থাৎ তথ্য পাওয়া রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশের আইসিইউ সেবা দরকার হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় অধিকাংশ রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকার বিষয়টিও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বরং জ্বর কমার সময়েই রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রভাবে রক্তনালি থেকে রক্তরস বা প্লাজমা বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমতে পারে। এতে রক্তনালিতে রক্তের পরিমাণ কমে গিয়ে শক তৈরি হতে পারে।

ড্রিমার্স কনসালটেশন অ্যান্ড রিসার্চের পরিচালক মেডিকেল সার্ভিসেস (ডিএমএস) ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, শক সিনড্রোমে রক্তনালিতে রক্তের পরিমাণ কমে যায়। এ অবস্থায় নাড়ির স্পন্দন পাওয়া কঠিন হয়, রক্তচাপ নির্ণয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, জ্বর ভালো হওয়ার পরও কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অসুস্থ বোধ করলে, তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলে, অজ্ঞান হয়ে গেলে কিংবা নাড়ির স্পন্দন অনুভব করা না গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুনের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কেউ মারা যাননি। মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন মারা যান। সেপ্টেম্বরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে। গতকাল পর্যন্ত চলতি অক্টোবরে মারা গেছেন ৬২ জন।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে দুই হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার ৭৭৪। অক্টোবরে গতকাল পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২১ হাজার ৮২২ জন।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৮৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৩৬ জন এবং দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ৬৩, চট্টগ্রামে ২৭, বরিশালে ২৬, ময়মনসিংহে ২৩, রাজশাহীতে ২২, রংপুরে ছয় ও সিলেটে তিনজন মারা গেছেন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর