নদীতে গেছে ভিটা, দাদনে শৈশব

চৌদ্দ বছরের শরিফ (ছদ্মনাম)। তার বাড়ি ছিল শরীয়তপুরের জাজিরায়। গত বছর পদ্মার ভাঙনে তা বিলীন হয়ে গেছে। কৃষক বাবা এখন হোটেলে কাজ করেন, মা অন্যের বাসায়। সে নিজে টঙ্গীর এক প্লাস্টিক কারখানায় দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে। তার ছয় মাসের শ্রম ৪০ হাজার টাকায় আগাম কিনে নিয়েছে কারখানা।

সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে পরিবারটির সঙ্গে কথা হয়। শরিফের বাবা বলেন, ‘এক রাইতেই তো হগল শ্যাষ। আমাগো গেরামের বেবাক মানুষ ঢাহায় গ্যাছে কাম করতে।’ ছেলের সম্পর্কে বলেন, ‘হ্যার মেলা কষ্ট অয়।’

টাঙ্গাইলের মধুপুরের এক ইটভাটায় তেরো বছরের সেলিমের (ছদ্মনাম) ছয় মাসের শ্রমের দাম উঠেছে ৩০ হাজার টাকা। কাজ সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা। বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। ভাটায় আসার আগে সেলিম পড়ত ষষ্ঠ শ্রেণিতে।

ভাটা থেকে আগাম টাকা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সেলিম বলে, ‘আমি যদি পলায়ে যাই, ওরা আমারে ধইরে আনবেনে। নালি আমার মার কাছতে টাকা আদায় কইরে নেবেনে।’
জলবায়ুর বিপর্যয়ের কারণে শরিফ, সেলিমের মতো অনেক শিশু শ্রমে যুক্ত হয়েছে। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ বলছে, শিশুশ্রমে আছে প্রায় ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু, এর ১০ লাখ ৬৮ হাজারই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এক দশকে সংখ্যাটা সাড়ে ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর ইউনিসেফের সাম্প্রতিক হিসাবে দেশের প্রায় ৫ কোটি ৮৮ লাখ শিশু অন্তত একটি জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে বড় হচ্ছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, জলবায়ুর আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে জীবিকায়, আর তাতে সবার আগে বিঘ্নিত হয় লেখাপড়া। তাঁর ভাষায়, ‘পেটে ভাত না থাকলে তো কাজ করতেই হবে, তখন স্কুলে যাওয়ার সময় কোথায়!’

ইটের ভাটায় শিশুর সারি
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জামালপুর, মধুপুর ও ধনবাড়ীর পাঁচটি ইটভাটা ঘুরে দেখা যায়, শ্রমিকের ভিড়ে একদল শিশু, বয়স ৭ থেকে ১৬। কেউ এসেছে মা-বাবার সঙ্গে, কেউ সরদারের হাত
ধরে। অনেকেরই বাড়ি নদীভাঙন বা উপকূলের কোনো গ্রামে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ধনবাড়ীর এক ভাটামালিক বলেন, প্রায় সব ভাটাতে শিশু-কিশোরেরা কাজ করে। উপকূল আর নদীভাঙন এলাকার অনেকে পরিবার নিয়ে আসেন, পুরো মৌসুম সবাই মিলে খাটেন। শিশুদের অল্প মজুরিতে পাওয়া যায় বলে মালিকেরাও মানা করেন না।

দাদনের বেড়াজাল
মৌসুম শুরুর আগে সরদারের হাত দিয়ে পরিবারের কাছে অগ্রিম টাকা যায়। এর বিনিময়ে ছয় মাসের জন্য ভাটায় কাজে যুক্ত হয় শিশু। এ ব্যবস্থার নাম দাদন। দেনা থেকে গেলে পরের বছর আবার সেই ভাটায় কাজ করতে হয়। এ লেনদেন লেখা থাকে সরদারের খাতায়। এক ভাটার সরদারের খাতায় ২০ কিশোর-কিশোরীর নাম দেখেছেন এ প্রতিবেদক।
আরেক ভাটায় ঝোপ পরিষ্কার করছিল ১৭ বছরের আরমান (ছদ্মনাম)। বাড়ি খুলনার কয়রায়, আইলায় বিধ্বস্ত উপকূলে। তার এটা পঞ্চম মৌসুম। সে জানায়, আগে খুব কান্না পেত। এখন আর পায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, বাস্তুচ্যুতিতে শিশু-কিশোরেরা মর্যাদা, পড়াশোনা, সচ্ছলতা, এমনকি মা-বাবার সঙ্গে কাটানো সময়টুকুও হারায়। সব হারানোর এই ট্রমা থেকে মাদক বা অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

মেয়ের বেলায় হিসাব আলাদা
সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে ঢাকার বছিলা ও কোম্পানিঘাটের কয়েকটি কারখানায় দশ বছরের কম বয়সী বহু ছেলেমেয়েকে কাজ করতে দেখা গেছে। তাদের একজন ৯ বছরের সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনিতে। গত বছরের শেষ দিকে ঢাকায় আসার পর সে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে। তার মা জানান, কারখানার লোকজন অগ্রিম দিয়েছে ১০ হাজার টাকা। মাসে দেওয়ার কথা তিন হাজার টাকা।

স্কুলে ফিরতে চায় কিনা জানতে চাইলে সুমাইয়া মাথা নেড়ে বলে, ‘পাল্লি এহনি চইলে যাতাম।’
সুমাইয়াদের কারখানার কাছাকাছি একটি কাগজের প্যাকেট তৈরির কারখানায় কাজ করে ১৫ বছরের শিউলি (ছদ্মনাম)। বাড়ি ছিল মুন্সীগঞ্জের নদীতীরের এক গ্রামে। গত বছর তার বিয়ের আয়োজন হয়। সে পালিয়ে আসে খালার কাছে। শিউলি বলে, ‘এইহানে দম বন্ধ লাগে। তয় এইডাই আমার বাঁচনের পথ। আমি জানি, এই বয়সে বিয়া করলে জীবন শ্যাষ। আমার বান্ধবীরা হগলতে দুই-একটা পোলাপানের মা।’ ভালো কাজ পেলে সে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার পড়তে চায়।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রথম আঘাতটাই আসে মেয়েদের ওপর।’ পড়ার বেলায় পরিবার ছেলেকে আগে রাখে। ভাঙনে স্কুল হারালে দূরের স্কুলে যাওয়া মেয়েদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) গবেষণায় উপকূলের কিছু এলাকায় দুর্যোগের পর বাল্যবিবাহ ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। অথচ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ঠেকানো বাল্যবিবাহের সংখ্যা ২০২৩ সালের ১ হাজার ৮৪৬ থেকে ২০২৫ সালে নেমেছে ৯৬৮-তে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩৪ ধারায় ১৪ বছরের কম বয়সী কাউকে কাজে নেওয়া নিষিদ্ধ। ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগানো যায় না, কারখানায় দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি খাটানোও যায় না। ইট তৈরি ও বহন ২০২২ সাল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায়। ৩৫ ধারা বলছে, শিশুকে কাজে দেওয়ার অনুমতি দিয়ে মা-বাবা কারও সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন না।
তবু শরিফ-সেলিমদের মতো শিশুরা কাজে আছে, চুক্তিও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে শ্রম পরিদর্শক মাত্র ৪৪২ জন। শাস্তিও সামান্য। আইনের ২৮৪ ধারায় শিশু বা কিশোরকে বেআইনিভাবে কাজে লাগানোর দণ্ড ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন না দেখে তাদের সদস্য কোনো কারখানায় চাকরি দেওয়া হয় না, সেখানে শিশুশ্রম নেই।’ বিজিএমইএও একই কথা জানিয়েছে।

যা করা দরকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুম শুরুর আগেই ভাটায় পরিদর্শন করা দরকার। দাদনে শিশু নিয়োগের জন্য মালিক ও সরদারের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নদীভাঙন আর লবণাক্ত এলাকার পরিবারে দুর্যোগের পরপরই নগদ সহায়তা পৌঁছাতে হবে, যার শর্ত হবে ছেলেমেয়ের স্কুলে থাকা। বাস্তুচ্যুত শিশু যেন কাগজ ছাড়াই শহরের স্কুলে ভর্তি হতে পারে। আর জলবায়ু বরাদ্দে শিশুর হিস্যা আলাদা করে দেখাতে হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর