গ্যাস সংকট সময়মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না, রপ্তানি আদেশ কমছে এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ থাকার তথ্য দিলেন বিকেএমইএ সভাপতি

0
2

গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইন্টারলুক বিডি কারখানায় ইউরোপের কয়েকটি ব্র্যান্ডের পোশাক উৎপাদন হয়। গ্যাস সংকটে গত দুই সপ্তাহ তারা অন্তত পাঁচ দিন কারখানা বন্ধ রেখেছে। খোলা থাকার সময়ে কোনো দিনই পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজ করা সম্ভব হয়নি। গড়ে ৬০ শতাংশের মতো উৎপাদন কম হচ্ছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ২টায় সরেজমিন কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ দেখা যায়।

ইন্টারলুক বিডি কারখানার হেড অব অপারেশন্স কেফায়েত উল্লাহ শাকিল সমকালকে বলেন, লাইনে গ্যাস না পাওয়ায় সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে বেশি ব্যয়ে বিকল্প উপায়ে কোনো রকমে সক্ষমতা থেকে ৩০ শতাংশ কম উৎপাদন নিয়ে চলছিল। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ কোনো উৎস থেকেই গ্যাস পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, উৎপাদন কাঠামো চেইনভিত্তিক। কোনো পর্যায়ে কাজ বন্ধ থাকলে বাকি কাজ আর এগিয়ে নেওয়া যায় না। এ কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত এক মাসে অন্তত পাঁচবার আকাশপথে পণ্য পৌঁছাতে হয়েছে তাদের। এর অর্থ কেবল আর্থিক লোকসান নয়; একই সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা হারানো। যার কারণে আগামীতে রপ্তানি আদেশ আরও কমবে।

নারায়ণগঞ্জের এ বি ফ্যাশন কারখানায় ফ্রান্সের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের এক লাখ পিস ট্রাউজারের রপ্তানি আদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। গত সোমবার তারা ক্রেতাকে জানিয়েছে, ৫০ হাজার পিসের বেশি উৎপাদনের সক্ষমতা নেই।

তীব্র গ্যাস সংকটে এমন বিপদে পড়েছে দেশের বেশির ভাগ তৈরি পোশাক কারখানা। অনেক কারখানা ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। কৌশল হিসেবে চার থেকে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে কিছু কারখানা। গতকাল ৫ আগস্টের ছুটির সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের ছুটি দিয়েছে কোনো কোনো কারখানা। আগামীকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। বৃহস্পতিবারের ছুটি পরে সমন্বয় করে নেবেন তারা। আবার কোনো কোনো কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণার কথাও জানা গেছে।

জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) গাজী জসীম উদ্দিন গতকাল সমকালকে বলেন, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় অনেক কারখানাই দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারে না। অথচ শ্রমিকদের দিনের মজুরি থাকে। এ কারণে কিছু কারখানা সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে এই সময়টায় ছুটি ঘোষণা করেছে। এতে শ্রমিকরাও খুশি। তারা ছুটি ভোগ করছে। অবশ্য, যাদের শিপমেন্টের চাপ আছে, আবার গ্যাসের জন্য খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে না; এ রকম কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে, বৃহস্পতিবার বন্ধ রাখতে হলে তারা এই দিনের মজুরি দেবে না। এসব কারখানা গতকাল খোলা ছিল। আজ বৃহস্পতিবারও খোলা আছে।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কিছু কারখানা আকাশপথে পণ্য পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছে। এ রকম বাস্তবতায় গত এক মাসে রপ্তানি আদেশ কমেছে আগের মাসের চেয়ে ৩ শতাংশ। আগামীতে রপ্তানি আদেশ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত।

তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর মিলে অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ। সরবরাহ লাইনে গ্যাস নেই। ফলে দিন-রাত সমান। লাইনে গ্যাস না থাকলে রাতে গ্যাস আসার সুযোগ নেই।

গ্যাসের কারণে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে পোশাকের নিট খাতে। নিট কারখানার প্রায় শতভাগ ফেব্রিক্স বা কাপড় স্থানীয় বস্ত্রকল থেকে সংগ্রহ করা হয়। ওভেন (শার্ট, প্যান্ট) খাতের প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্সের মধ্যে আমদানি হয় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। পোশাক খাতের মূল সংকট তৈরি হয়েছে বস্ত্রকল থেকে তৈরি পোশাকের প্রধান কাঁচামাল ফেব্রিক্স না পাওয়ার কারণে।

বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে করা চুক্তির নির্ধারিত তারিখে পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পারলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হতে পারে। ক্রেতারা আগামীর জন্য আস্থা হারাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় এলে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হলেও চুক্তি থেকে কম দর দেবে ক্রেতারা। নয় তো আকাশপথে রপ্তানিকারকের দায়িত্বে পণ্য পৌঁছাতে হবে। বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান হবে। ক্রেতারা পোশাক না নিলে স্টকলট হিসেবে অত্যন্ত কম দামে স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি করে দিতে হয়।

দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বস্ত্রকলগুলো সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করতে পারছে না। ডায়িং, ফিনিশিংও বন্ধ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গতকাল সমকালকে বলেন, শিল্পে গ্যাস সংকট একটা জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। সরকারকে এই মুহূর্তে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা উচিত।

বিটিএমএ সভাপতি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বস্ত্র কিংবা তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতের শিল্পসহ ব্যাংক-বীমা খাতও চরম সংকটে পড়বে। এমন একটা কঠিন পরিস্থিতির শঙ্কা তারা আগেই করেছিলেন। এ জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই সরকার তাদের কথা শোনার জন্য সময় পর্যন্ত দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার শিল্পের গ্যাস দিয়ে সার উৎপাদন করেছে, যে সার আমদানি করা যেত।

তিনি জানান, গ্যাসের অভাবে স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গত বছর শুধু ভারত থেকেই ৩০ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি করতে হয়েছে। গত দুই বছর ১৫০ বস্ত্রকল বন্ধ হয়েছে। বাকিগুলোর উৎপাদন ৬০ শতাংশের নিচে। অথচ দেশের সুতা ব্যবহার হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন হতো। কর্মসংস্থান হতো। অথচ ভুল নীতির কারণে এখন আমরা একটা আমদানিনির্ভর দেশে পরিণত হচ্ছি। শুধু সুতা-কাপড় নয়; আমাদের হয়তো রুটি-কলাও একদিন আমদানি করে খেতে হবে।

পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ব্র্যান্ড-ক্রেতারা। কোনো কোনো ক্রেতা প্রতিনিধি রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে রপ্তানি আদেশ কমেছে ৩ শতাংশ। রপ্তানি আদেশ পরিস্থিতি বোঝা যায় আদেশ পাওয়ার পর কাঁচামাল আমদানির অনুমতি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সনদ থেকে। সরকারের পক্ষে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ এই সনদ দিয়ে থাকে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে জানান, রপ্তানিতে চলমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। অবশ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা কাটিয়ে ওঠা গেলে আগামী মাসগুলোতে উদ্যোক্তা এবং ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে।

বিজিএমইএ গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পোশাকশিল্প যখন নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি; যার মধ্যে রয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা; সেই সময়ে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ৩৮৯ কোটি ডলার রপ্তানি আয় একটি ভালো শুরু। তবে জুলাই মাসে বিজিএমইএ সম্পাদিত ইউডির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিতে চলমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা দূর করতে পারলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা পেলে আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরে আসবে বলে মনে করছে বিজিএমইএ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here