বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে কূটনৈতিক আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুয়েক দিনের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই আশাবাদ জানান। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারও আলোচনায় অগ্রগ্রতির কথা জানিয়েছে। খবর সিএনএন ও আলজাজিরার।
সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, আমরা ইরানিদের সঙ্গে কথা বলছি। আমার মনে হয় আজ বা কালকের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়া এবং এই সংঘাতকে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে আসার বিষয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি হলে প্রণালিতে সাধারণ জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।
সমুদ্রপথে ইরানের কোনো টোল বা ফি আদায়ের সুযোগ থাকবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই চুক্তির মূল ভিত্তিই হবে অবাধ চলাচল। গত কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতি কিছুটা অস্থির থাকলেও ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক চেষ্টা পূর্ণগতিতে চলছে এবং এই আলোচনা বর্তমানে খুবই অগ্রগামী পর্যায়ে রয়েছে। কাতার, পাকিস্তান ও ওমান দুপক্ষের মধ্যস্থতা করছে এবং চুক্তির খসড়া আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে।
ওমানের সঙ্গে ইরানের পৃথক পথ তৈরির আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতার কথা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ইরান জানিয়েছে, তারা কেবল পার্শ্ববর্তী দেশ ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করছে। ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্য সাইদ আজোরলু জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো এক থেকে তিন মাসের জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ইরান দাবি করছে, এই এলাকায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সেবা তারা দিয়ে থাকে।
জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, যে কোনো দেশের জাহাজের জন্য মুক্ত চলাচলের অধিকার থাকলেও ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরুর পর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান।
বিশ্ব তেল সরবরাহে ধস ও জাহাজে নতুন হামলা
যুদ্ধ এবং প্রণালি বন্ধ থাকার মাশুল গুনছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২৬০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ব বাজারে যেতে পারেনি। বর্তমানে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন আগের তুলনায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
কূটনৈতিক এই দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। হামলায় জাহাজের ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং একজন প্রকৌশলী নিখোঁজ রয়েছেন।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তেহরানের নেতৃত্বকে ‘নজিরবিহীন প্রতারক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, পাঁচ মাসের এই সংঘাত বন্ধ করে একটি ভালো সমঝোতা চুক্তিতে সই করার জন্য এটাই ইরানের জন্য ‘শেষ সুযোগ’।
তবে ট্রাম্প এটাও বলেছেন, এই আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর ওপর সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, তিনি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না।
অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই ওয়াশিংটনকে পাল্টা সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানি বন্দরে অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে মার্কিন বাহিনী ও যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যাপক ঝুঁকি এবং বড় ধরনের প্রাণহানির মুখে পড়বে।
এদিকে, কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় ইউক্রেনের তিনটি সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানোর জন্য ইরান প্রস্তুত ছিল বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান মহসেন রেজাই। তবে কিয়েভ এই ঘটনাকে ভুলবশত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করায় ইরান সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত রেখেছে।



