চলে গেলেন অর্পিতা, বাঁচল না গর্ভের সন্তানও

বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মিঠুন চৌধুরী ও অর্পিতা দাশের সংসারে আসার কথা ছিল নতুন অতিথি। সন্তানকে ঘিরে তাদের ছিল নানা আয়োজন। স্ত্রীকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন মিঠুন। দুই পরিবারে ছিল আনন্দের বন্যা। কিন্তু ডেঙ্গু কেড়ে নিল তাদের স্বপ্ন। আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান অর্পিতা। মৃত্যুর পর তাঁর পেট থেকে মৃত ছেলেসন্তান প্রসব করা হয়।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল অর্পিতার ২৬তম জন্মদিন। সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১২ অক্টোবর। তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন মিঠুন।

চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটার আশরাফ আলী রোডের আর সি সার্চ এলাকায় অর্পিতাদের বাড়ি। স্বজন ও প্রতিবেশী কেউ মেনে নিতে পারছেন না এমন মৃত্যু। সানরাইজ গ্রামার স্কুলের পাথরঘাটা শাখার ইউনিট-৪-এর সহকারী শিক্ষক ছিলেন অর্পিতা। গত বছরের ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত মিঠুন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।  ৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বর আসে অর্পিতার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরদিন তাঁকে নগরীর আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর নেওয়া হয় এইচডিইউতে। দ্রুত কমতে থাকে প্লাটিলেট। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্লাটিলেট দেওয়া হয়। আরও রক্তের প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসকদের এমন পরামর্শে মিঠুন পরিচিত কয়েকজনকে রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন।

হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, অর্পিতার মৃত্যু হয়েছে ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে’। ডেঙ্গুর এটি অত্যন্ত জটিল, বিরল ও জীবনঘাতী পর্যায়।
অর্পিতার মা দিপালী দাশ বড় মেয়েকে হারিয়ে প্রায় অচেতন। দুই মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে ভারতে হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচারের সময় মারা যান অর্পিতার বাবা।

সংক্রমণ ছাড়াল ৫০ হাজার
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০ হাজার ২৭৬ জন। গত বছর অক্টোবর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল। এবার এক মাস আগেই এই সংখ্যা অতিক্রম করল। এদিকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা ১৪৩। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ড থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুনের পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। আগস্টে দেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৪৩ জন। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১২ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৩০ জন এবং মারা গেছেন ৪৬ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি  বেশ নাজুক হতে পারে। চলতি মাসের শুরু থেকেই হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একই দিনে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায়।

পুরুষের চেয়ে নারী মৃত্যু বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই পুরুষ। তাদের একজনের বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং অন্যজনের বয়স ৫৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ১৪৩ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাসপাতালে ৪৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালে ১৮ জন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ২৫, ময়মনসিংহে ১৪, বরিশালে ১২, চট্টগ্রামে ১০, রাজশাহীতে ছয় এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৫০ হাজার ২৭৬ জনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৬ হাজার ৬৯৯ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। মাসভিত্তিক হিসাবে, জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে দুই হাজার ৯০৭ এবং জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৩৬। চলতি সেপ্টেম্বরের ১২ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৩০ জন। এতে চলতি মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ঝুঁকি

২০০০ সালে দেশে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সময় রোগটি মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহিত এ রোগ। গত বছর থেকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটেছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী। এসব এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার এবং আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখার আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। গতকাল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পাড়াগাঁও ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে এবং রূপগঞ্জ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এ ক্যাম্প হয়।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যকর্মী বরখাস্ত
দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রথম দিনে গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ধানমন্ডির রাপা প্লাজা কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। রাপা প্লাজার পার্কিং জোনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় ডিএসসিসির স্বাস্থ্যকর্মী সুশীল চন্দ্র রবিদাসকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও জেলার প্রতিনিধিরা)

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর