দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ভারতকে তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার যে কোনো সমস্যা সমাধানে সংলাপ এবং গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছে ভারত। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে তাঁর দপ্তরে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে দুই পক্ষ আলাদাভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছে। তাতে প্রতিবেশী দুই দেশের এমন মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
আপত্তি জানানোর পরও ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ায় আবারও ক্ষোভ জানিয়েছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত শেখ হাসিনার দ্রুত প্রত্যর্পণ চেয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে ভারতে গ্রেপ্তার শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে অগ্রগতির আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিশ্চিত নয় বলেও বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ভারতের হাইকমিশনারকে অস্বস্তি তৈরির কারণগুলো বন্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সহায়ক পরিবেশ দরকার, তা সৃষ্টির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করতে দিল্লিকে অনুরোধ করেছে ঢাকা। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছে।
হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের ভারতে ধরা পড়ার কথা উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, ‘ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল সবকিছু তাদের দিয়েছি। আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আমরা বলেছি অভিযুক্তদের যত দ্রুত আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।’
সাক্ষাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন নিয়ে আলোচনা প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এগুলো নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার বিষয় নয়। ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে ভারতকে চিঠি পাঠিয়ে অসন্তোষ জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লির দূতের সাক্ষাতে তা এসেছে কিনা– এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। ভারত গত রোববারই তা জানিয়েছে। আজকেও (সোমবার) তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছে।’
ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কিনা– এমন প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, এখানে দুঃখ প্রকাশের ব্যাপার নেই। রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে– নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগ। শেখ হাসিনা বিচার বিভাগ থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত। তিনি ৫ আগস্ট বাংলাদেশের বিচার বিভাগ তথা রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গতকালও (রোববার) বলেছি, রাষ্ট্রের কাঠামোর প্রতি সব দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক। আশা করব, বিষয়টি ভারত সরকার অনুধাবন করতে পারবে। ধারণা হচ্ছে, তারা এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। আশা করব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন (খাটো) করার কিছু তারা আর করবে না। তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে; আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত– এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিশ্চিত নয়
নয়াদিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া দুই দফা আমন্ত্রণ বাংলাদেশ কি গ্রহণ করবে– এ প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত আমি গণক নই। পরের জিনিসটা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে। এই পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করবেন। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিটা সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তিনি (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ একটা আছে।’
ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’
আলোচনাকে সমাধান বললেন ভারতের হাইকমিশনার
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার যে কোনো সমস্যা সমাধানে সংলাপ এবং গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের পর তিনি বলেন, ‘আমার পূর্ণ আস্থা আছে– দুই দেশ একসঙ্গে বসলে এমন কোনো সমস্যা নেই যা সমাধান করা যায় না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাধান খুঁজে বের করা, যা ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্য লাভজনক হয়।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে হাইকমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন বিনয়ী নেতা। তিনি জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শুধু একটি অভিন্ন সীমান্তই নয়’ আরও অনেক কিছু রয়েছে। আমরা শুধু সীমান্তই ভাগ করি না; আমরা স্বপ্নও ভাগ করি।’
হাইকমিশনার বলেন, দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মতপার্থক্য ও সমস্যা থাকাটা স্বাভাবিক। এ ধরনের মতপার্থক্যকে কূটনীতি বা সম্পর্কের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করা যেতে পারে।
হাইকমিশনার বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ‘ভালোবাসা, সম্মান ও স্নেহের’ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, অব্যাহত সংলাপ, সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশ তাদের অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস।
সম্পর্কের অবনতি যেখান থেকে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার, বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনে হামলা, দেশটির রাজনীতিকদের বাংলাদেশ বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য, সীমান্তে হত্যা, পুশব্যাকের মতো ঘটনায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিসা বন্ধ, সড়ক-রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। গত ডিসেম্বরে হত্যার শিকার হাদির খুনিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সম্পর্কের আরও অবনতি হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সরকার গঠনের পর ধারণা করা হচ্ছিল, সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া এবং সীমান্তে ভারতের পুশইন চেষ্টার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধি পাঠানো, তাঁকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানানো, ভিসা সেবা চালুর মতো পদক্ষেপে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে কিছু এগোলেও দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন আবার সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।




