Home Blog Page 7

মেসির নামে নতুন ফুল, পাপড়িতে আর্জেন্টিনার রং

০

ফুটবল মাঠে তার কীর্তি আগেই জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসে। এবার প্রকৃতির জগতেও অমর হয়ে থাকছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার প্রতি সম্মান জানিয়ে পেরুর বিজ্ঞানীরা আন্দিজ পর্বতমালায় আবিষ্কৃত একটি সুগন্ধি উদ্ভিদের নাম রেখেছেন ‘সালভিয়া মেসি’। ফুলটির নীল-সাদা পাপড়িতে যেন ফুটে উঠেছে মেসির দেশের পতাকা ও আর্জেন্টিনার জার্সির রং।

আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেরুর দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় এই উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। আন্দিজ পর্বতমালার পাথুরে ঢালে জন্মানো উদ্ভিদটি আগে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচিত ছিল না। গবেষণার পর নতুন প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা প্রকাশ করা হয়েছে।

‘সালভিয়া মেসি’ ল্যামিয়াসি পরিবারের একটি গুল্মজাতীয় সুগন্ধি উদ্ভিদ। এই পরিবারেই রয়েছে তুলসী, পুদিনা, রোজমেরি ও সেজের মতো পরিচিত গাছ। উদ্ভিদটির আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনায় যুক্ত ছিলেন পেরুর সান মার্কোস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের পল গঞ্জালেস, আর্জেন্টিনার স্বাধীন গবেষক রোলান্দো উরিয়া এবং পেরুর হুরারাঙ্গো নেচারের জ্যঁ কাপচা-রামোস। তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ফাইটোতাক্সা-তে।

মেসির নামে উদ্ভিদটির নামকরণের পেছনে ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন গবেষকেরা। মায়মোনাইডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ন্যাচারাল, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সায়েন্সেস এবং আজারা ফাউন্ডেশনের গবেষক ক্লদিও বের্তোনাত্তির মতে, বিজ্ঞানীরাও সমাজ ও মানুষের আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন নন। তার ভাষায়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানুষেরই সৃষ্টি। তাই মেসির মতো বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতে গবেষকদের ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা কাজের ক্ষেত্রের পার্থক্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

এমন ঘটনা অবশ্য মেসির ক্ষেত্রে নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন প্রাণী ও জীবের বৈজ্ঞানিক নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার নাম। আর্জেন্টিনার বারিতু জাতীয় উদ্যানে আবিষ্কৃত একটি ছত্রাকের নাম রাখা হয়েছে ‘সেরকোপেমসেস মেসি’। এ ছাড়া ‘আকান্থোগোনাটাস মেসি’ নামে একটি মাকড়সা, ‘লিওলায়েমুস মেসি’ নামে একটি টিকটিকি এবং ‘ভালচার মেসি’ নামে আন্দিজ অঞ্চলের একটি প্রাগৈতিহাসিক শকুনের নামকরণ করা হয়েছে। ‘ডিস্কনিস্কা মেসি’ নামেও পরিচিত একটি প্রাগৈতিহাসিক খোলসধারী প্রাণী।

দায়িত্ব নেওয়ার ৫ দিনেরও কম সময়ে পদ ছাড়ছেন কেটি জাকারিয়া

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটরির পদ ছাড়ছেন কেটি জাকারিয়া। দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তার অপ্রস্তুত উপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার জেরে শেষ পর্যন্ত তাকে সরে যেতে হচ্ছে। বিবিসি তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

শুক্রবার তার বিদায়ের খবর প্রকাশের কিছুক্ষণ আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তিনি বলেন, জাকারিয়াকে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যদি না চাও, তাহলে তোমাকে এই কাজ করতে হবে না।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি তোমার জায়গায় থাকলে বিষয়টি আরেকবার ভেবে দেখতাম।’

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন জাকারিয়া। সংবাদ সম্মেলনটি ১৫ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়। সেখানে সাংবাদিকদের মাত্র তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। এরপরের দিনগুলোতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কঠিন প্রশ্নের মুখে নিজের যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয় তাকে।

শুক্রবার মেরিন ওয়ানের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জাকারিয়ার বিদায়ের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, কেটি, এটা কি তোমার জন্য? কারণ, সত্যি বলতে, তোমার এই কাজ করার প্রয়োজন নেই।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তোমাকে এভাবে আচরণের শিকার হতে হবে না।’ সংবাদমাধ্যম জাকারিয়ার সঙ্গে বেশ খারাপ আচরণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর বিবিসি জানায়, জাকারিয়া পদ ছাড়ছেন।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। জাকারিয়ার আকস্মিক বিদায়কে রিপাবলিকানদের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউসের ব্যর্থতার ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরছেন ডেমোক্র্যাটরা।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা হাকিম জেফরিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি চলে যাচ্ছেন। মাগা উগ্রপন্থীরা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।’

মঙ্গলবার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জাকারিয়াকে নার্ভাস দেখা যায়। প্রায় ১৪ মিনিটের ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি নোটবুক থেকে লিখিত বক্তব্য পড়েন, অল্প কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং একপর্যায়ে নিজের স্বামীকে প্রেসিডেন্ট বলে উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক তার আইন পেশার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। ট্রাম্পসহ কয়েকজন তাকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকও হয়েছেন। সাংবাদিক জানতে চান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোন অঙ্গরাজ্যে আইনজীবী হিসেবে সনদ পাওয়ার পরীক্ষা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বার অ্যাসোসিয়েশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনুমোদন নিতে হয়।

জবাবে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি যখন চীনে ছিলাম।’

পরে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার জাকারিয়া স্বীকার করেন, তিনি বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চীনে যথাযথ যোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত আইনি কাজ করেছেন।

পুরো সপ্তাহজুড়েই তার আইন পেশার যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন আলোচনায় ছিল। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির সাক্ষাৎকারেও বিষয়টি উঠে আসে। জাকারিয়া বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কথা জানালে হ্যানিটি তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি সরাসরি কেন বলেননি, আমি কখনো আইন পেশায় কাজ করিনি?’

ওই সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া জানান, প্রথম সংবাদ সম্মেলনের এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর হ্যানিটি প্রশ্ন করেন, তিনি কি বলতে চাইছেন যে কর্মীদের তাকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করা উচিত ছিল?

শুক্রবার ট্রাম্পের প্রায়ই দেখা অনুষ্ঠান ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস-এও একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েন জাকারিয়া। তিনি বলেন, নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার বিষয়টি তিনি ট্রাম্পকে আলাদাভাবে জানাননি, কারণ তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। তার ভাষ্য, তাকে আইনি দায়িত্বের জন্য নয়, যোগাযোগসংক্রান্ত কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক লরেন্স জোনস তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার কি মনে হয়, প্রেসিডেন্টের আস্থা এখনো আপনার ওপর আছে?’ সরাসরি উত্তর না দিয়ে জাকারিয়া বলেন, ‘আমার আশা, আশপাশের সবার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারব।’

ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রেস টিমে জাকারিয়ার বিদায়ই সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক অ্যান্থনি স্কারামুচি মাত্র ১০ দিন দায়িত্ব পালনের পর পদ ছেড়েছিলেন।

রাশিয়ার ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানান, কংগ্রেসের পাস করা আইনের আওতায় রাশিয়ার ওপর প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক কার্যকর করা থেকে আপাতত বিরত থাকছেন। জাতীয় স্বার্থের জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয়।

প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের উদ্যোগে আনা আইনটিতে গত মাসে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। আইনটির আওতায় রাশিয়ার কর্মকর্তা ও ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্যাঙ্কারের গোপন বহরকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা ছিল। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।

তবে যেসব দেশ তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ১৫ শতাংশের কম রাশিয়া থেকে নেয় এবং আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প সেগুলো স্থগিত করেন।

গত মাসে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’-এর লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়ন কমাতে দেশটির আর্থিক প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।

ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন তিনি প্রকাশ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন। একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতির খবরও সামনে এসেছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল আসবে। এ ছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়া আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে।

এ ঘোষণার পর ছয়জন রিপাবলিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর ট্রাম্পের কাছে ডিজেল চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানান। তাদের আশঙ্কা, এ চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া নতুন করে অর্থ পাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেশটিকে সহায়তা করতে পারে।

মঙ্গলবার উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের একটি দল ট্রাম্পের কাছে চিঠি পাঠিয়ে গত মাসে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানায়। আইনটির আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করা হবে, নাকি অব্যাহতি দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য ট্রাম্পের হাতে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সময় ছিল। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন আইনপ্রণেতাদের কিছু জানায়নি।

ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির অর্থ হলো দেশটিতে আবারও অর্থপ্রবাহ শুরু হবে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এতে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এদিকে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য কিয়েভের কাছ থেকে গোপন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন—এমন অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর কার্যকারিতাও সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা ড্রোনে এটি ব্যবহার করা না যায়। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনটি লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলাইন গ্রাহামের নির্বাচনী প্রচারণারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য ডারলাইনকে সিনেটে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সিনেটে ভাইয়ের স্থলাভিষিক্ত হতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ সপ্তাহের শুরুতে সাউথ ক্যারোলিনার ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুসের সঙ্গে এক বিতর্কে ডারলাইন গ্রাহাম বলেন, আইনটি পাসে সহায়তা করতে পেরে তিনি ‘খুবই গর্বিত’। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া ডারলাইন আগামী সপ্তাহে সাউথ ক্যারোলিনায় তাঁর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে আইনটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা সম্পূর্ণ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

কলম্বিয়ায় আয়োজিত ওই বিতর্কে ডারলাইন গ্রাহাম বলেন, এই আইনটি প্রেসিডেন্টকে এমন কিছু হাতিয়ার দেয়, যা তিনি চাইলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি এটি ব্যবহার করবেন কি করবেন না, কিংবা অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করবেন কি না—তা তাঁর ওপরই নির্ভর করে। তবে আমার মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানির দাম কমিয়ে আনা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করা। আর যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দামও কমে আসবে।

লন্ডনে বাংলার শরৎবন্দনা সংগীত, কবিতা ও নৃত্যমুখর ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে আনন্দধারা আর্টসের শারদোৎসব ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’। গত শনিবার লন্ডনের রেডব্রিজ মেথডিস্ট চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সংগীত, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের পরিবেশনায় তুলে ধরা হয় বাংলার চিরচেনা শরৎকালকে। সোনালি ধানখেত, নীল আকাশে সাদা মেঘ, কাশফুল ও শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আনন্দধারা আর্টসের পরিচালক ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ সংগঠনটির ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘ঋতুভিত্তিক উৎসব উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃতির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে চাই। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটি স্নেহময়, সংবেদনশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।’

তিনি আরও বলেন, শিশুদের মধ্যে শৈশব থেকেই সংগীত, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতিপ্রেম এবং পরিবেশসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলার ষড়ঋতুকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আয়োজন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক সেলিম জাহান। বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিতে উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে তার সর্বজনীনতায়। ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে একত্র করার মধ্য দিয়েই উৎসব সম্প্রীতি, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকাশ হয়ে ওঠে।

প্রায় আড়াই ঘণ্টার এ আয়োজনে অংশ নেন সংগঠনটির শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের শিল্পীরা। অতিথিশিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন নূপুর কাজী। শিশু শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। গান, কবিতা ও নৃত্যের সমন্বয়ে তারা প্রকৃতির বিচিত্র রূপ, ঋতুপরিবর্তন ও শরতের সৌন্দর্য তুলে ধরে। আনন্দধারা আর্টসের জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা পরিবেশন করেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীতনির্ভর একটি সংগীতালেখ্য। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নির্বাচিত গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্মের অংশ স্থান পায়।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নৃত্য পরিবেশনা। এতে অংশ নেন আর্থিকা চৌধুরী, নিহারিকা ভৌমিক, মাটি সিদ্দিকী, আনিকা ফাতিহা, রওনক আলভী, ইউসুফ রাতুল ও মনিরুল ইসলাম মুকুল। নৃত্য পরিকল্পনা, পরিচালনা ও কোরিওগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেন মনিরুল ইসলাম মুকুল। তাঁর পরিকল্পিত নৃত্যবিন্যাস সংগীত ও আবৃত্তির পরিবেশনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আসেন সংগীতশিল্পী নূপুর কাজী। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, বাংলা লোকসংগীত ও আধুনিক গানের সমন্বয়ে সাজানো তার একক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। তার পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় শারদোৎসবের সাংস্কৃতিক আয়োজন।

অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীতে অংশ নেন কিবোর্ডে প্রীতম সাহা, তবলায় সন্দীপ চক্রবর্তী, পারকাশনে কিংশুক দাস, গিটারে অমি ইসলাম এবং সেতারে দেবীপ্রিয়া সরকার। তাঁদের যন্ত্রসংগত সংগীত পরিবেশনাগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

আয়োজনের শব্দ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আরাফাত কীর্তি। মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব পালন করেন গোলাম আকবর মুক্তা। আলোকচিত্র ধারণ করেন জিআর সোহেল। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল এআরটিভি নেটওয়ার্ক।

দর্শকপূর্ণ মিলনায়তনে শিল্পীদের পরিবেশনা প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে স্বদেশের প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

ড. ইউনূসকে হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ সরকারের শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছে জামায়াত

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সরকার। হেনস্তাকারীদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এদিন বাংলাদেশ সময় সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার পথে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে কয়েক ব্যক্তি হট্টগোল করে। তারা সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে সন্ত্রাসী বলে গালি দেয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা যৌথ বিবৃতিতে এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন। এনসিপির অভিযোগ স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন।

হেনস্তাকারীরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতা বলে জানা গেছে। সরকারি সংস্থা পিআইবির বাংলা ফ্যাক্ট চারজনের নাম পরিচয় প্রকাশ করেছে। চিহ্নিত হওয়া হেনস্তাকারীরা হলেন– নিউইয়র্ক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী, দপ্তর সম্পাদক মেহরাজ ফাহমি, জ্যাকসন হাইটসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর কায়সার এবং যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী।

ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না।

সরকারের নিন্দা, ব্যবস্থার ঘোষণা
পররাষ্ট্র মন্ত্রলায়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট একদল ব্যক্তি ড. ইউনূসকে বিদেশের মাটিতে হেনস্তার ঘটনায় জড়িত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। বিদেশে তাঁর সঙ্গে এমন আচরণে সরকার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। সরকারের আশা, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ভবিষ্যতে দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের সঙ্গে এ ধরনের অসদাচরণ থেকে বিরত থাকবেন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনকে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাবেক উপদেষ্টাদের নিন্দা
ড. ইউনূসকে হেনস্তায় নিন্দা জানিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা গতকাল যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে চাই– ভয়ভীতি, মিথ্যাচার, অনলাইন হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত হুমকি জুলাইয়ের প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের সংকল্প থেকে আমাদের বিন্দুমাত্র দমাতে পারবে না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আপামর জনগণের ম্যান্ডেট এবং তরুণ সমাজের বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সংস্কার ও মর্যাদার ঐতিহাসিক অর্জনকে কোনো অপপ্রচার কিংবা ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসরদের চক্রান্তে মুছে যেতে দেওয়া হবে না।
বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সি আর আবরার, ড. আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. সাখাওয়াত হোসেন (অব.), ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক, ফরিদা আখতার, শারমিন সোনিয়া মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নাম রয়েছে।

শেখ হাসিনাকে দায়ী করলেন জামায়াত আমির
ড. ইউনূসকে হেনস্তার জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্টে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট তার সন্ত্রাসীদের সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসীরা যে অপকর্ম করেছে, তার দায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনারই।’
জামায়াত দলীয়ভাবেও বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, ড. ইউনূসকে হেনস্তা করা জনগণ এবং বাংলাদেশের জন্য অবমাননাকর।

দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ 
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন নিরাপত্তা দিতে পারেন না। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিদেশে নিরাপত্তা দিতে পারেন না। গতকাল মাদারীপুর শকুনি লেকপাড় মুক্তমঞ্চে জেলা এনসিপি আয়োজিত নাগরিক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ বলেন, তারেক রহমানের সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছেন অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের যেসব শক্তি তাদের তিনি নিরাপত্তা দিতে পারছেন না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অর্জন অনেক হলেও বিদেশে ড. ইউনূসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে: জামায়াত আমির

০

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে এখনো মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণভোটকে অস্বীকার করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় জনগণ হতাশ হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জনআস্থা অর্জনে জামায়াত নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় জামায়াতের গাজীপুর মহানগরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মুহা. জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তৃতা করেন।

শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে অন্য লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে।

এ সময় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জানমাল দিয়ে কাজ করে বিজয় নিশ্চিত করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন বিএনপির পছন্দের লোক বসানো হচ্ছে। এর ফলে দেশে কার্যত দুই ধরনের সরকারব্যবস্থা চলছে—একটি জনগণের ভোটের ভিত্তিতে, অন্যটি বিএনপির পছন্দের। স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে।’

বরগুনার আহত নেতার পাশে
সন্ত্রাসী হামলায় আহত বরগুনার জামায়াত নেতা শামীম আহসানকে দেখতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) যান বিরোধীদলীয় নেতা। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিভিন্নভাবে মানুষকে নাজেহাল করছেন। বাড়িঘরে হামলা, দোকানপাটে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে।

তিনি বলেন, এ ঘটনার পরপরই চিফ হুইপকে ফোন করেছি। সুষ্ঠু তদন্তে দায়ীদের বিচারের আহ্বান জানিয়েছি। দেশে সুস্থ ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ চাই।

হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা
এর আগে ৫ মাসব্যাপী আয়োজিত ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে অংশ নেন জামায়াত আমির। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে এ আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও অর্ধকোটি নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

কাঁকড়ায় প্লাস্টিক, মাছে তামা-সিসা সুন্দরবনে পানিতে দূষণ

সুন্দরবন এলাকায় নদীর পানি ও মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বনের জলজ প্রাণীর ওপর। শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা এবং পশুর নদের জনপ্রিয় তিন প্রকার মাছ পারশে, দাঁতিনা ও বাটায় ক্ষতিকর মাত্রায় তামা, নিকেল ও সিসা পেয়েছেন গবেষকরা।

দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় এর খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

এ ছাড়া মাছের শরীরে ভারী ধাতু নিয়ে গবেষণা করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গত বছর ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার ইনভারমেন্টে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক বড় প্রাণীর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারাও নানান জটিলতার শিকার হতে পারে। অন্যদিকে সিসা, তামা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এসব দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার, লিভার সিরোসিসসহ জটিল রোগের কারণ হতে পারে।

সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক
অতীতের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় আম্পান-পরবর্তী ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমে বনের ভেতর ৫৬ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল। বর্তমান চিত্র জানতে সুন্দরবনের নদীগুলোর পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীর পানি ও মাটি পরীক্ষা করে।

পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘন মিটার পানিতে ৫৭০টি প্লাস্টিক কণা, ভোলার নদীর পানিতে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছে। এ সময় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিমাটিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।

খোলপেটুয়ার নদীর শিলা কাঁকড়া পরীক্ষা করে ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছে গবেষক দলটি।
সুন্দরবন এলাকার পানি ও পলি নিয়ে অন্যান্য গবেষণার তুলনায় এবার কিছুটা বেশি পরিমাণে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কিছু জায়গায় প্রতি ঘনমিটার পানিতে ২ থেকে ৫৩টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ১৭ থেকে ১৭৭টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা রয়েছে। বিশেষ করে শিলা কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন এবং পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিকের উপাদান সাধারণভাবেই মিলেছে।

‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শিরোনামে পরিচালিত গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক সমকালকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলো প্রথমে জুপ্লাঙ্কটন ও ছোট ছোট জলজ জীব গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে এগুলো সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়া নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অনুজীব ও তলদেশের প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস করছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কেমন, তা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। প্লাস্টিক দূষণ কমানোর জন্য একটি বড় পরিকল্পনা ও সঠিক নিয়মনীতি তৈরি করা প্রয়োজন।

পশুর নদের মাছে ভারী ধাতু
সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের ছয়টি পয়েন্ট থেকে তিন প্রজাতির মাছের নমুনা সংগ্রহ করে বিষাক্ত ভারী ধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি পান গবেষকরা। গবেষণা দলটি নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পশুর নদের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া এলাকা থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করে। এই তিন প্রজাতির মাছ নদীর ওপর, মধ্য ও নিচের অংশে থাকে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিটি মাছে গড়ে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম রয়েছে। মাছের অন্ত্রে ধাতুর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি, এর পর ছিল ফুলকায়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহনশীল মান অনুযায়ী, মাছে দশমিক ২ থেকে দশমিক ৪ মিলিগ্রাম সিসা, দশমিক ০৫ থেকে দশমিক ১ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম, দশমিক ৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম নিকেল এবং তামা ৩০ মিলিগ্রাম থাকা সহনীয়।
গবেষণা দলের প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি সমকালকে বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। এক পর্যায়ে যা মাছের শরীরে যাচ্ছে। পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় নদীর পারের সব কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

করণীয় কী
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, প্রথমেই যৌথ নদী কমিশনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উজান থেকে প্লাস্টিক ফেলা বন্ধের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ১০ কিলোমিটারের পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের সময় প্লাস্টিক মোড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা, মোংলা বন্দর এবং ইসিএ সীমানায় সক্রিয় কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং নদীপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ বা ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেল-বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পর্যটক এবং ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে বনের চারপাশে একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন, নিহত ৫

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানীতে ‘টুপটুপ’ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় দগ্ধ অবস্থায় আরও তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

শনিবার সকালে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানা যায়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মোহাম্মদ বেলাল।

নিউইয়র্কে দুর্গাপূজা শুরু ১৬ই অক্টোবর থেকে

জন্মভূমি প্রতিবেদকঃ নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকায় শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হচ্ছে আগামী ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০ শে অক্টোবর । এবার নিউইয়র্ক সহ আমেরিকার বড় বড় শহর শিকাগো, লসএঞ্জেলস্ মায়ারি, ওয়াশিংটন, নিউজার্সি, ভার্জেনিয়াসহ ফ্লোরিডা মিলে প্রায় শতাধিক দুর্গাপূজার খবর পাওয়া গেছে। আমেরিকার প্রতিবেশী কানডার মন্ট্রিল, টরেন্টু অটোয়া, কেলগেরীর সহ অনেকগুলি দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে। বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। প্রতি বছরের অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশের এ উৎসব এ বছরও পালিত হচ্ছে।

একদিকে শারদোৎসব হলেও এবার দুর্গাপূজা পালন হচ্ছে বর্নীল উৎসবের ছন্দে। আলোকসজ্জা, সাজসজ্জাসহ উৎসব ও পূজার সাত্ত্বিক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে পূজামণ্ডপ। এবারের দুর্গোৎসবকে জাতীয় পূজা উদযাপন পরিষদ আড়ম্ব্বর ও উৎসবে দুর্গাপূজা ভিন্ন আমেজ থাকবে। দেবী দুর্গার পূজা মানেই অশুভ শক্তির প্রতীক অসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়। সে জন্য চিরসুন্দর কল্যাণময়ী মাতৃরূপের সঙ্গে অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয়ও তিনি। আর এখানেই শারদীয় দুর্গোৎসব সার্বজনীনরূপে আবির্ভূত। দুর্গাপূজা সার্বজনীন হওয়ার ফলে এর বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংশ্নিষ্টতা বেড়েছে। সমাজের ধনী-দরিদ্র সবাই একসঙ্গে মিলে এ উৎসব পালন করার সুযোগ লাভ করেছে। এখানে উঁচু-নিচু কিংবা জাতি-সম্প্রদায়গত ভেদ নেই। দুর্গাপূজার এই সার্বজনীনতা দেবী প্রতিমার রূপ-কল্পনায়ও পরিলক্ষিত হয়। অন্য সব দেবতাই এককভাবে পূজিত হন; কিন্তু দেবী দুর্গা পূজিত হন সমষ্টিগতভাবে। এই যে সামষ্টিকতা, সমাজের জন্য উপকারী হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। এবারে দুর্গার আগমনকে আমরা বাংলাদেশের জন্য, বাঙালির জন্য, মর্ত্যবাসীর জন্য শুভ সংবাদ হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। দেবীর আগমনে শান্তি ও সদ্ভাব সর্বত্র প্রসারিত হয়ে আমাদের চারদিক মঙ্গলালোকে ভরে তুলুক।

নিউইয়র্কেও দুর্গাপূজার আমেজ ও অনুভূমি প্রবাসী বাংলাদেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে উৎসব। ১৬ই অক্টোবর ষষ্ঠী পূজা দিয়ে দেবীর বোধন শুরু হবে। তারপর সপ্তামী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী বা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হয়।নিউইয়র্কে প্রধান প্রধান সংগঠন ও মন্দিরগুলির মধ্যে কুইন্সের করোনায় বাংলাদেশ হিন্দু মন্দির, জ্যাকসন হাইটসের ওম শক্তি মন্দির, উডসাইডের দিব্য দামে নিউইয়র্ক পূজা উদযাপন পরিষদ, ঢাকা ক্লাবে হিন্দু মিলন মেলা, কুইন্স প্যালেসে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, জ্যাকসন হাইটসের ডাইবারসিটি প্লাজা, টাইম স্কয়ারে বেঙ্গলী ক্লাব, টাইমস স্কয়ার পূজা উদযাপন কমিটি, ব্রুকলিনের গৌড়নিতাই মন্দির এবং রাধামাধব মন্দির, জ্যামাইকার মহামায়া মন্দির, জ্যামাইকা কালী মন্দির, সনাতন সেবাশ্রম মন্দির, মহাকাল মন্দির, রিচমণ্ডহালের শ্রীহরি মন্দির সহ ফ্লোরাল পার্কের দেবালয় মন্দিরে দুর্গোৎসবের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সচেতন ভূমিকার বিষয়ে অবগত রয়েছে। নিউইয়র্ক বাংলাদেশী হিন্দু কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ সকল প্রবাসীদের শান্তিপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দুর্গোৎসব পালনের আহ্বান জানান।

নিউইয়র্কের প্রথম বাংলাদেশী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। বাংলাদেশ পূজা সমিতি নিউইয়র্কের আদি সংগঠন। বাংলাদেশ পূজা সমিতির পূজা হচ্ছে প্রেশমেডোর গুজরাটী সমাজ হলে অক্টোবর ৪ ও ৫ তারিখে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে।

খবর নিয়ে জানা যায় নিউইয়র্কের সব পূজা মন্ডপে স্থানীয় শিল্পী, ঢাকা ও কলকাতার শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবে।

রোদে দেবীবরণ, বৃষ্টিতে বিদায়: টাইমস স্কোয়ারে হৃদয়ের মহামিলন

বিশ্বজিত সাহাঃ ১০ অক্টোবরের ঝলমলে রোদ আর ১১ অক্টোবরের বৃষ্টিভেজা আকাশ- দুটি দিনের দুটি ভিন্ন রূপের মধ্যে রয়ে গেল একই অনুভূতি: মায়ের জন্য ভালোবাসা, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন এবং দূরপ্রবাসে নিজের শিকড়কে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে ২০২৬ সালের দুর্গোৎসব তাই পূজার আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে হয়ে উঠল এক আবেগঘন স্মৃতি। দেবী এলেন রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে; বিদায়ের সময় আকাশ ভিজল বৃষ্টিতে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের মধ্যে বাঙালির উৎসবের চিরপরিচিত দুই অনুভূতি যেন পাশাপাশি ধরা দিল- আগমনের উচ্ছ্বাস এবং বিদায়ের বিষাদ।

ম্যানহাটনের ফাদার ডাফি স্কোয়ারে ১০ ও ১১ অক্টোবর আয়োজিত এই উৎসব ছিল টাইমস স্কোয়ারে দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় আয়োজন। এর ভাবনা ছিল ‘মহামিলন ২০২৬’- বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তর্জাতিক পর্যটক, প্রবাসী পরিবার, শিল্পী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে বিশ্বনগরীর এই পরিচিত প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল আপনজনের মিলনক্ষেত্র।

১০ অক্টোবর, শনিবার, ঝকঝকে রোদের নিচে দেবীবরণের আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে উৎসবস্থল। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি, পূজার আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মিলিয়ে টাইমস স্কোয়ার পায় অন্য এক পরিচয়। প্রতিদিনের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে সেদিন জায়গা করে নেয় বাঙালির শারদীয় আবেগ। দূরদেশে বসবাস করেও মানুষ অনুভব করেন, তাঁদের উৎসব, ভাষা ও সংস্কৃতি এখনও এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

প্রবাসে দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি। কারও মনে পড়ে শৈশবের পূজামণ্ডপ, কারও পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কারও পরিবারের সঙ্গে অঞ্জলি দেওয়ার মুহূর্ত। টাইমস স্কোয়ারের এই আয়োজন সেই স্মৃতিগুলোকে নতুন পরিবেশে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ এনে দেয়। এখানে বেড়ে ওঠা শিশুদের কাছে যে উৎসব নতুন পরিচয়ের দরজা, তাঁদের মা-বাবার কাছে সেটিই ফিরে পাওয়ার এক কোমল অনুভূতি।

মহালয়া, পূজা, সংগীত, নৃত্য ও মানুষের উপস্থিতি মিলিয়ে দুদিনের আয়োজনটি হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশের সম্মিলিত পরিসর। উৎসবের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে সত্যম রায়চৌধুরীর চণ্ডীপাঠ, সুতিপা চৌধুরীর পরিচালনায় শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠ এবং মালবিকা চ্যাটার্জির পরিচালনায় সংগীত সাধনা একাডেমির পরিবেশনার কথা ছিল। নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার এই ভাবনা আয়োজনটির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

উৎসবের দৃশ্যমান আনন্দের পেছনে ছিল বহু মানুষের শ্রম। টাইমস স্কোয়ার দুর্গা উৎসব অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে প্রায় ৩৫ জন তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি- এনওয়াইইউ এবং রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তাঁদের দায়িত্ববোধ ও সাংগঠনিক দক্ষতায় সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

এই তরুণদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। উৎসবের মঞ্চে শিল্পীরা যেমন সংস্কৃতিকে প্রকাশ করেন, স্বেচ্ছাসেবকেরা তেমনি নিজেদের শ্রম দিয়ে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। পড়াশোনা ও ব্যস্ত জীবনের মধ্যে সময় বের করে তাঁরা দেখিয়েছেন, ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু স্মরণে নয়, দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যেও গড়ে ওঠে। তাঁদের হাত ধরে প্রবীণ প্রজন্মের আয়োজন নতুন প্রজন্মের নিজের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

প্রথম দিনের অন্যতম স্মরণীয় আকর্ষণ ছিল নৃত্যাঞ্জলির ‘দশ মহাবিদ্যা’। চন্দ্রা ব্যানার্জির পরিচালনায় ষাটের অধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত এই নৃত্যানুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলে প্রায় তিন মাস ধরে। দীর্ঘ মহড়া, শিল্পীদের নিষ্ঠা এবং সমবেত সাধনা ১০ অক্টোবরের মঞ্চে পূর্ণতা পায়। দেবীশক্তির দশটি স্বরূপকে নৃত্যের ভাষায় তুলে ধরে তাঁরা উপস্থিত সহস্র দর্শককে মুগ্ধ করেন।

‘দশ মহাবিদ্যা’র পরিবেশনায় আধ্যাত্মিক ভাবনা ও শিল্পের সৌন্দর্য একসঙ্গে প্রকাশিত হয়। মুদ্রা, ছন্দ, অভিব্যক্তি এবং সম্মিলিত কোরিওগ্রাফির মধ্যে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয় দেবীশক্তির বহুমাত্রিক রূপ। বিশ্বের এত পরিচিত একটি প্রাঙ্গণে এই উপস্থাপনা শিল্পীদের জন্য যেমন অর্জনের মুহূর্ত, প্রবাসী দর্শকদের জন্য তেমনি গর্বের অনুভূতি। তিন মাসের পরিশ্রম যেন সেদিন প্রতিটি নৃত্যভঙ্গিতে কথা বলেছে।

সংগীতও প্রথম দিনের উৎসবকে দিয়েছে প্রাণ। শাহ্ মাহবুবের সুরেলা কণ্ঠ ও প্রাণবন্ত পরিবেশনায় দর্শকেরা আনন্দে উদ্বেলিত হন। তাঁর সংগীতের সঙ্গে শিল্পী মহিতোষ তালুকদার তাপসের নৃত্য যোগ করে বিশেষ মাত্রা। গান ও নাচের এই মেলবন্ধনে টাইমস স্কোয়ারের উৎসবস্থল ভরে ওঠে উচ্ছ্বাসে। মানুষের সমবেত আনন্দে ব্যস্ত শহরের মধ্যেও তৈরি হয় এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক পরিসর।

মেখলা দাশগুপ্ত ও তাঁর দলের পরিবেশনা রাত দশটা পর্যন্ত দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে। তাঁর কণ্ঠের আবেগ ও সুরের আকর্ষণ উৎসবের রাতকে স্মরণীয় করে তোলে। দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকদের এই সম্পৃক্ততা বুঝিয়ে দেয়, প্রবাসে বাংলা গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষার টান, স্মৃতির উষ্ণতা এবং নিজের পরিচয়কে অনুভব করার আনন্দ।

উৎসবে উত্তর আমেরিকার চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। তাঁরা হলেন ড. মৃদুল পাঠক, অশোক রক্ষিত, মিলন আওয়ান এবং জয়প্রকাশ বিশ্বাস। অশোক রক্ষিতের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়েছি আমি নিজে। মিলন আওয়ানের হাতে সম্মাননা তুলে দেন সংগঠনের সভাপতি শশধর হাওলাদার এবং জয়প্রকাশ বিশ্বাসের হাতে সম্মাননা তুলে দেন কোষাধ্যক্ষ সম্যব্রত দাশগুপ্ত। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ড. কল্লোল বসু।

এই সম্মাননা উৎসবের আনন্দের মধ্যে কৃতজ্ঞতার একটি জায়গা তৈরি করে। প্রবাসের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যাঁদের উদ্যোগে সমৃদ্ধ হয়, তাঁদের অবদান প্রকাশ্যে স্বীকার করার মধ্য দিয়ে একটি সম্প্রদায় নিজের ইতিহাসকেও মূল্য দেয়। উৎসবের মঞ্চ তাই সেদিন আনন্দের পাশাপাশি সম্মান ও স্বীকৃতির মঞ্চ হয়ে ওঠে।

১০ অক্টোবর বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. প্রিন্স মারিও-ম্যাক্স শাউমবুর্গ-লিপে এবং তাঁর মা ড. আন্তোনিয়া প্রিন্সেসিন জু শাউমবুর্গ-লিপে। তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। অ্যাসোসিয়েশনের অতিথি সম্পর্ক ও আতিথেয়তা বিভাগের প্রধান অনুপম দত্ত তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। বিভিন্ন পটভূমির অতিথিদের উপস্থিতি আয়োজনটির আন্তর্জাতিক চরিত্রকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

সেদিন রাত আনুমানিক নয়টার দিকে নিউ ইয়র্কে ভারতের কনসাল জেনারেল বিনয় শ্রীকান্ত প্রধান তাঁর স্ত্রী মোনালিসা প্রধান এবং দুই সন্তানকে নিয়ে দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে আসেন। দুদিনের বিভিন্ন সময়ে অন্য দেশের কূটনীতিবিদ এবং কর্পোরেট অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উৎসবে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানান। তাঁদের উপস্থিতিতে বাঙালির এই আয়োজন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ পায়।

উৎসবের সহযোগী উদ্যোগগুলোর অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অংশীদার আশা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত আশা হোম কেয়ার ও আশা রেস্টুরেন্ট আয়োজনটির পাশে ছিল। আয়োজক, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এত বড় জনপরিসরে ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব হয়েছে। মঞ্চের আলোয় যাঁদের দেখা যায় এবং আড়ালে থেকে যাঁরা কাজ করেন- সবার শ্রমেই উৎসবের পূর্ণতা।

পরদিন, ১১ অক্টোবর, রবিবার, বদলে যায় আবহাওয়া। আগের দিনের উজ্জ্বল রোদের জায়গায় আসে বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু মানুষের টান কমে না। দেবীর বিদায়ের দিনে প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে মিশে যায় বিসর্জনের বিষাদ। বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কোয়ারে উৎসবের আবেগ তখন আরও গভীর, আরও অন্তরঙ্গ।
দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে ছিল মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, শান্তিজল প্রদান এবং বিসর্জনের অনুষ্ঠান। সিঁদুর খেলায় ফুটে ওঠে বিদায়বেলার পরিচিত শারদীয় রং। মায়ের বিদায় মানেই উৎসবের সমাপ্তি, অথচ সেই সমাপ্তির মধ্যেই থাকে আবার দেখা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বৃষ্টির দিনে এই অনুভূতি যেন আরও নিবিড় হয়ে ওঠে।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় ছয়টি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে সম্মাননা প্রদানের বিশেষ অনুষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দশক বা তার বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজা আয়োজন এবং বাঙালি সংস্কৃতি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা সংগঠনগুলো হলো ক্যালিফোর্নিয়ার Bay Area Prabasi Inc., ইলিনয়ের Bengali Association of Greater Chicago, ওহাইওর Bengali Cultural Society, নিউইয়র্কের East Coast Durga Puja Association, নিউ জার্সির Kallol এবং পেনসিলভানিয়ার Pragati।

ছয়টি সংগঠনের এই স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের শ্রমকে সম্মান জানানোর অর্থ। প্রবাসে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখা সহজ নয়। মানুষের সময়, অর্থ, সাংগঠনিক নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতা একত্র হলেই এমন ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। তাঁদের সম্মাননা দেওয়ার মুহূর্তটি তাই অতীতের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে সেই কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বানও বহন করে।

রবিবারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সুদেষ্ণা সাহার একক নৃত্য এবং নৃত্যাঞ্জলির ধুনুচি নাচ উৎসবে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। কানেকটিকাট থেকে আসা তাথৈ শিল্পীগোষ্ঠী পরিবেশন করে ‘প্রেমের বৃন্দাবন’; কোরিওগ্রাফি ও পরিচালনায় ছিলেন তানিয়া চন্দ্র। সবিতা দাসের একক সংগীতানুষ্ঠানও আয়োজনকে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস—বাফার নিবেদন ছিল ‘জয় মা দুর্গা’, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় মার্জিয়া স্মৃতি। বিভিন্ন শিল্পীগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে একই মঞ্চে মিলিত হয় প্রবাসের নানা অঞ্চলের সৃজনশীল চর্চা।

বৃষ্টিস্নাত রবিবারে দিয়াসিনী রায় ও তাঁর ব্যান্ডের বাংলা ও হিন্দি গানের পরিবেশনা টাইমস স্কোয়ারকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলে। দর্শকেরা গানের তালে নৃত্যে মেতে ওঠেন। বাংলাভাষী ও হিন্দিভাষী মানুষের পাশাপাশি আমেরিকার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের দর্শকদের অংশগ্রহণও সেই আনন্দকে ছড়িয়ে দেয়। ভাষা পুরোপুরি না বুঝেও মানুষ সুরের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন—সংগীতের এই শক্তি উৎসবের মহামিলনের ভাবনাকে জীবন্ত করে তোলে।

বৃষ্টি তখন আয়োজনের বাধা, আবার স্মৃতিরও অংশ। তার মধ্যেই গান হয়েছে, নাচ হয়েছে, পূজা হয়েছে, সম্মাননা জানানো হয়েছে। মানুষের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে বোঝা গেছে, উৎসবের প্রাণ শুধু অনুকূল আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। অনেক দূর থেকে এসে একসঙ্গে দাঁড়ানোর যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিই এই আয়োজনকে ধরে রেখেছে।
উৎসবের আরেকটি স্থায়ী অর্জন বিশেষ প্রকাশনা ‘শারদীয় ২০২৬’। আমার (বিশ্বজিত সাহা) সম্পাদনায় প্রকাশিত এই শারদসংখ্যায় বিশিষ্ট সাহিত্যিক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়িসহ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং আমেরিকার বিভিন্ন শহরের লেখকদের রচনা স্থান পেয়েছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এক মলাটে ধারণ করে প্রকাশনাটি প্রবাসী বাঙালির মননশীল চর্চার সাক্ষ্য বহন করে।

উৎসব চলাকালে ‘শারদীয় ২০২৬’-এর শত শত কপি পাঠক ও উৎসাহীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যাঁরা সেখানে সংগ্রহ করতে পারেননি, তাঁদের কাছেও প্রকাশনাটি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঞ্চের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, কিন্তু লেখা থেকে যায়। পাঠকের ঘরে পৌঁছে এই শারদসংখ্যা উৎসবের স্মৃতিকে আরও দীর্ঘ জীবন দেবে; নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেবে পূর্বসূরিদের ভাবনা, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

টাইমস স্কোয়ারের ২০২৬ সালের দুর্গোৎসবের সবচেয়ে সুন্দর ছবি তাই কোনো একটি পরিবেশনা বা অতিথির উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তার মধ্যে আছে তিন মাস মহড়া করা শিল্পীদের নিষ্ঠা, প্রায় ৩৫ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ববোধ, দীর্ঘদিন সংস্কৃতি লালন করা সংগঠনগুলোর অবদান এবং রোদ-বৃষ্টি পেরিয়ে উৎসবে আসা মানুষের ভালোবাসা। এই সবকিছু মিলেই দুদিনের আয়োজনকে দিয়েছে হৃদয়ের গভীরতা।

দেবীর আগমন হয়েছিল ঝলমলে রোদে, বিদায় বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে। কিন্তু বিদায়ের পরও থেকে যাবে নৃত্যের ছন্দ, গানের রেশ, করতালির উষ্ণতা এবং একসঙ্গে থাকার স্মৃতি। দূরপ্রবাসের এই মহামিলন মনে করিয়ে দিল- ঘর শুধু একটি ভৌগোলিক ঠিকানা নয়; আপন ভাষা, আপন সংস্কৃতি এবং আপন মানুষের সান্নিধ্যেও ঘর তৈরি হয়।

টাইমস স্কোয়ারে সেই ঘর তৈরি হয়েছিল দুদিনের জন্য। দেবী বিদায় নিয়েছেন, মানুষ ফিরেছেন নিজেদের জীবনে। তবু তাঁদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে একটি রৌদ্রোজ্জ্বল বরণ এবং একটি বৃষ্টিসিক্ত বিদায়- যার মাঝখানে বাঙালি আবারও খুঁজে পেয়েছে একে অন্যকে।

(লেখক : বিশ্বজিত সাহা, মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার অন্যতম সূচনাকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠক।)