Home Blog Page 9

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা দুই হলের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রদল, ফেরেনি ছাত্রশিবির

ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার (আলিয়া মাদ্রাসা) আল্লামা কাশগারী (রহ.) হলের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। সামনে পুলিশ অবস্থান করছে। তিনতলা আবাসিক হলের কোনো কোনো কক্ষের জানালার কাচ ভাঙা। গত মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর বন্ধ রয়েছে মাদ্রাসাটির ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল। তবে ভেতরে কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। তাদের অধিকাংশই ছাত্রদলের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আলিয়া মাদ্রাসার আল্লামা কাশগারী (রহ.) হলে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। মুফতি আহসান উল্লাহ হলেও একই দৃশ্য। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হলের পাহারায় রয়েছেন। ছাত্রদলের দাবি, দুটি হলই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংঘর্ষে গত মঙ্গলবার রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মাদ্রাসাটির আল্লামা কাশগারী (রহ.) হল। একপর্যায়ে শিবিরের নেতাকর্মীরা পিছু হটেন। তাদের কেউ এখনও হলে ফিরে আসেননি। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হলে যাওয়া-আসা করতে দেখা গেছে।

ঢাকা আলিয়ায় আবাসিক হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে কয়েকশ নেতাকর্মী হলে ঢোকেন। তবে এর আগেই হল ছাড়েন শিবির কর্মীরা। শিবিরের দখলে থাকা হলের বেশ কয়েকটি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। এ সময় সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হককে বেধড়ক মারধর করা হয়। ছাত্রদলের ১৪ জন ও শিবিরের ১১ জন আহত হন বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে দেখা গেছে, হলের বাইরের ফটক খোলা। ফটক থেকে ভেতরে ঢুকতেই হলের মূল ফটক। ওই ফটকে তালা মারা। এর সামনেই বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য বসে আছেন। বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকলে পরিচয় জানতে চাচ্ছেন। বাইরে থেকে বেশ কয়েকটি কক্ষের জানালার কাচ ভাঙা দেখা যায়। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করলে সেখানে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়। তাদের কেউ কেউ এসেছেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে। কেউ অনার্সের পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিতে এসেছেন।

মাদ্রাসার তৃতীয় বর্ষের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিতে আসা জিহাদ সমকালকে বলেন, ‘গত পরশু দিন সংঘর্ষের সময় হলে ছিলাম না। তাই সবকিছু হলেই ছিল। শনিবার আমার তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা। তাই অ্যাডমিট কার্ড নিতে আসছি। হলের বাইরে থাকি।’

হলের ফটকে দায়িত্বরত চকবাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হাসান সমকালকে বলেন, কিছু শিক্ষার্থী ভেতরে আগে থেকেই ছিলেন। এ ছাড়া কিছু শিক্ষার্থী হলের ভেতরে ঢুকছেন যারা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে আসছেন। অনেকের পরীক্ষা আছে। তবে হলের শিক্ষার্থী ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনতলা ভবনের হলটিতে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য ৭৪টি কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে ৩১২টি বৈধ সিট আছে। সেখানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী থাকেন। মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষের বেশ কিছু কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। দুই দফায় সংঘর্ষের পর শিবিরের নেতাকর্মীরা হল ত্যাগ করেন।

মূল ফটকের ভেতরে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। তারা বলেন, ভেতরে কিছু শিক্ষার্থী এখনও রয়েছেন। তাদের অন্য কোথাও থাকার জায়গা নেই। আলী হাসান ওবামা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি কোথাও যাইনি। হলেই থাকছি।’

ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীও হলে অবস্থান করছেন। এ সময় সাদ চৌধুরী নামের ছাত্রদলের এক নেতাকে হলের ভেতরে যেতে দেখা যায়। তারা সেখানে অবস্থান করেন। হলের ‎নিরাপত্তাকর্মী বদিউর রহমান সমকালকে বলেন, ছাত্রদল যারা করে তাদের কিছু লোক নিজেরাই এসে হলের ভেতরে প্রবেশ করছেন।

মাদ্রাসাটির শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলীম সমকালকে বলেন, ‘এটা দুই পক্ষের মধ্যে সিট দখলের কোনো সংঘর্ষ ছিল না। যুবদল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পরিকল্পিত হামলা ছিল। দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের লোকজন ধাওয়া খেয়েছে। সেটারই প্রতিফলন ছিল আমাদের ওপর হামলা করা। এতে ১১ জন আহত হন। দুজন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’ কক্ষ ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধাওয়া দিয়েছে, তখন আমরা পাল্টা ধাওয়া দিয়েছি। আমরা হলের ভেতরে যেতে পারিনি, কক্ষ ভাঙচুর করিনি।’

আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদলের বর্তমানে কমিটি নেই। তবে আসন্ন কমিটিতে পদ পেতে অনেকে তৎপর। মাদ্রাসাটির আবাসিক হলের অবস্থা জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদপ্রত্যাশী সাদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বারবার আমাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমাদের লোকবল কমছিল। তাই আমাদের কিছু করার ছিল না। গত মঙ্গলবার শিবির কর্মীরা যখন বহিরাগতদের নিয়ে এসে ক্যাম্পাসে আমাদের ওপর হামলা করেন। মিডিয়ায় এই দৃশ্য দেখে আমাদের বড় ভাইয়েরা এগিয়ে আসেন। তখন শিবিরকর্মীরা পালিয়ে যান। হল এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। সেদিনের হামলায় আহত ছাত্রদলের অন্তত ১৪ জন এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

সংঘর্ষের পর হলে ফেরা শিবিরকর্মীরা চুপচাপ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) গত বুধবার দুপুরে সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রশিবিরকর্মীদের তাড়িয়ে দেয় ছাত্রদল। তবে শিবিরকর্মীরা রাতে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। তারা চুপচাপ আছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ তথ্য দিয়েছেন। এদিকে শিবিরকর্মীদের অভিযোগ, তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা আতঙ্কে আছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের কর্মীরা বলছেন, ক্যাম্পাস শিবিরমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে কোনো শিবিরকর্মী নেই। যারা আছেন, তারা গুপ্ত।

বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। সেদিন সকালে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ‘অদম্য জুলাই’ শীর্ষক শোভাযাত্রা বের করে। এটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু। এজন্য উভয় সংগঠনই একে অপরকে দুষছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আশিক আহমেদের অভিযোগ, বহিরাগতদের নিয়ে কর্মসূচি পালন না করতে শিবিরকর্মীদের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা কথা না শুনে ছাত্রদল কর্মীদের ওপর হামলা করেন। এতে ছাত্রদলের অন্তত পাঁচজন আহত হন।

ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো হামলা চালাইনি। হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুই-তিনজনকে ধরে আমরা উপাচার্যের কাছে সোপর্দ করেছি।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া ইসলাম বাবুর দাবি, তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি উপাচার্য ভবনের ফটকের দিকে যাওয়ার সময় ছাত্রদল কর্মীরা অতর্কিত হামলা করেন। এতে তাদের অন্তত ৫ জন কর্মী আহত হন।

শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য মতে, সংঘর্ষের পর শিবিরকর্মীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। তবে রাতে ফিরে আসেন। এরপর থেকে প্রকাশ্যে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা যায়নি। পরদিন বৃহস্পতিবারও ক্যাম্পাসের পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক। শিবিরকর্মীরা ক্যাম্পাসে থাকলেও কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাননি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চব্বিশের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর ববি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাপুটে অবস্থান ছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল একক আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। তবে শিবিরের কার্যক্রমে বাধা দিত না ছাত্রদল। বিলুপ্ত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতাকর্মীরা ছাত্রশক্তি নামে ক্যাম্পাসে থাকলেও তাদের অবস্থান খুবই দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটেই বুধবার সংঘর্ষ হয়।

শিবিরের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের বর্তমান কমিটি গঠিত হয় গত জানুয়ারিতে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম প্রকাশিত হয়েছে। সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী কমিটির অপর আটজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ১২৭ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে গত ৩ মে। কমিটিতে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হয়। দুই সংগঠন হল শাখায় কমিটি দেয়নি।

ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জাকারিয়া ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদলের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শিবিরকর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা ক্যাম্পাসে থাকলেও আতঙ্কের মধ্যে আছি।’

ছাত্রদল সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ক্যাম্পাস শিবিরমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন ক্যাম্পাসে কোনো শিবির নেই। যদিও কেউ থেকে থাকেন তারা গুপ্ত। শিবিরের কমিটি দুই সদস্যের। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাসে নেই। অন্যদের পদ না থাকায় পরিচয় লুকিয়ে ক্যাম্পাসে হয়তো থাকতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহকারী অধ্যাপক মো. মেহেদি হাসান সমকালকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। বুধবার শিবিরের সঙ্গে ও বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের সঙ্গে বৈঠক করেছি। অন্যান্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক হবে।’

সাঈদ, ভৈরবীদের জীবনের গল্প সড়কেই থেমে গেল বেপরোয়া চালক, ১৮ মৃত্যু

মেয়ের বিয়ের দেনা দিনমজুরি করে শোধ দিতে চেয়েছিলেন আবু সাঈদ। বাউল গানের বড় শিল্পী হতে চেয়েছিলেন ইসরাত জাহান পেহেলী ভৈরবী। রেলস্টেশনে ফেরি করে পণ্য বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন আবুল হোসেন। তাদের এসব ইচ্ছা কোনো দিন পূরণ হবে না। বেপরোয়া বাস তাদের সঙ্গে আরও ১৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আর আদরের সন্তান হারানো পরিবারগুলোতে চলছে মাতম।

গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে বগুড়া সদরের এরুলিয়া বাজার এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কৃষি শ্রমিকদের চাপা দেয়। এতে সাতজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৮ জন। এ ছাড়া সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসের সংঘর্ষে ৯ যাত্রী নিহত হন। আহত হন কমপক্ষে ২৫ যাত্রী। একই দিন বাগেরহাট সদর উপজেলার জয়গাছি-রঘুনাতপুরে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সৈকত (৩৮) নামে এক মোটরসাইকেলচালক নিহত হয়েছেন।

মেয়ের বিয়ের দেনা শোধ হলো না 
দুই মাস আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন বর্গাচাষি আবু সাঈদ (৪৮)। বিয়ের সময় বেশ কিছু ধারদেনা করেছিলেন। তা শোধ করতে কয়েক দিন আগে বগুড়ায় এসেছিলেন কৃষি শ্রমিকের কাজ করতে। কয়েক দিন কাজ করে যে টাকা জমা হয়েছে তা নিয়ে আর তিন দিন পর বাড়ি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই একটি বাস আবু সাঈদের প্রাণ কেড়ে নিল। শজিমেক হাসপাতালের পেছনে মর্গের পাশে বসে বিলাপ করে এসব কথা বলছিলেন নিহত আবু সাঈদের স্ত্রী রিনা খাতুন।

স্বজনরা জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাঈদ দুই সন্তানের জনক। নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের কিছু জমিতে বর্গাচাষ করতেন। তা দিয়ে সংসার ঠিকমতো চলত না। তার ওপর দুমাস আগে মেয়ে শারমিনকে বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের সময় ধারদেনা করতে হয়েছে। তাঁর বড় সন্তান শামীম একটি প্রতিষ্ঠানে প্রহরীর কাজ করেন। তিন বছর আগে বিয়ে করে তিনি আলাদা থাকেন। আবু সাঈদের স্ত্রী রিনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী লোকলজ্জার কারণে এলাকায় শ্রমিকের কাজ করত না। এ জন্য বগুড়ায় গিয়েছিলেন। এখন আমার সব শেষ। দেনা কীভাবে শোধ হবে? আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?’

মাজারে গান গেয়ে ফিরছিলেন পেহেলী মাজারকেন্দ্রিক বাউল ও পীর-মুর্শিদি গান গাইতেন ইসরাত জাহান পেহেলী (১৮)। কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মধ্যপাড়ার বাবুল মিয়া ও রোজিনা বেগম দম্পতির মেয়ে তিনি। ৬ আগস্ট সিলেটের বিশ্বনাথে ছাওয়াল পীরের মাজারে বাউল আসরে ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের আসার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। আসর শেষে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় লাশ হয়ে ঘরে ফেরেন। এতে স্বজন, সুহৃদ-শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মো. বাবুল মিয়া (৫০) মেয়ে পেহেলীকে নিয়ে সিলেট গিয়েছিলেন। তিনি আহত হয়ে সিলেটের ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি হন।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলা সদরের চন্ডিবেড় মধ্যপাড়ার মেয়ে ইসরাত জাহান পেহলি। তিনি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার নদার রামপাশার বৈরাগীবাজার এলাকার ছাওয়াল শাহ (রহ.) মাজারে বাউল গানের আসরে যোগ দেন। আসরে উদীয়মান জনপ্রিয় এই শিল্পী দর্শক-শ্রোতার করতালি আর উপঢৌকন গ্রহণের মধ্য দিয়ে গীতিকার ও সুরকার পাগল হাসানের ‘গলার হার বানাইয়া দিমু, দিমু হাতের বালা’ গান পরিবেশন করেন। জীবনে লাল শাড়ির সঙ্গে মাথায় টিকলি, গলায় হার, হাতের বালা পরে সাজার আগে ভক্ত-শ্রোতাদের চোখের জলে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি দেন এই শিল্পী।

পেহেলীর মা রোজিনা বেগম বলেন, ‘মেয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল নিজেকে বাউল গানের বড় শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। সেই স্বপ্ন অধরা রয়ে গেল।’

দ্বিতীয় সন্তানকেও হারালেন শোভা রায়
সিলেটের দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম রায় প্রিয়ম সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগর এলাকায় বড় হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে হাছননগর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়ার বাসিন্দা সপ্তমের স্বজন মুহিত রায় জানান, সপ্তম ও প্রিতম রায় দুই ভাই ছিল। প্রিতম বড়, সপ্তম ছোট। ১২ বছর আগে প্রিতম (১১) সুরমা নদী থেকে বল তুলতে গিয়ে গিয়ে স্রোতে ভেসে যায়। পরে তাঁর লাশ ভেসে ওঠে। এখন দ্বিতীয় সন্তানকেও হারালেন মা শোভা রায়। দুই ছেলে হারানোর কষ্ট কীভাবে সইবেন তিনি। এ কথা বলেই মূর্ছা যান মুহিত।

হাছননগরের বাসিন্দা সুমিত চৌধুরী জানালেন, সপ্তমের বাবা উত্তম রায় স্ত্রী শোভা, ছেলে সপ্তম, প্রিয়ম ও মেয়ে বৈশাখীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। কোনোভাবে সংসার চলত। বড় ছেলেটি মারা যাওয়ার পর শোকে কাতর ছিলেন শোভা। টানাপোড়নের সংসার চালাতে পড়াশোনার পাশাপাশি সিলেটের মহাজনপট্টির কাপড়ের দোকানে চাকরি নেন সপ্তম। এরপর বাবা-মা দুজনই অসুস্থ হলে সপ্তমই ছিল সংসারের ভরসা। কদিন আগেও সপ্তম তাঁর স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, বোনকে (বৈশাখীকে) পড়াশোনা করিয়ে ভালো ছেলের কাছে বিয়ে দেওয়াই তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। কিন্তু বোনকে বিয়ে দেওয়া হলো না তাঁর।
সপ্তমদের গ্রামের বাড়ি একসময় ছিল হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জের বিরাট গ্রামে। ওখানে তাদের এখন কিছুই নেই।

ভ্রমণে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে 
সিলেটে ঘুরতে গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সাবেক ছাত্রদল নেতা পাঁচ বন্ধু। কিন্তু বাড়ি ফিরেছেন চারজন। গতকাল সিলেটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাইফুল ইসলাম (৫৩)। তিনি কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও ঠিকাদার ছিলেন।

দুর্ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুকুল ইসলাম ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আ. লতিফ নামে অন্য দুজন আহত হয়েছেন। জানা যায়, বুধবার সাইফুল ইসলাম, ফারুকুল ইসলাম, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আ. লতিফ সিলেট যান। উপজেলা বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক জমরুত মিয়া বলেন, ‘অনেক দিন থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল সিলেটে ঘুরতে যাওয়ার। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে আমরা পাঁচজনের মধ্যে তিনজন বাসে রওয়ানা করেছিল। দুজন ঢাকার উদ্দেশে বিমানে চড়েছিলাম। বিমানটি ছাড়ার আগে সাড়ে ৭টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে চলে আসি।’

মূর্ছা যাচ্ছেন হাফেজ আরমানের মা-বাবা
সিলেটে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, তাঁর বড় ছেলে আরমান শাহপরাণ (রহ.) মাদ্রাসা থেকে হাফেজ হয়। ঢাকার একটি মাদ্রাসায় পড়ছিলেন তিনি। সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে শেরপুর হাইওয়ে থানায় ছুটে যান তিনি। লাশ শনাক্তের পর বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তারা।

আবুল হোসেনের আয়ে চলত পরিবার
নিহতদের একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের তারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন। পেশায় ফেরিওয়ালা। সিলেট রেলস্টেশনে ফেরি করে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতেন। বাসে ওঠার আগে পরিবারকে জানিয়েছিলেন, জমানো টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তাঁর লাশ শনাক্ত করেন চাচাতো ভাই সিরাজুল ইসলাম। তিনি সমকালকে জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন আবুল হোসেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবারে মাতম চলছে।

কাজের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের বাসচাপা
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকালে এরুলিয়া বাজারে দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকদের হাট বসে। আশপাশের জেলা থেকেও এখানে লোকজন আসেন। অধিকাংশ দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকরা দিনে বগুড়া সদরের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন। কাজ শেষে রাতে স্থানীয় স্কুলের বারান্দায় তারা ঘুমান। তাদের সংখ্যা শতাধিক। গতকাল ভোরে শ্রমিকরা এরুলিয়া বাজারে রাস্তার ধারে কাজের সন্ধানে বসে ছিলেন। হঠাৎ ওই বাসটি শ্রমিকদের চাপা দেয়।

নিহত সাতজন হলেন– গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এনায়েতপুরের আবু সাঈদ (৪৮), নুর আলম (৪৫); জয়পুহোটের কালাইয়ের পার্বতীপুরের আনোয়ারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবির আমিরপুরের আমিরুল ইসলাম (৪৫), দিনাজপুরের পার্বতীপুরের গুঘোলগাছির তাজিমুর রহমান (৪৭), বগুড়া সদরের ফাঁপোড় মধ্যেপাড়ার বেলাল হোসেন (৪০) ও বগুড়ার কাহালুর নারহট্ট এলাকার নুর মোহাম্মদ (৭০)। তারা কৃষি শ্রমিক ছিলেন।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিক দুলাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার পাঁচজন ১৪ দিন আগে এই এলাকায় আমন ধান রোপণের জন্য এসেছি। কাজের জন্য আজ (গতকাল) ভোরে এরুলিয়া এলাকায় অনেকে বসেছিলাম। হঠাৎ বাস এসে আমাদের ওপর উঠিয়ে দেয়। আমরা চারজন কোনোমতে বাঁচলেও আমাদের সাথে থাকা তাজিমুর মারা গেছে।’

বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী বলেন, ‘আহতদের শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে পুলিশ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছি, চালক ঘুম ঘুম চোখে বাস চালাচ্ছিলেন।

শজিমেক হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আ ন ম আনোয়ারুল কাদির বিটু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্ঘটনার খবর পেয়েছেন। তিনি চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

একই এলাকায় দুর্ঘটনা, এবার নিহত ৯
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসের সংঘর্ষে ৯ যাত্রী নিহত হন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ যাত্রী।  একই সড়কের ১৩ মাইল নামক স্থানে ২০১২ সালে দুর্ঘটনায় তৎকালীন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমসহ আটজন নিহত হয়েছিলেন। প্রায় ১৪ বছর পর একই এলাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল।

নিহতরা হলেন– বাউলশিল্পী কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার ইসরাত জাহান পেহেলী ভৈরবী (১৭), নিকলীর রুবেল সূত্রধর (৩৭), সিলেটের দক্ষিণ সুরমার চণ্ডীপুল বাইপাস এলাকার জাহাঙ্গীর শেখের মেয়ে জাইফা (৩), নগরীর মাহাজনপট্টির দোকান কর্মচারী সপ্তম রায় প্রীতম (২২), কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম (৫০) ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নবীনগরের আবুল হোসেন (৪৪), কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের হাফেজ আরমান হোসেন রাহিম (১৯), একই জেলার বাঙ্গুরাবাজার থানার পীর কাশিমপুরের সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সাইফুল ইসলাম ইমন।

বাসের যাত্রী ও হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গতকাল সকালে ঢাকার উদ্দেশে ইউনিক পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস সিলেট ছেড়ে যায়। সাড়ে ৭টার দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ওসমানীনগর এলাকার কাশিকাপন নামক স্থানে সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে ওভারটেক করার সময় সংঘর্ষ হয় এবং ইউনিক পরিবহনের বাসটি খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই বাসের সাত যাত্রী মারা যান।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ১৬ জনকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যায় শিশু জাইফা। চিকিৎসাধীন মারা যান দোকান কর্মচারী প্রীতম। বাকি ১৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে বাবুল মিয়া ও হিসাবরক্ষক আতিকুল ইসলাম ফেরদৌসের অবস্থা গুরুতর।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওমর রাশেদ মুনির জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ১৪ জন চিকিৎসাধীন। হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম জানান, এ ঘটনায় পুলিশ মামলা করবে।

খুনের কারণ ও খুনি সম্পর্কে জানতে পারল না পরিবার ঠিকাদার কাজী নাসির উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা

ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরা আগেই বন্ধ করে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা। ফলে প্রকাশ্যেই ঠিকাদার কাজী নাসির উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আট বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবশেষে মামলার বাদীপক্ষকে না জানিয়েই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। মামলাটির সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক আলতাফ হোসেন সম্প্রতি এই প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।

স্বজনদের প্রশ্ন, একজন মানুষকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হলেও খুনি এবং পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা গেল না কেন? খুনের পেছনে কারণ কী, সেটিও জানতে পারলেন না তারা। হত্যারহস্য উদ্ঘাটন না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে তাদের অবহিত করেননি।

নাসিরের মেয়ে ও মামলার বাদী নার্গিস আক্তার নিপু সমকালকে বলেন, বাবা হারানোর বেদনা কতটা গভীর, তা শুধু আমরাই অনুভব করতে পারি। খুনিরা বাবার বুকে গুলি চালিয়ে পার পেয়ে গেল। বিচার পাওয়ার অধিকার কী আমাদের নেই? কেন, কী কারণে কারা বাবাকে হত্যা করল, সেই উত্তর পেলাম না। বাবা প্রাণনাশের হুমকিতে ছিল। কাদের শত্রুতা ছিল, সে বিষয়ে পুলিশকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ সেটিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না। নিপুর দাবি, তাঁর বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে হয়তো তারা বিচার পেতেন।

জানা যায়, নাসিরের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার মাদুয়াখালী এলাকায়। তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। ভবনের টাইলস ফিটিংয়ের ঠিকাদারির কাজ করতেন। ২০১৮ সালের শুরু থেকে মহাখালীর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের টাইলস ফিটিংয়ের কাজ চলছিল তাঁর অধীনে। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে তিনি কাজের তদারকি করতে যান দক্ষিণপাড়ায়। সেখানে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু ঘটনাস্থলেরই নয়, ওই এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানার মোট ২৬টি সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সিসি ক্যামেরা বন্ধের বিষয়ে একাধিকার জিজ্ঞাসাবাদ করেও তথ্য পাওয়া যায়নি। একটি এলাকায় একযোগে কে বা কারা এই ক্যামেরাগুলো বিচ্ছিন্ন করল, সেটিও তদন্তকারীরা সিসি ক্যামেরা পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বের করতে পারেননি।

হত্যার ঘটনায় নাসিরের মেয়ে নিপু অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। কোনো কুলকিনারা না পেয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে মামলাটি স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন তদন্ত করে ডিবিও জড়িতদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্ত সংস্থাটি ২০২২ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে কে বা কারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে সিসি ক্যামেরার প্রধান লাইন কেটে দেয়। ফলে হত্যার সময়ের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সিসি ক্যামেরা পরিচালনাকারীসহ আশপাশের লোকজন সংযোগ বিচ্ছিন্নকারীদের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেনি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, নাসির হত্যার ঘটনাটি সত্য বলে প্রতীয়মান হলেও জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পিবিআইর এই বক্তব্য গ্রহণ না করে আদালত সিআইডিকে পুনর্তদন্তের দায়িত্ব দেন। ২০২৩ সালের ৩ মে সিআইডির সে সময়ের পরিদর্শক মহসিন উদ্দিন তদন্ত শুরু করেও কিছুই বের করতে পারেননি। ২০২৪ সালের মে থেকে সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের পরিদর্শক আলতাফ হোসেন পঞ্চম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। সম্প্রতি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি।

আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, খুন হয়েছে এটা সত্য। তবে জড়িতদের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

বাদীপক্ষকে না জানানোর কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বাসার ঠিকানায় চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিকানায় তাদের পাওয়া না যাওয়ায় সেটি ফেরত এসেছে। এ ছাড়া তাদের ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

তবে তদন্ত কর্মকর্তা আলতাফ ফোন করেননি বলে দাবি করে বাদী নার্গিস আক্তার নিপু বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের সঙ্গে কোনো মাধ্যমেই যোগাযোগ করা হয়নি। আমরা আগের ঠিকানাতেই আছি। চিঠি পাঠানো হলে অবশ্যই আমাদের পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশে হিন্দু কথা বললেই তাঁর কপালে দু:খ নেমে আসে?

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক।। কোন অপরাধ না করে বিনা কারণে বিনা বিচারে শ্রীচিন্ময় কৃষ্ণ দাস অনেকদিন জেলে আছেন। কবে তিনি মুক্তি পাবেন, বা আদৌ মুক্তি পাবেন কিনা কেজানে? সদ্য হরিদাস চন্দ্র তরনিদাস গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁর ভাগ্যও অনিশ্চিত। ইতোপূর্বে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অপমানিত হয়েছেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক কলঙ্কিত হয়েছেন। এমনকি পঙ্কজ দেবনাথ ভিকটিম হয়েছেন। এ সবগুলো নাম হিন্দু, এদের নির্যাতিত হবার অন্য কোন কারণ দরকার নেই? এঁরা যে ‘অপরাধী’ রাষ্ট্রযন্ত্র কিন্তু তা প্রমান করতে পারেনি, বিচারপতি সিন্হা’র ক্ষেত্রে ‘ফালতু’ মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। বাংলাদেশে যেকোন হিন্দু কথা বললেই তাঁর কপালে দু:খ আছে?

এডভোকেট চৈতালি মুখার্জি চুপ হয়ে গেছেন বা তাঁকে চুপ করে দেয়া হয়েছে। অনেকদিন আগে প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে একটি সত্য কথা বলে দিয়েছিলেন, পুরো জাতি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো, রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হয়েছিল, দেশে থাকলে তাঁর অবস্থা কি হতো তা আন্দাজ করা যায়, তিনি আদৌ আর এ জীবনে দেশে যেতে পারবেন কিনা সেটা অনিশ্চিত। প্রবাসে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম-আন্দোলন করছেন তারা দেশে যেতে সাহস পাননা, কারণ দেশের মানুষগুলো বর্বর হয়ে যাচ্ছে। দেশে আইন-কানুন, বিচার-সালিশ আছে বলে মনে হয়না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থাও এখন হিন্দুদের মত, তবে তাঁরা ধর্মের কারণে নির্যাতিত নন, হিন্দুরা ধর্মের কারণে নির্যাতিত।

মুক্তিযুদ্ধকালে একাত্তরেও একই অবস্থা ছিলো, হিন্দুরা ধর্মের কারণে টার্গেট ছিলো, আওয়ামী লীগ কর্মীরা টার্গেট ছিলো রাজনৈতিক কারণে। দেশের অবস্থাটা কিন্তু এখন একাত্তরের মতোই, শেষটাও কি একাত্তরের মত হবে? তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া যাক যে, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসলো, তাতে কি হিন্দুদের অবস্থার উন্নতি হবে? আওয়ামীলীগের ১৭বছরের শাসনামল কি সেই কথা বলে? এটি সত্য ১৯৭১ সালে হিন্দুরা বিশ্বাস করেছিলো যে, পাকিস্তান গেছে, এখন আমরা সবাই বাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলমান একসাথে বসবাস করবো, দেশ গড়বো। হিন্দুরা মুসলমানদের বিশ্বাস করেছিলো। গত ৫৫ বছরে সেই বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। অনেক হিন্দুই এখন বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশের হিন্দুরা মুসলমানের সাথে একসাথে বসবাস করতে পারবে না?

তাহলে উপায়? উপায় তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানকে খুঁজে বের করতে হবে? এখনো বাংলাদেশে দুই কোটি হিন্দু আছে, এদেরকে মেরে ফেলা যাবেনা, ধর্মান্তরিত করা যাবেনা, বিতাড়ন করা যাবেনা। হিন্দুরা বাংলাদেশের ভূমিপুত্র, এই দেশ তাঁদের চৌদ্ধপুরুষের। তাঁরা উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। বাংলাদেশে হিন্দু আন্দোলনে একটি শ্লোগান এখন বেশ শোনা যায়, সেটি হচ্ছে, “কথায় কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপ্-দাদার”? ইউনুস সরকারের আমলে হিন্দুরা যথেষ্ট অত্যাচারিত হয়েছে, প্রতিবাদী হতে শিখেছে। একজন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস হাজারো হরিদাস, চৈতালির জন্ম দিয়েছে, এদের অত্যাচার করে দমিয়ে রাখা যাবেনা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে হিন্দুরা আর কোন দলের ‘ভোটব্যাংক’ থাকবে না, তারা নিজের মত করে বাঁচতে শিখেছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হিন্দু জেনজি আন্দোলন দেখবে।

২৭ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট চার সংস্থার ঠেলাঠেলি, সেতুর দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। এই রেললাইনের কারণে উত্তর-দক্ষিণ দুই অংশে বিভক্ত নগরী। সেই রেললাইনের ওপর নির্মিত একটি সেতু সংযুক্ত করেছে উত্তর-দক্ষিণকে। নগরীর টাইগারপাস ও দেওয়ানহাটের ঠিক মাঝখানে থাকা সেতুটি দেওয়ানহাট ব্রিজ নামে পরিচিত। মূলত এটি একটি ওভারব্রিজ। অর্ধশত বছর আগে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তার পর থেকে সেতুটির নিচে ট্রেন এবং ওপরে গাড়ি চলাচল করছে।

১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে সেই সেতুটি কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থা নির্মাণ করেছিল, তা বলতে পারছে না কেউ। ফলে সেতুটির দায়-দায়িত্বও নিচ্ছে না কেউ। বছরের পর বছর বড় ধরনের কোনো মেরামত না করায় নড়েবড়ে সেতুটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারী ট্রাক-লরিসহ হাজার হাজার যানবাহন পারাপারের এই সেতুটি কোনো কারণে ভেঙে পড়লে নগরীর মূল যান চলাচল ব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রেললাইনের ওপরে যানবাহন চলাচলের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সেতুটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল রেলওয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের প্রথম ওভারব্রিজটি নির্মাণ করেছিল। ব্রিজটি ১ হাজার ২২০ ফুট দীর্ঘ এবং ৫৬ ফুট প্রস্থ।

নির্মাণের পর থেকে শক্তপোক্ত সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচল করে আসছে। কিন্তু সেতুটির ‘অভিভাবক’ কে– এ প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে; কেউই সেতুটির দায়িত্ব নেয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নিয়মিত মেরামত না করায় এটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ওভারব্রিজটির পিলার থেকে সিমেন্ট-বালুর আস্তর খসে পড়ছে। বেরিয়ে আসছে রড। স্থানে স্থানে জন্মেছে আগাছা। সব মিলিয়ে ব্রিজটির এখন ভঙ্গুর দশা। আর ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচল করছে কাভার্ডভ্যান, লরি, ট্রাক, বাস, কারসহ বিভিন্ন ধরনের ভারী ও হালকা যানবাহন।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলে ২০২৪ সালের শুরুতে সেতুটি নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় চউক। পুনর্নির্মাণের আগে সেতু দিয়ে যাতে ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারে, সে জন্য তখন সেতুর দুই পাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ‘হাইট ব্যারিয়ার’ স্থাপন করার কথা ছিল চসিকের। এর মাধ্যমে নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত শুধু ছোট যান চলাচল করবে এই সেতু দিয়ে। আর ভারী যানবাহনগুলোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই বছরের ১৫ জানুয়ারি চিঠি দিয়ে বিষয়টি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে অবহিতও করা হয়। কিন্তু সে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

চউকের সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, চউক সড়ক কিংবা স্থাপনা নির্মাণ করে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে হস্তান্তর করে। তাই উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ব্রিজটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চায়নি চউক।

সেতুটির দুরবস্থার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এবার টনক নড়েছে চসিকের। গত ২ আগস্ট সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের উপস্থিতিতে একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল দেওয়ানহাট ওভারপাসের বিদ্যমান বিপজ্জনক অবস্থা (কংক্রিট ক্ষয়, রডের মরিচা ও সারফেস ক্র্যাকিং) নিয়ে একটি তথ্যপত্র উপস্থাপন করে। এতে বলা হয়, প্রতিদিনের ভারী কনটেইনার ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সেতুটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমস্যা সমাধানে ‘স্ট্রেংদেনিং’ ও ‘রেট্রোফিটিং’ কৌশল উপস্থাপন করা হয়। এতে বিদ্যমান অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ ও আধুনিকায়ন করা হবে। তাতে সেতুর পিলারের লোড ক্ষমতা ৪৫ শতাংশ এবং মেয়াদ ৩০ বছর বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিদ্যমান কোনো কাঠামোতে আধুনিক পদ্ধতি ও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করে সেটির কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে রেট্রোফিটিং বলা হয়। এ ছাড়া কোনো কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ যেমন কলাম, বিম বা ফাউন্ডেশনের ভার বহন করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত লোড নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাকে স্ট্রেংদেনিং বলা হয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, বিদ্যমান দেওয়ানহাট ওভারপাস বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। আরও আগেই সেতুটির কাজ করা খুবই প্রয়োজন ছিল। এখন রেট্রোফিটিং ও স্ট্রেংদেনিং প্রক্রিয়ায় সেতুটির অবকাঠামো মজবুত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে গ্রামে বাড়ছে বায়োপ্লান্ট

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দিন দিন বাড়ছে। আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ। শিল্পকারখানায়ও মিলছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। চাহিদা মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। একই সময়ে এলপিজি গ্যাসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রামীণ জনপদে নীরবে গুরুত্ব বাড়ছে বায়োগ্যাসের। গবাদি পশুর গোবর ও জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত এই জ্বালানি শুধু রান্নার খরচ কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে তৈরি করছে জৈব সার, কমাচ্ছে পরিবেশ দূষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন সম্ভাবনা।

বগুড়া সেই সম্ভাবনার এক বড় উদাহরণ। সরকারি উদ্যোগে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় স্থাপিত শত শত বায়োগ্যাস প্লান্ট এখন অনেক পরিবারের রান্নাঘরের প্রধান জ্বালানির উৎস। যে গোবর একসময় ছিল অব্যবহৃত বর্জ্য, সেটিই এখন রান্নার গ্যাস, জৈব সার ও কৃষি উৎপাদনের সহায়ক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে বগুড়ার ১২ উপজেলায় ৩৯৩টি বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু রয়েছে। এসব প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার ৯৬০ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার এবং ১৫ হাজার ৩০০ কেজি বায়ো-কেমিক্যাল। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৬৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, ঋণ বিতরণ করা হয়েছে পাঁচ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে বায়োগ্যাস প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প নয়। তবে গ্রামীণ পরিবারের রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমবে, একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গবাদি পশু পালন বেশি, সেখানে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি বিস্তারের সুযোগও বেশি।

বগুড়ায় এখন পর্যন্ত তিনটি বায়োগ্যাস পল্লি গড়ে উঠেছে। ধুনটের পাঁচথুপী ও গোসাইবাড়ী এবং গাবতলীর জামিরবাড়িয়া গ্রামের এসব পল্লিতে প্রযুক্তিটির সুফল মিলছে সরাসরি। জামিরবাড়িয়া গ্রামের ৩৬টি পরিবার নিজেদের গরুর গোবর ব্যবহার করে প্রতিদিন রান্নার গ্যাস উৎপাদন করছে। একই সঙ্গে প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার ব্যবহার হচ্ছে কৃষিজমিতে। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমছে।

জামিরবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ শিমু বেগম বলেন, ‘আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য কাঠ ও খড় সংগ্রহ করতে হতো। এখন বায়োগ্যাস ব্যবহার করায় রান্না সহজ হয়েছে।’ একই গ্রামের উদ্যোক্তা সাথী খাতুন বলেন, আগে গরুর গোবরের তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। এখন সেই গোবর থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে। প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলনও মিলছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক সেলিম উদ্দিন বলেন, বায়োগ্যাস প্রকল্পকে শুধু একটি জ্বালানি কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি উৎপাদন এবং আত্মকর্মসংস্থানের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।

বায়োগ্যাস প্লান্টে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর ও পানি ডাইজেস্টারে প্রবেশ করানো হয়। বায়ুশূন্য পরিবেশে জৈব বর্জ্য পচে মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি রান্নাঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালভের সাহায্যে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই গ্যাস ব্যবহার করে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান কিংবা অন্যান্য ছোট যন্ত্রও চালানো সম্ভব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে চাহিদা বাড়ছে। সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখা হয়তো বায়োগ্যাসের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে গ্রামীণ পর্যায়ে রান্নার জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশের চাহিদা পূরণে এটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

কৃষি বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক জমির জৈবগুণ কমে যাচ্ছে। বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় থাকে এবং উৎপাদন ব্যয়ও কমে। পাশাপাশি গোবর খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে যে দুর্গন্ধ, মাছি-মশার উপদ্রব ও পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হয়, বায়োগ্যাস প্রযুক্তি সেই সমস্যাও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার বায়োগ্যাস প্লান্টগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ ঘনফুট কার্বন নির্গমন কমাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার, যা কৃষিতে জৈব উপাদান ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখছে।

তবে এই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পর্যাপ্ত গবাদি পশু না থাকলে প্লান্ট থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় না। নিয়মিত গোবর সরবরাহ, কারিগরি জ্ঞান এবং সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে একদিকে পরিবারের জ্বালানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, বায়োগ্যাস প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

ইমরান খানের মুক্তি দাবিতে পাকিস্তানে বিক্ষোভ, ধরপাকড়

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি দাবিতে বুধবার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। পুলিশের কঠোর অবস্থানের মুখেও সমর্থকরা এই কর্মসূচি পালন করেন।

ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, পাঞ্জাব প্রদেশে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ২০ জনের বেশি কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এএফপি প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে লাহোরে দলীয় কর্মীদের বড় জমায়েত দেখা যায়। পরে সেখান থেকে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করে।

বিক্ষোভকারীদের মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। বুধবার লাহোরে। ছবি: এএফপি

বিক্ষোভকারীদের মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। বুধবার লাহোরে। ছবি: এএফপি

একটি ছবিতে, বিক্ষোভ চলার সময় ‘ইমরান খানকে মুক্তি দিন’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায় সমর্থকদের। বুধবার এই নেতা তাঁর কারাবন্দি জীবনের তিন বছর পূর্ণ করলেন। একটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনি জেলে আছেন।

ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া ৭৩ বছর বয়সী ইমরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি মামলা আছে। এরমধ্যে কয়েকটিতে সাজা স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। তবে অন্যান্য মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি এখনও কারাগারে আছেন।

পিটিআইয়ের সমর্থককে আটক করে পুলিশ। বুধবার লাহোরে। ছবি: এএফপি

পিটিআইয়ের সমর্থককে আটক করে পুলিশ। বুধবার লাহোরে। ছবি: এএফপি

এদিকে ইমরান খানের মুক্তি দাবিতে হওয়া বিক্ষোভ মিছিলের দিনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরে সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদেরকে অনুমতি নিতে হবে। পাকিস্তানি নাগরিকরা বিদেশি গণমাধ্যমের হয়ে কাজ করলে, তাদের ক্ষেত্রেও এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য।

মোদির সেই রিল ব্লকের ঘটনায় ক্ষমা চাইল মেটা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রিল ব্লক বা অপসারণের ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। বুধবার কোম্পানিটির একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তখন তিনি মেটার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করেন।

মেটার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফেসবুক থেকে নরেন্দ্র মোদির ভিডিও বার্তাটি পাঁচ ঘণ্টার জন্য সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে বৈঠকে এর জন্য ক্ষমা চেয়েছেন কোম্পানির প্রধান বৈশ্বিক কর্মকর্তা জোয়েল কাপলান।

বিবৃতিতে কাপলানের একটি উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘পিএম মোদির পোস্ট ভুল করে রেস্ট্রিক্ট করার জন্য আমি মন্ত্রীর কাছে মেটার পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়েছি।’ মেটার এই কর্মকর্তার সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর আর কি নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা জানতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে হিন্দুস্থান টাইমস। তবে তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার সময় নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে দুটি সেলফি ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি ভিডিও সাময়িকভাবে ব্লক করেছিল মেটা। কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রকাশ করা বার্তায় তখন বলা হয়েছিল, ‘আইনি অনুরোধের কারণে ভারতে এটি পাওয়া যাচ্ছে না।’ পরে সমালোচনা শুরু হলে প্ল্যাটফর্মটি দ্রুতই ভিডিওটি চালু করে দেয়।

ঘটনাটির জন্য ক্ষমা চাইতে মঙ্গলবার যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গকে তিনদিনের সময়সীমা দেয়। এতে বলা হয়, জাকারবার্গ যদি তিনদিনের মধ্যে ক্ষমা না চান, তাহলে তিনি ভারতে ‘ইমিউনিটি’ বা বিশেষ আইনি সুরক্ষা হারাতে পারেন।

গত সোমবার কমিটির চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দুবেও এমন সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর রিল সাময়িকভাবে ব্লক করার জন্য জাকারবার্গের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তা না হলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারার আওতায় মেটা সুরক্ষা ব্যবস্থা হারাবে।

ফাঁকা পড়ে থাকা ৫১ প্লটের অর্ধেকই ফরচুন গ্রুপের ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরী

ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ৫১টিই ফাঁকা পড়ে আছে। এগুলোতে কোনো শিল্পকারখানা বা উৎপাদন নেই। এ প্লটগুলোর মধ্যে ২৫টিই ফরচুন গ্রুপের। তিন বছর আগে বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি তারা। এমনকি বিসিকের প্রায় দেড় কোটি টাকা পাওনাও পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি।

বকেয়া কিস্তির টাকা আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বিহিত করতে পারছেন না বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তারা। বিসিক কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
২০২৩ সালে ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ফরচুন গ্রুপের নামেই বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৫টি। ফরচুনের নামে বরাদ্দ করা প্লটে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের লে-আউট দাখিল ও জমির কিস্তির টাকা বাবদ বকেয়া এক কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ না করলেও বরাদ্দ  প্লটগুলো এখনও বাতিল করা হয়নি। বিসিক একাধিকবার এ টাকা পরিশোধের নোটিশ দিলেও পাওনা পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেই মালিকপক্ষের। এ ছাড়া শিল্পনগরীতে চালু থাকা বিভিন্ন শিল্প ইউনিটগুলোর কাছে বকেয়া পড়েছে আরও এক কোটি টাকা।

২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীর মোট জমির পরিমাণ ১১.৮ একর। শিল্পনগরীতে মাত্র ১৫৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই শিল্পনগরীর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবসার প্রসার ঘটবে– এমনটাই আশা ছিল সবার। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে এ নগরী। নগরীতে মোট প্লটের এক-তৃতীয়াংশ ফরচুন গ্রুপের নামে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া শিল্পনগরীর অপর ৫৪টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২৮টি প্লটে ১১টি শিল্প ইউনিট উৎপাদন শুরু করেছে। বাকি ২৬টি প্লট ফাঁকা। এর মধ্যে পাঁচটি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে উদ্যোক্তারা নিতে না চাওয়ায়। এ হিসাবে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ৫১টিই ফাঁকা পড়ে আছে।

অন্য যারা আছে তাদের দু-তিনটি ছাড়া বেশির ভাগ প্লটই চলছে কোনোমতে। এদিকে বিসিকের প্লট নিয়ে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে। তাদের কার কারও আশা ছিল, বিসিকের প্লট পেলে সহজ কিস্তিতে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাবে।

জানতে চাইলে শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, ‘এ এলাকা নদীমাতৃক হলেও শিল্পনগরীর সঙ্গে নদীর কোনো সংযোগ নেই। তাই ভারী শিল্পের উদ্যোক্তারা আসছেন না। এত ছোট জায়গায় শিল্পনগরী হয় না। পশ্চিম পাশের ইট ভাটার জমি অধিগ্রহণ করে সুতালরী ব্রিজ পর্যন্ত এ নগরী নেওয়া হলে বড় অনেক উদ্যোক্তা আসতে রাজি। পায়রা বন্দর চালু হলেও অনেক উদ্যোক্তা এখানে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রত্যাশা অনুসারে ছোট উদ্যোক্তাদের আনা যায়নি, এটা ঠিক। ফরচুনের প্লট বরাদ্দ বাতিলের বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছি।’

শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, ‘বিসিকে প্লট বরাদ্দ পাওয়া উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ না পাওয়ার কারণ হলো তাদের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আমরা ব্যাংকে কোনো সুপারিশপত্র দিতে পারি না।’

ফরচুনের প্লট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের বকেয়া টাকা আদায়ে অফিসে গিয়ে, ফোনে কোনোভাবেই পাচ্ছিনা। বকেয়া টাকা আদায়ে তাগাদাপত্রের পাশাপাশি ফরচুনকে চূড়ান্ত পত্র দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে আলোচনা করে প্লট বরাদ্দ বাতিল করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’

তিনি বলেন, আসলে এখানে উদ্যোক্তার অভাব। এখানে উৎপাদিত পণ্য অন্য জায়গায় পাঠাতে খরচ বেশি পড়ায় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম। এ ছাড়া শিল্পকারখানা করলে এখানে শ্রমিক আনতে হয় অন্য জেলা থেকে। জেলার যারা প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, তাদের এগিয়ে আসা উচিত। নদীবেষ্টিত এ জেলায় মাছ সংরক্ষণাগার, পেয়ারা ও আমড়ার জেলি কারখানা ইত্যাদিহতে পারে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং তাদের সচেতন করে উৎপাদনমুখী শিল্পে আগ্রহ বাড়াতে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মোমিন উদ্দিন বলেন, বিসিক এখানে ঝালকাঠির উদ্যোক্তাদের খুব একটা আগ্রহী করে তুলতে পারেনি। ফরচুনের মালিকপক্ষ একাই ২৫টি প্লট নিয়ে কিছু না করায় সেগুলো ফাঁকা। প্লটের কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় পরিশোধে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে একবার ফরচুন গ্রুপের সিইও পরিচয়ে মো. হাফিজ এবং আরেকবার মিজানুর রহমানের পিএস পরিচয়ে মো. মিরাজ ফোন রিসিভ করেন। মো. হাফিজ বলেন, ‘ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ফরচুন গ্রুপের প্লট আছে। স্যার মিটিংয়ে আছেন। মিটিং শেষ করে কল ব্যাক করবেন।’ কিন্তু কেউ কল ব্যাক করেননি। গতকাল বুধবার নম্বরটিতে আবারও বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও কেউ রিসিভ করেননি।