Home Blog Page 9

দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়ায় ঢাকার তীব্র ক্ষোভ

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সরকারকে আগে থেকে উদ্বেগ জানানোর পরেও এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা খেদ প্রকাশ করেছে।

গতকাল বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদে ক্ষোভ ও খেদের কথা জানানো হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গতকাল বিকেলে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রথমে বক্তব্য এবং পরে প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কারাবাস বা আরও খারাপ কিছুর শঙ্কা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো অনুশোচনা কিংবা ভুল স্বীকার করার মানসিকতা দেখাননি।

দিল্লির এ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রথমে একটি রেকর্ড করা বক্তব্য দেন। পরে সরাসরি ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। তবে তখন কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া সশরীরে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

এ সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশের জনগণ দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে যে, জাতি আর কখনও ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরে যাবে না। বাংলাদেশ কখনও কোনো পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আর কোনো স্থান হবে না। সাজাপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তাঁর মাফিয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনও স্থান পাবে না।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা এ ধরনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনও তাই করছে। এতে বলা হয়, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিক লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী।

একই সঙ্গে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, যে কোনো অজুহাতে তাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত দিয়েছে এবং বাংলাদেশ-ভারতের সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

এর আগে গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় শেখ হাসিনা যাতে দিল্লি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ড না চালাতে পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

একই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গ্যাস সংকট সময়মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না, রপ্তানি আদেশ কমছে এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ থাকার তথ্য দিলেন বিকেএমইএ সভাপতি

গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইন্টারলুক বিডি কারখানায় ইউরোপের কয়েকটি ব্র্যান্ডের পোশাক উৎপাদন হয়। গ্যাস সংকটে গত দুই সপ্তাহ তারা অন্তত পাঁচ দিন কারখানা বন্ধ রেখেছে। খোলা থাকার সময়ে কোনো দিনই পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজ করা সম্ভব হয়নি। গড়ে ৬০ শতাংশের মতো উৎপাদন কম হচ্ছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ২টায় সরেজমিন কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ দেখা যায়।

ইন্টারলুক বিডি কারখানার হেড অব অপারেশন্স কেফায়েত উল্লাহ শাকিল সমকালকে বলেন, লাইনে গ্যাস না পাওয়ায় সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে বেশি ব্যয়ে বিকল্প উপায়ে কোনো রকমে সক্ষমতা থেকে ৩০ শতাংশ কম উৎপাদন নিয়ে চলছিল। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ কোনো উৎস থেকেই গ্যাস পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, উৎপাদন কাঠামো চেইনভিত্তিক। কোনো পর্যায়ে কাজ বন্ধ থাকলে বাকি কাজ আর এগিয়ে নেওয়া যায় না। এ কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত এক মাসে অন্তত পাঁচবার আকাশপথে পণ্য পৌঁছাতে হয়েছে তাদের। এর অর্থ কেবল আর্থিক লোকসান নয়; একই সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা হারানো। যার কারণে আগামীতে রপ্তানি আদেশ আরও কমবে।

নারায়ণগঞ্জের এ বি ফ্যাশন কারখানায় ফ্রান্সের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের এক লাখ পিস ট্রাউজারের রপ্তানি আদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। গত সোমবার তারা ক্রেতাকে জানিয়েছে, ৫০ হাজার পিসের বেশি উৎপাদনের সক্ষমতা নেই।

তীব্র গ্যাস সংকটে এমন বিপদে পড়েছে দেশের বেশির ভাগ তৈরি পোশাক কারখানা। অনেক কারখানা ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। কৌশল হিসেবে চার থেকে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে কিছু কারখানা। গতকাল ৫ আগস্টের ছুটির সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের ছুটি দিয়েছে কোনো কোনো কারখানা। আগামীকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। বৃহস্পতিবারের ছুটি পরে সমন্বয় করে নেবেন তারা। আবার কোনো কোনো কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণার কথাও জানা গেছে।

জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) গাজী জসীম উদ্দিন গতকাল সমকালকে বলেন, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় অনেক কারখানাই দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারে না। অথচ শ্রমিকদের দিনের মজুরি থাকে। এ কারণে কিছু কারখানা সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে এই সময়টায় ছুটি ঘোষণা করেছে। এতে শ্রমিকরাও খুশি। তারা ছুটি ভোগ করছে। অবশ্য, যাদের শিপমেন্টের চাপ আছে, আবার গ্যাসের জন্য খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে না; এ রকম কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে, বৃহস্পতিবার বন্ধ রাখতে হলে তারা এই দিনের মজুরি দেবে না। এসব কারখানা গতকাল খোলা ছিল। আজ বৃহস্পতিবারও খোলা আছে।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কিছু কারখানা আকাশপথে পণ্য পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছে। এ রকম বাস্তবতায় গত এক মাসে রপ্তানি আদেশ কমেছে আগের মাসের চেয়ে ৩ শতাংশ। আগামীতে রপ্তানি আদেশ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত।

তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর মিলে অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ। সরবরাহ লাইনে গ্যাস নেই। ফলে দিন-রাত সমান। লাইনে গ্যাস না থাকলে রাতে গ্যাস আসার সুযোগ নেই।

গ্যাসের কারণে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে পোশাকের নিট খাতে। নিট কারখানার প্রায় শতভাগ ফেব্রিক্স বা কাপড় স্থানীয় বস্ত্রকল থেকে সংগ্রহ করা হয়। ওভেন (শার্ট, প্যান্ট) খাতের প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্সের মধ্যে আমদানি হয় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। পোশাক খাতের মূল সংকট তৈরি হয়েছে বস্ত্রকল থেকে তৈরি পোশাকের প্রধান কাঁচামাল ফেব্রিক্স না পাওয়ার কারণে।

বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে করা চুক্তির নির্ধারিত তারিখে পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পারলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হতে পারে। ক্রেতারা আগামীর জন্য আস্থা হারাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় এলে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হলেও চুক্তি থেকে কম দর দেবে ক্রেতারা। নয় তো আকাশপথে রপ্তানিকারকের দায়িত্বে পণ্য পৌঁছাতে হবে। বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান হবে। ক্রেতারা পোশাক না নিলে স্টকলট হিসেবে অত্যন্ত কম দামে স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি করে দিতে হয়।

দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বস্ত্রকলগুলো সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করতে পারছে না। ডায়িং, ফিনিশিংও বন্ধ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গতকাল সমকালকে বলেন, শিল্পে গ্যাস সংকট একটা জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। সরকারকে এই মুহূর্তে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা উচিত।

বিটিএমএ সভাপতি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বস্ত্র কিংবা তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতের শিল্পসহ ব্যাংক-বীমা খাতও চরম সংকটে পড়বে। এমন একটা কঠিন পরিস্থিতির শঙ্কা তারা আগেই করেছিলেন। এ জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই সরকার তাদের কথা শোনার জন্য সময় পর্যন্ত দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার শিল্পের গ্যাস দিয়ে সার উৎপাদন করেছে, যে সার আমদানি করা যেত।

তিনি জানান, গ্যাসের অভাবে স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গত বছর শুধু ভারত থেকেই ৩০ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি করতে হয়েছে। গত দুই বছর ১৫০ বস্ত্রকল বন্ধ হয়েছে। বাকিগুলোর উৎপাদন ৬০ শতাংশের নিচে। অথচ দেশের সুতা ব্যবহার হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন হতো। কর্মসংস্থান হতো। অথচ ভুল নীতির কারণে এখন আমরা একটা আমদানিনির্ভর দেশে পরিণত হচ্ছি। শুধু সুতা-কাপড় নয়; আমাদের হয়তো রুটি-কলাও একদিন আমদানি করে খেতে হবে।

পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ব্র্যান্ড-ক্রেতারা। কোনো কোনো ক্রেতা প্রতিনিধি রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে রপ্তানি আদেশ কমেছে ৩ শতাংশ। রপ্তানি আদেশ পরিস্থিতি বোঝা যায় আদেশ পাওয়ার পর কাঁচামাল আমদানির অনুমতি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সনদ থেকে। সরকারের পক্ষে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ এই সনদ দিয়ে থাকে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে জানান, রপ্তানিতে চলমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। অবশ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা কাটিয়ে ওঠা গেলে আগামী মাসগুলোতে উদ্যোক্তা এবং ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে।

বিজিএমইএ গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পোশাকশিল্প যখন নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি; যার মধ্যে রয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা; সেই সময়ে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ৩৮৯ কোটি ডলার রপ্তানি আয় একটি ভালো শুরু। তবে জুলাই মাসে বিজিএমইএ সম্পাদিত ইউডির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিতে চলমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা দূর করতে পারলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা পেলে আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরে আসবে বলে মনে করছে বিজিএমইএ।

ইরান যুদ্ধ শিগগিরই হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তির আশা

বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে কূটনৈতিক আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুয়েক দিনের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই আশাবাদ জানান। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারও আলোচনায় অগ্রগ্রতির কথা জানিয়েছে। খবর সিএনএন ও আলজাজিরার।

সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, আমরা ইরানিদের সঙ্গে কথা বলছি। আমার মনে হয় আজ বা কালকের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়া এবং এই সংঘাতকে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে আসার বিষয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি হলে প্রণালিতে সাধারণ জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।

সমুদ্রপথে ইরানের কোনো টোল বা ফি আদায়ের সুযোগ থাকবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই চুক্তির মূল ভিত্তিই হবে অবাধ চলাচল। গত কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতি কিছুটা অস্থির থাকলেও ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক চেষ্টা পূর্ণগতিতে চলছে এবং এই আলোচনা বর্তমানে খুবই অগ্রগামী পর্যায়ে রয়েছে। কাতার, পাকিস্তান ও ওমান দুপক্ষের মধ্যস্থতা করছে এবং চুক্তির খসড়া আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

ওমানের সঙ্গে ইরানের পৃথক পথ তৈরির আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতার কথা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ইরান জানিয়েছে, তারা কেবল পার্শ্ববর্তী দেশ ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করছে। ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্য সাইদ আজোরলু জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো এক থেকে তিন মাসের জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ইরান দাবি করছে, এই এলাকায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সেবা তারা দিয়ে থাকে।

জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, যে কোনো দেশের জাহাজের জন্য মুক্ত চলাচলের অধিকার থাকলেও ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরুর পর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান।

বিশ্ব তেল সরবরাহে ধস ও জাহাজে নতুন হামলা

যুদ্ধ এবং প্রণালি বন্ধ থাকার মাশুল গুনছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২৬০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ব বাজারে যেতে পারেনি। বর্তমানে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন আগের তুলনায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

কূটনৈতিক এই দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। হামলায় জাহাজের ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং একজন প্রকৌশলী নিখোঁজ রয়েছেন।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তেহরানের নেতৃত্বকে ‘নজিরবিহীন প্রতারক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, পাঁচ মাসের এই সংঘাত বন্ধ করে একটি ভালো সমঝোতা চুক্তিতে সই করার জন্য এটাই ইরানের জন্য ‘শেষ সুযোগ’।

তবে ট্রাম্প এটাও বলেছেন, এই আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর ওপর সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, তিনি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না।

অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই ওয়াশিংটনকে পাল্টা সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানি বন্দরে অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে মার্কিন বাহিনী ও যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যাপক ঝুঁকি এবং বড় ধরনের প্রাণহানির মুখে পড়বে।

এদিকে, কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় ইউক্রেনের তিনটি সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানোর জন্য ইরান প্রস্তুত ছিল বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান মহসেন রেজাই। তবে কিয়েভ এই ঘটনাকে ভুলবশত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করায় ইরান সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত রেখেছে।

ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে, কিন্তু তারা স্বীকার করতে চায় না: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরান বরাবরই এ ধরনের আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব ভালো আলোচনা করছি। তারা বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু আলোচনা চলছে।’

তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তব অগ্রগতি। তার ভাষ্য, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। তবে তারা চুক্তি না করলে সেটি তাদের জন্য ভালো হবে না।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তার দাবি, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তা হতে দেওয়া হবে না। হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, অচিরেই এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে যাবে। অন্যথায় ইরানকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

এ সময় তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলার পরিকল্পনা করেছিল। তবে সে সময় ইরানের পক্ষ থেকেই যোগাযোগ করে আলোচনার অনুরোধ জানানো হয়।

ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘তারা খুব ভদ্রভাবে বলেছিল, আমরা কি কথা বলতে পারি? আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, কথা বলতে পারি। চলুন, এবার বিষয়টির সমাধান করি।’

সাক্ষাৎকারে ইরান-নীতি নিয়ে আগের মার্কিন প্রশাসনগুলোরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নীতির সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে ইরানকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যদি আবার আলোচনা থেকে সরে আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। তার দাবি, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে যাবে না এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব হবে।

সাত মাসে বাংলা কিউআরে পরিশােধ বেড়ে ৬ গুণ

ফুটপাত বা গলির দোকান, সুপারশপ কিংবা শপিং মল সব জায়গায় ক্যাশলেস পেমেন্ট সুবিধা দিতে চালু হওয়া বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সবার জন্য অভিন্ন কিউআর (কুইক রেসপন্স) বাধ্যতামূলক করার পর গত মাসে বাংলা কিউআরে মোট এক হাজার ২৫০ কোটি টাকার পেমেন্ট বা পরিশােধ হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম মাসে যা ছিল ২১২ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রথম ৭ মাসে বাংলা কিউআরে পরিশােধ প্রায় ৬ গুণ বেড়েছে।

গত ১ জুলাই থেকে সব ব্যাংক, এমএফএসের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরে প্রতিস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়। যদিও ২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তির এ ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানো, ছাপানো নোটের ব্যবহার কমিয়ে লেনদেনকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও দ্রুত করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিউআরভিত্তিক লেনদেনে মার্চেন্ট থেকে এক শতাংশ চার্জ কাটা হয়। তবে ক্ষুদ্র মার্চেন্টের জন্য এ চার্জ যেন না লাগে সে জন্য সম্প্রতি একশ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর চ্যানেলে গত জুলাইয়ে দৈনিক গড়ে ৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা তথা মোট এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আগের মাস জুনে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮৪৫ কোটি টাকা। মে মাসে যা ৪৭৯ কোটি টাকা ছিল। এর আগে গত এপ্রিলে লেনদেন হয় ১৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া মার্চে ২২৯ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২১৮ কোটি এবং জানুয়ারিতে ২১২ কোটি টাকা লেনদেন হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ব্যাংক, এমএফএসসহ ৩৭টি প্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআরে যুক্ত হয়েছে। গত ১ আগস্ট পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৩৩টি। এক সপ্তাহ আগে গত ২৫ জুলাই যা ছিল ২২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৪১। অর্থাৎ শুধু শেষ সপ্তাহে কিউআর প্রতিস্থাপন হয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৫৯২টি। সারাদেশে বর্তমানে মার্চেন্ট সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। তবে নতুন করে কিউআর প্রতিস্থাপনে উঠে আসছে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নতুন করে ৫০ হাজার ৩০৩টি মার্চেন্টে কিউআর দিয়ে শীর্ষে ছিল। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির মোট কিউআর দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৪৫৭টি। শেষ সপ্তাহে শীর্ষ দশ কিউআর প্রতিস্থাপনের তালিকার দ্বিতীয় ছিল পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটি শেষ সপ্তাহে ৪৫ হাজার ৬৭৩টি কিউআর দেওয়ার পর মোট কিউআর ঠেকেছে তিন লাখ ৫৩ হাজার ৬৬১টিতে। কিউআর সম্প্রসারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। এর প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে নতুন কিউআর দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনেক এগিয়ে আছে। গত সপ্তাহে কিউআর সম্প্রসারণে পর্যায়ক্রমে জনতা ব্যাংক ১৭ হাজার ১৪৪টি, রূপালী ১৪ হাজার ৮৬, বাংলাদেশ কৃষি ১১ হাজার ৫৮৩টি, অগ্রণী ৮ হাজার ২২৮টি, সোনালী ৬ হাজার ৮২২টি, ডাচ্‌-বাংলা ৫ হাজার ২৬৩টি, ব্র্যাক করেছে ৪ হাজার ১৪০টি এবং টালিপে নতুন করে ৯৪৫টি কিউআর দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এক কিউআরে সব পরিশোধের সুবিধার ফলে দোকানদার ও ভোক্তা উভয়ের সুবিধা হয়েছে। একটি দোকানে এখন আর আগের মতো একাধিক কিউআর রাখার দরকার হচ্ছে না। এ ব্যবস্থার ফলে বাংলা কিউআরে লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। তিনি বলেন, একজন মার্চেন্ট যে ব্যাংক বা এমএফএসের কিউআরে পরিশোধ নেবে টাকাটা ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হবে। এটি তার জন্য ‘নো কস্ট ডিপোজিট’ হিসেবে বিবেচিত। ফলে কিউআর সম্প্রসারণে এখন ব্যাংকগুলো বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। অবশ্য এমএফএসগুলোর বিষয় বিবেচনা করে মার্চেন্টের ওপর ১ শতাংশ চার্জ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি না থাকলে এ লেনদেন আরও বাড়ত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ

দেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধসহ মোট ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, যন্ত্রাংশসহ মোট এক হাজার ৫৪টি পণ্য একই ধরনের সুবিধায় বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার পাবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে দরকষাকষি শেষ হয়েছে। এখন দুই দেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তি সই হবে। প্রায় এক বছরের আলোচনার পর মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এ-সংক্রান্ত কার্যপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে যৌথভাবে ঘোষণা দেন দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ রপ্তানিপণ্য ও সেবায় দক্ষিণ কোরিয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। আর বাংলাদেশ সুবিধা দেবে সে দেশের ৮৭ শতাংশ পণ্য ও সেবায়। চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই এ সুবিধার আওতায় আসবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৯ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৪৯ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। আমদানি করে প্রায় ৯০ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৪১ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং সিরামিক সামগ্রী রপ্তানি করে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় শিল্পযন্ত্র, লোহা ও ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, রাসায়নিক এবং কাগজজাত পণ্য।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, সিইপিএ কার্যকর হলে শুধু রপ্তানি নয়, শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য সক্ষমতা ধরে রাখতে এ চুক্তি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশের প্রধান নেগোসিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান নেগোসিয়েটর পার্ক গিউন-ওহ এবং ডেপুটি প্রধান নেগোসিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এফটিএ) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির একটি বড় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির চূড়ান্ত আলোচনা শেষ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু সেই পরিমাণ বিনিয়োগ দেশে নেই। তাই রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তিতে যাচ্ছে, যা এলডিসি উত্তরণের পরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তাড়াহুড়া করে এ চুক্তি চূড়ান্ত করেনি। দুই বছরের কাজ দিন-রাত পরিশ্রম করে মাত্র ছয় মাসে শেষ করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। এটি কোনো গোপন বিষয় নয়; সবকিছুই উন্মুক্ত করা হবে। যে কেউ তা বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের। এতদিন সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত টেক্সটাইল খাত। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি মহাসড়কের মতো সংযোগ তৈরি হবে। এখন সময় এসেছে প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে সম্পর্ক সম্প্রসারণের। তিনি বলেন, সিইপিএ কার্যকর হলে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও বাড়বে।

সেবা খাতে বড় অঙ্গীকার 
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ উল্লেখযোগ্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে। এর ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৫ সালের ২২ থেকে ২৭ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে প্রথম দফা আলোচনা শুরু হয়। পূর্বনির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী মোট পাঁচ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে দুই দফা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা বৈঠক হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয়ে প্রধান নেগোসিয়েটর পর্যায়ে প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আলোচনার সমাপ্তি ঘটে।

বিশেষজ্ঞ মত
কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির বিষয়ে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক সমকালকে বলেন, এটি একটি ভালো নীতি উদ্যোগ। এর আগে জাপানের সঙ্গেও এ ধরনের চুক্তি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বার্তা যাবে, বাংলাদেশ এ ধরনের বাণিজ্য আলোচনা ও দরকষাকষিতে সক্ষম।

ছাত্রদলের মাস্তানি সহ্য করা হবে না: শিবির সভাপতি

ছাত্রদলের মাস্তানি সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্টনে সংগঠনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে দেওয়ার দাবি তোলায় করায় শিবির নেতাদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল।

নূরুল ইসলাম বলেন, শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতায় সাধারণ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও জকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল। প্রতিটি ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি করতে না পেরে এই সন্ত্রাসীরা আজ উন্মাদ হয়ে গেছে।

শিবির সভাপতি বলেন,  উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের ওপর সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে। ভিত্তিহীন গুজবকে হাতিয়ার করে থানার ভেতর ডাকসু নেতাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের পর জকসুর ভিপি, জিএসের ওপর হামলা চালানো হল।

নূরুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিনির্মাণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হচ্ছে। সরকারের পাঁচ মাসের চরম জনদুর্ভোগ, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতেই দেশজুড়ে ছাত্রদল-যুবদলের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে তিন দফা জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে, জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফের চোয়াল ভেঙে দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান রুমি, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনায় জড়িত যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নসহ অন্যদের গ্রেপ্তার করতে হবে। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের নিয়ন্ত্রণ শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং জগন্নাথের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণ কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর।

সরকারকে জামায়াত আমির শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করুন

শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা হলো না। শুনেছি, স্বল্প সংখ্যক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সামনে আনতে হবে; এটা সরকারের দায়িত্ব।  উদ্যোগ নিন, পরিবারগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রকাশিত ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

জামায়াত আমির বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, তা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির পর তা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল নতুন বয়ান তৈরি করছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। সরকারি দল তা মানবে না, হতে পারে না। মানতেই হবে। ইনশাআল্লাহ, মানতে বাধ্য করা হবে।

সরকারকে প্রতি হুঁশিয়ার করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাঁদের কারণে আজ আপনারা সরকারে, সেই জুলাই যোদ্ধাদের চোখগুলো কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটাও রক্ত ঝরাবেন না। যদি রক্ত ঝরান, এটি অবশ্যই চরম নিমকহারামি হবে।

জ্বালানি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের উন্নতি নেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং

দেশজুড়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের তেমন উন্নতি হয়নি। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল বন্ধ থাকার প্রভাব এখনও কাটেনি। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তিও কমেনি।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বর্তমানে লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার সচেষ্ট। এ ব্যাপারে সরকার কাজ করছে। আশা করি, দ্রুতই সমাধান হবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং হয়েছে দুই হাজার ২৮৮ মেগাওয়াট। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গত সোমবার রাত ১২টায় ১৬ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং দাঁড়ায় তিন হাজার ২৩২ মেগাওয়াটে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। রোববার বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এতে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর একটি টার্মিনাল বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে, যা দৈনিক চাহিদার চেয়ে অনেক কম।

পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির বয়লার মেরামত শেষ হয়েছে, তবে এখনও পরীক্ষামূলক চালানো হয়নি। আজকালের মধ্যে এটি পরীক্ষা করা হতে পারে। এই সংকটে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্পাঞ্চলে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও ফতুল্লার গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় ১৫ পিএসআই চাপের বদলে মিলছে ২ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, স্পিনিং ও সিরামিক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। অনেক কারখানা দিনের বদলে রাতে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে না পেরে অতিরিক্ত ব্যয়ে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও বিটিএমএ দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে।

পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখনও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা কমে গেছে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও কমেনি। দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করলেও লোডশেডিংয়ের কারণে সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের যুগপৎ সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

চট্টগ্রামেও বাড়ছে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত–সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে।

নগরীর আরকান হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, বিদ্যুৎ একবার গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টার আগে আসে না। প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদার চেয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে চাহিদা ছিল প্রায় এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া গেছে ৯৫০ মেগাওয়াট। প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি কর্মকর্তারা।

 

বজ্রপাত ঠেকাতে প্রকল্পের পর প্রকল্প, নেই সুফল

বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। এই জুনের প্রথম তিন সপ্তাহে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যান। অথচ নব্বইয়ের দশকে এই সংখ্যা ছিল গড়ে মাত্র ৩০ জন।

বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর প্রাণহানি কমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া হয়েছিল একের পর এক প্রকল্প। ৪০ লাখ তালগাছ রোপণ, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সেন্সর বসানোসহ সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে শত শত কোটি টাকা। তবে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পই কার্যত ভেস্তে গেছে। কোথাও গাছের অস্তিত্ব নেই, কোথাও যন্ত্র অকেজো, আবার কোথাও প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে হয়েছে অনিয়ম ও অপচয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বজ্রপাত এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপের বদলে লোকদেখানো প্রকল্পের কারণে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

৪০ লাখ তালগাছের প্রকল্পে নেই গাছ
বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। এতে খরচ হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সরকারের যুক্তি ছিল, তালগাছের উচ্চতা ও গঠন বজ্রপাত মাটিতে নামিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তবে দুই বছর না যেতেই দেখা যায় অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও গবাদি পশু খেয়ে ফেলেছে, কোথাও পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে। আবার কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।

রাজশাহীতে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১৪ লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। খরচ হয়েছিল দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। এখন সড়কের পাশে সেই গাছের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

রংপুর বিভাগের আট জেলায় দুই লাখের বেশি তালগাছের চারা ও বীজ রোপণে খরচ হয়েছিল ছয় কোটির বেশি টাকা। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ৯৫ শতাংশ গাছই টেকেনি।
সুনামগঞ্জে ২০১৮ সালে এক লাখ এবং পরে আরও দুই হাজার তালগাছ লাগানোর কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

নেত্রকোনায় দুই লাখের বেশি তালগাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছিল। স্থানীয় কৃষিবিদ ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, সেই গাছগুলোরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র পাওয়া গেছে।

কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড, অধিকাংশই অচল
তালগাছ প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় ৩৩৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানোর জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এসব দণ্ডের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিজমি বা হাওরে না বসিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, বাজার কিংবা মুজিবপল্লিতে বসানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি দণ্ড স্থাপন করা হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, সেই দণ্ড কোথায় আছে স্থানীয় লোকজনই জানেন না। বেশির ভাগ বজ্রনিরোধক দণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণও হয় না। বগুড়ায় ২০২১ সালে প্রায় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১টি যন্ত্র বসানো হয়েছিল। এসবের ১৯টিই অকেজো বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

নেত্রকোনায় ২০২২ সালে স্থাপন করা ৩২টি দণ্ডের অধিকাংশই কার্যকারিতা হারিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ হাওরাঞ্চলের বদলে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বসানো হয়েছিল সেগুলো।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের যন্ত্রাংশ বসানোর ছয় মাসের মধ্যে চুরি হয়ে যায়।
বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে ‘লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর’ স্থাপন করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই সেন্সরগুলো বজ্রপাতের ১০ থেকে ৩০ মিনিট আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন অধিকাংশ সেন্সর কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কৃষক ছাউনি
সরকারি প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি ছোট উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে উপজেলার শিবরাম গ্রামে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি কৃষক ছাউনি। ঝড়বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।
স্থানীয় কৃষক আল আমিন বলেন, ‘আগে বৃষ্টি এলেই মাঠে আতঙ্কে থাকতাম। এখন অন্তত আশ্রয় নেওয়ার একটা জায়গা আছে।’
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, তালগাছ বড় হতে কয়েক দশক সময় লাগে। কিন্তু কৃষক ছাউনি দ্রুত নির্মাণ করা সম্ভব এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানি কমাতে কার্যকর হতে পারে।

আবারও নতুন প্রকল্প
পুরোনো প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার মধ্যেই নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলে সাইরেন স্থাপন, শক্তিশালী টাওয়ার নির্মাণ এবং কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুস ছোবহান জানান, আগে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। কমিশনের পরামর্শে সেটি ছোট পরিসরে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

তবে নতুন উদ্যোগ নিয়েও আশাবাদী নন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, আগের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের নামে লুটপাট হয়েছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মকর্তা একই রয়েছেন। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন প্রকল্পও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি আছে।