নিজস্ব প্রতিনিধিঃ পরিশ্রম, উদ্যোক্তা মনোভাব, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করছে বাংলাদেশী কমিউনিটি। বাংলাদেশী আমেরিকানরা এই দেশের অগ্রগতির অংশীদার, তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় পাশে থাকতে হবে। টাইম টেলিভিশনের এক যুগ ও বাংলা পত্রিকা’র ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ও প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক দলীয় নেতা হাকিম জেফ্রিস বাংলাদেশী কমিউনিটির অবদান তুলে ধরে এ অঙ্গীকার করেন। অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তারাও কমিউনিটির অগ্রযাত্রার টাইম টেলিভিশন ও প্রশংসা করে নাগরিক অংশগ্রহণ, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর, রোববার নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া ওয়ার্ল্ড ম্যানরের বলরুমে দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিকেলে মূল পর্ব শুরু হয় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। এর আগে অপরাহ্নে ফিতা কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের টাইটেল স্পন্সর ও ফ্লোরিডার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনির হোসেন। এতে মূলধারার জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবি, ব্যবসায়ী ও কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিরুপ প্রকৃতি উপেক্ষা করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী সপরিবারে অংশ নেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে ছিল বিজনেস এক্সপো, একাধিক সেমিনার, শুভেচ্ছা বিনিময় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বাংলা পত্রিকা’র তিন দশক এবং টাইম টেলিভিশনের এক যুগের পথচলা উদ্যাপনের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে প্রবাসীদের অর্জন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের করণীয়।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন সি ল্যু, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলী সদস্য জেসিকা গনজালেজ রোহাস ও প্যাট্রিক মার্টিনেজ, প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদ, অনুষ্ঠানের টাইটেল স্পন্সর ও ফ্লোরিডার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনির হোসেন, সাউথ এশিয়ান জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শ্রী শ্রীনিবাসন, নিউজার্সীর মনমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোলাম এম. মাতবর, এটর্নি মীর মিজানুর রহমান, বাংলা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহাসান, কুইন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার এট লার্জ অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, অধ্যাপক ডক্টর শওকত আলী, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী আলহাজ সোলায়মান ভূইয়া, ডাক্তার বর্নালী হাসান, আরমান চৌধুরী সিপিএ, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম, মামুন টিউটেরিয়াল-এর কর্ণধার শেখ আল মামুন, পার্কচেস্টারের রিয়েল এস্টেট এর কর্ণধার সালেহউদ্দিন সাল, রিয়েল এস্টেট ইন্সট্রাক্টর আজিজুল হক মুন্না, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিষ্ট আমীন মেহেদী এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি তরুণ বক্তা নাবিল এইচ মুহিত প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দীন নাসের, মাহমুদ খান তাসের ও সাঈদ তারেক, বাংলা পত্রিকা’র সাবেক বার্তা সম্পাদক হাবিব রহমান, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম মজুমদার, সাপ্তাহিক নবযুগ সম্পাদক শাহাবুদ্দীন সাগর, সাপ্তাহিক হককথা ও ইউএনএ সম্পাদক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাপ্তাহিক যুগান্তর সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, অ্যাসাল-এর প্রতিষ্ঠাতা মাফ মিজবাহ উদ্দিন, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি নার্গিস আহমেদ ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাজী হেলাল আহমেদ, ফার্মাসিস্ট সাহাব আহমেদ ও মোস্তাক আহমেদ, জাকির চৌধুরী সিপিএ, ডাক্তার জুন্নুন চৌধুরী, ডাক্তার ইনামুল হক এম সবুর, মিয়া মোহাম্মদ আবজাল, বেস্ট কেয়ার হোম সার্ভিস-এর প্রেসিডেন্ট ও সিওও ব্রায়েন শীল, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রোকন হাকিম, বাগ-এর সভাপতি জয়নাল আবেদীন ও সাধারণ সম্পাদক শাহানা মাসুম, কবি ও লেখক এবিএম সালেহ উদ্দিন, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিষ্ট আব্দুস শহীদ, দুলাল মিয়া এনাম, কাজী ফৌজিয়া, মাজেদা উদ্দিন, ঢাকা জেলা এসোসিয়েশনের সভাপতি দুলাল বেহেদু, বিশিষ্ট রাজনীতিক জিল্লুর রহমান জিল্লু, মূলধারার রাজনীতিক খোরশেদ খন্দকার, ব্যবসায়ী ও শেফ খলিলুর রহমান, এস্টোরিয়া ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি সোহেল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদ উদ্দিন, সহ সভাপতি কয়েস আহমেদ, ডেভিড সরকার, মীর মোহাম্মদ হোসেন সহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশী-আমেরিকানদের অবদানের স্বীকৃতির সঙ্গে উঠে আসে অভিবাসীদের অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং কমিউনিটির রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ।
বাংলা পত্রিকার তিন দশক ও টাইম টেলিভিশনের এক যুগের পথচলাকে ঘিরে বক্তাদের অভিনন্দনের সঙ্গে উঠে আসে ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও। নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশন, মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরা এবং প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ তৈরির কাজে দুই প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তাঁরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশী আমেরিকানদের অবদানের প্রশংসা করে হাকিম জেফ্রিস বলেন, এই কমিউনিটি পরিশ্রমী, উদ্যোগী, পরিবারকেন্দ্রিক, পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি যত্নশীল এবং দেশপ্রেমিক। ব্যবসা, পেশা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা নিউইয়র্ক সিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বাংলাদেশি আমেরিকানদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার করেন তিনি।
হাকিম জেফ্রিস তার বক্তব্যে নিউইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশী আমেরিকান কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের আত্মত্যাগ স্মরণ করে বলেন, তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ নিউইয়র্কের সেরা মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশী অভিবাসী কমিউনিটির অবদানের প্রতিফলন। বিভিন্ন দেশ ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের ঐক্যই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অভিবাসন প্রসঙ্গে জেফ্রিস বলেন, আইসের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সামগ্রিক অভিবাসন সংস্কারের জন্য তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অবদান কুইন্স, ব্রুকলীন, নিউইয়র্ক সিটি ও যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
হাকিম জেফ্রিস বক্তব্যের শুরুতে এই আয়োজনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, স্টেট অ্যাসেম্বলীর সদস্য হিসেবে তিনি এই অনুষ্ঠানে এসেছেন, কংগ্রেস সদস্য হিসেবেও অংশ নিয়েছেন। এবার উপস্থিত হয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হিসেবে। টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অংশ নিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করে তিনি প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান।
জেফ্রিসের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় স্বাধীন কমিউনিটি সাংবাদিকতা। তিনি বলেন, নিজের কমিউনিটি, সিটি ও দেশের চলমান ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত রাখতে টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকা কাজ করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। জনগণের সরকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বকে সম্মান করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী রক্ষার অঙ্গীকার করে জেফ্রিস বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে যা-ই বলুন, প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে যাবেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য তুলে ধরার জন্য টাইম টেলিভিশনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে জেফ্রিস অভিযোগ করেন, অর্থনীতি, সরকারি শিক্ষা, খাদ্যসহায়তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইন মেনে চলা অভিবাসী কমিউনিটি রিপাবলিকানদের নীতির চাপের মুখে রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখনও ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেন তিনি। ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবা সাশ্রয়ী করা এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন এই কংগ্রেস নেতা।
টাইম টেলিভিশনের এ দীর্ঘযাত্রায় সিইও আবু তাহের ও পরিচালক সৈয়দ ইলিয়াস খসরুসহ সকলের অবদান স্মরণ করে বিশেষ ধন্যবাদ জানান হাকিম জেফ্রিস।
কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং বাংলাদেশী আমেরিকান কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, এই কমিউনিটি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। বহু বাংলাদেশী আমেরিকানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা তাঁর জন্য সম্মানের। টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার অগ্রযাত্রায় আবু তাহের এবং সংশ্লিষ্ট সবার অবদানের প্রশংসা করেন তিনি।
বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন দাবির পক্ষে নিজের কাজের বিবরণ দিতে গিয়ে গ্রেস মেং ঈদের দিন ফেডারেল ছুটির স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগের কথা বলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের লক্ষ্য ও আদর্শ সমর্থন এবং হালাল খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন। ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলা এবং হুমকি ও আক্রমণ থেকে কমিউনিটিকে সুরক্ষিত রাখার কাজে পাশে থাকার অঙ্গীকার জানান তিনি।
গ্রেস মেং অভিযোগ করেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি কমিউনিটির মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং কর্মজীবী পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা আরও ব্যয়বহুল করেছে। স্ন্যাপ, মেডিকেইডসহ প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে কাটছাঁটের সমালোচনা করেন তিনি। এসব নীতির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশী আমেরিকানদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলী সদস্য জেসিকা গনজালেজ রোহাস বলেন, কুইন্সের বাংলাদেশী কমিউনিটির শক্তিশালী কণ্ঠ তুলে ধরতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার মতো গণমাধ্যম মানুষের মতামত, দাবি ও নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসে। কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গণতান্ত্রিক আলোচনার কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান দুটির ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
স্টেট সিনেটর জন সি ল্যু এই আয়োজনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে দুই প্রতিষ্ঠানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীদের উদযাপন নয়, কমিউনিটির জন্যও এটি আনন্দের উপলক্ষ। আবু তাহের ও তাঁর সহকর্মীদের কাজের প্রশংসা করেন তিনি।
প্যাট্রিক মার্টিনেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকা কমিউনিটির জন্য স্থানীয় সংবাদ ও তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা অবস্থায় কমিউনিটির নিজস্ব গণমাধ্যমকে সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সাউথ এশিয়ান জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাংবাদিকতা শিক্ষক শ্রী শ্রীনিবাসন আবু তাহেরের সঙ্গে ১৯৯২ সাল থেকে পরিচয়ের স্মৃতিচারণা করেন। বাংলা পত্রিকা থেকে টাইম টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর অগ্রযাত্রা কাছ থেকে দেখার কথা জানান। বাংলাদেশী কমিউনিটির পাশাপাশি নিউইয়র্ক ও বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্রের সমাজেও এই উদ্যোগের সেবামূলক ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রীনিবাসনের বক্তব্যে গুরুত্ব পায় ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যমূলক অপতথ্য প্রতিরোধ। তিনি বলেন, এই সমস্যা মোকাবিলায় সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিপরীতে নির্ভরযোগ্য সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। বাংলা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং টাইম টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির পেশাদারত্ব ও কাজের মানের প্রশংসা করেন তিনি। পাঠক, দর্শক, বিজ্ঞাপনদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান।
বাংলাদেশী আমেরিকানদের নাগরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. গোলাম এম. মাতবর। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কমিউনিটির ক্ষমতায়ন কি শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা জনসংখ্যার আকার দিয়ে পরিমাপ করা যায়? এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাগরিক জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রথম প্রজন্মের অবদান স্মরণ করে ড. মাতবর বলেন, তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে ব্যবসা গড়েছেন, পরিবার প্রতিষ্ঠা করেছেন, শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন এবং কমিউনিটির প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করিয়েছেন। পরবর্তী প্রজন্ম সেই ভিত্তি আরও বিস্তৃত করেছে। এখন প্রয়োজন নেতৃত্ব ও জনসেবার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা। যোগ্য নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধন, প্রার্থী ও নির্বাচনী বিষয় সম্পর্কে জানা এবং সব পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। তবে নাগরিক সম্পৃক্ততাকে শুধু ভোটদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার পরামর্শ দেন। স্থানীয় সরকারের কাজ বোঝা, জনসভায় অংশ নেওয়া, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং স্কুল বোর্ড, পরিকল্পনা বোর্ড, বিভিন্ন কমিশন ও কমিউনিটি সংগঠনে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজনৈতিক মতভিন্নতা প্রসঙ্গে ড. মাতবর বলেন, বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ডেমোক্র্যাট, রিপাবলিকান, স্বতন্ত্র এবং কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন মানুষও রয়েছেন। এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে। মানুষকে কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা বলে দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সুযোগ নিশ্চিত করাই দায়িত্ব।
নেতৃত্ব বিকাশে বাংলাদেশী আমেরিকান নাগরিক নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা একই ধরনের কর্মসূচি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন ড. মাতবর। তরুণ পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, আইনজীবী, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবীদের একত্র করে বক্তৃতা, সরকার পরিচালনা, জননীতি, নৈতিকতা, যোগাযোগ এবং জনসেবার দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অভিজ্ঞদের পরামর্শ ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন ড. মাতবর। তিনি বলেন, অভিজ্ঞ নেতাদের উচিত নতুনদের সঙ্গে নিজের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, প্রয়োজনীয় মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ভুল এড়িয়ে চলতে সাহায্য করা। সবাইকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে হবে এমন নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক কাজে দায়িত্ব পালন করেও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। শিক্ষার্থী থেকে স্বেচ্ছাসেবী, স্বেচ্ছাসেবী থেকে কমিউনিটি সংগঠক এবং সেখান থেকে বৃহত্তর দায়িত্বে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সালেহউদ্দিন সাল নিজেকে টাইম টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবাদের পাশাপাশি সিটি হল থেকে হোয়াইট হাউস, জাতিসংঘের অধিবেশন থেকে অভিবাসন পরিস্থিতি, স্থানীয় ব্যবসা ও কমিউনিটির ঘটনা তুলে ধরছে চ্যানেলটি। প্রবাসীদের তথ্যসমৃদ্ধ ও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এই সংবাদসেবা ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফ্লোরিডা থেকে আগত নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী তরুণ বক্তা নাবিল এইচ মুহিত বলেন, সমাজে পরিবর্তন আনতে বড় পদ বা বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকা জরুরি নয়। ছোট উদ্যোগও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। নেতৃত্বের অর্থ শুধু নিজের সাফল্য নয়, অন্যদের এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করাও। বয়স যেন অংশগ্রহণের বাধা না হয়, সেই আহ্বান জানিয়ে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
টাইম টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং বাংলা পত্রিকা’র সম্পাদক আবু তাহের অতিথি, দর্শক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফ্রিসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ সম্পর্ক, স্টুডিওতে তাঁর বিভিন্ন সময়ের উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে অংশ নেওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেন। ব্যস্ততার মধ্যেও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় হাকিম জেফ্রিস ও গ্রেস মেংসহ অতিথিদের ধন্যবাদ জানান তিনি। এছাড়াও তিনি টাইম টেলিভিশন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেন।
অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে প্রতিষ্ঠান দুটির পথচলার ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। সঙ্গীত, নৃত্য পরিবেশনা, অতিথিদের শুভেচ্ছা এবং মঞ্চে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে মিডিয়া দু’টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রবাসী কমিউনিটির মিলনস্থল। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনা করেন প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী করিম হাওলাদার, রন্টি দাস, কৃষ্ণা তিথি, রেশমী মির্জা, টিনা রাসেল, আফজাল, শেখ সবুজ, নাহিদ সুলতানা প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব উপস্থাপনায় ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক শেখ সিরাজুল ইসলাম, নিউজ প্রেজেন্টার দিমা নেফারতিতি ও সাদিয়া খন্দকার এবং ডাক্তার সৈয়দ আল আমীন রাসেল। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মেরী জোবাইদা, সৈয়দ ইলিয়াস খসরু ও আবুল হাসান।
অনুষ্ঠানে অতিথি ও আমন্ত্রিতদের আপ্যায়ন ব্যবস্থাপনায় ও বিশেষ সহযোগিতায় ছিলেন এস্টোরিয়া ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কর্মকর্তাবৃন্দ।


