ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ও সংগীতায়োজক। আজ দেশের শীর্ষ এই রকতারকার জন্মদিন। বিশেষ এই দিনটি নানাভাবে উদযাপন করে থাকেন দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অগণিত ভক্ত অনুরাগী। জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংগীতাঙ্গনের বর্তমান প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনা ও অন্যান্য বিষয়ে জেমসের সঙ্গে কথা বলেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
জন্মদিনে দৈনিক সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনার জন্য রইলো অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। এবার বলুন আজকের এই বিশেষ দিনটি কীভাবে কাটাতে চান?
শুভেচ্ছার জন্য দৈনিক সমকালের সবাইকে ধন্যবাদ। জন্মদিনকে ঘিরে আজ কী করব, না করব তা আসলে ভেবে দেখিনি। কারণ, জন্মদিন তো কখনও ঘটা করে উদযাপন করিনি। ভক্তর উদযাপন করে, আমি শুধু দেখে যাই।
অনেক পথ পার হয়ে এসে আপনার আজকের যে অবস্থান সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান?
আমি যা ছিলাম তাই আছি। নিজের মধ্যে কোনো পার্থক্য তো দেখি না। মাথা ভর্তি চুল ছিল, সেগুলো পাতলা হয়ে এসেছে [হা-হা-হা। এই যা পার্থক্য। সত্যিকার অর্থে যদি আমার পরিবর্তন হয়ে থাকে, সেটি চোখে পড়বে দর্শক-শ্রোতার। শুধু তারা বলতে পারবে সময়ের সঙ্গে আমি কতটা বদলে গেছি।
অনেকদিন আপনার নতুন কোনো গান নেই, এ নিয়ে কিছু ভাবছেন?
আগে থেকে পরিকল্পনা করে কিছু হয় না। সংগীতচর্চা তো থেমে নেই। রুটিন বেঁধে নিয়মিত অনুশীলন করছি। অনুশীলন করতে করতেই যখন কোনো সুর চলে আসবে, তা নিয়ে গান বাঁধার চেষ্টা করব। যখন সোট পূর্ণাজ রপ পাবে, তখন তার প্রকাশনা নিয়ে ভাবব। যখন কোনো গান তৈরি হয়ে যাবে, নিজ থেকে জানান দেব।
‘সবই ভুল’ গানের পর নতুন কিছু তৈরি হয়েছে?
গানের কাজ নিয়ে বসব কখন। একের পর এক তো শো করে যাচ্ছি। গত কয়েক বছর তো এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা সব মহাদেশের সবই চষে বেড়ালাম। এক দেশ থেকে অন্য দেশের মঞ্চে ছুটে বেড়ানো-এই দীর্ঘ সফরে গান তৈরির জন্য আলাদাভাবে সময় বের করা হয়ে ওঠেনি। ওই যে বললাম, গানের বিষয়টি হঠাৎ করে হয়ে যায়। তাই আগেও যেখানে গান তৈরি হয়েছে, আগামীতেও হবে। দেখা যাবে একটার পর একটা গান আসছে।
নব্বই দশক ছিল দেশীয় ব্যান্ড সংগীতের সোনালি সময়। কখনও কী মনে হয়, সেই সময়ের চিত্রটা নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
আমরা ভাগ্যবান, যারা দারুণ কিছু শিল্পী, মিউজিশিয়ান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পেরেছি। প্রতিদ্বন্দিতা ছিল প্রবল। কে কী করছে, তারও খোঁজ-খবর রাখতাম। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ হতো। এভাবে নব্বই দশকের চিত্রটা তৈরি হয়েছিল, যা এই সময়ের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলানো যাবে না। খেয়াল করলে দেখবেন, এই সময়ে আমাদের
চেয়ে অনেক ভালো শিল্পী, মিউজিশিয়ান আছেন। সেই শিল্পীদের অনেকে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেন না, যা আমরা পেয়েছি।
এর কারণ কী বলে মনে হয়?
যখন কোনো কিছু সহজলভ্য হয়ে যায়, তখন তার কাদর থাকে না। ফটোগ্রাফির কথাই বলি। এক সময় ফটোগ্রাফি করতে পারা ছিল বড় একটা বিষয়। এখন তো যার হাতে ফোন আছে, সেই নিজেই একজন ফটোগ্রাফার। একই ঘটনা গানের বেলাও ঘটেছে। সমাজ মাধ্যম, ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সবাই ফ্রিতে গান শুনছেন। বিনামূল্যে এই প্রাপ্তিটাই ভুলিয়ে দিচ্ছে সৃষ্টির মাহাত্ম্য। একসময় টাকা খরচ করে গান শুনতে হতো। তাই শ্রোতা সেই গানই বেছে নিতেন, যা তাদের কাছে মনের তৃষ্ণা মেটানোর মতো কিংবা ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী মনে হতো। নতুন ও ভিন্ন রকম আয়োজনের জন্য, কার কাজের ধরন কেমন, সে বিষয়েও নজর রাখতেন। এখন সেই চিত্র তো চোখে পড়ে না।
এই বাস্তবতায় কী মনে হয় না, গানের ভুবনে এক ধরনের খরা দেখা দিতে পারে?
আমার তো মনে হয়, আগামী ২০ বছর নতুন কিছু সৃষ্টি না হলেও শ্রোতার কাছে গানের কোনো অভাব থাকবে না। মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এ পর্যন্ত যত গান তৈরি হয়েছে, সেগুলোই যথেষ্ট। তারপরও শিল্পী ও মিউজিশিয়ানরা নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছেন, সৃষ্টির নেশায়। আমার কথাই যদি বলি, আমার প্রকাশিত গানগুলো আমি মঞ্চে বিভিন্নভাবে গাওয়ার চেষ্টা করি। যেখানে গানের মূল কাঠামো ঠিক থাকে, কেবল অ্যারেঞ্জমেন্ট ও গায়কীতে কিছু নতুনত্ব তুলে আনা হয়। এভাবেই দর্শক-শ্রোতার কাছে পুরোনো গানও একটু আলাদা হয়ে ওঠে। তাই যতক্ষণ প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো কিছুর অভাব থাকার কথা নয়।
দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে পেছন ফিরে তাকালে কখনও কারও শূন্যতা অনুভব করেন?
আমাদের সময়ের অনেক সংগীতযোদ্ধা আজ পৃথিবীতে নেই। তাদের অনেকের শূন্যতা অনুভব করি। নিলয় দাসের কথা যদি বলি, একসময় সারগাম স্টুডিওতে আমাদের আড্ডা হতো। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগেও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই মানুষটি আর নেই। তাঁর কথা এখনও মনে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আইয়ুব বাচ্চু ভাইয়ের কথা। কত শত স্মৃতি তাঁকে ঘিরে, তা বলে শেষ করা যাবে না। এর বাইরেও আজম ভাই [আজম খান], খালিদ, শাফিন আহমেদ থেকে শুরু করে অনেকে আমাদের ছেড়ে গেছেন, যাদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি করেছি। তাদের না থাকাটা এখন মনে আঁচড় কাটে।


