রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার ধলপুরে বাদল সরদার রোডের শেষ মাথায় একটি রিকশার গ্যারেজ। সেখানে গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন দুই বন্ধু। হঠাৎ তিনটি মোটরসাইকেলে সাত দুর্বৃত্ত এসে তাদের ঘিরে ফেলে। পরে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইমরান হোসেনকে। গুলিতে আহত হন তাঁর বন্ধু সাদ্দাম হোসেন।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট সকালে বাসা থেকে যাত্রাবাড়ীতে মাছের আড়তে যাওয়ার পথে আড়তের পেছনেই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তাঁকে কুপিয়ে ২৮ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোনসেট ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।
অপরাধ দুটি সংঘটিত হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগে। শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়। এই এলাকায় খুন ও ধর্ষণের ঘটনা রাজধানীর অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। ছিনতাই, শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনাও বেশি এই বিভাগে। খুন এবং নারী-শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মিরপুর বিভাগ।
ঢাকায় পুলিশের আটটি বিভাগের মধ্যে চুরির ঘটনা বেশি গুলশানে। এর পর রয়েছে উত্তরা ও মতিঝিল বিভাগ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
ওয়ারী বিভাগ ছয়টি থানা নিয়ে গঠিত, এর মধ্যে অন্যতম যাত্রাবাড়ী। ওয়ারী বিভাগে অন্য পাঁচ থানা হলো– ডেমরা, ওয়ারী, শ্যামপুর, গেণ্ডারিয়া ও কদমতলী। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগের মধ্যে পড়েছে গাবতলী এলাকা। এটি দারুস সালাম থানার আওতাধীন। এ ছাড়া এই বিভাগের অন্য থানাগুলো হলো– কাফরুল, মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক, শাহ আলী ও রূপনগর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়ারী ও মিরপুর বিভাগের এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে অনেক ভাসমান অপরাধীর বাস। তারা অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত আত্মগোপনে চলে যেতে পারে।
খুনের ঘটনায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে তেজগাঁও বিভাগ। সম্প্রতি আদাবর ও মোহাম্মদপুরে কয়েকটি বাড়ি-জমি দখলে হামলার ঘটনায় এ বিভাগের অপরাধ আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালেও ছিনতাইয়ের ঘটনায় শীর্ষে ছিল তেজগাঁও বিভাগ।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় জমি দখল ঘিরে একটি কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। একই দিন আদাবরে শ্যামলী হাউজিংয়ের ৪১/৪২ নম্বর বাড়ি দখলের চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল দেশি অস্ত্রসহ বাড়ির গেটে হামলা চালায়। গেট ভাঙার চেষ্টা করে।
ঢাকা মহানগরের এলাকাভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংঘটিত খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই-ডাকাতি, দখল, হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় নথিভুক্ত মামলার পরিসংখ্যান থেকে। তবে খুন ছাড়া অন্য অপরাধের অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। ফলে এসব অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুলিশের পরিসংখ্যানে পুরোটা উঠে আসে না। এর পরও যেসব ঘটনায় রাজধানীর থানাগুলোতে মামলা নথিভুক্ত হয়, সেই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে মহানগরের কোন এলাকায় কী ধরনের অপরাধ বেশি ঘটছে, এর একটি ধারণা পাওয়া যায়।
ঢাকা মহানগরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ৫০ থানাকে আট ভাগে ভাগ করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ডিএমপি। বিভাগগুলোর মধ্যে এলাকার আয়তন ও জনসংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, নাগরিকের পেশা, তারা কোথা থেকে এসে বাস করছে– এগুলোর ওপর অপরাধের ধরন নির্ভর করে। ভৌগোলিক অবস্থা ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে অপরাধের ভিন্নতা থাকে। এলাকাভিত্তিক অপরাধপ্রবণতা কমবেশি হয় শ্রেণি, অর্থ ও শিক্ষাব্যবস্থার ফলে। যে এলাকায় ভাসমান জনসংখ্যা বেশি, ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরাধ ঘটিয়ে পালানোর অবাধ সুযোগ আছে, সেখানে অপরাধ বেশি হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধী চক্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের হাত বা পৃষ্ঠপোষকতা বদলে গেছে। অনেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সহিংসতা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধী চক্র। কোথাও আবার অপরাধীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যোগসাজশের বিষয়টি সামনে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মিরপুর, উত্তরা, ওয়ারী ও মতিঝিলের মতো এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত ঢাকার বাইরে পালিয়ে যাওয়া সহজ। এটি অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। বাস টার্মিনাল, লেগুনা স্ট্যান্ড ও আবাসন প্রকল্প থাকার কারণে এসব এলাকায় ভাসমান অপরাধীদের আনাগোনা ও আশ্রয় পাওয়া সহজ হয়।
ডিএমপির কোনো বিভাগে থানার সংখ্যা বেশি, কোনো বিভাগে কম। তবে প্রতিটি বিভাগে থানার সংখ্যা ছয় থেকে সর্বোচ্চ সাতটি। থানায় হওয়া মামলার ভিত্তিতে অপরাধের পরিসংখ্যান তৈরি করে ডিএমপি সদরদপ্তর। এলাকাভিত্তিক অপরাধীদের তালিকাও করে পুলিশ।
ডিএমপির হালনাগাদ করা তালিকায় রাজধানীতে এক হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারীর নাম উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী ওয়ারী বিভাগে; ৩০৮ জন। তেজগাঁও বিভাগে ২৪০, মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনা বিভাগে ১৫২, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন।
ডিএমপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে ৫০ থানায় ১০ হাজার ৯০৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩০ হাজার ১৭০ জনকে। এর মধ্যে মামলায় এগিয়ে ওয়ারী বিভাগ, এক হাজার ৮৯৬ মামলা। আসামি গ্রেপ্তার বেশি তেজগাঁও বিভাগে, ১১ হাজার ৯৫ জন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত থানাগুলোতে ১৬৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। বেশি খুনের ঘটনা ওয়ারী বিভাগে ৩৪টি। গত বছরও এ বিভাগে খুনের মামলা ছিল সর্বোচ্চ ৯৫টি। ওই বছর সবচেয়ে কম খুনের ঘটনা ছিল রমনা বিভাগে ২৪টি।
এ বছর ২৬ খুনের ঘটনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মিরপুর বিভাগ। গত বছরও মিরপুর এলাকা খুনের ঘটনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল, ৭৪টি মামলা। এ বছরের আট মাসে নারী নির্যাতনের মামলায় মিরপুর বিভাগ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলা ১৭৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনায় ৭৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এই এলাকার থানাগুলোতে, যা ধর্ষণের ঘটনায় ঢাকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলা। গত বছরও ধর্ষণের ঘটনা বেশি ছিল মিরপুর এলাকায়, মামলা হয়েছিল ১১৬টি।
তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম আট মাসে খুনের ঘটনায় তৃতীয় তেজগাঁও বিভাগ, মামলা হয়েছে ২২টি। গত বছরও খুনের ঘটনায় তৃতীয় ছিল এই এলাকা, মামলা হয় ৫২টি। ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায়ও তৃতীয় এই বিভাগ, মামলা হয়েছে ৩৩টি। তবে গত বছর ছিনতাইয়ে শীর্ষে থাকা বিভাগটিতে এ-বিষয়ক মামলা ছিল ১০৬টি।
অন্যদিকে, চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল বিভাগে। গুলশানে ১৬৮টি এবং উত্তরা ও মতিঝিলে ১৬৩টি করে মামলা। গত বছর চুরি এবং শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় শীর্ষে ছিল মতিঝিল বিভাগ। চুরির ঘটনায় ৪১৫ মামলা এবং শিশু ও নারী নির্যাতনবিষয়ক মামলা হয়েছিল ৩৩৬টি। চুরির ঘটনায় এ বছরের প্রথম আট মাসে ওয়ারী ১৪৯, তেজগাঁওয়ে ১৪১, মিরপুরে ১৩৮, রমনায় ১৩২ এবং লালবাগে ৬৪টি মামলা হয়েছে। অপহরণের ঘটনায় বেশি মামলা হয়েছে মতিঝিল বিভাগে, ২৭টি মামলা। গত বছরও এ-বিষয়ক অপরাধ বেশি ছিল এই এলাকায়, মামলা হয় ৫০টি।
গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনায় ২২৬টি মামলা হয়েছে। এ-বিষয়ক সর্বোচ্চ মামলা ওয়ারী বিভাগে, ৫০টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মতিঝিল বিভাগে, ৩৯টি। এ ছাড়া গুলশানে ২৫টি, রমনা ও উত্তরায় ২৪টি করে, মিরপুরে ২৩ ও লালবাগে আটটি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চুরি-ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ঝামেলা এড়াতে মামলা করেন না। ছিনতাই হওয়া টাকার পরিমাণ কম হলে এবং মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে সাধারণত ভুক্তভোগী নিজেই থানা-পুলিশ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
মামলার পরিসংখ্যান বলছে, আট মাসে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় ওয়ারী বিভাগের থানাগুলোতে ২১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এ-বিষযক মামলা মতিঝিল বিভাগে ১৪৫টি, তেজগাঁওয়ে ১২৭, গুলশানে ১২৫, উত্তরায় ৯০, রমনা ৭৭ ও লালবাগ বিভাগে ৭৬টি মামলা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা বেশি ওয়ারী বিভাগে, মামলা হয়েছে ৮৯টি। মিরপুরে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা ৭৪টি।
মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার সমকালকে বলেন, এই এলাকায় নিম্ন আয় ও পিছিয়ে পড়া জনসংখ্যা বেশি, এলাকার ঘনত্বও তুলনামূলক বেশি মিরপুরে। এ কারণে অপরাধপ্রবণতা বেশি দেখা যায়।
উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার রেজাউল করিম বলেন, আমি কিছুদিন হলো উত্তরা বিভাগের দায়িত্বে এসেছি। দক্ষিণখান ও উত্তরখান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। অনেক ভাসমান মানুষ। দেখা যায়, হঠাৎ চুরি করে পালিয়ে যায়।
আইনের শাসনের ঘাটতির সুযোগ নেয় অপরাধীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, আইনের শাসনের ঘাটতি থাকলে অপরাধীরা মাথাচাড়া দেয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক রীতিনীতি, সামাজিক অনুশাসন প্রয়োগও জরুরি। এই দুটি বিষয় যথাযথ প্রয়োগে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সূত্র ধরেই অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, এলাকাভেদে অপরাধের ধরন, সংখ্যা, ভয়াবহতার ভিন্নতা আছে। সংঘটিত অপরাধের ঘটনা তিনটি শ্রেণীকরণ রয়েছে। এক. রাজনৈতিক কারণে অপরাধ। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন, স্বার্থের প্রশ্নে অপরাধ হচ্ছে। দুই. দুর্বৃত্তদের কাছে জীবন-জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হয়ে উঠেছে অপরাধ। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি মাদক বিক্রি– এসব অপরাধ কোনো কোনো এলাকায় মহামারি আকার ধারণ করেছে। এর পেছনেও দুটি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। কখনও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে, আবার যারা অপরাধ করছে তারা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। তিন. জেন্ডারভিত্তিক সংবেদনশীলতার যে ঘাটতি, সব ক্ষেত্রে আইনের অনুশাসন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ব্যক্তির সুরক্ষা না থাকায় নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। পারিবারিক সহিংসতাও বাড়ছে।


