বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারের দুই ধাপ শেষ হয়েছে। চুড়ান্তভাবে দণ্ড কার্যকর করতে আরও এক ধাপ বাকি রয়েছে। এদিকে আবরারের পরিবারের দাবি, হত্যা মামলাটি যেন আপিল বিভাগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানি হয় এবং আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের কতিপয় বিপথগামী শিক্ষার্থী। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার বিচারিক আদালত। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে আসামিদের পক্ষে আপিল করা হলে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) শুনানির পর নিম্ন আদালতের দেওয়া সম্পূর্ণ সাজা ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ বহাল রাখেন হাইকোর্ট। ওই রায় বাতিল এবং আসামিদের খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করা হয়েছে, যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে আবরার হত্যা ঘটনার সাত বছর আজ। গতকাল সোমবার আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ সমকালকে জানিয়েছেন, এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত চার আসামি এখনও পলাতক। ২১ জন কারাগারে আছে। তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে আবেদন জানিয়েছি, যেন মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা হয়। জবাবে আইনমন্ত্রী আশ্বাস দেন, যত দ্রুত সম্ভব আপিল শুনানির জন্য তিনি আদালতের কাছে বলবেন।’ পাশাপাশি ছেলে হত্যার দায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রেখে সাজা কার্যকরের দাবি জানান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাসিন্দা বরকতউল্লাহ।
আবরার হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুই আসামি মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ও মেফতাউল ইসলাম জিওনের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দাখিল করা হয়েছে। তাঁর মক্কেলরা হাইকোর্টে ন্যায়বিচার পাননি।
আসামিপক্ষের অন্য আইনজীবী এস এম শাহজাহান সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আমার চেম্বার থেকে ৪-৫ জন আসামির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হয়েছে। শুনানি হলে আসামিরা সর্বোচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।
ফেসবুকে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের পরদিন আবরারের বাবা বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই বছরের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছেন।’ ওই মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার বিচারিক আদালত। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার এই রায় হাইকোর্টও বহাল রাখেন।
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মাজেদুর রহমান মাজেদ, মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, শামসুল আরেফিন রাফাত, মিজানুর রহমান, মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ। শেষের তিনজন মামলার শুরু থেকেই পলাতক। ফাঁসির আসামিদের মধ্যে মুনতাসির আল জেমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালিয়েছেন বলে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞপ্তিতে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।


