অপ্রদর্শিত ব্যয়ের খোঁজে ‘টাইম মেশিনে’ এনবিআর পুরোনো কোনো ব্যয় আয়কর রিটার্নে উল্লেখ না করলে জরিমানাসহ কর আরোপের প্রস্তাব অর্থবিলে

0
5

এবারের বাজেটে অর্থবিলে অতীতের যে কোনো বছরের অপ্রদর্শিত ব্যয় খুঁজে পেলে, তার ওপর জরিমানাসহ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া কর কর্মকর্তারা যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে অতীতের পুরোনো নথি দেখতে চাওয়ার ক্ষমতা পাবেন। এতে করদাতাদের হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে ২০২৩ সালের আয়কর আইনে ছয় বছর পর্যন্ত কোনো লুকানো বা অপ্রদর্শিত সম্পদের খোঁজ কর কর্মকর্তারা পেলে তার ওপর কর আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এবার ওই ধারা সংশোধন করে সম্পদের সঙ্গে করযোগ্য ব্যয়ও সংযুক্ত করে কর কর্মকর্তাকে ওই ব্যয়ের ওপরও সরাসরি করারোপ করার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আইন এনবিআরের হাতে একটি ‘টাইম মেশিন’ বা অতীত-সন্ধানী ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। আগে সম্পদের ক্ষেত্রে এমন বিধান ছিল। এখন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই আইন করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থবিলে যা আছে
এবারের অর্থবিলের ২১২ ধারার ৪(খ) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তির এমন কোনো অপ্রদর্শিত আয়, ব্যাখ্যাহীন ব্যয় বা লুকানো সম্পদ থাকে, যা আয়কর আইনের সাধারণ ছয় বছরের ‘লুকব্যাক পিরিয়ড’ বা অতীত অনুসন্ধানের সীমারও পুরোনো, তবে আইনত ধরে নেওয়া হবে, ওই আয়, ব্যয় বা সম্পদ সেই ষষ্ঠ (সবচেয়ে পুরোনো সচল বছর) কর বছরেই সংঘটিত হয়েছে।

অর্থবিলে এই ধারা পাস হলে ছয় বছর আগেরও কোনো করযোগ্য ব্যয় পেলে কর কর্মকর্তা ওই ব্যয়কে পেছনের ষষ্ঠ বছরের ব্যয় হিসাবে গণনা করে ওই বছরের কর আইন অনুযায়ী কর ধার্য করবেন। এর পর টানা ছয় বছর তা অপরিশোধিত থাকায় বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে জরিমানাসহ কর পরিশোধের নোটিশ দিতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ 
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া এ পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, যদি কোনো করদাতা আজ থেকে আট বছর আগে কোনো খাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে থাকেন, যা তখন তিনি আয়কর নথিতে দেখাননি, তাহলে বর্তমান আইনে কর কর্মকর্তা সেই ব্যয়টিকে ষষ্ঠ বছরের আয় হিসেবে গণ্য করে বর্তমান সময়ে করহারে কর আরোপ করতে পারবেন। ফলে আয়কর নথিতে জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের সঠিক তথ্য প্রদানই ভবিষ্যতে আপনাকে বড় ধরনের করভার থেকে বাঁচাতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

কোম্পানি-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তারা ভয় করছেন, বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নে বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে কর কর্মকর্তারা পুরোনো অনেক নথি চাইতে পারেন। এ নিয়ে হয়রানির স্বীকার হওয়ার শঙ্কার কথাও জানান তারা।

পেশাদার চার্টার্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং কর বিশেষজ্ঞ এমবিএম লুৎফুল হাদী মনে করেন, যারা আইন মেনে চলেন, তাদের এ বিধান নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে এটাও ঠিক, আগে সবার মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল ছিল, ছয় বছর আগের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এ প্রস্তাব সে ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

এই কর বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধের বিচারের কোনো সময়সীমা থাকে না, এটা ঠিক। কিন্তু আর্থিক ক্ষেত্রে এর একটা সীমা থাকা উচিত।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হবে 
শুধু আইনি বিধান করেই নয়, এ বিধান প্রয়োগের জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্য ‘সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন’ ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে। বাজেট বক্তব্যে তিনি বলেন, সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। ফলে এনবিআর চাইলে জানতে পারবে, করদাতা তার আয় বা ব্যয় বা সম্পদ-সম্পর্কিত কোনো তথ্য লুকাচ্ছে কিনা।

অর্থমন্ত্রী জানান, এ ডিজিটাল সংযোগের ফলে কর ফাঁকি রোধ করা এবং করদাতার প্রকৃত সম্পদ ও ব্যয়ের চিত্র বের করা সহজ হবে। এ ছাড়া কর ফাঁকি শনাক্ত করতে এনবিআর এখন থেকে ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করবে, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিট নির্বাচন করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here