বাজেট বিশ্লেষণ স্বাস্থ্য বাজেটের ‘স্বাস্থ্য ভালো’ বাস্তবায়ন দুর্বল

0
3

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে গেলবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দের ঘোষণা এসেছে। টাকার অঙ্কে তা ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি। উপজেলা হাসপাতালে শয্যা ও জনবল বাড়ানো, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জরুরি রোগী পরিবহনে হেলিকপ্টার সেবা চালুর মতো বেশ কয়েকটি বড় উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

তবে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বরাদ্দ বাড়ানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়ে বেশি জরুরি সেই টাকা যথাযথভাবে খরচ করা। কারণ, বছরের পর বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ খরচ করতে পারেনি। ফলে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এবার বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল। স্বাস্থ্য বাজেটে সরকারের অন্যতম বড় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ৪৬২ উপজেলা সদর হাসপাতালকে ধাপে ধাপে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা পর্যায়ে শয্যা ও জনবল সংকটের কারণে রোগীকে জেলা শহর ও রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে। শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু ভবন বা শয্যা বাড়ালেই হবে না। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত না হলে এসব হাসপাতাল কার্যকরভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়।

বন্ধ শিশু হাসপাতাল চালু হচ্ছে
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আটটি ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১৮টি এক হাজার শয্যার সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীকেন্দ্রিক বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে ক্যান্সার চিকিৎসা, শিশুস্বাস্থ্য ও জটিল রোগ ব্যবস্থাপনায় ঢাকার ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি।

এক লাখের বেশি জনবল নিয়োগ
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। জনবল সংকটে থাকা স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট নার্সিং ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সাইক নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. ইয়াহিয়া বলেন, জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিয়োগে সুষম বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসক, নার্স বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নয়; অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট (ওটি), স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট (এসএলটি) এবং পুষ্টিবিদের জন্যও পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি করতে হবে।

পুরোনো সমস্যা: বরাদ্দ আছে, ব্যয় নেই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং সেই টাকা ব্যয়ের সক্ষমতা। তিনি বলেন, সংশোধিত বাজেটে যেন বরাদ্দ কমানো না হয় এবং বছর শেষে যেন দেখা যায়, বরাদ্দের পুরো টাকা ব্যয় হয়েছে। তাহলেই মানুষ বাজেট বাড়ার সুফল পাবে।

মাঝপথে বরাদ্দ কমার শঙ্কা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বাড়লেও যদি প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পাবে না।

‘এক টাকাও ফেরত যাবে না’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তিনি বলেন, উপজেলার সব হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি নতুন শিশু হাসপাতাল চালুর প্রস্তুতি চলছে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হেলিকপ্টার সেবাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here