Home Blog Page 153

ট্রাম্প কেন যুদ্ধবিরতির অনির্দিষ্ট মেয়াদ বাড়ালেন

ইরানের বিষয়ে পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়- তা ঠিক করতে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অংশ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স  ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। নিজেদের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তারা অধীর আগ্রহে কেবল একটি সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

বৈঠকটি চলার সময় জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে উড্ডয়নের অপেক্ষায় ছিল এয়ার ফোর্স টু (ভাইস প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ)। কিন্তু ইরানিদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর নিয়ে প্রশাসন এক গোলকধাঁধায় পড়ে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরকে ফোন করে অনুরোধ করা হয়, যাতে ভ্যান্স উড়োজাহাজে ওঠার আগেই ইরান আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে সাড়া দেয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সাড়া মেলেনি।

হোয়াইট হাউসে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলের বৈঠকের বিষয়ে অবগত তিনজন কর্মকর্তা এসব বর্ণনা দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স ছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন এবং সিআইয়ের পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ।

কেন অনির্দিষ্ট মেয়াদ
কয়েকটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবেন না। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার যখন কয়েক ঘণ্টা বাকি, তখন তিনি মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেন। তবে এবার মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেননি। লিখেছেন, আলোচনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলো।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলোর মতে, উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন। তাদের ধারণা হলো- কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে ইরানের ওপর চাপ কমে যাবে। তখন তারা আলোচনা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেতে পারে।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকদের বসার একটি সম্ভাবনা এখনো আছে। তবে সেটা কবে তা নিশ্চিত নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তিনি এখনো এই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের আলোচনায় ফেরার সংকেত পাওয়া গেলে ফের পাকিস্তান সফরের ব্যবস্থা করা সম্ভব। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তারা আশা করছেন, দুই দেশ দ্রুতই একটি সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহ দেখাবে।

তবে ইরানি কর্মকর্তাদের কণ্ঠে এখনো পরিবর্তনের কোনো সুর শোনা যায়নি। তাদের প্রতিনিধি দলের প্রধান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মাহদী মোহাম্মদী বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণার কোনো মূল্য নেই।  পরাজিত পক্ষ কোনো শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।  অবরোধ জারি রাখা আর বোমা বর্ষণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর জবাব অবশ্যই সামরিকভাবে দেওয়া হবে।

সাড়া না পাওয়ায় বিভেদের ধারণা
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীদের ধারণা, ইরানিদের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যকার বিভেদ। তিন কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে থেকে পাওয়া বার্তার ওপর ভিত্তি করে হোয়াইট হাউসের এই ধারণা জন্মেছে।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানিরা তাদের অবস্থান নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।  বিশেষ করে মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে আলোচনায় দর-কষাকষির জন্য তারা মধ্যস্থতাকারীদের কতটা ক্ষমতা দেবে- তা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় অন্তরায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী, এই জটিলতার অনেকটা কেন্দ্রে আছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তাঁর অন্তরালে থাকার প্রচেষ্টা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত পোস্টে ট্রাম্পও ইরানের ভেতর বিভেদের কথা উল্লেখ করেছেন। লিখেছেন, ইরানের সরকার ‘মারাত্মকভাবে বিভক্ত’।

বিশ্লেষণ ইরান যুদ্ধ এখন ‘ধৈর্য ও সময়ের লড়াই’

ইরান যুদ্ধ ধীরে ধীরে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ থেকে সরে এসে এখন পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘ধৈর্যের লড়াইয়ে’-যেখানে সময়ই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক পোস্টে বলেছেন, ‘এই যুদ্ধে সময় তার প্রতিপক্ষ নয়। তিনি ছয় সপ্তাহের সামরিক অভিযানকে অতীতের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।’

সময় কি সত্যিই বড় বিষয় নয়?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যুদ্ধের সময়কাল শুধু সামরিক সাফল্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। উদাহরণ হিসেবে ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইরাকের আকাশে মার্কিন আধিপত্য এবং জোটের অনেক উন্নত অস্ত্রশস্ত্র মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকি সামরিক বাহিনীকে দ্রুত পরাজিত করতে সক্ষম করেছিল। ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিল বাগদাদের পতন হয় এবং তার সাথে ইরাকি সরকারেরও পতন ঘটে। কিন্তু পরে দীর্ঘ ও জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ, দ্রুত শুরু হলেও যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে।

ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
এই যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও—সেখানে জ্বালানির দাম বেড়েছে, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে এবং দ্রুত সমাধানের চাপ তৈরি হচ্ছে।

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, জ্বালানির দাম শিগগিরই কমবে। তবে তারই জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সতর্ক করে বলেছেন, দাম কমতে কয়েক মাস লাগতে পারে। এই মতবিরোধ নিঃসন্দেহে প্রশাসনের ভেতরের অনিশ্চয়তাও তুলে ধরছে।

ইরানের কৌশল: সময়কে হাতিয়ার করা
গত এক মাসের বেশি সময় ধরে হামলার মুখেও ইরান তাদের সক্ষমতা ধরে রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হিসাব হলো-তারা দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হিসাব করছে- যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে, জনগণের অসন্তোষ বাড়বে, এতে আলোচনায় তাদের অবস্থান শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ, ইরান সময়কে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তিন ধরনের কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করছে- সামরিক চাপ (হামলার হুমকি), অর্থনৈতিক চাপ (অবরোধ) এবং কূটনৈতিক চাপ (আলোচনা)। ওয়াশিংটনের ধারণা, এই চাপের ফলে ইরান এমন একটি চুক্তিতে রাজি হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল।

কে আগে নত হবে?
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্র কি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সামলে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে? নাকি ইরানই আগে ছাড় দেবে?

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন শুধু অস্ত্রের নয়- সময়, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ধৈর্যের লড়াই।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি জাহাজ জব্দ করায় ক্ষুব্ধ ইরান, সংলাপে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় ইসলামাবাদের পথে মার্কিন দল

ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজ মার্কিন মেরিন সেনাদের হাতে জব্দ হওয়ার প্রেক্ষাপটে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ইরান বলছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যে ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপে তারা ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। সেই সঙ্গে পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান। এ অবস্থায় মার্কিন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা করলেও ইরানের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।

আগামীকাল বুধবার শেষ হচ্ছে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। নতুন করে মার্কিন হামলার শঙ্কা বাড়ছে। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গতকাল সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ‘ইতিবাচক’ভাবে বিবেচনা করছে তেহরান। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, তারা সংলাপে যাচ্ছেন না। তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ওয়াশিংটন যে ‘আন্তরিক নয়’, তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে তেহরান কোনো আলটিমেটাম বা চরমপত্রে বিশ্বাস করে না।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্র সমর্থিত সংবাদমাধ্যম ইরনা তাঁকে উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘যুদ্ধ কারও স্বার্থরক্ষা করে না। হুমকি প্রতিরোধের পাশাপাশি উত্তেজনা কমাতে প্রতিটি যুক্তিসংগত ও কূটনৈতিক পথ ব্যবহার করা উচিত।’

তেহরানের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকায় শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ তেহরানের ‘প্রতিরক্ষা সক্ষমতা’ নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, পাকিস্তানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, এ অবরোধ আলোচনার পথে একটি বাধা। জবাবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এ পরামর্শ বিবেচনা করবেন।

গতকাল দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন ওই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রথম দফার আলোচনায় তিনি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। প্রতিনিধি দলে এবারও ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার থাকবেন। তারা ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি, আমাদের মধ্যে আলোচনা হতে যাচ্ছে। তাই এ মুহূর্তে কেউ কোনো খেলা খেলবে না, এটাই প্রত্যাশা।’

স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ৯টার পর (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা) ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তাঁর প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা করতে যাচ্ছে। রাতেই তারা সেখানে পৌঁছবেন। একটি বড় অগ্রগতির প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান একটি আলোচনার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই পক্ষ আঞ্চলিক অগ্রগতি ও সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে সমন্বয় ও মতবিনিময় করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দ্বিতীয় দফা সংলাপকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একজন সরকারি ও একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইসলামাবাদজুড়ে ২০ হাজার পুলিশ, আধাসামরিক ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ গত শনিবার বলেন, উভয় পক্ষ অগ্রগতি করেছে। কিন্তু পারমাণবিক বিষয় ও হরমজু প্রণালি নিয়ে তারা এখনও অনেক দূরে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের বরাত দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যোগাযোগ সরঞ্জাম নিয়ে গতকাল অন্তত ছয়টি মার্কিন সরকারি বিমান পাকিস্তানের নূর খান বিমানবন্দরে পৌঁছেছে।

আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম
নতুন যুদ্ধের শঙ্কা ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ-চলাচল ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে; টালমাটাল হয়ে পড়েছে শেয়ার বাজার। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী গতকাল সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৬৪ ডলার মূলে বিক্রি হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ছয় ঘণ্টার অচলাবস্থার পর গত রোববার তারা ইরানের পোর্ট আব্বাস বন্দরের দিকে আসা একটি ইরানের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটির ইঞ্জিন অচল করে দেয়। পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় মেরিন সেনারা হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে জাহাজটিতে নামছেন।

ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’র অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, এ ‘প্রকাশ্য আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে তারা মার্কিন বাহিনীর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু জাহাজে থাকা নাবিকদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির কারণে তারা তা করতে পারেননি। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র উভয় পক্ষকে দায়িত্বশীলভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে কার্যত কোনো জাহাজ চলাচল করছে না
জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্যের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গতকাল মাত্র তিনটি জাহাজ পারাপার হওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ডেটা অ্যানালিটিক্স বিশেষজ্ঞ সিনম্যাক্সের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও কেপলার প্ল্যাটফর্মের ট্র্যাকিং ডেটা অনুসারে, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘নেরো’ উপসাগর ছেড়ে প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করছে। অন্য দুটি জাহাজের একটি রাসায়নিক ট্যাঙ্কার ও অন্যটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ট্যাঙ্কার আলাদাভাবে এ জলপথে উপসাগরে প্রবেশ করেছে।

আরও তিনজনের মৃত্যু হামের জরুরি টিকাদান শুরু ১ কোটি ৭৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য

সারাদেশে হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল দুপুরে টিকা কর্মসূচি উদ্বোধনের সময় বলেন, ‘সব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন একটি শিশুও বাদ না পড়ে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পুষ্টিতে গুরুত্ব আরোপ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে টিকা কার্যক্রম উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, আগামী অর্থবছর থেকে ১৫ মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে টিকার মজুত নিশ্চিত করা হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, না, এটা (হাম) এখনও মহামারি নয়। যেসব এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়েছে, আমরা সেসব এলাকা টার্গেট করে ৮৫ শতাংশ ইতোমধ্যে টিকার আওতায় নিয়ে এসেছি। সিটি করপোরেশনও সেটি করছে। যেখানে হবে, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। ইনশাআল্লাহ, এটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
অনুষ্ঠানে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন মেগান বলডিন ও ইউনিসেফ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 ‘ভগ্নপ্রায়’ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভ
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে কর্মসূচি উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, বিগত সরকারের দুর্নীতি আর অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ বিপর্যস্ত। তিনি জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের ১ কোটি ৭৮ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কুসংস্কারে কান না দেওয়ার আহ্বান
সিলেটের চিকনাগুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিকা কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। টাঙ্গাইলে হামের টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে সারাদেশে টিকার সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাঁচ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এই টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। সামান্য জ্বর হওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়ে কোনো কুসংস্কারে কান না দিয়ে শিশুদের কেন্দ্রে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, হাম-রুবেলার এক ডোজ টিকা প্রায় ৮৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয় এবং শিশু দুই ডোজ টিকা পেলে সুরক্ষার হার প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌঁছায়। যখন শিশুদের সময়মতো টিকার ডোজ দেওয়া না হয়, তখন নীরবে সুরক্ষার ঘাটতি বাড়তে থাকে; আর আমরা যখন তা টের পাই, ততক্ষণে রোগ অনেকটাই ছড়িয়ে পড়ে।

সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এই পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৮৩ জন। সব মিলিয়ে ২২০ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭৪ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৪৬ শিশু, বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।

এসএসসি পরীক্ষায় বসছে সাড়ে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী। আজ মঙ্গলবার বাংলা প্রথমপত্রের মাধ্যমে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আর দাখিল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ বিষয় দিয়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

সূচি অনুযায়ী, এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। এরপর ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। দাখিলের তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে ২৪ মে পর্যন্ত। আর ৭ থেকে ১৪ জুনের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টায় শুরু হবে পরীক্ষা। পরে ৭ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩১৮ জন। আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিলে অংশ নিচ্ছে তিন লাখ তিন হাজার ২৮৬ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন। সারাদেশে ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তিন হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেবে। এ বছর মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭১ হাজার ৬২৬।

পরীক্ষার কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিটি বিষয়ে প্রথমে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) এবং পরে সৃজনশীল বা রচনামূলক অংশ হবে; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয় ছাড়া। দুই অংশের মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। এমসিকিউ অংশের জন্য ৩০ মিনিট এবং সৃজনশীল অংশের জন্য দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। সঙ্গে রাখতে হবে প্রবেশপত্র। পরীক্ষা চলাকালে মোবাইল ফোন বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরীক্ষায় শুধু সাধারণ নন-প্রোগ্রামেবল সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যাবে। নিবন্ধনপত্রে উল্লেখিত বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে অংশ নেওয়া যাবে না। বহুনির্বাচনী, সৃজনশীল ও ব্যবহারিক– প্রতিটি অংশে আলাদাভাবে পাস করতে হবে; কোনো এক অংশে অকৃতকার্য হলে পুরো বিষয়েই অকৃতকার্য হিসেবে গণ্য করা হবে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রগুলো সরাসরি মনিটরিং করা হবে। প্রশ্ন ফাঁস ও ডিজিটাল অনিয়ম ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, পরীক্ষা পরিচালনায় জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। নকল ও অনিয়ম প্রতিরোধে আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে ডিজিটাল অপরাধকে শাস্তির আওতায় আনা যায়।

সংবাদ সম্মেলনে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার্থীবান্ধব হল নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, জনবান্ধব সরকার শিক্ষার্থীদের মন থেকে পরীক্ষা ভীতি নামক শব্দটি দূর করতে চায়।

জুলাই শহীদের মা এমপি হচ্ছেন জামায়াতের মনোনয়নে শরিকদের ছাড়া হলো তিনটি আসন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে যাচ্ছেন। জোটের শরিক এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত, জাগপাকেও একটি করে আসন ছেড়েছে জামায়াত।

এতে এনসিপির নারী এমপির সংখ্যা হবে ২। ভাগে ১২টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও জুলাই শহীদ পরিবার এবং  শরিকদের আসন ছেড়ে দেওয়ায় জামায়াতের পদধারী নেত্রীদের মধ্যে সাতজন এমপি হতে পারছেন।

জামায়াত এককভাবে ৬৮ আসন পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফতের দুই এমপি ও খেলাফত মজলিসের এক এমপি জামায়াতের সঙ্গে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ছয় আসন পাওয়া এনসিপির এমপিরা আলাদা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সংসদের প্রতি ছয়টি সাধারণ আসনের জন্য একটি নারী আসন পায় রাজনৈতিক দল ও জোট। এ হিসাবে জামায়াতের ১২টি ও এনসিপির একটি নারী আসন পাওয়ার কথা।
আজ মঙ্গলবার নারী আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। সোমবার সন্ধ্যায় মগবাজারে জামায়াত কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জোটের ১৩ নারী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। একাধিক প্রার্থী না থাকায় মনোনয়নপত্র বৈধ হলে ঘোষিত প্রার্থীদের সবার এমপি হওয়া নিশ্চিত।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, শহীদ পরিবারকে সম্মান করে একজন শহীদজননীকে সংসদে পাঠানো হচ্ছে। জামায়াত প্রতিশ্রুতি রেখেছে। ১১ দলীয় ঐক্যের কাছে মুখ্য হলো প্রাপ্যতা ও  সমঝোতা। তাই এনসিপি, জাগপা ও খেলাফতকে একটি করে আসন ছাড়া হয়েছে সমঝোতার প্রতিশ্রুতি রক্ষায়।
দলীয় নেত্রীদের কোন প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে– প্রশ্নে হামিদুর রহমান বলেছেন, জামায়াতের মনোনয়ন পদ্ধতি আলাদা। এখানে কেউ এমপি হতে চেয়ে আবেদন করেন না। তৃণমূল ও নারী বিভাগের মতামতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সংসদে নারী এমপিরা ১১ দলের পক্ষেই ভূমিকা রাখবেন জানিয়ে হামিদুর রহমান বলেছেন, একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছি। একসঙ্গে দেশ গড়ব। মূল লক্ষ্য শক্তিশালী দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন, সংসদে নারীর পক্ষে কথা বলা, নারীদের অধিকারের পক্ষে লড়াই করা।

জুলাই শহীদের মা এমপি
ছয় বছর বয়সী জাবির ইব্রাহিম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়। উত্তরার কেসি মডেল স্কুলের নার্সারির ছাত্র জাবির সেদিন বাবা কবির হোসাইন এবং মা রোকেয়া বেগমের সঙ্গে মিছিলে গিয়ে প্রাণ হারায়।

রোকেয়া বেগম পেশায় গৃহিণী। জুলাই শহীদদের জীবনী অনুযায়ী, ছোট্ট জাবির শিক্ষার্থীদের মিছিলে অংশ নিতে উদগ্রীব ছিল। রোকেয়া সন্তানদের নিয়ে ৫ আগস্টের লংমার্চে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। শেখ হাসিনার পতনের পর সন্তান নিয়ে বিজয় মিছিলে যোগ দেন। তখন পূর্ব থানা থেকে পুলিশ গুলি করলে মায়ের হাত ধরা জাবির গুলিবিদ্ধ হয়। তার ঊরুতে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জাবিরকে কোলে করে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। রক্ত জোগাড় হলেও ক্রস ম্যাচ না হওয়ায় সন্ধ্যায় মারা যায়।
পুত্রহারা রোকেয়া বেগম এমপি হতে যাচ্ছেন। জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীরা হলেন মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন বিভাগের সেক্রেটারি সাবিকুন নাহার মুন্নি, প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলু, সাবেক সেক্রেটারি মাহফুজা সিদ্দিকা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য সাজেদা সামাদ ও শামছুন্নাহার নাহার। এ ছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন নারী অধিকার আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের নেতা এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ।

এনসিপির মনিরা ও মিতু তালিকায়
জামায়াত জোট থেকে এমপি হতে যাচ্ছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মনিরা শারমিন। জামায়াতের ভাগ থেকে সংসদে যাচ্ছেন ডা. মিতু।
সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন মিতু। পরে তিনি জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তখনই সমঝোতা হয়েছিল, জোট থেকে তিনি নারী আসনে পরে মনোনয়ন পাবেন।

আসন পাচ্ছে খেলাফত ও জাপগা 
সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের জোটে থাকলেও জাপগাকে কোনো আসন ছাড়া হয়নি। জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান। এর প্রতিদান হিসেবে তাঁর বোন তাসমিয়া প্রধানকে নারী আসনে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। জামায়াতের সমর্থনে একটি আসন পাচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত।

সংরক্ষিত নারী আসন বিএনপির মনোনয়নে নবীনরা এগিয়ে আলোচিত অনেকে নেই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ২৬ জন প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। জায়গা পাননি আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেত্রী।

গতকাল সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ মঙ্গলবার দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন জমা দেওয়া হবে।

আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হবে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ৬ জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। সে অনুযায়ী, বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত আসন পাবে।

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে এবার ১০ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। তারা হলে–বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রেহেনা আক্তার রানু, কেন্দ্রীয় নেত্রী নেওয়াজ হালিমা আরলী, বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আক্তার, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি ও সুলতানা আহমেদ।

মনোনয়নের তালিকায় নতুন করে স্থান পেয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, বিএনপি সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন।
এছাড়া ফরিদা ইয়াসমিন, জীবা আমিন খান, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা ও রেজেকা সুলতানাকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

দুই পরিবারে একাধিক সদস্য
তালিকায় থাকা দুজনকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। তাদের একজন নিপুণ রায় চৌধুরী। তাঁর বাবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শ্বশুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

নিপুণ রায় চৌধুরী পেশাগতভাবে একজন আইনজীবী হলেও পারিবারিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ শাখা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে।

আরেকজন শিরিন সুলতানা। তাঁর স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন এমপি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল সাবেক এই ছাত্রদল নেত্রীর। তিনি ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ষষ্ঠ জাতীয় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।

নির্বাচনে পরাজিত তিনজন সংরক্ষিত আসনে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৯ জন নারী প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করেন। তাদের মধ্যে শেরপুর-১ আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা, ঢাকা-১৪ আসনে মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি পরাজিত হন। সংরক্ষিত নারী আসনে তিনজনই মনোনীত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেত্রীও মনোনয়ন পেয়েছেন
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সুবর্ণা ঠাকুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ড. কাজী মনিরুজ্জামান সমকালকে জানান, গত বছরের অক্টোবরে মতুয়া সংগঠনের ব্যানারে সুবর্ণা ঠাকুর বিএনপিতে যোগদান করেন। এই মতুয়া সংগঠন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুইজনকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।

পার্বত্য অঞ্চল থেকে মনোনীত অ্যাডভোকেট মাধবী মারমাকে নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি মাধবী মারমার আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা আওয়ামী লীগের আমলে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরের (এপিপি) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা কোনো পদপদবিও ছিল না বলে জানা গেছে।

নেতাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে আরও যারা মনোনয়ন পেয়েছেন  
বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরউদ্দিন আহমদ পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এবং মৌলভীবাজারের বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আবিদ চৌধুরী। তিনি স্থানীয় বিএনপির নেত্রী।
দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন, তবে সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন আন্না মিনজ। তিনি ওঁরাও জনগোষ্ঠী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আন্না মিনজ বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট জন গমেজের সহধর্মিণী। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক (প্রোগ্রাম) হিসেবে কর্মরত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, কৃষি, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা খাতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করছেন।

আলোচিত যারা মনোনয়ন পাননি
মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমেদের সহধর্মিণী হাসনা জসীম উদ্‌দীন মওদুদ, সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শাহিনুর নার্গিস, নাসিমা আক্তার (কেয়া), তামান্না খান আইরিন, শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, টাঙ্গাইল মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহেলা জাকির, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নিহার সুলতানা তিথিসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খানের নাম আলোচনায় ছিল। তবে তারা মনোনয়ন পাননি।

সংস্কৃতি জগতের কেউ নেই
সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা,  রিজিয়া পারভীন, নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, মডেল মেঘনা আলম ও রুকাইয়া জাহান চমক। রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন তালিকায় জায়গা পাননি।

এর মধ্যে শিল্পী কনকচাঁপা ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া না হলেও নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন– সংরক্ষিত আসনে তিনি এমপি হবেন। তবে মনোনয়ন ঘোষণার পর কনকচাঁপা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। জাতীয় নির্বাচনে নমিনেশন না পেয়েও আলহামদুলিল্লাহ বলেছি নির্দ্বিধায়। গ্রামের মানুষের প্রবল চাহিদার জন্য আবারও গেলাম সংরক্ষিত আসনের এই প্রসেসে। সেখানেও তারা আমাকে মূল্যায়ন করল না। তবু বলি আলহামদুলিল্লাহ। নিশ্চয়ই আল্লাহ এর মধ্যে মঙ্গল রেখেছেন। জীবন তো এখানেই শেষ হয়ে গেল না।’

কনকচাঁপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দিন বগুড়ার বিএনপি নেত্রী সুরাইয়া জেরিন রনি নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। আন্দোলনে থাকা নেত্রীদের মূল্যায়নের দাবি ছিল তাঁর। তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন।

ছাত্রদলের মানসুরা ও তুলির চমক
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে চমক দেখিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার ও সানজিদা ইয়াসমিন তুলি। মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্য মানসুরা সর্বকনিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্য সচিব তুলিও আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখ সারিতে ছিলেন।
ওই দুই নেত্রী ছাড়াও ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন আরও চার তরুণ নারী নেত্রী। এদের উত্থানকে দলীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চারজন হলেন— সেলিনা সুলতানা, আরিফা সুলতানা, শওকত আরা উর্মি ও নাদিয়া পাঠান পাপন।

তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মনোনয়নের তালিকায়
টেলিভিশন টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক ও পরিচালক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হককে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ফাহমিদা হক একজন গবেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

স্বতন্ত্র জোটে মনোনয়ন পেলেন ছাত্রদল নেত্রী জুঁই
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র ছয় এমপির জোট থেকে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সুলতানা জেসমিন জুঁইকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি শেখ মজিবর রহমান ইকবাল এবং ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মোহাম্মদ সালমান ওমর জুঁইয়ের মনোনয়নে স্বাক্ষর করেছেন। স্বতন্ত্র এমপিদের জোটের সবাই বিএনপির নেতা ছিলেন।

বাংলাদেশে গম রপ্তানিতে দুর্নীতি, নুসরাতকে ইডির তলব

০

টালিউড সিনেমার পর্দা থেকে হুট করেই রাজনীতির মাঠে নেমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নুসরাত জাহান। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে বসিরহাট কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে সংসদেও পৌঁছেছিলেন তিনি। বর্তমানে চলমান বিধানসভা নির্বাচনের আবহে রেশন দুর্নীতি মামলায় অভিনেত্রীকে ডিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।

টিভি-নাইন বাংলার একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে গম রপ্তানি ঘিরে যে দুর্নীতির মামলা হয়েছিল সে বিষয়ে জানার জন্য নায়িকাকে তলব করেছে ইডি। কারণ, সেই সময়ে বসিরহাটের সাংসদ ছিলেন নুসরাত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে বসিরহাটের সাংসদ হিসেবে দায়িত্বে থাকায় গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে নুসরাতের কিছু ধারণা থাকতে পারে। সেই কারণেই তার বক্তব্য নথিবদ্ধ করতে চাইছে ইডি। যদিও অভিনেত্রী এই বিষয় এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।

নুসরাত জাহান। ছবি: ফেসবুক

নুসরাত জাহান। ছবি: ফেসবুক

এদিকে ইডির তলবের পর কলকাতা নয়, দিল্লিতে হাজিরা দিতে চেয়ে আবেদন করেছেন নুসরাত। সেই আবেদনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এখন কেন্দ্রীয় সংস্থার ওপর নির্ভর করছে।

এবার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও দলীয় পরিসরের সঙ্গে তার যোগাযোগ এখনও বজায় রয়েছে। প্রচারেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে যশ-নুসরাত তাদের প্রযোজনা সংস্থা নিয়ে ব্যস্ত। ইতিমধ্যেই দুটি ছবি মুক্তি পেয়েছে তাদের প্রযোজনা সংস্থা থেকে। ছবি প্রযোজনার পাশাপাশি অভিনয়, কেরিয়ার আর ছেলেকে নিয়ে তাদের সংসার। এর মাঝেই ইডি তলবের খবর। ভোটের আবহে এর পরে নুসরাত কী পদক্ষেপ করেন, সেটাই এখন দেখার।

মধ্যপ্রাচ্যের ১৮ দেশে পোশাক রপ্তানি বন্ধ

আরব ও অনারব মিলে মধ্যপ্রাচ্যে দেশের সংখ্যা ১৮টি। এসব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি খুব বেশি নয়। মোট রপ্তানির ১ শতাংশেরও কম। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের হামলার পর এসব বাজারে রপ্তানি কার্যত বন্ধ। প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ। যদিও রপ্তানি তালিকায় টুপিসহ অন্যান্য ছোট কিছু পণ্য এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ইরানে হামলার পর যুদ্ধ পরিস্থিতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আকাশ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রপ্তানিকারকরা জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্র্যান্ড-ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ স্থগিত করে দেয়। কবে নাগাদ এসব রপ্তানি আদেশ ফিরবে, বলা যাচ্ছে না। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাজার ধীরে ধীরে বাড়ছিল। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগী পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশের রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি গন্তব্য এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। সম্প্রতি স্বল্প পরিসরে আকাশপথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। যদি শিগগির যুদ্ধ বন্ধ হয়ও, তবু মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না। দেশগুলোতে যে পরিমাণ অবকাঠামোর ক্ষতি হলো, তা সেরে উঠতে বহু বছর লাগতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ৬৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে; ২৮ কোটি ১১ লাখ ডলারের। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দেশটিতে রপ্তানি হয় ২৫ কোটি ১৬ লাখ ডলারের। কুয়েতে ২ কোটি ডলারের মতো। যুদ্ধের মূল ক্ষেত্র ইরানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮১ লাখ ডলারের কিছু বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব দেশে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের কিছু বেশি। ইপিবির মধ্যপ্রাচ্য ব্লকে ১২টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয় এর মধ্যে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক। পোশাকের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জোব্বা, শেরওয়ানি, আম্মামা, পাগড়ি, সিরওয়াল ইত্যাদি। এ ছাড়া শার্ট, প্যান্ট, স্যুট, ব্লেজারের চাহিদাও রয়েছে সেখানে। সরাসরি আমদানি ছাড়াও বহুজাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের মাধ্যমে অন্যান্য দেশ থেকেও মধ্যপ্রাচ্যে যায় মেড ইন বাংলাদেশের পোশাক। অন্যদিকে পর্যটন আকর্ষণে সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলো নানা পরিকল্পনা নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের চাহিদার পাশাপাশি পর্যটকদের মাধ্যমেও রপ্তানি বাড়ানোর বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে। পোশাকের বাইরে সবজি, ফল, বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।

জানতে চাইলে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. মাসরুর রিয়াজ গতকাল সমকালকে বলেন, গত অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ থকে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে তার মধ্যে ৮৯ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক। মূলত ছিল জিসিসিভুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এই বাজারের পুরোটাই প্রায় বন্ধ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই যুদ্ধে আক্রান্ত। আবার বিমান চলাচল কিছুদিন বন্ধই ছিল। তারপর সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। জাহাজ চলাচল তো একেবারেই বন্ধ। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় শতকোটি ডলারের সর্বশেষ বাজারটা এই মুহূর্তে আর কার্যকর নয়। ইউরোপ ও আমেরিকানির্ভর রপ্তানি বাজার বাস্তবতায় এই বাজারগুলো ধীরে ধীরে বাড়ছিল।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। উচ্চ মূল্যের পোশাকের চাহিদা রয়েছে সেখানে। এই মুহূর্তে সেটা বন্ধ এবং দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর অভিঘাত এসেছে। যেমন সৌদি আরব বা কুয়েতের বেশ কিছু তেল-গ্যাসের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলো ঠিক হতে সময় লাগবে। সেখানে পর্যটনের গতি ফিরতেও অনেক সময় লাগবে। সে জন্য আমাদের পণ্যের যে চাহিদা সেখানে ছিল, সেটা হয়তো খুব সহজেই আগের পর্যায়ে ফেরত আসবে না।
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমি বলব, স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে আমাদের বাজারে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের একটা সম্ভাবনা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল। সেটা পিছিয়ে গেল। আর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ বাজার আর ফিরবে কিনা, বলা মুশকিল।

তৈরি পোশাকের অপ্রচলিত শ্রেণি বা নতুন বাজারের মধ্যে সম্ভাবনাময় বাজারের তালিকায়  মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ রয়েছে– সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে এই দেশ দুটির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়েছে ২০ কোটি ডলারের পোশাক। সৌদি আরবে এ সময় রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ডলারের মতো। যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো এই দেশ দুটিতে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান সমকালকে বলেন, অনন্ত গার্মেন্টস গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আসছিল। এখন সেখানে তাদের রপ্তানি একেবারেই বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্র্যান্ড-ক্রেতারা আপাতত তাদের দেওয়া আদেশের রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের  যৌথ হামলার পরপরই সুইডিশ ব্র্যান্ড এইচ অ্যান্ড এম তাদের রপ্তানি আদেশের পণ্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে বলেছে। মধ্যপ্রাচ্য আসলে এখনও বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার হয়ে ওঠেনি। মোট রপ্তানি আয়ের ১ শতাংশেরও কম রপ্তানি হয় সেখানে। তিনি জানান, কবে নাগাদ আবার এসব  বাজার খুলবে, বলা মুশকিল।
দীর্ঘ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নতুন বাজার গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বিজিএমইএ। মধ্যপ্রাচ্যের ১৮ দেশের উপযোগী পণ্য সরবরাহে স্থানীয় চাহিদা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোন মৌসুমে কী ধরনের রঙের প্রাধান্য, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টিতে কূটনীতিকদের কাজে লাগানো হচ্ছে। চাহিদা বোঝা এবং সরকার ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন বিজিএমইএ নেতারা। প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টিতে মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। অন্যদিকে পর্যটন আকর্ষণে সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলো নানা পরিকল্পনা নিয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের ৮৭৯ গাড়ি দুই বছর ধরে গ্যারেজবন্দি গাড়িগুলো স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের

স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছিল ৮৭৯টি গাড়ি। সেই প্রকল্প শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর হলো। সেই থেকে গাড়িগুলো বসে আছে। কোনোটা এখন গ্যারেজবন্দি, কোনোটা খোলা জায়গায় পড়ে আছে। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে থাকা সরকারি এসব গাড়ি সচল করার কার্যকর উদ্যোগ নেই।

এই গাড়িগুলো স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এগুলো ফেলে রাখায় শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে মাঠ পর্যায়ের তদারকিতে ধাক্কা লেগেছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সাল থেকে অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ৩৮টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছিল। এসব তদারকির জন্য ওপির অর্থেই ধাপে ধাপে ৮৭৯টি গাড়ি কেনা হয়। তবে ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার এসব কর্মসূচি গুটিয়ে নেয়।

পরে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওপি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিলেও গত বছর ৫ মার্চ তা বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বাতিল হওয়া কর্মসূচির গুরুত্ব বুঝে বিএনপি সরকার তা ফের চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে পাঁচটি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরুও হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক তদারকি না থাকায় মাঠ পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গাড়ির টায়ার, ব্যাটারি ও ইঞ্জিন বিকল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গত বছর ১৫ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে ওপির টাকায় কেনা সব গাড়ি সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত একটি গাড়িও জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, গাড়িগুলো একবার পরিবহন পুলে চলে গেলে অন্য দপ্তরে বরাদ্দ হয়ে যাবে। এতে স্বাস্থ্য বিভাগ তার সম্পদ স্থায়ীভাবে হারাবে।

গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এসব গাড়ি সচল ও চালক নিয়োগের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠকে গাড়ি সচলের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, গাড়ির প্রয়োজন আছে। আমাদের একটু সময় দেন। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুততম সময়ে সমাধান হয়ে যাবে।

কত রকমের গাড়ি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো জানান, ২০১৬ সালে নারী ইউএইচএফপিওদের জন্য প্রায় ৫০টি টয়োটা র‍্যাব ফোর, ২০১৮ সালে ৫০টি মিতসুবিশি এক্সপান্ডার এবং ২০২০ সালে করোনার শুরুতে ৩৪০টি মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার গাড়ি কেনা হয়েছিল। করোনার সময় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়নে এসব গাড়ি বেশ কাজে দিয়েছিল। গাড়ির কারণে যাতায়াত সহজ হয়ে যাওয়ায় করোনার টিকা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন, পুষ্টির কার্যক্রমে গতিশীলতা বেড়েছিল। এখন এসব গাড়ি অচল পড়ে আছে। ফলে সেবা তদারকি ব্যবস্থা গতি হারিয়েছে।

অচল থাকা যানবাহনের মধ্যে আরও রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস, জিপ এবং ওষুধ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত কাভার্ডভ্যান। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে সেবার জন্য কেনা এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় এখন কার্যত অচল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এই কর্মসূচিতে ৫৭৩টি যানবাহন কেনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি জীপ, ১০টি মাইক্রোবাস, ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স, ২০টি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর জন্য ৪৯০টি যানবাহন। এসব যানবাহনের বড় অংশই এখন নিয়মিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরেও একই চিত্র। সেখানে রয়েছে ৪৯টি অডিও-ভিজ্যুয়াল ভ্যান, তিনটি জীপ ও তিনটি মাইক্রোবাস। সিসিএসডিপি ইউনিটের জন্য ৭১টি জিপের মধ্যে ৬৪টি জেলা পর্যায়ে রিজিওনাল ও ডিস্ট্রিক্ট কনসালট্যান্টদের তদারকির কাজে ব্যবহৃত হলেও বাকি সাতটি পড়ে আছে অধিদপ্তরে। এ ছাড়া এমসিএইচ-সার্ভিসেস ইউনিটে সাতটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস ও ৬৭টি অ্যাম্বুলেন্স, পরিকল্পনা ইউনিটে দুটি জিপ ও একটি মাইক্রোবাস, এফপি-এফএসডি ইউনিটে চারটি জিপ এবং পিএসএসএম-এফপি ইউনিটে ছয়টি জিপ রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ৪৩টি পিকআসহ (কাভার্ডভ্যান) এই অধিদপ্তরে ৩০৩টি গাড়ি পড়ে আছে।

টিকা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণসামগ্রী সরবরাহে ৪৩টি কাভার্ডভ্যান ব্যবহারের কথা থাকলেও কেন্দ্রীয় পণ্যাগারসহ ২৩টি আঞ্চলিক পণ্যাগার থেকে ৪৯৬টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধ পৌঁছানোর কাজে এসব যানবাহনের ব্যবহার হচ্ছে না। এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ১৬টি গাড়িও দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে।

মাঠপর্যায়ের তদারকির এখনকার হাল 
মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এর প্রমাণ মিলেছে গত ১২ এপ্রিল। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) শংকর প্রসাদ অধিকারী মোটরসাইকেলে করে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। অথচ ২২ মাস আগেও তিনি হাসপাতালের গাড়িতে করে পরিদর্শনে যেতেন। গাড়ি সচল না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁকে মোটরসাইকেলে চেপে পরিদর্শনে যেতে হয়েছিল। এখন তিনি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বরিশালের ইউএইচএফপিও ডা. মনির শাওন বলেন, আমাদের কাজই হলো মাঠপর্যায়ে চলমান সেবা কার্যক্রম সচল রাখা। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শন করে থাকি। আমার অধীনে ২৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, এসব কেন্দ্রে মানুষ ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে কিনা, তা তদারকি করা জরুরি। এ ছাড়া মাসে আট দিন উপজেলা পরিষদে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এতেও গাড়ির প্রয়োজন হয়। ২২ মাস গাড়ির সুবিধা না থাকায় এখন নিজ খরচে এসব কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সিলেটের ইউএইচএফপিও ডা. ইয়াসিন আরাফাত বলেন, গাড়িগুলো সচল থাকা জরুরি হলেও ২২ মাস ধরে অচল। এখন ব্যক্তিগত খরচে বা অন্যের মোটরসাইকেলে গিয়ে তদারকি করতে হচ্ছে। গাড়ি থাকলে তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা যেত।

বোয়ালখালী উদাহরণ
ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু কর্মকর্তা প্রকল্পের গাড়ি সচল রেখেছেন। তেমনই এক কর্মকর্তা চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ইউএইচএফপিও ডা. জাফরিন জাহেদ জিতি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যক্তিগত খরচে সরকারি গাড়ির ব্যবস্থাপনা আমি নিজেই করছি। আমি আর্থিক ক্ষতিতে পড়লেও বোয়ালখালীবাসীর স্বাস্থ্যসেবার পথ সুগম রাখতে আমার এই উদ্যোগ।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকের মত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, একটি গাড়ি শুধু লোহার কাঠামো নয়, এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সচল মাধ্যম। ২২ মাস এই গাড়ির বহর অকেজো রাখা মানে হলো আমাদের সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদান কর্মসূচির ওপর সরাসরি আঘাত। যখন তদারকি বন্ধ হয়ে যায়, তখন মাঠকর্মীদের মধ্যে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়, যার প্রমাণ আমরা এখন হামের প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। অচিরেই এই সংকটের সমাধান না হলে শুধু সরকারি সম্পদই অপচয় হবে না, বরং গত তিন দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে আমাদের যে অর্জন, তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

কারা কী বলছেন
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ওপি বন্ধ হওয়ায় পুরো স্বাস্থ্য খাতেই এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। তবে সেটি থেকে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে সরকার। ইতোমধ্যে কয়েকটির অনুমোদন হয়েছে। বাকিগুলোও দ্রুত হয়ে গেলে গাড়ির বিষয়ে আর কোনো সংকট থাকবে না।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গাড়ির সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।