Home Blog Page 16

জাপানে ভূমিকম্প ধসে যাওয়া শপিং সেন্টারে বহু মানুষ আটকা, নিহতের আশঙ্কা

জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমামোতোতে মঙ্গলবার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ১। ভূমিকম্পে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, কুমামোতোতে ধসে পড়া একটি বিপণিবিতানের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন। সেই ভবনে অনেক ব্যক্তি নিহত হতে পারেন।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির একটি তলা ধসে পড়ার পর বহু মানুষ ভেতরে আটকা পড়েন। জরুরি উদ্ধারকর্মীরা তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন।

জাপানের সম্প্রচারমাধ্যম টিবিএস জানিয়েছে, শপিং সেন্টারটিতে ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক’ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে টিভি আসাহি স্থানীয় পুলিশের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এ ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ফুজি টিভিও হতাহতের খবর দিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে ভূমিকম্পের পর জাপানের আবহাওয়া দপ্তর উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। তারা কুমামোতো, নাগাসাকিসহ কয়েকটি এলাকায় এ সতর্কতা জারি করে। তবে আবহাওয়া-বিশেষজ্ঞরা সাগরের পানিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখতে পাননি। তাই প্রায় দুই ঘণ্টা পর আবহাওয়া দপ্তর সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়।

ভূমিকম্পে কিউশু দ্বীপের অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে রেল কর্তৃপক্ষ বুলেট ট্রেন চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে।

চলতি মাসেও রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা

ব্যাংকিং চ্যানেলে টানা দুই অর্থবছর প্রবাসী আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেও ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রয়েছে। চলতি মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ২৪৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের জুলাইয়ের একই সময়ের তুলনায় যা ৫০ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।

২০২৫-২৬ অর্থবছর প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্য উৎসে ভালো অবস্থান না থাকলেও রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। অবশ্য গত এক মাসে ডলারের দর এক টাকার মতো বেড়ে গতকাল সোমবার আন্তঃব্যাংকে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা বেচাকেনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আমদানিতে ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ২ শতাংশের বেশি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) ১৪৮ কোটি ডলার পরিশোধ হয়। এর মধ্যেও গতকাল গ্রস রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় যা ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। সেখান থেকে বেড়ে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার হয়। আর জুনের শেষে উঠেছিল ৩৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। তবে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। তবে অর্থ পাচারে কড়াকড়ি নীতির ফলে হুন্ডি কমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার গতি বেড়েছে। এ কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। রেমিট্যান্সের এ ধারা ধরে রাখতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখাসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

ফেরত গেল উন্নয়নকাজের বরাদ্দ, বিপাকে ৬১ বিদ্যালয়

ময়মনসিংহের নান্দাইলে ৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণসহ উন্নয়নকাজ কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি। এতে বরাদ্দের পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। এদিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বিদ্যালয়গুলোয় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।

প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তারা বারবার তাগাদা দিয়েও কাজ শেষ করাতে পারেননি। ঠিকাদাররা বলছেন, এ পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তা তারা নিজেদের টাকায় করেছেন। এখন বরাদ্দের অর্থ ফেরত গেলে তাদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে পিইডিপির (প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প) অধীনে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও এখন পর্যন্ত তা শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট অফিস জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের পর বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ না করায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষে বরাদ্দের টাকা ফেরত গেছে। উন্নয়নকাজের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ।

উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাদের তত্ত্বাবধানে উপজেলায় পিইডিপি প্রকল্পের অধীন দুই কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া রয়েছে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬টি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর এবং দুই কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের আলাদা কক্ষ নির্মাণ। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব প্রকল্প ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে নির্দিষ্ট সময়েও কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিকবার সময় বৃদ্ধি করা হলেও এখনও কাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ ২০ শতাংশও শেষ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

নির্মাণকাজ বাকি থাকা কয়েকটি বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চণ্ডীপাশা মডেল সরকারি বিদ্যালয়, ধীতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর ভেলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভবন নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গাঁথুনির জন্য মাটির ওপর ভিম তৈরি করে সেভাবেই ফেলে রাখা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবু বকর ছিদ্দিক জানান, একটি ভবনের অভাবে পাঠদানে তাদের খুব সমস্যা হচ্ছে।

দেউলডাংরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, বারবার তাগাদা দেওয়ার পর সম্প্রতি ঠিকাদারের লোকজন দরজা জানালা লাগিয়েছে, প্লাস্টার এখনও বাকি রয়েছে। হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে প্রধান শিক্ষকের জন্য তিন তলায় পৃথক কক্ষ নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক বেগম নুরুন্নাহার জানান, প্রতি মাসে প্রকৌশল অফিসে গিয়ে তাগাদা দিয়েও তিনি কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কান্দাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক জুলফিকার আলী ভূঁইয়া জানান, কাজটি শেষ না হওয়াতে তিনি বিদ্যালয়টিকে সুন্দর করে গোছাতে পারছেন না। পুরহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান ফকির জানান, তাঁর বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের কাজ দীর্ঘদিন অর্ধেক করে ফেলে রাখা হয়েছে।

ঠিকাদারদের একজন আমরু মিয়া জানান, তিনি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ পেয়েছেন। প্রায় সবগুলোর কাজই শেষের পথে, কয়েকটির সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম (বড় সাইফুল) জানান, সীমানা জটিলতার কারণে সেখানে এতদিন কাজ শুরু করা যায়নি। কিছু দিন আগে জায়গা বুঝে পেয়ে তিনি কাজ শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানান, নিজেদের টাকায় কাজ করেছেন, বরাদ্দ ফেরত গেলে তারা মাঠে মারা যাবেন।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া পিয়াল জানান, ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ হয়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। আগামীতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনরায় টেন্ডার দিয়ে কাজ করতে হবে।

বন্যায় তছনছ চট্টগ্রামের কৃষি, প্রণোদনার অপেক্ষায় কৃষক ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে

ঋণ নিয়ে ও নিজের সঞ্চিত অর্থ লগ্নি করে আউশের ধান চাষ, ক্ষেত-খামার করেছিলেন চট্টগ্রামের অসংখ্য কৃষক। বৃষ্টি ও বন্যায় এসব চাষাবাদ তলিয়ে গেলে সবজির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব হিসাবনিকাশও নষ্ট হয়ে গেছে। চাষের মাছ বন্যায় ভেসে যাওয়াতে চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। পরের মৌসুমের আবাদ নিয়েও রাজ্যের অনিশ্চয়তা ভর করেছে তাদের মনে। সরকারি সহায়তা ছাড়া উদ্ধারপ্রাপ্তির আর কোনো সহায় দেখছেন না এই চাষিরা।

কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশের শঙ্খ নদের চরে সবজি চাষ করছেন মোহাম্মদ হাসান (৩২)। চলতি মৌসুমেও এই চরে প্রায় পাঁচ কানি জমিতে ঢ্যাঁড়শ, লাউ, ঝিঙা, চিচিঙ্গাসহ নানান সবজি চাষ করেছিলেন। নিজের সঞ্চিত ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে স্থানীয় একটি সমবায় সমিতি থেকে চড়া সুদে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকায় সবজিক্ষেত করেছিলেন এই চাষি। কিন্তু বন্যার পানিতে ডুবে যায় তাঁর ক্ষেত। পানি নামার পর দেখতে পান তাঁর বেশির ভাগ সবজি পচে গেছে; যা অবশিষ্ট ছিল, তাও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের মধ্যবয়সী বাসিন্দা মওলানা মো. হামিদ একজন মাছচাষি। ১৫ লাখ টাকা খাটিয়ে এলাকার ছোট-বড় কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়েছেন তিনি। নিজের সাত লাখ টাকার পাশাপাশি সমবায় সমিতি ও একটি এনজিও থেকে আট লাখ টাকা ঋণ করেছেন। দিনে দিনে তাঁর পুকুরের মাছ বড় হচ্ছিল। কিন্তু বন্যায় চোখের সামনেই পুকুরগুলো তলিয়ে গেলে সব মাছ বেরিয়ে যায়। এখন পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা এই ক্ষুদ্র মৎস্য খামারি।

সমকালের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মওলানা মো. হামিদ ও মো. হাসানের চোখে পানি টলমল করছিল; গলাও ধরে আসছিল তাদের। হামিদ বলেন, ‘পুকুর থেকে আসা লাভের টাকায় সংসার চলত। এবার পুকুরে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যায় পুকুর ডুবে সব মাছ বেরিয়ে গেছে। এখন কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, আর কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’

মো. হাসান বলেন, ‘শঙ্খচরে সবজি চাষ করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করি, সংসার চালাই। এখন ধার-দেনা কীভাবে মেটাব? কীভাবে সংসার চলবে? বুঝতে পারছি না। সরকারের সহায়তা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই আমাদের।’

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলায় ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি ও আউশ ধানের আবাদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। জেলার ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৪৩ হাজার ৫০ টন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলায় ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার। ৫২০ টন আদা নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হলুদের ১১৮ দশমিক ৩৬ টন উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ৭৮ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। টাকার অঙ্কে এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।

৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৭ জুলাই বিকেল ৩টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় চট্টগ্রামে। টানা কয়েক দিনের অতিভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ধানি জমি, সবজিক্ষেত, মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম আর পানের বরজ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বন্যায় শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫১১ জনই কৃষক। তবে জেলা প্রশাসনের হিসাবে,  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়েছেন, ‘কেবল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষি খাতেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার। কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্যান্য জেলায়ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ আশ্বাস দিয়ে অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনাসহ সব ধরনের সহায়তা দিতে কাজ চলছে।’

শিশুরা যে ক্ষেত্রে বিকশিত হতে চায়, সরকার সহযোগিতা দেবে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজকের শিশুরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবেই ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছোট্ট বন্ধুরা, সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে কিশোর-কিশোরীদের বৃহৎ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৫-২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এই আয়োজন হয়।

প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোর ও খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার কাজ করছি। কিন্তু এই কাজটি আমরা তখনই সফলভাবে করতে পারব, যখন আজকে যারা গ্যালারিতে বসে আছে এবং যারা খেলার মাঠে পুরস্কার পেয়েছ, তোমরা নিজেদের আগামী দিনের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। এখন পড়ার সময় মন দিয়ে পড়তে হবে, একইভাবে মন দিয়ে খেলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তুলতে পার, আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। এই কাজ আমরা হয়তো শুরু করেছি। কিন্তু বাংলাদেশ গড়ার কাজ তোমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আজ প্যান্ডেল ও গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার শিশুর মধ্য থেকেই আগামী দিনের সফল ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থপতি, আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার, সাঁতারু ও টেনিস খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে, যারা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই তোমরা শক্তভাবে আত্মগঠনে মনোযোগ দাও।’

শিশুদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমাদের সবার কাছে আমি একটি সহযোগিতা চাই। এই দেশটা আমাদের সবার দেশ। এই দেশের আলো, এই দেশের বাতাস, এই দেশের পরিবেশ আমরা সবাই মিলে যদি ঠিক রাখি, তাহলে আমরা একটি সুন্দর পরিবেশ গড়তে পারব। তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো– রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তোমার বাসার আশপাশে অনেকে বিভিন্ন রকম ময়লা, প্লাস্টিকের বোতল ফেলে যায়। কেউ এগুলো ফেলছে, সেটি পুকুর হোক, নদীনালা হোক, বাসার আশপাশে এখন থেকে যদি এ রকম কোনো দৃশ্য তোমাদের চোখে পড়ে, প্লিজ তোমরা তাকে বারণ করবে। দরকার হলে সেই ময়লাটি তোমরা তুলে নিয়ে গিয়ে যেইখানে ময়লা ফেলার জায়গা, নির্দিষ্ট সেই জায়গায় ফেলতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি কাজ তোমাদের করতে হবে, কেউ যদি পুকুর নদীনালায় ময়লা ফেলে, যদি তুমি পার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সেই ময়লা পরিষ্কার করবে। যাতে আমাদের পরিবেশ, আমাদের নদীর পানি, পুকুরের পানি পরিষ্কার থাকে। যাতে সেখানে মানুষ সুন্দরভাবে হাঁটাচলা করতে পারে বা মানুষ সেখানে বসতে পারে। প্রতিবছর চেষ্টা করবে, তোমার বাড়ির আশপাশে হোক, তোমার স্কুলের আশপাশে হোক অথবা যেখানে তুমি সুবিধা মনে করো সেইখানে একটি করে গাছ লাগাতে হবে। গাছ যদি আমরা লাগাতে পারি, আমাদের পরিবেশটা সুন্দর হবে, পরিষ্কার হবে। আমরা সবাই মিলে বুকভরে শ্বাস নিতে পারব।’
কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা প্রকৃতির প্রতি, বিভিন্ন পশুপাখির প্রতি অত্যন্ত নির্দয় হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোট বন্ধুদের আমি অনুরোধ করব, এসো আমাদের আশপাশে যত কুকুর-বিড়াল, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন রকম পশুপাখি আছে, আমরা চেষ্টা করব, এই যে প্রকৃতির, আল্লাহ দেওয়া বিভিন্ন জীব, পশুপাখি এদের যত্ন নেওয়ার। যত্ন যদি নিতে না পারি, অন্তত আমরা চেষ্টা করব, তাদের যাতে কোনো প্রকার ক্ষতি হতে না পারে।’

বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। শিশুরা যে ক্ষেত্রে নিজেদের বিকশিত করতে চায়, তা পড়ালেখা, খেলাধুলা, গান বা ছবি আঁকা যাই হোক না কেন সরকার তাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
উপস্থিত সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রায়শই নানামুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক খবর লিড নিউজ হিসেবে প্রাধান্য পায়। তবে শিশুরা এবং তাদের এই আয়োজনই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত ভবিষ্যৎ। তাই আগামীকালের (আজ) পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদে শিশুদের এই উদ্যোগ ও তাদের সাফল্যকে যেন অগ্রাধিকার দিয়ে প্রচার বা লিড নিউজ করা হয়, এটা আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান থাকল।

গণমাধ্যমের নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের চলমান কাজে সম্পাদকদের সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া সংবাদপত্রের সম্পাদকদের প্রতি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ও যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠকে উপস্থিত ছিল। অন্যরা হলেন– দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম এবং মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম।

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনে সভা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সভা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে এ সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

সভায় জাতীয় সংসদের বিদ্যমান সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সাউন্ড সিস্টেম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এ সময় গণপূর্ত অধিদপ্তর সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত বিকল্প, কারিগরি সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার কথাও  উল্লেখ করে।
সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি করা আমলাকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের উপসচিব মো. সামসুল আলম ২০১৮ সালের মার্চে চাকরি থেকে অবসরে যান। পরে তিনি বিএনপির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। গত বছর গঠিত বিএনপির আসন পুনবির্ন্যাস-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৩ জুলাই তাঁকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসি সচিবালয়ে এক বছরের চুক্তিতে অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

একই দিন ১১টি কোম্পানি, করপোরেশন এবং সরকারি সংস্থায় বিএনপির পদধারী নেতাদের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে আমলাদের নিয়োগ করা হতো। সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের নজির রয়েছে। বিএনপির আগের আমলগুলোতে অবশ্য দু-একজন নেতাকে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী এসব কোম্পানি, করপোরেশন এবং সংস্থায় সরকার যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে বাধা নেই।

তবে সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসিতে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি এই নিয়োগকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দলীয় রাজনীতি করা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যায় না। অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয়েছে, সেগুলো নির্বাহী বিভাগের অংশ, মানে সরকারের অধীন। সরকার চাইলে যে কাউকে নিয়োগ করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সরকারের অধীন নয়; অংশও নয়। এর মূল চরিত্রই নিরপেক্ষতা।

তিনি বলেন, ইসিতে দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া মানে, এই চরিত্র শেষ হওয়া। তখন আবার ইসির প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে। ৫ আগস্টের আগের মতো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। সরকারের এই নিয়োগ বাতিল করা উচিত।

বিএনপি করা কর্মকর্তা
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ সমালোচনা করলেও নিজের নিয়োগে সমস্যা দেখছেন না মো. সামসুল আলম। তিনি সমকালকে বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ‘রাতের ভোট’খ্যাত নির্বাচনের ফলাফলের তথ্য চাওয়ায় তাঁকে তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীনের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই মাস তিন দিন কারাগারে ছিলেন তিনি।

সামসুল আলমের ভাষ্য, তিনি কখনোই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কথা বলায় তাঁকে আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। পরে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে বিএনপির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

জামায়াত-এনসিপির সমালোচনা বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি তো বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে সব পদেই সরকারি দলের কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হয়। আমি অবসরের পর বিএনপির আসন পুনর্বিন্যাস কমিটিতে ছিলাম মাত্র। এটা কোনো দলীয় পদ নয়। যে কোনো ব্যক্তি তা থাকতে পারেন। তবে আমি এখন নিরপেক্ষ। বিএনপি করি না।

নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ পাওয়া নৈতিক কিনা– এমন প্রশ্নে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, কাজের মাধ্যমেই আগামী দিনে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করব।

গত বছরের ৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে গঠিত আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন সামসুল আলম। একই কমিটিতে সদস্য ছিলেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চাহিদা অনুযায়ী, নাকি সরকার থেকে সামসুল আলমকে নিয়োগ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমকালকে বলেন, ‘এটা আমি পরিষ্কার নই। আমার ধারণায় নেই।’

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায় কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমিও তো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অতিরিক্ত সচিব সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পদ। তাই সরকারের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

সামসুল আলম বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আন্দোলনও করেছেন। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও নিয়মিত অফিসার্স ক্লাবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে দলের নেতাকে নিয়োগ দিয়ে দলীয়করণের সব সীমা পার করেছে বিএনপি। অতীতে কেউ এতটা নির্লজ্জতা করেনি। সামসুল আলম যদি চাকরিজীবনে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে সরকার তাঁকে ভূতপূর্ব পদোন্নতি দিয়ে সম্মান এবং বকেয়া বেতন-ভাতা দিতে পারত। যেমন দেওয়া হয়েছে শত শত বঞ্চিত কর্মকর্তাকে। কিন্তু ৬৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি, যিনি সরাসরি দল করেছেন, তাঁকে কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে পারে?

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, স্থানীয় নির্বাচন এবং আগামী সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করতেই সরকার বিএনপি নেতাকে ইসিতে নিয়োগ দিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ও আবদুল বারীর বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।

পুরোনো নিয়মে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ অনুমোদিত হলেও সংবিধান সংশোধন না হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে পুরোনো নিয়মেই। গোপন ব্যালট ব্যবহার হবে না। তবে যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তাহলে সংসদ সদস্যরা (এমপি) ব্যালটে সইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ্যে ভোট দেবেন।

জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই ছয়টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের একক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও এর একাংশে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এসব নিয়োগ ক্ষমতা পাবেন না।

জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে ইতোমধ্যে সংসদীয় কমিটি করেছে সরকারি দল। তবে বিরোধী দল এতে যোগ দেয়নি। তারা সংবিধান সংশোধন নয়; গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার চায়।

এদিকে সরকারি দলের সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম সভা এখনও হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সংবিধান সংশোধন করতে কয়েক মাস লেগে যাবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে তার সম্ভাবনা নেই। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, শিগগির তারা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে ইসি তা করে থাকে। ফলে আগামী সপ্তাহে জানা যাবে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা কবে হবে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। মোঃ সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়েন ২৪ জুলাই। এ হিসাবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিলে সর্বোচ্চ ২৫ দিন সময় দেওয়ার নজির রয়েছে। ফলে আগামী সেপ্টেম্বরে এই নির্বাচন হতে পারে। একাধিক প্রার্থী না থাকলে এর আগেও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন।

রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগে শূন্য পদে ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৭৭ দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে শূন্য পদে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোঃ আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের ২০ মার্চ থেকে ওই বছরের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ দিন দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল তপশিল ঘোষণা করে ২৯ এপ্রিল ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছিল। মোট সময় দেওয়া হয়েছিল ২০ দিন। তবে আবদুল হামিদ একক প্রার্থী হওয়ায় ভোট গ্রহণের আর প্রয়োজন হয়নি। ২০১৩ সালের তপশিলে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল ২১ এপ্রিল। যাচাই-বাছাই ছিল ২২ এপ্রিল। আর কোনো প্রার্থী না থাকায় সেদিনই  আবদুল হামিদ নির্বাচিত হয়ে যান।

এবারের সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। নির্বাচন হবে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী। এই আইনের ১০ ধারা অনুসারে প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার নিয়ম থাকায়, বিএনপির প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা নেই।

তাই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটে প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। জামায়াত নেতারা ইতোমধ্যে তা সমকালকে জানিয়েছেন। ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায়, সেবার প্রথম এবং শেষবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করতে হয়েছিল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এমপিদের সমর্থনে ১৭২ ভোট পেয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হয়েছিলেন।
ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ঠেকাতে জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, সংসদের উভয় কক্ষের ৪৫০ এমপির গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। যে ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে কোনো দলেরই নোট ডিসেন্ট ছিল না, এর একটি এই প্রস্তাব। সংবিধানের সংশোধন না হওয়ায় ১০০ আসনের সংসদের  উচ্চকক্ষও গঠিত হয়নি।

ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে জুলাই সনদে ছয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের একক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

বিএনপি এ প্রস্তাবের একাংশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। দলটি রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা দিতে রাজি হয়নি। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে ৯টি সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, এর একটি এটি।

বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। যদিও বিরোধী দল এতে রাজি নয়। তবে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি যেভাবে চাইবে সেভাবেই সংবিধান সংশোধন হবে। ফলে আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ ক্ষমতা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করতে হয়। সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য রাষ্ট্রপতি। ফলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা নেই তাঁর। চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ক্ষমতা দিতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

গ্যাস সরবরাহ তলানিতে, বন্ধের মুখে বহু কারখানা দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুট

দীর্ঘদিন ধরে দেশে গ্যাস সংকট চলছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস সংকটের কারণে ধুঁকছে শিল্প খাত।

দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও চাপ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল, এলপিজি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াচ্ছে কয়েক গুণ। উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে হতে পারে। বিশেষ করে অনেক ছোট কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারায়।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপরেও। রাজধানী থেকে জেলা শহর; সবখানেই গ্যাসের ঘাটতিতে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট গ্রুপ। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।

তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আগে পাওয়া যাচ্ছিল প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পাঞ্চল, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেটিও এখন অচল। ফলে ডায়িং, ফিনিশিং ও আয়রনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল বা মূল্য কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি সংকট
দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও বোর্ডবাজার এলাকার অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই/ গ্যাস চাপের বিপরীতে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। কোথাও আবার চাপ একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে। এতে অন্তত অর্ধশত ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে।

গোমতী টেক্সটাইল কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুর রহমান আনিস বলেন, লাইনে কার্যত কোনো গ্যাস নেই। কয়েক দিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, কারখানা চালাতে ন্যূনতম ৪ পিএসআই গ্যাস চাপ দরকার। কিন্তু অনেক সময় ১ পিএসআইও পাওয়া যায় না। উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি বলেন, তাঁর কারখানায় ৭ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এখন তারা অলস সময় পার করছেন। আমবাগ এলাকার তাপস পিন কারখানার দৃশ্য একই। ২ হাজার ৭০ শ্রমিকের এ কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনাবাড়ীর তুসুকা গ্রুপ ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তারেক হাসান বলেন, প্রতিদিন শুধু ডিজেল কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এভাবে বেশি দিন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তিতাস গ্যাস গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩০ কোটি ঘনফুট।

সাভার-আশুলিয়ায় রপ্তানি খাত চাপে
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোও গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও সকালে গ্যাস থাকলে দুপুরের পর চাপ কমে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আশুলিয়ার লুসাকা নামে এক কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মনিরুজ্জামান বলেন, ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম বাড়াচ্ছেন না। তিনি জানান, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় ইতোমধ্যে ৫২টির মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

ভালুকায় বাড়ছে উদ্বেগ
ময়মনসিংহের ভালুকায় এখনও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে দিনের মধ্যে কয়েক দফা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং কিছু সময়ের জন্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন শিল্প উদ্যোক্তারা।

শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক মোকলেসুর রহমান বলেন, উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়ে গেছে। এর মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

নোমান কম্পোজিট অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলসের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক রেদোয়ান আহাম্মেদ বলেন, দিনে পাইপলাইনে গ্যাস একেবারে শূন্য হয়ে যায়। ডিবিএল গ্রুপের গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, মাঝেমধ্যে গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে বিকল্প পথও বন্ধ
নারায়ণগঞ্জের ডাইং শিল্পেও সংকট তীব্র হয়েছে। লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা এতদিন সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে উৎপাদন চালাচ্ছিল। কিন্তু তিতাসের নির্দেশে সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ডাইং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাঝপথে গ্যাস চলে গেলে পুরো কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে সমিতিভুক্ত প্রায় দেড়শ কারখানার উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইল অ্যান্ড ওভেন ডাইং লিমিটেড আগে থেকেই বায়োমাসভিত্তিক জ্বালানির ব্যবস্থা করায় উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুব খান হিমেল বলেন, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট বিবেচনায় রেখে আগেই বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এখন সেটিই কাজে লাগছে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
সংকটে পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোও। রাজধানী থেকে জেলা শহর– সবখানেই গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ নেই। অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানেও দীর্ঘ লাইন।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইয়ের কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মালিবাগ, বিমানবন্দর এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। কোথাও দিনের মধ্যে একাধিকবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

মালিবাগের সিটি ওভারসিজ সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক ইমরুল হাসান গতকাল সোমবার বলেন, ‘সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানানো হলো– গ্যাস নেই। এখন অন্য একটি পাম্পে যেতে হবে। সেখানেও গ্যাস পাব কিনা, জানি না। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি চালাব কখন?’

আবাসিকে রান্না প্রায় বন্ধ
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরের দিনের রান্না সেরে রাখছেন।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ মেয়াদে এলপিজি কিনবে সরকার

বিশ্বজুড়ে জ্বালানির প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস  বা এলপিজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। এলপিজি আমদানি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের (ডিএফসি) তহবিল থেকে অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়।  চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির শর্ত রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এবার দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানির  সরকারি উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা।

জানা গেছে, গত ২৯ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকোনমিক মিনিস্টার ডা. মো. ফজলে রাব্বী এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সিনিয়র ইকোনমিক অ্যাডভাইজার লরা অ্যান্ডারসনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের ফলাফল ও সুপারিশমালা সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিবের কাছে পাঠানো হয়।

বৈঠকে ইকোনমিক মিনিস্টার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানিতে সহযোগিতা এবং ডিএফসি অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের যোগ্যতা নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকারের জোরালো সমর্থন চান। তিনি জানান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতোমধ্যে এলপিজি সরবরাহের জন্য আগ্রহপত্র জমা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক সাড়া দিতে উৎসাহিত করতে মার্কিন সরকারের সহযোগিতাও চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে লরা অ্যান্ডারসন জানান, বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, জ্বালানি বিভাগ এবং বাণিজ্য বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শিগগিরই যোগাযোগ করে তাদের অংশগ্রহণ সহজতর করা হবে। এ জন্য যেসব কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন, তাদের তালিকা দ্রুত পাঠাতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে অনুরোধ জানান তিনি।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প ভাবা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান ইরান যুদ্ধ, উৎপাদন ব্যাহত
হওয়া এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার কারণে বিকল্প উৎসের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। ইতেমাধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানিও বেশ বেড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে এলপিজি আনতে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি।

ডিএফসি তহবিল ও শ্রম অধিকার ইস্যু
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়াতে ২০১৯ সালে ছয় হাজার কোটি ডলারের মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে ডিএফসি। অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে ঋণ ও গ্যারান্টি সুবিধা দিয়ে থাকে সংস্থাটি। বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে এ তহবিলের সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ এবং সামগ্রিক কর্মপরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ এখনও ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।

তবে বৈঠকে লরা অ্যান্ডারসন আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্য হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়  বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের একটি তালিকা প্রস্তুত রাখারও পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে বিডার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডিএফসি অর্থায়নের সুযোগ মিললে অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার যে কোনো সংকটে দেশ চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে যায়।

বড় জ্বালানি প্রকল্পে মার্কিন আগ্রহ
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও কার্যকর করতে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। গত মে মাসে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সহায়তায় একটি সফল ব্যবসায়ী সফরের অভিজ্ঞতার আলোকে উভয়পক্ষ একমত হয়, বড় আকারের প্রতিনিধি দলের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক প্রতিনিধি দল পাঠালে বাণিজ্যিক সুফল বেশি পাওয়া যাবে। এ জন্য যৌথভাবে অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের দুটি বড় জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প– ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় শোধনাগার (ইআরএল-২)–এর দরপত্রে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইকোনমিক মিনিস্টার জানিয়েছেন, বিষয়টি দ্রুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে জানানো হবে।

দূতাবাসের পাঁচ সুপারিশ
বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন মিশন সরকারের কাছে পাঁচটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো– যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে সম্ভাব্য ১০টি মার্কিন এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানো; প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ডিএফসি অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের যোগ্যতার বিষয়টি নিয়মিত উত্থাপন করা; সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত রাখা; ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের জন্য যৌথভাবে অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা এবং উপযুক্ত সময়ে এফএসআরইউ ও ইআরএল-২ প্রকল্পের দরপত্রের সুযোগ সম্পর্কে মার্কিন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে বিকল্প কম, ইরানের দাবি– আটকে গেছে যুক্তরাষ্ট্র

ইসরায়েলের ইন্ধনে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ মাসের যুদ্ধে জড়িয়ে আটকে গেছে এবং সমস্যার মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে ইরান। তারা আরও বলেছে, দেশটিকে অবশ্যই এর মূল্য দিতে হবে। প্রায় একই কথা বলছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণও। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, যুদ্ধ যত গড়াচ্ছে ট্রাম্পের হাতের বিকল্পের পরিধি তত ছোট হয়ে আসছে।

গত রোববার ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, ইরানে বিমান হামলা বন্ধ করা হয়েছে কূটনীতিকে সুযোগ করে দিতে। সিএনএন বলছে, কূটনীতির কিছু প্রমাণ দেখা গেছে। তবে ইরানের মূল দাবি হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসতে দেখা যায়নি।

ঘুরেফিরে ট্রাম্প আবারও আগের অবস্থানেই রয়েছে। তিনি ইরানে হামলা চালিয়ে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাঁর সে পরিকল্পনা কাজ করেনি। স্থল অভিযানে সেনা পাঠাতে পারেন তিনি। তবে এতে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আগে থেকেই এই যুদ্ধ অজনপ্রিয়।

ইরান যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। এটি স্থায়ী হয়েছে পাঁচ মাস। সব মিলিয়ে তাঁর হাতে বিকল্পের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। একে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। তেলের দাম, গ্যাসের দাম, বেশির ভাগ মার্কিনির যুদ্ধবিরোধিতা, লোহিত সাগরের বিকল্প পথ হুমকির মুখে পড়া–সবই ট্রাম্পের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্প এখন ইরানে হামলা চালাতে পারেন, অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারেন। এতে ইরানের শাসক শ্রেণির ওপর চাপ পড়বে না। বরং বেসামরিকরাই চাপের মুখে পড়বেন। আর এটি যুক্তরাষ্ট্রের খরচও বাড়াবে। ফলে এই বিকল্প নিয়ে খোদ ট্রাম্পের আশপাশের ব্যক্তিদেরই আপত্তি রয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।

আরেকটি পথ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ। বন্দর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অবরোধ দিয়ে ইরান সরকারকে দেশ ও সামরিক বাহিনী চালানোর মতো অর্থ জোগাড়ে বাধা দেওয়া। এটিও দীর্ঘসময় ধরে চালাতে হবে, মাসের পর মাস ধরে এটি সমস্যা তৈরি করবে। সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ধৈর্য বা দেশীয় রাজনৈতিক সমর্থন–কোনোটাই এ পথে যাওয়ার জন্য অনুকূল অবস্থায় নেই। উল্টো এই পথে হাঁটলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ পড়বে।

তৃতীয় বিকল্প হতে পারে, ইরানের সঙ্গে এর আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ফেরত যাওয়া। এই বিকল্পে তেহরান রাজি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্তত হরমুজ প্রণালি থেকে অর্থ আয় ও এর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অস্পষ্ট রেখে ওই পথে হাঁটবে না তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এতে রাজি হলে, তা হবে দেশটির জন্য পরাজয়। ট্রাম্প দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখোমুখি হবেন। ফলে এই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থে ট্রাম্পের হাতে বিকল্প নেই বললেই চলে।

অস্ত্রের মজুত কমেনি
টানা ১৩ দিন হামলার পর গত তিন দিন ধরে ইরানে হামলা হচ্ছে না। গুঞ্জন রটেছিল, হয়তো অস্ত্রের মজুত কমে আসায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, পেন্টাগনের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিরোধকের কোনো সংকট নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বের যে কারও চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি রয়েছে।’

এদিকে, গতকাল সোমবার প্রথম ভাগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এআই দিয়ে তৈরি একাধিক ছবি শেয়ার করেন। সেগুলোতে দেখা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী এগিয়ে রয়েছে।

ওয়াশিংটনের পথে নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের উদ্দেশে গতকাল রওনা হয়েছেন। সেখানে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার কথা রয়েছে।

ট্রাম্পের আমন্ত্রণেই ওয়াশিংটন সফর করছেন নেতানিয়াহু। তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নিয়ে আলাপ করবেন। গত রোববার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রয়োগ করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করতে বলেছেন।

তবে ট্রাম্প বলেছেন, নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় গ্রেপ্তার করা হবে না। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ওই পরোয়ানা জারি করে আইসিসি।