Home Blog Page 2

আলুর পর করলাতেও লোকসান

পরপর তিন বছর আলুতে লোকসান গুনে এবার করলা চাষ করেছিলেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষকরা। এই বিকল্প ফসলও তাদের হতাশ করে বাড়িয়েছে দুশ্চিন্তা। মৌসুমের শুরুতে করলার বাজারদর ভালো থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে অস্বাভাবিকভাবে দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।

চলতি মৌসুমে উপজেলায় এবার ১০ হেক্টর জমিতে করলার চাষ হয়েছে। ফলনও ভালো। মাসখানেক আগে থেকে ফসল বাজারে তুলতে শুরু করেছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত দাম পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ করলার দাম ২০০০-২১০০ থেকে কমে ১১০০-১২০০ টাকায় নেমে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ তোলা তো দূরের কথা, বড় লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

গত শুক্রবার বিকেলে ক্ষেতলাল-আক্কেলপুর আঞ্চলিক সড়কের ভাসিলার মোড়, কলিঙ্গার মোড়, কুসুমশহর, চৌমুহনী বাজার, নামাজগড়, আমলাগাড়ি মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে। এসব এলাকায় কৃষকরা জমি থেকে করলা তুলে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। সেখানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাওয়ার জন্য ট্রাকভর্তি করে করলা তুলতে দেখা গেছে।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমের শুরুতে করলার ভালো দাম পাওয়ায় তারা বেশ খুশি ছিলেন। হঠাৎ টানা বৃষ্টি হওয়ার পর ১৫ দিনের ব্যবধানে বাজারদর প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন তারা হতাশায় ভুগছেন। এই বাজারদর অব্যাহত থাকলে অনেক কৃষককে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।

উপজেলার তুলসীগঙ্গা ইউনিয়নের আটি-মুকুল গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর ইসলাম জানান, প্রতিবছর তিনি এনজিও থেকে ফসলের ওপর ঋণ নিয়ে অন্যের পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করতেন। পরপর তিন বছর মোটা অঙ্কের লোকসান গুনে তিনি প্রায় নিঃস্ব। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আলু চাষ বাদ দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালান। সারাবছর ঢাকার অলিগলিতে ফেরি করে বেশি দামে সবজি বিক্রি দেখে তাঁরও ফের চাষবাসের ইচ্ছা জাগে। গত জুনে বাড়িতে ফিরেও আসেন। তবে এবার আর আলু নয়, বিকল্প হিসেবে বেছে নেন করলা। রিকশা চালিয়ে জমানো টাকায় তিনি এক বিঘা জমি ৫০ হাজার টাকা বর্গা নিয়ে করলার চাষ শুরু করেন। তিনি জানান, এরপর বাঁশ, সুতা, কীটনাশক, সার, শ্রমিক, অন্যান্য খরচসহ এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ করলা এক হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি এ দামে বিক্রি করতে হয়, তাহলে করলা চাষেও তাঁর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। তিনি বলেন, আপাতত আর কোনো ফসল চাষ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারের গতি ফিরে না আসছে, আর কৃষকের ওপর সরকারের দৃষ্টি না ফিরছে।

চৌমুহনী বাজারে আসা করলা চাষি তরিকুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর আলুতে লোকসান হওয়ায় এ এলাকার অধিকাংশ কৃষক করলা চাষ করেছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন ভালো হলেও হঠাৎ করে দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকরা পুঁজি হারানোর আশঙ্কা করছেন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি করেন তিনি।

একই এলাকার কৃষক আলী আজম বলেন, দুই বিঘা জমিতে করলা চাষ করেছি। বাঁশ, সুতা, কীটনাশক, সার, শ্রমিক, মালচিসহ প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ করলার দাম মাত্র এক হাজার ১০০ টাকা। এ দামে করলা বিক্রি করে উৎপাদন খরচের টাকা ওঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, কৃষকরা সবজি উৎপাদন করলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্থানীয় কৃষি অফিসও বিষয়টি দেখভাল করছে না বলে অভিযোগ তাঁর। তারা কোনো প্রকার সহযোগিতা করে না বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

করলা কিনতে গত শুক্রবার কুমিল্লা থেকে আসা সবজির পাইকার কামরুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এখানে প্রতি মণ করলা দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা দরে কেনাবেচা হয়েছে। আজ দাম অনেক কম, অতিরিক্ত পরিমাণে কিনেছি।

উপজেলা কৃষি অফিসের ব্লক সুপাভাইজার মেহেদী হাসানের তথ্যমতে, এ উপজেলায় দেড় শতাধিক কৃষক করলার চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে ১৫ হেক্টর জমিতে করলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয় ১০ হেক্টরে। ফুল ও ফলের ওপর নির্ভর করে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭০ টন। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী করলা বিক্রি করলে কমপক্ষে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মল্লিকা রানী সেহানবীশ বলেন, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। সবজির দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়টি কৃষি বিভাগ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। পাশাপাশি কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামে যেভাবে ধরা পড়ে ৬৩ বিদেশি প্রতারক

চট্টগ্রামে সম্প্রতি কোকেন জব্দের ঘটনায় তদন্ত চলছিল। এক পর্যায়ে গোয়েন্দাদের নজরে আসে একটি আটতলা ভবন। সেখানে ৬৩ বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছিলেন। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। সংগ্রহ করা হয় গোয়েন্দা তথ্য। এর পর অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয় ১৭০ ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস। অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় ৬৩ বিদেশিকে। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর দক্ষিণ খুলশী ২ নম্বর রোডের বিশ্রাম ভবনের নিচতলায় অবস্থিত ‘স্টেড ফাস্ট কুরিয়ার লিমিটেডের’ মাধ্যমে কোকেনের একটি চালান ঢাকায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল। এই তথ্য পান গোয়েন্দারা। রাতেই কাউন্টার টেররিজম, এলআইসি শাখা ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান চালায়। ৫ সেপ্টেম্বর বুকিংয়ে থাকা সব মালপত্র তল্লাশি করা হয়। এ সময় দুটি পলিব্যাগ থেকে মোট ১১৮ গ্রাম কোকেন জব্দ করা হয়। এই কোকেনের মূল্য প্রায় ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

কোকেন চোরাচালানের এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের রিয়াদুল আহম্মেদ ও ঢাকার উত্তরা দক্ষিণখানের খলিল বক্স রোডের মো. আলমগীর নামে দুই ব্যক্তিকে আসামি করে খুলশী থানায় মামলা হয়। পরে রিয়াদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু আলমগীর পলাতক।

কোকেনের চালান ধরা পড়ার পর গোয়েন্দারা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করেন। এক পর্যায়ে এলআইসি শাখার গোয়েন্দারা খুলশীর থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের আটতলা ভবনে অবস্থানরত বিদেশিদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পান। পাঁচ দিন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর পর থানা পুলিশ, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, এলআইসি শাখা, র‌্যাবসহ বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মিলে ওই ভবনে অভিযান যায়। ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে সার্ভার স্টেশন তৈরি করে অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। গোয়েন্দারা নানা ডিভাইস জব্দ করেন। এ ছাড়া ওই ভবনে থাকা ৬৩ বিদেশি নাগরিকের কারও কাছেই পাসপোর্ট পাননি। তাদের গ্রেপ্তার করে সাইবার সুরক্ষা আইনে আদালতে পাঠালে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। তারা চীন, পাকিস্তান, লাউস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক। তারা প্রায় দেড় মাস ধরে ওই ভবনে অবস্থান করছিলেন। ভবনটি এক দুবাই প্রবাসীর।

৬৩ পাসপোর্ট জমা রাখা সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার 
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ এলাকার বাসিন্দা এস এম মহসিন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোকেন চোরাচালানের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা আছে। তা ছাড়া গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে মহসিনের যোগাযোগ ছিল। তিনি ওই আটতলা ভবনটি তাদের ভাড়া করে দেন। তাদের পাসপোর্ট নিজের কাছে জমা রাখেন। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় মহসিনকে গ্রেপ্তার দেখাতে আদালতে আবেদন করা হবে। প্রতারক চক্রটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য তার বিরুদ্ধে রিমান্ডেরও আবেদন করা হবে।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাস থেকে চট্টগ্রামের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করছেন। এই বিদেশি নাগরিকদের বিস্তারিত তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তাদের পাসপোর্ট উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

কোকেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ তানভীর ভূঁইয়া বলেন, কোকেন চোরাচালানের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে খোঁজা হচ্ছে।

ব্রিকস সম্মেলন গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমত বিশ্বনেতারা

বিশ্বের বড় কয়েকটি দেশের নেতারা ভারতে একসঙ্গে বসে বিশ্বকে শান্ত করার একটি বড় বার্তা দিলেন। দিল্লিতে বসেছে ‘ব্রিকসের’ দুদিনের বড় বৈঠক। বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা যোগ দিয়েছেন।

বৈঠকের প্রথম দিনেই সব দেশ মিলে একটি যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ব্রিকস নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, গাজা থেকে জোর করে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত তারা কখনোই মেনে নেবেন না। এ নিয়ে যে কোনো চক্রান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ব্রিকস নেতারা। সেখানে ইসরায়েল যে হামলা চালাচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের মাঝেও বেসামরিক মানুষ ও পারমাণবিক কেন্দ্রে যাতে হামলা না হয়, সে বিষয়ে তারা সতর্ক করেছেন।

এ ছাড়া গাজায় অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কোনো শর্ত ছাড়াই দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দুই রাষ্ট্র নীতির প্রতি পুনরায় সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে এ সম্মেলনে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য, খাবার ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। তাই বাণিজ্য সচল রাখা এবং অযৌক্তিক শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আটকে দেওয়া নিয়ে নেতারা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সরাসরি বলেছেন, এই যুদ্ধ কারও জন্য কোনো ভালো ফল আনছে না, বরং পুরো পৃথিবীর ক্ষতি করছে।

২০০৯ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই জোটটিতে এখন অনেক নতুন দেশ যুক্ত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির নানা টানাপোড়েন আর যুদ্ধের উদ্বেগের মাঝেও, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখা ও বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাদের এই ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খবর আলজাজিরার।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে লাগাম টানার আহ্বান ব্রিকসের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ

ব্রিকস জোটের শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন গতকাল শনিবার গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে লাগাম টানার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সমর্থন জানিয়ে জোটের দুই সদস্যদেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণাপত্রে সই করেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধে দেশ দুটির ভিন্ন অবস্থান থাকলেও যৌথ ঘোষণায় তাদের সমর্থনকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে বৈঠক হয়। চলমান উত্তেজনা শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা। আবুধাবির সরকারি তথ্যমতে, দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু, সংঘাত প্রশমন, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়ন জোরদারের নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সম্মেলনে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে সব ধরনের একতরফা সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে জোর দেওয়া হয়।

সম্মেলনে বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস। সদস্য দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একতরফা অর্থনৈতিক বাধা দূর করার দাবি জানিয়েছে তারা।

রয়টার্স ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে জোটের যৌথ ঘোষণাপত্র ‘ব্রিকস নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিকস নেতারা এ ঘোষণা দিলেন। ঘোষণাপত্রে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সব ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্টসহ ১১ সদস্যের এই জোটের অন্য নেতারা অংশ নিচ্ছেন।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শি জিনপিং 
সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ডেকে এনেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থেরও পরিপন্থি।

শি জিনপিং ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বাণিজ্য শুল্কের সমালোচনা করে তিনি সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে একটি স্থিতিশীল বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন।

শি জিনপিং ব্রিকস জোটকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃস্থানীয় এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই জোটের উচিত উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। শি ঘোষণা করেন, আগামী বছর চীন ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবে এবং ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করবে।

মোদি-শি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে দুই নেতা প্রতিশ্রুতি দেন। মোদি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং আগের চুক্তিগুলো মেনে চলা জরুরি। দুই দেশের মতভেদ যেন কখনও বড় বিরোধে রূপ না নেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থ– এই তিন নীতি অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি।

গাজা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান 
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে সব পক্ষকে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ ও অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনো নীতি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে ব্রিকস জোট। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান শুধু শান্তিপূর্ণ উপায়েই অর্জন করা সম্ভব বলে আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার, যার মধ্যে রয়েছে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিজ ভূমিতে ফিরে আসার অধিকার।’

পরোক্ষ সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের, নিন্দা ইসরায়েলের
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সমালোচনা করা হয়েছে। এখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেওয়া না হলেও ওয়াশিংটনের একতরফা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার নীতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কৌশলী শব্দ ব্যবহার করলেও গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেছে ব্রিকস। লেবাননের ভূখণ্ড থেকে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য
ব্রিকসের দুই নতুন সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা চলছে। যুদ্ধের কারণে গত আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করে আমিরাত। গত মে মাসেও দুই দেশের মতপার্থক্যের কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। এবার নয়াদিল্লি সম্মেলনে সব পক্ষকে একটি অভিন্ন ঘোষণাপত্রে সম্মত করানোকে ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার দাবি 
ব্রিকস নেতারা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জরুরি সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা বিশ্ব অনুচিত প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। জোটের দেশগুলো নিজস্ব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা এবং এআই প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলো টেকসই পরিবহন অবকাঠামো তৈরিতে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিমানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন নেতারা।

প্রসঙ্গত, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঋণ পরিশোধের নিশ্চিয়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে চীনের ব্যাংক

পটুয়াখালী এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ বাবদ চলতি সেপ্টেম্বরে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে প্রকল্পের ঋণদাতা চায়না এক্সিম ব্যাংক। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিপিডিবির বকেয়া বিল আদায় এবং ঋণের অর্থ ডলারে রূপান্তর ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

পটুয়াখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের নোরিনকো ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে দুটি প্রতিষ্ঠান সমানভাবে বহন করেছে। প্রকল্পের বাকি ৭০ শতাংশ খরচ মেটাতে চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং ব্যাংক অব চায়না যৌথভাবে প্রায় ১৭৭ কোটি ডলার সিন্ডিকেটেড ঋণ দিয়েছে। এর মোট উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায় চায়না এক্সিম ব্যাংক। চিঠিতে কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ পরিশোধের জন্য আনুমানিক ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার অবশ্যই প্রস্তুত রাখার কথা বলেছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে যে নগদপ্রবাহ তৈরি হবে, তা দিয়েই প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের প্রয়োজনীয় অর্থ আসবে বলে আশা করছে তারা।

ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব নিশ্চিত করতে স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আরএনপিএলকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর উৎপাদন থেকে যে অর্থপ্রবাহ তৈরি হওয়ার কথা, তা যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়– সে বিষয়টি ঋণদাতা ব্যাংকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেলে বা বন্ধ থাকলে প্রত্যাশিত রাজস্ব কমে যেতে পারে। এতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চিঠিতে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এবং এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিলের তথ্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জানাতেও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিপিডিবির কাছে বকেয়া থাকা অর্থ দ্রুত যাচাই করে নিষ্পত্তির জন্য অনুরোধ করতে বলা হয়েছে। চায়না এক্সিম ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট তহবিল সিন্ডিকেট মনোনীত এজেন্ট ব্যাংকের হিসাবে জমা করতে হবে। এর মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে চাইছে ঋণদাতা।

শুধু রাজস্ব আয় ও বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায় নয়, কিস্তির অর্থ সময়মতো ডলারে পরিশোধের বিষয়েও সতর্ক করেছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার মূলধন ও সুদ পরিশোধের নির্ধারিত শেষ তারিখ। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের কোনো ঘাটতি তৈরি হলে  বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ঋণের অর্থ সময়মতো পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার রূপান্তর ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে ব্যাংকটি। এখানে মূল বিষয় হলো, কেন্দ্রের আয় স্থানীয় মুদ্রায় হলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। তাই নির্ধারিত সময়ের আগে প্রয়োজনীয় ডলার সংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছে চীনা ব্যাংক।

খেলাপি হলে ক্রস ডিফল্টের ঝুঁকি
কিস্তি পরিশোধে কোনো ঘাটতি হলে সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে চিঠিতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। চায়না এক্সিম ব্যাংক বলেছে, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ঘাটতি হলে তা সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত অন্যান্য ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক খেলাপি বা ক্রস ডিফল্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দ্রব্যমূল্য নিম্ন আয়ের ক্রেতার কাছে ডিমও এখন দামি দুই মাস ধরে ডিমের ডজন ১৫০, হালি ৫৫ টাকা

নিক ৬০০ টাকা মজুরি ভিত্তিতে রংমিস্ত্রির কাজ করেন। আয়-রুজি বলতে পরিবারে এটাই তাদের সম্বল। আক্ষেপ করে ওই গৃহিণী বলেন, ‘মাছ-মাংস কিনার কথা তো মাথাই আনি না। ডিম-সবজি খাই, কোনো রকম দিন পার করি। অহন ডিমের দামও বাড়ি (বেড়ে) গেল।’

বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে সাজুদা বেগমের মতো নিম্ন আয়ের যেসব ক্রেতা ডিমের ওপর ভরসা করতেন, তাদের অনেকের কাছেই এখন ডিম দামি হয়ে উঠছে। মাস চারেক আগে ডিমের ডজন কমে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে এসেছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকে। গতকাল সমিতি বাজার, কারওয়ান বাজার ও নাখালপাড়া এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্মের সাদা রঙের প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। আর বাদামি রঙের প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা দরে। তবে পাড়া-মহল্লায় কেউ এক হালি কিনতে গেলে দোকানিরা ৫৫ টাকা দাম রাখেন; সে হিসাবে ডজনের দাম পড়ে ১৬৫ টাকা। দুই মাস ধরে ডিমের এমন উচ্চ দাম রয়েছে। এতে চাপ বাড়ছে কম আয়ের মানুষের সংসারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাম কমানোর কিংবা নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক মাসে ডিমের দর ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে ডিমের দাম বাড়াচ্ছেন। তাদের অতি মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আমিষের অন্যতম এই উৎস।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিবছর এ সময় সবজির দাম বেশি থাকে। এ কারণে ডিমের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে দামও বাড়ে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ডিমের বড় একটি অংশ সরবরাহ হয় টাঙ্গাইল থেকে। তবে বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকে ঢাকার ব্যবসায়ীদের হাত। তারা সারাদেশের ব্যবসায়ীদের কত টাকা দরে ডিম বিক্রি করবেন, তা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানিয়ে দেন। ওই দরেই ডিম বেচাকেনা হয়।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ডিম বিক্রেতা সাইফুল গাজী সমকালকে বলেন, পাইকাররা ডিমের দাম দুদিন কমান তো তিন দিন বাড়ান। এভাবে বাড়তে বাড়তে এখন দেড়শ টাকায় ঠেকছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অস্বাভাবিক বেড়েছিল ডিমের দাম। তখন ডজন ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছিল। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করে দেয়, অর্থাৎ প্রতি ডজনের দাম ১৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এদিকে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডিমের দর বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হয়েছিল ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। ডজনে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়।

মধ্যবিত্তের বাজার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট। এই বাজারের পাইকারি সেলস সেন্টারের ব্যবসায়ী আহমেদ ফারুক বলেন, কিছুদিন ডিমের দাম স্থিতিশীল ছিল। মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় ডিমের দাম বাড়ছে। সরবরাহকারী ফার্মের মালিক, আড়তদাররা দাম বাড়ানোর কারণে খুচরায় এর প্রভাব পড়ছে। একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর আগ্রাবাদসংলগ্ন চৌমুহনী বাজারেও।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক পণ্য নিয়ে খেলছেন। তদারকির অভাবে অর্থলোভীদের এই নির্মম চক্র থেকে ভোক্তা রেহাই পাচ্ছে না। গরিবের পাত থেকে যারা ডিম কেড়ে নিতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৬০ হওয়ার পর দেশে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল এবং সরকার দাম নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এখন তো সেই দামও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যারা তখন দাম বাড়িয়েছিল, তারাই আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিম বেচাকেনা হয়। এসব ডিমের সিংহভাগই আসে বাইরে থেকে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, গত জুলাইয়ের বন্যায় ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ডিম দেওয়া লেয়ারজাতের মুরগির ফার্মও রয়েছে। এমনিতেই স্থানীয়ভাবে ডিমের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে বন্যায় লেয়ার জাতের মুরগির ফার্মও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও বাড়ে। দাম বৃদ্ধির জন্য এটিকেও একটি ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে সিন্ডিকেটের কারসাজিও রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা সমকালকে বলেন, প্রতিদিনই আমরা বাজার তদারকি করি। ডিমের বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কিনা, সেটি আমরা খতিয়ে দেখব।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক বিএনপির সব কমিটির শূন্য পদ পূরণে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে, জনগণ জানে: রিজভী

কেন্দ্রীয়সহ সব কমিটির শূন্য হওয়া পদ পূরণে নিচের সারির নেতাদের পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্তের আগে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে দলটি। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কর্মসূচি গ্রহণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল শনিবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সূত্র জানায়, বৈঠকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ডেঙ্গু ও জ্বালানি পরিস্থিতি, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, মূলত ডেঙ্গু ও জ্বালানি ইস্যু আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। এ দুই ইস্যু কীভাবে মোকাবিলা করা যায় এবং মানুষকে স্বস্তিতে রাখা যায়, তা নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণ করা হবে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের কমিটিগুলোর মধ্যে অনেকে মারা গেছেন, অনেকে নানা কারণে দলের মধ্যে নেই কিংবা বহিষ্কৃত হয়েছেন। সেই শূন্য পদগুলোতে তাদের ঠিক নিচের পদধারীদের যেন পদোন্নতি দেওয়া যায়, সে বিষয়ে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান রিজভী। তিনি বলেন, এই আসনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান তাদের জন্য আমরা একটি শিডিউল ঘোষণা করছি। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর দলের প্রার্থীরা পল্টনে দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করবেন। ১৬ সেপ্টেম্বর পূরণ করে জমা দেবেন। ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় স্থায়ী কমিটির (মনোনয়ন বোর্ড) সভায় সিদ্ধান্ত হবে, কে সেখানে প্রার্থী হবেন। বৈঠকে দলের জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও জানান রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ডেঙ্গু ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে যে কার্যক্রমগুলো নিয়েছেন, সেগুলো যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার গঠনের পর গতকাল তৃতীয়বারের মতো স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে বিএনপি। বৈঠকের শুরুতে নতুন চার সদস্য– রুহুল কবির রিজভী (ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব), আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও ইসমাঈল জবিউল্লাহকে স্বাগত জানানো হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন বিদেশে চিকিৎসা শেষে মির্জা আব্বাস বৈঠকে যোগ দেওয়ার পর তাঁরও সুস্থতা কামনা করা হয়।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান ও অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন।

কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে, জনগণ জানে: রিজভী
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ গুলশানে মিছিল করেছে– এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, আমাদের কোনো জাতীয় নেতা তো বলেননি যে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেব। এটা কারা বলেছিল, সেটা নিশ্চয় দেশবাসী ভুলে যায়নি। সুতরাং কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে, সেটা জনগণ জানে। ফলে এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই।
তিনি বলেন, যারা বেআইনি সংগঠন, নিষিদ্ধ সংগঠন– আদালত তাদের নিষিদ্ধ করেছেন। সুতরাং, বেআইনি যে সংগঠন, তারা প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না। সরকারের কনসার্ন যে মিনিস্ট্রি, অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দেখবে যে, কারা এর সঙ্গে জড়িত আছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ভূমিকা রেখেছে। কিছু গ্রেপ্তারও হয়েছে।

আ’লীগের মিছিলের প্রতিবাদে গুলশানে জামায়াতের বিক্ষোভ

রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শনিবার রাতে একই এলাকায় বিক্ষোভ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সমাবেশ থেকে দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, ‘সরকার বিচারে শিথিলতা দেখানোর কারণেই ফ্যাসিবাদী খুনিরা মিছিলের দুঃসাহস দেখাচ্ছে’।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় মিছিল করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। গুলশানে মিছিলের ঘটনায় গ্রেপ্তার ২৪ জনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্র ও নানামুখী অপতৎপরতার’ প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের গুলশান থানা এ বিক্ষোভ করে।
.
মিছিলের পর সমাবেশে মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত বলেন, সরকারকে বলতে চাই, যারা শত শত মায়ের বুক খালি করেছে, যারা এই দেশে আয়নাঘর সৃষ্টি করেছে, যারা কোটি কোটি টাকা পাচার করেছে এবং যারা গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে, তাদের ঠাঁই এই বাংলাদেশে হতে পারে না।

প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, গুলশানের মত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের লোকেরা কীভাবে মিছিল করতে পারে, জবাব চাই। সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। সরকার যদি বিচার নিয়ে তালবাহানা করে, তাহলে জপথে নামব।

মিছিলে গুলশান পূর্ব থানা আমির জিল্লুর রহমান, ভাটারা থানা আমির অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম, গুলশান পশ্চিম থানা আমির মাহমুদুর রহমান আযাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

চলে গেলেন অর্পিতা, বাঁচল না গর্ভের সন্তানও

বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মিঠুন চৌধুরী ও অর্পিতা দাশের সংসারে আসার কথা ছিল নতুন অতিথি। সন্তানকে ঘিরে তাদের ছিল নানা আয়োজন। স্ত্রীকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন মিঠুন। দুই পরিবারে ছিল আনন্দের বন্যা। কিন্তু ডেঙ্গু কেড়ে নিল তাদের স্বপ্ন। আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান অর্পিতা। মৃত্যুর পর তাঁর পেট থেকে মৃত ছেলেসন্তান প্রসব করা হয়।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল অর্পিতার ২৬তম জন্মদিন। সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১২ অক্টোবর। তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন মিঠুন।

চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটার আশরাফ আলী রোডের আর সি সার্চ এলাকায় অর্পিতাদের বাড়ি। স্বজন ও প্রতিবেশী কেউ মেনে নিতে পারছেন না এমন মৃত্যু। সানরাইজ গ্রামার স্কুলের পাথরঘাটা শাখার ইউনিট-৪-এর সহকারী শিক্ষক ছিলেন অর্পিতা। গত বছরের ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত মিঠুন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।  ৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বর আসে অর্পিতার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরদিন তাঁকে নগরীর আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর নেওয়া হয় এইচডিইউতে। দ্রুত কমতে থাকে প্লাটিলেট। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্লাটিলেট দেওয়া হয়। আরও রক্তের প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসকদের এমন পরামর্শে মিঠুন পরিচিত কয়েকজনকে রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন।

হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, অর্পিতার মৃত্যু হয়েছে ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে’। ডেঙ্গুর এটি অত্যন্ত জটিল, বিরল ও জীবনঘাতী পর্যায়।
অর্পিতার মা দিপালী দাশ বড় মেয়েকে হারিয়ে প্রায় অচেতন। দুই মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে ভারতে হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচারের সময় মারা যান অর্পিতার বাবা।

সংক্রমণ ছাড়াল ৫০ হাজার
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০ হাজার ২৭৬ জন। গত বছর অক্টোবর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল। এবার এক মাস আগেই এই সংখ্যা অতিক্রম করল। এদিকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা ১৪৩। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ড থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুনের পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। আগস্টে দেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৪৩ জন। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১২ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৩০ জন এবং মারা গেছেন ৪৬ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি  বেশ নাজুক হতে পারে। চলতি মাসের শুরু থেকেই হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একই দিনে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায়।

পুরুষের চেয়ে নারী মৃত্যু বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই পুরুষ। তাদের একজনের বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং অন্যজনের বয়স ৫৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ১৪৩ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাসপাতালে ৪৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালে ১৮ জন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ২৫, ময়মনসিংহে ১৪, বরিশালে ১২, চট্টগ্রামে ১০, রাজশাহীতে ছয় এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৫০ হাজার ২৭৬ জনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৬ হাজার ৬৯৯ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। মাসভিত্তিক হিসাবে, জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে দুই হাজার ৯০৭ এবং জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৩৬। চলতি সেপ্টেম্বরের ১২ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৩০ জন। এতে চলতি মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ঝুঁকি

২০০০ সালে দেশে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সময় রোগটি মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহিত এ রোগ। গত বছর থেকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটেছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী। এসব এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার এবং আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখার আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। গতকাল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পাড়াগাঁও ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে এবং রূপগঞ্জ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এ ক্যাম্প হয়।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যকর্মী বরখাস্ত
দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রথম দিনে গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ধানমন্ডির রাপা প্লাজা কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। রাপা প্লাজার পার্কিং জোনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় ডিএসসিসির স্বাস্থ্যকর্মী সুশীল চন্দ্র রবিদাসকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও জেলার প্রতিনিধিরা)

ডিজেলের ব্যবহার বেড়েছে ২২%, বাড়ছে জ্বালানি খরচ

গ্যাস সংকট সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। আগস্টে ডিজেল বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। আসছে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে আন্তর্জাতিক নৌপথে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে ডিজেল নিয়েও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধ। এর মধ্যে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একমাত্র লাইফলাইন এই বাব আল-মান্দেব। এটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট এসেছে। অথচ মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমছে। এলএনজি সরবরাহে এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাজারে।

চুক্তির বেশির ভাগ এলএনজি আসেনি
বাংলাদেশের সঙ্গে চার দেশের এলএনজি আমদানির আটটি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় চলতি বছর ১০৩টি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে বছরের প্রথম ৯ মাসে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১টি। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ৮৬টি কার্গোর বিপরীতে আগস্ট পর্যন্ত এসেছে ১৩টি। আর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ১৭টি কার্গোর মধ্যে দেশে পৌঁছেছে মাত্র চারটি।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগামী নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৪৭টি কার্গোর সরবরাহ বাতিল হয়েছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহকারীরা এসব চালান পাঠাতে পারছে না। ফলে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি থেকে এলএনজি কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। একই কার্গো সংগ্রহে বাড়তি প্রতিযোগিতার কারণে আমদানির খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে কাতারের ওপর নির্ভরতা বেশ বেশি। গত বছর দেশে আসা মোট এলএনজির প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল কাতার থেকে। আটটি চুক্তির ছয়টির সরবরাহের প্রধান উৎসও দেশটি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়েছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।

বিশ্বের এলএনজি বাজারও সীমিত সংখ্যক উৎপাদনকারী দেশের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বড় কোনো উৎপাদনকারী দেশে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘ সময় পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। এদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহে সক্রিয় হওয়ায় একই কার্গো কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

বাড়ছে ডিজেলের ব্যবহার
এলএনজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি তেলের ওপর। গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানাগুলো জেনারেটর ও বয়লারে ডিজেল ব্যবহার করছে। শিল্পের বয়লার ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহারও বাড়ছে।

সরকারি তিন তেল বিপণন কোম্পানির আগস্টের বিক্রির হিসাবে এর চিত্র স্পষ্ট। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পদ্মা অয়েলের ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২১ শতাংশ এবং যমুনা অয়েলের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ৩৩ শতাংশ।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন, যা গত বছরের আগস্টের দৈনিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, ৫০ শতাংশ কারখানা গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে বাড়তি ডিজেল নিয়েছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে ওষুধশিল্পেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানায় গ্যাস সংকটের আগে বয়লারে দৈনিক প্রায় ৫০০ লিটার এবং জেনারেটরে ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হতো। সংকটের পর বয়লারে দৈনিক ডিজেলের ব্যবহার বেড়ে প্রায় ১০ হাজার লিটার এবং জেনারেটরে প্রায় ৫০ হাজার লিটারে উঠেছে। অর্থাৎ, কারখানাটিতে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। তবে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে প্রতি দফায় ৩৬ হাজার থেকে ৪৮ হাজার লিটার ডিজেল পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বোরো মৌসুমে বাড়বে ডিজেলের চাপ
গ্যাস সংকটে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের বাড়তি ব্যবহার যখন জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে, তখন সামনে যুক্ত হচ্ছে বোরো মৌসুমের সেচ চাহিদা। অগ্রহায়ণ থেকে জমি প্রস্তুত ও সেচ শুরু হওয়ায় নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ডিজেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।

দেশে সচল সেচ পাম্পের বড় অংশ ডিজেলচালিত। এতে বোরো মৌসুমে কৃষি খাত জ্বালানি তেলের অন্যতম বড় ভোক্তা হয়ে ওঠে। বছরের অন্যান্য সময়ে মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হলেও বোরো মৌসুমের সর্বোচ্চ সময়ে তা চার থেকে সাড়ে চার লাখ টনে উঠতে পারে। কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলের বড় অংশ বোরো মৌসুমের কয়েক মাসে খরচ হয়।

ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে শিল্পে বাড়তি ডিজেল ব্যবহারের সঙ্গে বোরো সেচের চাহিদা যোগ হলে সামনের মাসগুলোতে ডিজেলের মোট চাহিদায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে। এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক রুটে ঝুঁকি, আমদানি-রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব
দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা যখন বাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বশেষ প্রায় ১০৪ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রায় ৯৯ ডলারে ছিল।

স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও এলএনজি পরিবহন হয়। একইভাবে সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দেবও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট। এসব নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে সরবরাহের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বাড়তে পারে।

এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথও ঝুঁকিতে পড়লে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচলের সময় ও ব্যয় আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব শুধু জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপমুখী তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য পরিবহনে লোহিত সাগর ও সুয়েজ রুট গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথে চলতে হলে পরিবহন সময় ও ফ্রেইট খরচ বাড়বে। বাড়বে যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও। এতে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সরবরাহ নিয়ে স্বস্তিতে সরকার, উদ্বেগ দামে
আপাতত সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখছে না জ্বালানি বিভাগ। যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, অক্টোবর পর্যন্ত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। ফলে গ্যাসের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে ডিজেলের চাহিদা বাড়লেও দেশে ডিজেলের সরবরাহে সমস্যা হবে না। বাংলাদেশ আগাম পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রায় ছয় মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তি করে থাকে। ফলে চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজসহ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলেও ডিজেল আমদানিতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই বলে জানান মনির হোসেন চৌধুরী। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ডিজেল আমদানি করে মূলত মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনের মতো এশীয় উৎস থেকে। ফলে হরমুজকেন্দ্রিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি ডিজেলের সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি করবে না।

তিনি বলেন, সরবরাহের চেয়ে এখন বড় উদ্বেগ দাম নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এশীয় উৎস থেকে ডিজেল আমদানি করলেও বাংলাদেশকে বেশি অর্থ গুনতে হবে। আর গ্যাসের সংকট দীর্ঘায়িত হয়ে ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়লে সেই ব্যয়ের চাপও বাড়বে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ বা যে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে। সরবরাহকারীরাও প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে।

তিনি জানান, এখন আগামী বছরের জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমান মজুতও সন্তোষজনক। সরবরাহকারীরা প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে তেল সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।

বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ
এলএনজি সংকটের কারণে পেট্রোবাংলার ওপরও বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে। সূত্র অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে প্রায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত লোকসান হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে তেল কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় বিপিসিও বড় লোকসানে রয়েছে। মার্চ থেকে জুন– এই চার মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকারের কাছে চেয়েছে বিপিসি।

বিকল্প খুঁজছে সরকার
জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার এলএনজির উৎস বহুমুখী করা এবং আমদানি অবকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭ কার্গোর চুক্তি করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গেও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির উদ্যোগ রয়েছে। মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি আরও দুটি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।