Home Blog Page 39

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি থেকে সরে আসছে সরকার

গত জুন পর্যন্ত মেয়াদে জারি করা ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির মেয়াদ বাড়ায়নি সরকার। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি কেনা, আমলাদের জন্য সুদমুক্ত গাড়ি ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার ওপর থাকা বিধিনিষেধ উঠে যেতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে গত অর্থবছরের শুরুতেই প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এবার এ ধরনের নতুন বিধিনিষেধ জারির সম্ভাবনা কম। জারি হলেও আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে তা শিথিল করা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, গত ৫ এপ্রিল জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপন ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যার মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়েছে। ব্যয় সংযম ব্যবস্থা পুনরায় জারি করার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের
কাছ থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স একটি বড় ক্রয়চুক্তিকেও ব্যয় সংযম নীতির সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত বছরের ৮ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকারি খরচে বিদেশে কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে গাড়ি, জাহাজ ও উড়োজাহাজ কেনা বন্ধ রাখা হয়। পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় এবং সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকেও অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল অর্থ বিভাগ ব্যয় সাশ্রয়ী নীতির সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ নীতির আওতায় বিদেশ সফর, সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ এবং যানবাহন, জলযান, উড়োজাহাজ ও জমি কেনার ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে সংশোধিত ব্যয়সংযম ব্যবস্থার আওতায় বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়। কম্পিউটার ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থ ছাড়ও স্থগিত করা হয়।

২০২০ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক মহামারি করোনা, ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতাসহ দেশে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও ব্যাংকে অর্থ বেহাত হওয়ার মতো ঘটনায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়। এ কারণে কয়েক বছর ব্যয় সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপ নেয় সরকার।

অর্থ বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সরকারি ব্যয়ও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তারা আরও বলেন, সাশ্রয়ী ব্যয়ের নীতি অনুসরণ করা হলেও পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় খুব বেশি কমানোর সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের গতিও ধীর। এ পরিস্থিতিতে সরকার আপাতত আগের মতো সরকারি ব্যয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপে আগ্রহী নয়। বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। ওই বৈঠক থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চড়া মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে খরা, সরকারি ব্যয়ে ধীরগতি, বিদেশি ঋণে দুরবস্থা আর রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপের মধ্যে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে; যা সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক। এদিকে সরকার ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়ী ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তাদের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য ঘাটতি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে চাপে ফেলতে পারে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট বহিরাগত ধাক্কার ঝুঁকিও এখনও কাটেনি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সমকালকে বলেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ বিবেচনায় এখনই ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি থেকে সরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং এ নীতিকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ব্যয় যথাযথভাবে বাড়ানো গেলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা এর প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে ব্যয় বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয় না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে কিনা, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এয়ার-ফ্লো মেশিন ভুল পরিকল্পনা, পেঁয়াজ চাষির বিপদ পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই প্রযুক্তি বিতরণ

পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার গত দেড় বছরে পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তি হিসেবে ‘এয়ার-ফ্লো মেশিন’ ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে পড়েছে। আবার কোথাও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মেশিন চালানোই যাচ্ছে না। এতে কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের সুফল পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

তাদের অভিযোগ, এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণের আগে দেশের দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অপরিকল্পিত প্রকল্প এবং ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকায় ৮ হাজার আধুনিক এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে আরও ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়। দুটি কর্মসূচিতেই একটি করে মেশিন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২৭ হাজার টাকা এবং কৃষকদের দিতে হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ১১ হাজার ৭০০টি মেশিন বিতরণে সরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কৃষকদের অংশ যোগ করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।

এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণের আগে প্রশিক্ষণে কৃষকদের জানানো হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রতিটি মেশিন ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, গ্রামাঞ্চলে দিনে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পেঁয়াজে পচন ধরছে।

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বেশ জোরেশোরে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ঘর নির্মাণ করা হয় এবং ভর্তুকিতে মেশিন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংরক্ষিত পেঁয়াজে পচন ধরতে শুরু করে।

মুজিবনগরের ভবেরপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আউয়াল পাঁচ বিঘা জমির পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য একটি মেশিন নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ভালো দামে বিক্রির আশায় পেঁয়াজ রেখেছিলাম। এখন প্রতিদিন পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে।

রামনগর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও কৃষক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রশিক্ষণে শেখানো নিয়ম মেনেও তাঁর কয়েকশ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। কৃষি অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাননি।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা বলেন, নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় এর কার্যকারিতা অনেকটাই ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎ সমস্যা, তাপমাত্রা ও রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণের কারণেও পচন হতে পারে।

ফরিদপুরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। চলতি অর্থবছরে জেলায় ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফরিদপুরে পেঁয়াজ চাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণে দেখা দিয়েছে বড় সংকট।

জেলার সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, সরকারি এয়ার-ফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রতিদিন সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়।

কৃষকদের অভিযোগ, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। এই বিদ্যুৎ দিয়ে কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব নয়।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এয়ার-ফ্লো মেশিন কার্যকর রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিনের কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব নয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃষকের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। দেশের গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং চলাকালে বিদ্যুৎনির্ভর সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিতরণ করা ছিল বড় ধরনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা। প্রতিটি মেশিনের সঙ্গে যদি সোলার প্যানেল সংযুক্ত করা হতো, তাহলে বিদ্যুৎ না থাকলেও বাতাস চলাচল অব্যাহত থাকত এবং পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেত।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব রায়হান কাওছার বলেন, মেশিনগুলোর সঙ্গে সোলার ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি সংশোধন করে সোলার সংযুক্ত করার সুযোগ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঝুঁকি নিয়ে চালু হচ্ছে রূপপুর, কয়েকটি চুক্তি নিষ্পন্ন হয়নি বিদ্যুতের দাম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অমীমাংসিত

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের প্রত্যাশা, আসছে আগস্ট মাসের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে উৎপাদন শুরুর আগমুহূর্তেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এখনও হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ স্পেন্ট ফুয়েল অপসারণের চূড়ান্ত চুক্তি। নির্ধারিত হয়নি বিদ্যুতের দাম। বাকি রয়েছে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সমঝোতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি লোড বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই একমাত্র সফলতা নয়; বরং এর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর্থিক বিবেচনায় দেশের একক বৃহত্তম এই প্রকল্প নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই নির্মাণকাজ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বেশ কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাচ্ছে। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ। এই ক্ষতিকর বর্জ্য রাশিয়া পুনর্ব্যবহারের জন্য ফেরত নিয়ে যাবে, নাকি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে–সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ার ব্যয়ভার কেমন হবে– তাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) চূড়ান্ত না হওয়ায় বিদ্যুতের দাম নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

কেন্দ্রটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনও অমীমাংসিত।
এই নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞের মতে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে এই চুক্তিগুলো অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। এখন তাড়াহুড়ো করে এগুলো করলে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল নাও আসতে পারে। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই চুক্তিগুলো সম্পাদন করে এর শর্তাবলি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা জরুরি। গ্রিড ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামার ঝুঁকি এড়াতে রূপপুর কর্তৃপক্ষ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন। দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় সব কিছু একসঙ্গে করতে গেলে কোনোটিই মানসম্মত হবে না। তবে ফুয়েল নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি আছে এবং ব্যবস্থাপনা চুক্তির কাজও অনেক দূর এগিয়েছে।’ রাষ্ট্রীয় দুই কোম্পানির বিষয় হওয়ায় পিপিএ নিয়েও তিনি চিন্তিত নন।

তিনি জানান, কোনো ঘাটতি থাকলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়, তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী মাসের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে ইউনিটটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুতের দাম এখনও অজানা
দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে পিপিএ সম্পন্ন হতে হয়, যার ভিত্তিতে পাইকারি দাম বা ট্যারিফ নির্ধারিত হয়। তবে রূপপুরের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন ঘনিয়ে এলেও এই চুক্তি সই হয়নি। পিডিবি প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালন খরচ চেয়ে বারবার চিঠি পাঠালেও রূপপুর কর্তৃপক্ষের সাড়া মেলেনি।

পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পারমাণবিক কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া সাধারণ গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে জটিল, কারণ এখানে ঋণের কিস্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিকমিশনিং ব্যয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাত যুক্ত থাকে।

ট্যারিফ চুক্তি না হওয়ায় বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য এসেছে। ২০২০ সালে প্রতি ইউনিটের দাম চার থেকে সাড়ে চার টাকা দাবি করা হলেও ২০২৩ সালে সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়। বর্তমানে শুধু উৎপাদন খরচই ধরা হচ্ছে চার টাকা ৩১ পয়সা। এর সঙ্গে যখন রাশিয়ার ঋণের সুদ, বিদেশি জনবলের পরিচালন ব্যয় এবং উচ্চ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ যুক্ত হবে, তখন প্রকৃত দাম জানা যাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘আমার কাছে যতটুকু তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১১-১২ টাকা হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। পরিবেশবিদরা শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন। এর মধ্যেও এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। তাই দেশের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিলে রূপপুরের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি।

স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে ধোঁয়াশা
প্রকল্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো স্পেন্ট ফুয়েল বা ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। দেড় থেকে দুই বছর চলার পর রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ধরে রাখতে প্রতিবার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়, যা প্রচণ্ড উত্তপ্ত ও উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়াসম্পন্ন। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এটি স্থায়ী সংরক্ষণের অবকাঠামো না থাকায় শুরুতে পরিকল্পনা ছিল এই বর্জ্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। দুই দেশের মধ্যে এই বিষয়ে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মতিপত্র সই হলেও স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফেরত নেওয়ার কোনো চূড়ান্ত বা বাধ্যতামূলক চুক্তি এখনও সম্পাদিত হয়নি। রাশিয়া এই বর্জ্য তাদের দেশে নিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে, নাকি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে এবং এর বিশাল ব্যয়ভার কে বহন করবে, তার আর্থিক রূপরেখা এখনও অস্পষ্ট।

জাতীয় গ্রিডের ঝুঁকি
রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন সক্ষমতা। পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে অপরিবর্তনীয় মাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, কিন্তু দেশের গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা দিন ও রাতের ভেদে ব্যাপক ওঠানামা করে। হঠাৎ চাহিদা কমে গেলে বা ঝড়বৃষ্টির সময় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঞ্চালনের ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ হার্টজের নিচে নেমে গেলে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট হতে পারে। তবে পিজিসিবি সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সম্পন্ন করার দাবি করেছে।

ড. জাহেদুল হাছান জানান, রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ পিজিসিবিকে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন অনেক আগেই সরবরাহ করেছে এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

বাকি আরও চুক্তি
দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণসহ (ওঅ্যান্ডএম) একাধিক জরুরি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও চূড়ান্ত হয়নি। কেন্দ্রের পরবর্তী ৬০ থেকে ৯০ বছরের জীবনকালে নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও কারিগরি জ্ঞান নিশ্চিত করা জরুরি। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রথম তিন বছর জ্বালানি সরবরাহ করবে, তবে এর পরের দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম আমদানির কোনো চুক্তি সই হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং আপৎকালীন প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তিগুলোর বেশির ভাগই ঝুলে আছে। কর্মকর্তারা প্রথম ইউনিট চালুর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকায় এগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। তবে কেন্দ্র চালু হওয়ার পর দরকষাকষি করতে গেলে পরিচালনার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেবে।

ঋণ পরিশোধে জটিলতা
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের রূপপুর প্রকল্প দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক ঋণনির্ভর প্রকল্প, যার প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারই এসেছে রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়ায় রাশিয়ার ঋণের অর্থ পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিকল্প পদ্ধতিতে পাওনা পরিশোধের আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। এর আগে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নেওয়া প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে তাও আটকে আছে। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে রাশিয়ার পাওনা অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। সুইফট ব্যবস্থায় রাশিয়ার অংশগ্রহণ সীমিত থাকায় সেই অর্থ রাশিয়ায় পাঠানোর পথ বন্ধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যা বাংলাদেশের অনিচ্ছার কারণে নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো অর্থ গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও ঋণ পরিশোধ কাঠামোর এই জটিলতা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট সৃষ্টি করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, ‘সব প্রক্রিয়াই সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপনের পর রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এবং আইএইএর তত্ত্বাবধানে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এ বছরের মধ্যেই প্রথম ইউনিট চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’

নরওয়েকে হারাতে পারবে ব্রাজিল? কী বলছে সুপারকম্পিউটার

ব্রাজিলের জন্য শেষ ষোলোতে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ ডার্ক হর্স নরওয়ে। যে দলের বিপক্ষে ইতিহাসের পাতায় আজ পর্যন্ত একবারও জয়ের মুখ দেখেনি সেলেসাওরা। আজ দিবাগত রাত ২টায় নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। একদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, ব্রুনো গিমারায়েসদের ব্রাজিল। অন্যদিকে আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নরওয়ে। লাতিন সাম্বা আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শক্তির এই লড়াই ঘিরে তাই বাড়ছে উত্তেজনা।

কাগজে-কলমে অবশ্য এগিয়ে ব্রাজিলই। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে সেলেসাওরা রয়েছে পঞ্চম স্থানে, নরওয়ের অবস্থান ২১। সাম্প্রতিক ফর্মও কথা বলছে ব্রাজিলের পক্ষেই। শেষ পাঁচ ম্যাচে চারটি জয় ও একটি ড্র করেছে আনচেলত্তির দল। অন্যদিকে নরওয়ের ঝুলিতে রয়েছে তিন জয়, একটি ড্র ও একটি হার।

মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস সেলেসাওদের জন্য অস্বস্তির হলেও, জনপ্রিয় পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান ওপ্টা সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণীতে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে কার্লো আনচেলত্তির দল। ২৫ হাজারবার ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল সিমুলেশন করে ওপ্টা জানিয়েছে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা ৫৩.৬%।

বিপরীতে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ২২.৪%, আর ম্যাচ ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ২৪%। সব মিলিয়ে শেষ আটে ওঠার দৌড়ে ব্রাজিল ৬৫.৬% ও নরওয়ে ৩৪.৫% সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে নামবে। এই ম্যাচের জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে।

কুড়িগ্রাম ট্রাক-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৫

কুড়িগ্রামের রাজারহাট-তিস্তা সড়কের মন্ডলের বাজার এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি ট্রাকের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে উপজেলার সুধী কানন পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে সিএনজিটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই এরশাদ আলী (৪০) নামে এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। তিনি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালিয়াপুর এলাকার বাসিন্দা।

দুর্ঘটনায় আহত পাঁচজনের মধ্যে একজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকি চারজনকে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রংপুরে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। রাজারহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশীদ দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুর্নীতি-অবহেলায় বদলি নয়, চাকরিচ্যুত করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অবহেলার ক্ষেত্রে বদলি নয়, সরাসরি চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি।

শনিবার দুপুরে নরসিংদী শিশু একাডেমি মিলনায়তনে নরসিংদী ডায়াবেটিক সমিতির ৩১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে অবহেলা-দুর্নীতি, সেখানেই চাকরিচ্যুত। ট্রান্সফার বা বদলিতে আমি বিশ্বাস করি না। সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। এগুলোকে কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’ তিনি জানান, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সংস্কার করে নতুনভাবে সাজানো হবে এবং সেখানে আরও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রগুলোরও উন্নয়ন করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে চলতি বছরই একটি বিপ্লবের সূচনা করতে চাই। জনগণের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন নতুন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এবারের বাজেট টাকার বাজেট নয়, আদর্শের বাজেট। প্রতিটি কর্মসূচি দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ইসরাত জাহান কেয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুর এলাহী, নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বকুল, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনসহ অন্যান্য অতিথি ও নরসিংদী ডায়াবেটিক সমিতির সদস্যরা।

বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৪৮ বিলিয়ন ডলার

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি খাত ছিল অনেকটা গতিহীন। অর্থবছরটির দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত টানা ৮ মাস রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কম ছিল। মাঝখানে এপ্রিল মাসে রপ্তানি বাড়ে ৩৩ শতাংশ। সেটি আসলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ছিল না। আগের বছরের একই মাসের দুর্বল ভিত্তির কারণে মাসটিতে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে। মে মাসে আবার পতনের ধারায় ফেরা তা প্রমাণ করে। অবশ্য অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি বেড়েছে ২৬ শতাংশ। তবে ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই কমে যাওয়ার কারণে রপ্তানিতে পতনের ধারা নিয়েই শেষ হলো বিদায়ী অর্থবছর। কাঁটায় কাঁটায় ৪৮ বিলিয়ন বা ৪ হজার ৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার এবং শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ইপিবির তথ্যউপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলার। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয় ৪ হাজার ৬৪৩ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার রপ্তানি থেকে আয় এসেছিল। অবশ্য ওই বছর পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে গোজামিলের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইপিবির সংশোধিত হিসাবমতে, গত ১০ অর্থবছরে রপ্তানি বেশি দেখানো হয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের রপ্তানি প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। সে অবস্থা থেকে হঠাৎ পরিস্থিতি নেতিবাচক হওয়ার পেছনে কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার নিয়ে অনিশ্চয়তা। এতে অস্বস্তি তৈরি হয় রপ্তানি খাতে। ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে। পরের মাসে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক নেমে আসে। তবে চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের পণ্যে মার্কিন শুল্ক আরও বেশি হারে আরোপ থাকায় এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারে আগ্রাসী রপ্তানি শুরু করে। এতে ওই সব বাজারে রপ্তানি কমে বাংলাদেশের।
ইপিবির প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে একক পণ্য হিসেবে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকেই আয় এসেছে তিন হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। বাকি সব পণ্য থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৯৩০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে গেছে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই কারণেই গত অর্থবছর রপ্তানি কমেছে। আন্তর্জাতিক কারণের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, মার্কিন পাল্টা শুল্ক ও এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য বাজারগুলোতে চীন বেশি মনোযোগ দিয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। অভ্যন্তরীণ কারণের মধ্যে জ্বালানি সংকট, বন্দর, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ও পশ্চাৎসংযোগ শিল্পের দুর্বলতা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ এবং আধুনিক উৎপাদন ও বিপণন কৌশল আয়ত্ত করতে না পারলে এগোনোর সুযোগ খুব কম।
গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৭ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১২৩ কোটি ডলারের। কৃষিপণ্যের রপ্তানি ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি হয়েছে ৯৮ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য। হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি বেড়েছে ৭ শতাংশের মতো, রপ্তানি হয়েছে ৯৩ কোটি ডলারের। পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। এ খাতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ডলার। প্রায় ২২ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এসেছে প্রকৌশল পণ্যে। এ খাতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটি ডলার।

আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম, আজ থেকেই কার্যকর

দেশের বাজারে আবার বেড়েছে স্বর্ণের দাম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বেড়েছে। এর ফলে পরপর দুই দফা বাড়ল স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) শুক্রবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্য ঘোষণা করে। নতুন দাম সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

বাজুস জানিয়েছে, খাঁটি স্বর্ণ ও রুপার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৮ হাজার ২৯২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, নতুন মূল্য ভ্যাটসহ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অলংকারের ডিজাইন ও কারুকাজভেদে মজুরি আলাদাভাবে যুক্ত হবে। রুপার অলংকারের ভ্যাট বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এদিকে বেড়েছে রুপার দামও। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৩৩ টাকা।

‘তারেক রহমানকে ১০ বছর সময় দিতে হবে, কোনো কথা চলবে না’ জুলাই আন্দোলনে আহত শাহিন মালু

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আহত ও নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ শাহিন মালু বলেছেন, দেশের মানুষ যদি দেশকে ভালোবাসে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১০ বছর সময় দিতে হবে, এ নিয়ে কোনো কথা চলবে না।

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ আহত পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

শাহিন মালু বলেন, ‘আমরা আজ বিদেশের মাটিতে কাজ করতে যাই। তারেক রহমানকে ১০ বছর সময় দেন, বিদেশ থেকে মানুষ আমাদের দেশে এসে কাজ করবে।’

এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিএনপিপন্থী আহত ও নিহতদের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত। তিনি দাবি করেন, বিএনপিকে ভালোবাসতে গিয়ে তিনি সব হারিয়েছেন। ‘১৭ বছর কষ্ট করেছি, তারপরও দলের দিকেই তাকিয়ে আছি। আমাদের ভালো কিছু দেওয়া হয় না। কিন্তু হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সার্জিস আলম কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন,’ বলেন তিনি। নিজের হাঁটার ক্রাচ দেখিয়ে শাহিন মালু বলেন, ‘আমরা এখনো এই ক্রাচের ওপর ভর করেই চলছি।’

জিয়া পরিবার দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শাহিন মালু বলেন, ‘দেশকে ভালোবাসতে গিয়ে জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের মানুষকে ভালো রাখতে গিয়ে তারেক রহমান ১৭ বছর দেশে ফিরতে পারেননি। আমি শুধু একটি কথাই বলব, দেশ যদি ভালো চান, তাহলে তারেক রহমানের দিকে তাকাতে হবে।’

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

৫ আগস্টের অর্জন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন শহীদ হয়েছেন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি তা একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন। জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।

শনিবার সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি, আহতদের জীবনমান নিশ্চিত করতে এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই অনুষ্ঠান চলাকালে আমি বারবার ভাবছিলাম এই মূহুর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নেই। আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এই মূহূর্তে তোমার কাজ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।

জুলাই শহীদদের বিচার এদেশের মাটিতেই হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তবে বিচারের নামে কারো প্রতি যেন অবিচার না হয়। এ বিষয়ে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। একটু বিলম্ব হোক তবুও অন্যায়কারীর যেনো সঠিক বিচার হয়। আমরা সেই চেষ্টাই করব।

জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই মানুষই ত্যাগ করতে পারে যার সাহস আছে। আপনারা আপনজনকে হারিয়েছেন, কেউ কেউ অঙ্গ হারিয়েছেন। যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা ঠিক হয়ে যাবে? না, ঠিক হয়ে যাবে না। তবে সবাই মিলে আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন আপনার আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। তাই আসুন দেশ, মাটি এবং মানুষের কল্যাণে সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।

জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ জাতীয় সম্মেলনে যোগ দেওয়া শত জুলাই যোদ্ধা পরিবারের সদস্য সরকার প্রধানের সামনে নিজেদের যন্ত্রণা, মনের ভাব তুলে ধরেন।

এদিন সকাল ১০টায় পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত এবং জাতীয় সংগীতের পর জুলাই আন্দোলনের ওপর প্রামান্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। জাতীয় এই সম্মেলনের মূলমন্ত্র ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আল মিরাজ, জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত সবার জন্যে রাখা স্মৃতি স্মারক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে জুলাই সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।

এ ছাড়াও সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।