অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে আলোচনা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া সফররত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারের একটি সার্বভৌম তহবিলকে বিনিয়োগের সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে আলোচনায়। এ ছাড়া কোরিয়ার ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে কেআইসির বিনিয়োগের পাশাপাশি কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করছে। প্রতিনিধি দলটি গত মঙ্গলবার কোরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা, শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। গতকাল বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কীভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন দুইপক্ষ। কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগের সঙ্গে কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (কেএক্সিম) অর্থায়ন যুক্ত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়। কোরীয় ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে এ ধরনের বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
উল্লেখ্য, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল হলো সরকারের মালিকানাধীন বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল। দেশের আর্থিক সম্পদ থেকে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা অর্জন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এ তহবিলের অর্থ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৭ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে এ ধরনের তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তা বাতিল করা হয়।
কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়নের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের ৩০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি পর্যালোচনা করেছে দুইপক্ষ। এ কাঠামোর আওতায় কয়েকটি অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ রুট, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ সংগ্রহ।
ইডিসিএফের অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহারে বাংলাদেশ একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার মতো নতুন খাতে অর্থায়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। কেএক্সিম জানিয়েছে, ইডিসিএফের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে।
কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় ভাইস মিনিস্টার চ্যাং হুহর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদন, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগের মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে কোরিয়ার কারিগরি সহায়তার বিষয়টিও স্বাগত জানানো হয়। এ উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ
এআই সহযোগিতার ক্ষেত্রেও আলোচনা হয়েছে। এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরির বিষয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন ও সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এআই ও ডেটা সেন্টার হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
কোরিয়ার বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। রুফটপ ও বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।


