লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি মুক্তিপণ আদায়কারী ও হুন্ডি চক্রের ৩৪ জনের সম্পদ জব্দ

ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে লোকজনকে লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন করত একটি চক্র। পরে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে সেই অর্থ জমা রাখা হতো বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে চক্রটির ৩৪ ব্যক্তির ১১১টি ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এসব ব্যাংক হিসাবের মধ্যে দেড় কোটি টাকা জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি চক্রটির স্থাবর সম্পত্তি দেখভালের জন্য নড়াইলের জেলা প্রশাসককে রিসিভার (তত্ত্বাবধায়ক) নিয়োগ করা হয়েছে। সিআইডি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় ও হুন্ডির সঙ্গে ৩৪ জন জড়িত। তাদের মধ্যে কাজী বিল্লাল, রাব্বানী ফরাজিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিরা দেশে-বিদেশে পলাতক।

চক্রের যেসব সদস্যকে পুলিশ খুঁজছে, তারা হলেন– চাঁপাইনবাবগঞ্জের জুয়েল আলী, তোজাম্মেল হক; নওগাঁর মঙ্গলবাড়ির গৌরী রাণী মোহন্ত; মাদারীপুরের শিপু কবিরাজ; কুমিল্লার আছমা বেগম, আব্দুল্লাহ আল নোমান, কাজী বিল্লাল হোসেন ও নুসরাত শাহিন ইতি; কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হানিফ মিয়া; রংপুরের জিয়াউর রহমান; চট্টগ্রামের রেজাউল করিম; খুলনার তাওহিদুল ইসলাম, সামিম সানা ও আবদুল হাই; নড়াইলের সাতবাড়িয়ার আওয়াল ফরাজি, রুবেল ফরাজি, মিনা বেগম, আলাউদ্দিন, রবিউল ইসলাম, রাকিবুল, আইয়ুব আলী ও রুহুল আমিন; যশোরের অভয়নগরের আরশাদ আলী; নীলফামারীর ডিমলার নুরুল ইসলাম, মিনা আক্তার, সহিদুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান, রিপন মিয়া, ফেরদৌস ওয়াহেদ, আব্দুর রহিম, আব্দুস সালাম, মোহাম্মদ আলী শেখ ও মুরাদ মোল্লা।

সিআইডির সূত্র বলছে, যেসব ব্যাংক হিসাবে মুক্তিপণের অর্থসহ অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে জুয়েল আলীর ২৩টি হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর মালিকানাধীন জে কে এন্টারপ্রাইজের চারটি, মিতু গার্মেন্টসের আটটি এবং নিজের নামে ১১টি হিসাব রয়েছে। তাঁর একটি হিসাবে জমা হয়েছে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪ হাজার ২৩১ টাকা। এর মধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে ৮ কোটি ৩২ লাখ ৯ হাজার ৮৮২ টাকা।

তদন্ত সূত্র বলছে, তাঁতীবাজারের কাজী গোল্ড হাউস নামে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কাজী বিল্লালের নির্দেশে তাওহিদুল ইসলাম ও সামিম সানা সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের কাছ থেকে বিদেশি মুদ্রা গ্রহণ করতেন।

এরপর কাজী গোল্ড হাউসের মাধ্যমে প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হতো।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা লিবিয়ায় আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের মুক্তির বিনিময়ে অর্থ আদায়ের জন্য কয়েকটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট হিসাব নম্বর ব্যবহার করেছেন। একই সঙ্গে লিবিয়ার মুদ্রা ও ডলার স্থানান্তরে হুন্ডির আশ্রয় নিয়েছেন। এসব লেনদেনে প্রতি এক লাখ টাকায় ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা কমিশন দেওয়া হতো। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাব ব্যবহারে তাদের প্ররোচিত করেছেন। সব মিলিয়ে তদন্তে ৩৪ অভিযুক্তের মালিকানাধীন ১৮টি প্রতিষ্ঠান অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সিআইডির একটি সূত্র বলছে, লিবিয়া ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় আলাউদ্দিন-আওয়াল চক্রের সদস্যরা সক্রিয়। ১২ বছর আগে আলাউদ্দিন লিবিয়ায় যান। পরে আওয়ালের সঙ্গে মানব পাচারে যুক্ত হন। লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের আটকে রাখা, মুক্তিপণ আদায় এবং দেশের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন আলাউদ্দিন।

সূত্রটি আরও বলছে, চক্রের সদস্যরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নিতেন। পরে তাদের আওয়াল ও আলাউদ্দিনের কাছে লিবিয়ায় পাঠানো হতো। এরপর ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করত চক্রের সদস্যরা।

তদন্তে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, লিবিয়ায় শতাধিক ক্যাম্প রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্যাম্পে মানুষকে জিম্মি করে নির্যাতন করা হয়। জিম্মি ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ৫ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর