দেশের বিরুদ্ধে আবার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দমিয়ে রাখতে চায়; তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো এবারও তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের ভেতরে বা বাইরে সব ষড়যন্ত্র আমরা শেষ করে দেব। কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত ‘সার্বভৌমত্ব’ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের সার্বভৌমত্ব র্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি হোক গণতন্ত্র রক্ষার দিন।
এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে স্লোগান ধরে বলেন– ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কেনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ। আসুন, আমরা আমাদের অসমাপ্ত বিপ্লব শুরু করি আজ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে আনে নাই; দেশের মানুষ স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে; দেশের মানুষের অংশগ্রহণে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।’
বক্তব্য শেষ করে প্রধানমন্ত্রী হেঁটে র্যালিতে যোগ দেন। এ সময় তিনি হাত উঁচিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছে সমাপনী বক্তব্য দেন।
বিএনপির এ কর্মসূচি ঘিরে দুপুর ১২টা থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন। তাদের হাতে ছিল লাল-সবুজ পতাকা এবং জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আলোকচিত্র-সংবলিত প্ল্যাকার্ড।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জিয়া উদ্যানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এরপর আর্মি স্টেডিয়ামে ক্যাডেট ও স্কাউটদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে উপভোগ করেন। সেখান থেকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশে যোগ দেন। পরে নয়াপল্টন থেকে বিএনপির শোভাযাত্রায় যোগ দিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন তিনি। সন্ধ্যায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দিবসটি উপলক্ষে কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
পরাজিতরা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কর্মসূচির সমাপ্তির আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে যারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত, তাদের জনগণ বারবার পরাজিত করেছে। আবারও তারা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আসুন, এই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করব– এটাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রতিজ্ঞা।
তিনি বলেন, যতদিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন এই বিপ্লবের র্যালি চলমান থাকবে।
ছয় কিলোমিটার হাঁটলেন প্রধানমন্ত্রী
সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থেকেও প্রটোকল ও আনুষ্ঠানিকতার বলয় ভেঙে রাজপথে হাজারো নেতাকর্মীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই পুরো পথে প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে হাতে নেড়ে শুভেচ্ছা জানায়। উঁচু উঁচু দালানেও উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে।
শোভাযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যসহ সর্বস্তরের নেতারা অংশ নেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছে সমাপনী বক্তব্য দেন। শোভাযাত্রাটি কাকরাইল মোড়, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের পাশ দিয়ে রমনা পার্ক সড়ক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় হয়ে বাংলামটর, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আমান, ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু প্রমুখ।
৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ম্যাগনা কার্টা
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল সকালে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) ক্যাডেট ও স্কাউটদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ডিসপ্লে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিএনসিসি, ক্যাডেট ও স্কাউটদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের ম্যাগনা কার্টা বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর হলো স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ম্যাগনা কার্টা। দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী; যারা এই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন, নাগরিক হিসেবে সবার একটাই পরিচয়– আমরা বাংলাদেশি। এই পরিচয় আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আমাদের বাংলাদেশি পরিচয় নির্ধারণের জন্য ভিত্তিভূমিও রচনা করেছিল। সুতরাং যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিএনসিসির তিন হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। তিন পর্বে সাজানো হয় ডিসপ্লে অনুষ্ঠান। প্রথম পর্বে রণাঙ্গনের যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা জিয়াউর রহমানের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। দ্বিতীয় পর্বে খালেদা জিয়ার আপসহীনতার অনির্বাণ যাত্রা এবং তৃতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের পরম্পরা ফুটিয়ে তোলা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। অনুষ্ঠান শেষে চমৎকার পরিবেশনার জন্য ক্যাডেট ও স্কাউটদের ধন্যবাদ জানান তিনি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সচিব এবং সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জিয়া ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মী
দিবসটি উপলক্ষে দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে অবস্থিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতির প্রেস উইংয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ সময় রাষ্ট্রপতি তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর জিয়া উদ্যানে যান। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দুই নেতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তারা ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে নেতাকর্মীরা দুই সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।


